Latest News

চা-ওয়ালা, চপ-ওয়ালাদের অসম্মান করছেন কেন

অমল সরকার

বছর কুড়ি-বাইশ আগে আমহার্স্ট স্টিটের কর্মস্থলে যাতায়াতের পথে প্রায়ই সূর্য সেন স্ট্রিট ধরতে হত। বিকাল হলেই ভিড় জমে যেত ওই রাস্তায় দুটি দোকানে। একটির সাইনবোর্ডে লেখা ছিল বিশুদ্ধ তেলেভাজা (fried pokoras)। আর একটিতে লেখা ছিল বিশুদ্ধ তেলে ভাজা। আমরা সহকর্মীরা মাঝমধ্যে টস করে ঠিক করতাম কোন দোকানের তেলেভাজা খাব। ভিড় দেখেই যদিও বোঝা যেত, মানে ও দামে কোনওটা কারও থেকে কম নয়। আরও একটি মিল লক্ষ্য করতাম। কেউ একটু তাড়া দিলে ভারী গলায় জবাব আসত, ‘তাড়া থাকলে চলে যান।’ অনেক সময়ই সাদামাটা কথাটা অভদ্রতার মাত্রা ছাড়িয়ে যেত (insult)। ভাল লাগত না। এক-দু’দিন বিরক্তি প্রকাশ করে চলে এসেছি। কিন্তু একটি বিষয়ে উপলব্ধি করেছিলাম, লক্ষ্মীর আশীর্বাদ না থাকলে দিনের পর দিন অমন মেজাজি থাকা যায় না। পরে শুনেছি, তখনকার দিনে ওই দোকানিরাই ছিলেন এলাকার সবচেয়ে বিত্তবান।

প্রায় একই রকম ব্যবহার পেয়েছি কোন্নগর ফেরিঘাটে বাটার দোকানের পাশের গলির দোকানটিতে। সন্ধ্যা নামার আগেই সেখানেও তুমুল ভিড় লেগে যেত। ভিড় সামলাতে দোকানি মাঝেমধ্যে মুখঝামটা দিতেন। দু-দণ্ড অপেক্ষা করলে অবশ্য টের পাওয়া যেত, ব্যবসার জোর। কলকাতা ও কোন্নগরের এই তেলেভাজা বিক্রেতারা আয়কর দিতেন কি না জানা হয়নি। আয়কর মিটিয়ে থাকলে করদাতার তালিকায় নিশ্চয়ই উপরের দিকে নাম ছিল ওঁদের। কিন্তু তাতে কী! চপওয়ালাই তো বটে। চপের ঠোঙাটি হস্তগত করার পর অনেক ক্রেতাকেই বলতে শুনেছি, ‘বেচিস তো চপ। তার আবার এত গলাবাজি।’

দুই চপ বিক্রেতার কথা মনে পড়ল বাঙালির এই অত্যন্ত প্রিয় খাবারটি নিয়ে চারপাশের আলোচনা কানে আসায়। চপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চা (tea), ঘুগনি, আলুর দম, ফুচকা ইত্যাদিও। প্রখ্যাত সাংবাদিক বরুণ সেনগুপ্তর সঙ্গে বহু বছর চাকরি করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। সহকর্মীদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া ছিল তাঁর হবি। রবিবার একটি নির্ধারিত আড্ডার আসরে থাকত চপ-মুড়ি। বর্তমান কাগজ বাইপাসে প্রাসাদসম হোয়াইট হাউসে উঠে যাওয়ার পরও বরুণবাবু এই ধারা বজায় রেখেছিলেন।

প্রায়ই তিনি শহরের দীর্ঘদিনের চপ বিক্রেতাদের লড়াই ও সাফল্যের কাহিনি শোনাতেন। বহু চপ-চা-ফুচকা-জিলিপি-পাঁপড় বিক্রেতার তিন পুরুষের কাহিনি জানতেন। মাঝে মধ্যেই তাঁদের কথা বলতেন। একদিন বললেন, জানো, অমুক ফ্ল্যাট বাড়িটা যে প্রমোটার বানাচ্ছে ওই ছেলেটার দাদু বাড়ির গলিতে চা-চপ-ঘুগনি-আলুরদম বেচতেন। পরে ওঁর ছেলে দোকানের হাল ধরে। নাতিকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়িয়েছে ওই দোকানের রোজগারের টাকায়। চাকরি-বাকরি না পেয়ে শেষে প্রমোটিং শুরু করেছে। পুঁজিও জুগিয়েছে দাদুর সেই চা-চপের দোকান।

