Latest News

বাঁকুড়ার ঘোড়াকে কি বিষ্ণুপুরের কবিরা আর নিজেদের সম্পদ ভাববেন না?

অংশুমান কর

এক ধাক্কায় সাতটি নতুন জেলা (New District Division) তৈরি করার কথা ঘোষণা করেছেন মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী। ঘোষণাটি প্রকাশ্যে আসার সঙ্গে সঙ্গেই সামাজিক মাধ্যমে এক অংশের মানুষ জেলা-ভাগ নিয়ে তাঁদের ক্ষোভ উগরে দিতে শুরু করেছেন। বাঁকুড়া (Bankura) জেলার বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ আবার কেবল ক্ষোভ উদ্‌গীরণ করেই ক্ষান্ত হননি। জেলা ভাগ রুখতে বৃহত্তর আন্দোলনে যাওয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। নতুন একটি জেলা পেয়েছেন, তাও তাঁরা ক্ষুব্ধ। এই ক্ষোভের কারণ কী?

Image - বাঁকুড়ার ঘোড়াকে কি বিষ্ণুপুরের কবিরা আর নিজেদের সম্পদ ভাববেন না?

স্বাধীনতার পরে পশ্চিমবঙ্গে জেলার সংখ্যা ছিল মাত্র চোদ্দো। গত শতাব্দীর পাঁচের দশকেই জেলার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া শুরু হয়। প্রথমে কোচবিহার এবং পরে পুরুলিয়া অন্তর্ভুক্ত হয় পশ্চিমবঙ্গের। মনে রাখতে হবে যে, এই সংখ্যাবৃদ্ধির পেছনে কিন্তু জেলা-ভাগের দায় ছিল না। সংখ্যাবৃদ্ধি পেয়েছিল নতুন স্থান দু’টি জেলা হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায়। পরে অবশ্য জেলা বিভাজনের ফলেও জেলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরেও নতুন জেলা তৈরি হয়েছে বেশ কয়েকটি। তবে এক ধাক্কায় এভাবে সাতটি নতুন জেলার জন্মলাভ পশ্চিমবঙ্গ আগে কখনও দেখেনি।

সামাজিক মাধ্যমে এই যে জেলা-ভাগ নিয়ে শোরগোল শুরু হয়েছে, এর একটি বড় কারণ এতগুলি নতুন জেলা পাওয়ার জন্য পশ্চিমবঙ্গের মানুষ প্রস্তুত ছিলেন না। এর আগে যতবারই জেলা-ভাগ করা হয়েছে, জেলা-ভাগের সিদ্ধান্তের কথা যে-জেলাগুলি ভাগ হতে যাচ্ছে, সেই জেলার মানুষেরা অগ্রিম জেনেছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁরা জেলা-ভাগকে সমর্থনও করেছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ জেলা-ভাগের দাবিও তুলছিলেন দীর্ঘদিন ধরেই। কাজেই অতীতে জেলা যখন বিভক্ত হয়েছে তখন মানুষ সেই বিভাজনকে অধিকাংশ সময়েই দেখেছেন তাঁদের আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন হিসেবে। এইবার কিন্তু তা হয়নি।  হঠাৎ করেই এই জেলাভাগের সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। এই নীল আকাশ থেকে বিনা মেঘে হঠাৎ করে নেমে-আসা বজ্রের ধাক্কা তাই এবার অনেককেই খানিকটা হতবুদ্ধি করে দিয়েছে বই কী!

স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগের দুর্নীতি থেকে দৃষ্টি ঘোরাতেই তড়িঘড়ি এই জেলা-বিভাজনের সিদ্ধান্ত কি না—সেই বিতর্কে প্রবেশ না করাই ভাল। জেলা বিভাজন যে একটি জরুরি এবং অনিবার্য প্রক্রিয়া এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। ভারতবর্ষেরই একাধিক রাজ্যে জেলার সংখ্যা আমাদের রাজ্যের জেলার সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। জেলা ভাগ হলে প্রশাসনিক কাজের যেমন সুবিধে হয়, তেমনই সরকারি পরিষেবাও সহজে পান মানুষ। সুন্দরবন একটি নতুন জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে যে ওই অঞ্চলের মানুষদের প্রভূত সুবিধে হবে, সামগ্রিকভাবে এলাকাটির উন্নতি দ্রুতি পাবে এ নিয়েও সংশয় নেই।

কিন্তু এই যুক্তি বাঁকুড়া জেলা যেভাবে ভাগ করা হল, সেই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে খাটে কি? বাঁকুড়া জেলার মোট আয়তন ৬৮৮২ বর্গকিমি। সেখানে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার মোট আয়তন ৯৯৬০ বর্গকিমি। কাজেই যে-যুক্তিতে সহজেই দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলাকে ভাগ করা যায়, সেই একই যুক্তিতে বাঁকুড়া জেলাকে ভাগ করা যায় কি? বাঁকুড়া জেলাকে ভাগ করে যে-নতুন জেলাটি তৈরি করা হচ্ছে সেটি বিষ্ণুপুর। এখনও পর্যন্ত যেটুকু জানা গেছে তাতে বিষ্ণুপুর মহকুমাটিই হয়ে যাচ্ছে বিষ্ণুপুর জেলা। তাই-ই যদি হয় তাহলে এই নতুন জেলাটির আয়তন হবে মাত্র মাত্র ১৮৭০ বর্গকিমি। 

স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে এই বিভাজনের আদৌ কোনও প্রয়োজন ছিল কিনা। প্রায় একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে মুর্শিদাবাদ বা নদিয়া জেলার ক্ষেত্রেও। জেলা-ভাগের ক্ষেত্রে এইবার আরও একটি বিষয়ও বড় হয়ে উঠেছে, তা হল জেলার নাম। উত্তর ২৪ পরগনা ভেঙে ‘ইছামতী’ যদি একটি জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, নামটি শুনতে যতই সুন্দর হোক না কেন, অনেকেই আপত্তি জানাবেন, স্থলভাগের সঙ্গে নামটির সংযোগের অভাবে। পশ্চিমবঙ্গে আর এমন একটিও জেলা নেই যেটির নামের সঙ্গে স্থলভাগের কোনও সংযোগ নেই।

তবে, সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদের ধরনটি খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যাবে যে, এখনও পর্যন্ত জেলা-ভাগ নিয়ে প্রতিবাদ আসছে মূলত সংস্কৃতি কর্মীদের কাছ থেকে। এর একটা বড় কারণ হল এই যে, একটি জেলার প্রাকৃতিক সম্পদ বা মানব সম্পদের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হল সেই জেলাটির সাংস্কৃতিক সম্পদ। এই সাংস্কৃতিক সম্পদের ওপর জেলার মানুষের একটি অধিকারবোধ থাকে। যেমন, বাঁকুড়া জেলার এক কৃতী সন্তান সুভাষ চক্রবর্তীর একটি বিখ্যাত গান ‘বাঁকুড়ার মাটিকে পেন্নাম করি দিনেদুপুরে’। এই গানটিতে যেমন বেলিয়াতোড়ের বাসিন্দা সুভাষ চক্রবর্তী অহং বোধ করছেন বেলিয়াতোড়েরই শিল্পী যামিনী রায়কে নিয়ে, তেমনই এই গানেই উল্লেখ রয়েছে বাঁকুড়া শহরের রামকিঙ্কর বেইজ, ছাতনার চণ্ডীদাস আর বিষ্ণুপুরের জ্ঞান গোঁসাইয়ের। ভুলে গেলে চলবে না যে, একটি জেলার মানুষ যেমন প্রশাসনিক সুবিধে চান তেমনই উপভোগ করতে চান সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের অহংটুকুও।

বিষ্ণুপুর নতুন জেলা হচ্ছে। একদা বিষ্ণুপুর-নিবাসী প্রয়াত চারণ কবি বৈদ্যনাথের একটি বিখ্যাত কবিতা আছে বাঁকুড়ার ঘোড়াকে নিয়ে। সেই কবিতায় বৈদ্যনাথ লিখেছিলেন, “বাঁকুড়ার ঘোড়া তোকে কে করেছে সৃষ্টি?/চারপায়ে ছুটে যাস্‌…কত যে তেপান্তর/শিল্পীর হাতে-গড়া বাংলার কৃষ্টি/শুধু নোস পোড়ামাটি—কত বড় অন্তর!” 

যামিনী রায় বা রামকিঙ্কর বেইজের মতোই বাঁকুড়ার ঘোড়া বাঁকুড়া জেলাকে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি দিয়েছে। সেই ঘোড়াকে নিয়েই কবিতা লিখেছিলেন বৈদ্যনাথ, যদিও এই ঘোড়া মূলত তৈরি হয় পাঁচমুড়া গ্রামে, যা কিনা খাতড়া মহকুমার অন্তর্গত। আগামী দিনে বিষ্ণুপুরের কোনও তরুণ কবি তাহলে কি আর বাঁকুড়ার ঘোড়াকে নিজেদের সাংস্কৃতিক সম্পদ ভাববেন না?

বৈদ্যনাথের কবিতাটি ফিরে পড়লে দেখা যায় যে, বাঁকুড়ার ঘোড়া তেপান্তর পেরিয়ে গেলেও, ‘বাংলার কৃষ্টি’ হলেও শেষমেশ তা ‘বাঁকুড়া’রই ঘোড়া। আসলে সাংস্কৃতিক সম্পদের ওপর এই অধিকারবোধ ও সেই অধিকারবোধ-সঞ্জাত অহংকে আঘাত দিয়েছে নতুন এই জেলাভাগের সিদ্ধান্ত। তাই শোরগোল হচ্ছে। মানুষ যে কেবলই সুবিধালোভী, পণ্য-আর-অর্থদাস নাগরিক নন, নন কেবলই পরিষেবা-ভোক্তা বরং তার অতিরিক্ত কিছু— মানুষ যে সাংস্কৃতিক জীবও— এই কথাটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়েও কর্তাব্যক্তিরা স্মরণে রাখলে এ রাজ্যের মঙ্গল।

পুষ্পরেণু আঘ্রাণে যখন, না হয় দাঁড়ালে কিছুক্ষণ

You might also like