চায়ের প্রসঙ্গ এলে প্রধানমন্ত্রী (Prime Minister) নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) কথা না বললেই নয়। তিনি একটা সময় চা বেচতেন, বলেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীই। ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে দেশবাসীর কাছে তাঁর চা-ওয়ালা (tea seller) পরিচয় ফলাও করে প্রচার করেছিল বিজেপি (BJP)। ‘চায়ে পে চর্চা’ ছিল প্রচারের মস্ত বড় আয়োজন। গর্ব করে বিজেপি নেতারা বলতেন, এই প্রথম একজন চা-ওয়ালা দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন।

সেই নরেন্দ্র মোদী পাঁচ বছর দেশের প্রধানমন্ত্রী থাকার পর ২০১৯-এর লোকসভা ভোটের মাস কয়েক আগে এক অনুষ্ঠানে বেকারদের পকোড়া বিক্রির পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, ‘এতে দিনে অন্তত দুশো টাকা রোজগার করা সম্ভব।’ সে কথা নিয়ে উত্তাল লোকসভায় কংগ্রেসের আক্রমণের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী অন্যায়টা কী বলেছেন! বেকার থাকার থেকে পকোড়া বিক্রি করা ভাল।’

প্রধানমন্ত্রীকে কংগ্রেস এখনও পকোড়া নিয়ে খিল্লি করে থাকে। এবারও, ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে যুব কংগ্রেসের নেতা-কর্মীরা পকোড়া ভেজে প্রতিবাদ জানান।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগেই চপের কথা বলেছিলেন। দিন কয়েক আগে বলেছেন চা বিক্রির কথাও। তাঁকে খিল্লি করতে বিজেপির বিধায়কেরা বিধানসভায় চা, চপ, ফুচকা ইত্যাদি বিক্রির আয়োজন করে। তাঁরা সম্ভবত দলের দুই প্রাতঃস্মরণীয় নেতা নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহের কথা ভুলেই গিয়েছিলেন। ভুলে গিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রী একদা চা-বিক্রেতা ছিলেন।

ফুচকার প্রসঙ্গ যখন এলই তখন বলে নেওয়া যাক, করোনার সময় মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া এক ফুচকাওয়ালা এবং ফুচকাওয়ালির কথা। তাঁরা সম্পর্কে ভাই-বোন। খড়দহের বাসিন্দা তরুণের মহামারীর সময়ে বেসরকারি সংস্থার চাকরিটি চলে গিয়েছিল। পড়া বন্ধ হয়ে যায় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া তরুণীরও। পরিবারের পাশে দাঁড়াতে ভাই-বোন মিলে খুলে বসে ফুচকা পার্লার। শুনেছি, সম্প্রতি পূর্ব কলকাতায় একটি আউটলেট খুলেছেন তাঁরা।

Image - চা-ওয়ালা, চপ-ওয়ালাদের অসম্মান করছেন কেন

ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ তরুণ-তরুণীর ফুচকা পার্লার খুলে বসার কাহিনি অনুপ্রেরণা হিসাবে দেখেছিল সমাজ। এজন্য অবশ্য প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী, কারও অনুপ্রেরণাই তাঁদের ওই সিদ্ধান্তের পিছনে কাজ করেনি। সিদ্ধান্তটি ছিল পরিস্থিতিজনিত। যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য নির্দিষ্ট করে কারও দিকেই আঙুল তোলার উপায় ছিল না তখন। সেই ভাই-বোনেরা সমাজকে শিক্ষা দিয়েছিল, বসে না থেকে কিছু করো। সমস্যা, সঙ্কটকে ফেস করো।

করোনার সময় অফিসে যাতায়াতের পথে আমি এক তরুণীকে রাস্তার পাশে টুলের উপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে ডিম বিক্রি করতে দেখেছি। খোঁজ নিয়ে জানলাম, সে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া। করোনাকালে বাবার বেতন অর্ধেক হয়ে গিয়েছে। পরিবার বলেনি, মেয়েটি নিজেই সিদ্ধান্ত নেয়, তিন ডজন ডিম নিয়ে রাস্তার ধারে বসে পড়ে। পুঁজি দু’শো টাকা।

অনেক দিনই ভেবেছি, পাঁচজনকে জানাব মেয়েটির লড়াইয়ের কথা। কিন্তু বাদ সাধে এক ডিম বিক্রেতার স্মৃতি। ভ্যানগাড়ি বোঝাই ডিম এনে পাড়ার দোকানে সাপ্লাই দিতেন। বছর তিরিশ-পঁয়ত্রিশ আগে পাড়ার গলিতে একমাত্র তাঁকেই দেখতাম টাকা গুনতে গুনতে হাঁফিয়ে উঠছেন। পাড়ার পুজো, উৎসব-অনুষ্ঠানে মোটা টাকা চাঁদা দিতেন। ওপারে কলেজে ভর্তির মুখে এপারে চলে এসেছিলেন। একদিন কথায় কথায় বলেছিলেন, শুরুতে পুঁজি বলতে ছিল এটা-ওটা করে জমানো সামান্য ক’টা টাকা।

কিন্তু তাঁকে, চারপাশে অন্য কাউকেও তখন আক্ষেপ করতে শুনিনি, ‘কী অবস্থা! হাইস্কুল পাশ ছেলে ডিম বিক্রি করে।’ সেই ভদ্রলোকের কথা মনে পড়তে মনে হল, তরুণীর ডিম বিক্রিকে আর ‘বিশেষ খবর’ মনে হয়নি, পাছে তাতে পেশাটাকেই খাটো করা হয়। হয়তো ধারণা হবে, ডিম বিক্রি শিক্ষিত মানুষের কাজ নয়।

মুখ্যমন্ত্রী পুজোর দিনগুলিতে অল্প পুঁজি খাটিয়ে দু-পয়সা রোজগারের যে উপায় বাতলেছেন বহু বছর ধরেই বেকার ছেলেমেয়েরা তা করে আসছে। বলা হয় বাঙালি ব্যবসা বিমুখ। কথাটির সত্য-মিথ্যা নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা হওয়া জরুরি। ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ বলতে পারি, গণেশ নয়, দুর্গাপুজোই শিক্ষিত বাঙালি তরুণ সমাজের ব্যবসায় হাতেখড়ি হয়ে থাকে চা-চপ-রোল-চাউমিন-শাড়ি-সাজগোজের সামগ্রী আরও কত কিছু বিক্রি দিয়ে। বাঙালির ব্যবসা গুজরাতি, মারোয়াড়ি, তামিল, মারাঠির মতো সাফল্যের মুখ দেখে না পুঁজির অভাবে। তাছাড়া, আমরা আসলে ধরেই নিয়েছি, ‘ভুজিওয়ালা’, ‘নমকিনওয়ালা’ না হলে ঠিক জাতে ওঠা হল না।

দুর্গাপুজোকে ইউনেসকোর হেরিটেজ তকমা দেওয়ার পিছনে উৎসবের অর্থনৈতিক অবদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। উৎসব মাত্রেই আর্থিক লেনদেন। বছর তিন আগে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও ব্রিটিশ কাউন্সিলের যৌথ উদ্যোগে তৈরি রিপোর্টে বলা হয়, পুজো ঘিরে মাস দেড়-দুইয়ের মধ্যে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হয় বাংলায়। তাতে খাবারদাবারে লেনদেন হয় তিন হাজার কোটির কাছাকাছি, যার ৬৫ শতাংশই হল স্ট্রিট ফুড সহ নানা অসংঘঠিত উদ্যোগে বিক্রিবাট্টা। যার মধ্য আছে চা, চপ, তেলেভাজা, ফুচকা, আলুর দম, রোল, চাউমিনের রোড সাইড স্টল, কিয়স্ক ইত্যাদি।

সপ্তমীতে মিলতে পারে বেশ কিছু সুখবর, হাতছাড়া হবে চালু সুযোগও

রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলের এক ছাত্রী চপ বিক্রির ব্যবসা নিয়ে একটি ছোট সমীক্ষা করেছেন। তা নিয়ে ‘চপের ভূগোল-ভূগোলে চপ এবং মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণা’ জাতীয় চর্চরি বিতর্ক দেখা দিয়েছে। ছাত্রীর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চপ বিক্রির ব্যবসায় কর্মসংস্থান এবং আয়ের নানা ইতিবাচক দিক। আছে সমস্যার দিকগুলিও। তার একটি হল, এই ক্ষুদ্র ব্যবসাতেও লিঙ্গ বৈষম্য বিরাজ করে। একই পরিমাণ ব্যবসায় নারী উদ্যোক্তার আয় পুরুষের তুলনায় কম। পরিচ্ছন্নতা রক্ষা, পরিষেবার মানের উন্নতি বিষয়ে কিছু সুপারিশ আছে এই ব্যবসার শ্রীবৃদ্ধিতে যা কাজে আসতে পারে।

আসলে আমরা অনেকে জানি না, জেনেও না বোঝার ভান করি, যে হোটেল ম্যানেজমেন্ট মানেই ম্যানেজার, এক্সিকিউটিভ নয়। খাবার রান্না, পরিবেশন, ঘর গোছানো থেকে টয়লেট পরিস্কার, সবই তার অংশ। হোটেলে এই কাজটা করার সময় নির্দিষ্ট ইউনিফর্ম পরতে হয়। সেখানে কোট-প্যান্ট-টাই-শু সব পদেই মাস্ট। এয়ার হোস্টেজের যে ভূমিকা প্যাসেঞ্জারেরা চাক্ষুষ করেন তার সঙ্গে বাড়ির কাজের লোকের কাজের ফারাকটা কী?

তবু সুযোগ পেলেই আমরা নিজের পেশার গুরুত্ব জাহির করতে গিয়ে অন্য পেশাকে খাটো করি। সাংবাদিকতায় আমার হাতেখড়ি খবরের কাগজে পাঠকের কলমে। প্রথম ছাপা চিঠিটির বিষয় ছিল ডাক্তারদের আলু-পটল বিক্রির প্রতিবাদ। সাড়ে তিন দশক আগে চিকিৎসকদের ক্রেতা সুরক্ষা আইনের আওতায় আনার প্রতিবাদে তাঁরা অ্যাপ্রন পরে, গলায় স্টেথো ঝুলিয়ে হাসপাতালের গেটে আলু-পটল বিক্রি করেছিলেন। একবারও মনে রাখেননি, আলু, পটল বিক্রিও একটি সম্মানজনক পেশা, ব্যবসা। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে।

ডাক্তারদের কথাই বা শুধু বলি কেন? প্রধানমন্ত্রীর ‘পকোড়া-পরামর্শ’-কে বিদ্রুপ করতে গিয়ে দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের বাম ছাত্র নেতা শ্রেণি-রাজনীতির মুরুব্বি কানাহাইয়া কুমার ক্যাম্পাসে উনুন জ্বালিয়ে পকোড়া ভাজার আয়োজন করেছিলেন।

অবশ্য মুখ্যমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর বেকার ছেলেমেয়েদের চপ, পকোড়া বিক্রির পরামর্শ দেওয়ার নৈতিক অধিকার আছে কিনা সে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার নয়। দু’জনেই কথায় কথায় কোটি কোটি চাকরি-কর্মসংস্থানের কথা শোনান। এ রাজ্যে নিয়োগ কেলেঙ্কারি শুধু শিক্ষা দফতরেই সীমাবদ্ধ বলে মনে হয় না। হাজার হাজার শিক্ষিত বেকারের ন্যায্য চাকরি খেয়ে নেওয়া সরকারের মুখ্যমন্ত্রী, চাকরি, কর্মসংস্থানের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি বিলোনো প্রধানমন্ত্রী চপ-পকোড়া বিক্রির পরামর্শ দিলে রাজনীতির ভাষাতেই তাঁদের জবাব দেওয়া যায়, উচিতও বটে। অনুগ্রহ করে পেশা, উদ্যোগগুলিকে খাটো করবেন না। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন চপ শিল্প, চপ কি একটা শিল্প! মুখ্যমন্ত্রীর কথাকে খানিক শুধরে নিয়ে আমরা ‘অতিক্ষুদ্র শিল্প’ কথাটি ব্যবহার করতে পারি। অনুগ্রহ করে চপ বিক্রেতাকে অসম্মান করবেন না।

You might also like