Latest News

পসমন্দা মুসলিম দরদ ও মোদীর রাবড়ি রাজনীতি

অমল সরকার

গত মাসের গোড়ায় হায়দরাবাদে বিজেপির জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) ভাষণে বলেন, শুধু হিন্দুদের স্বার্থ দেখলে চলবে না। অন্য ধর্মের নিপীড়িত, বঞ্চিতদের পাশেও থাকতে হবে আমাদের।

Image - পসমন্দা মুসলিম দরদ ও মোদীর রাবড়ি রাজনীতি

মোদীর কথাই এখন বিজেপির (BJP) কথা। মাসের শেষ রবিবার সকালে দলের নেতারা যে যেখানেই থাকুন না কেন, ‘মন কী বাত’ মনযোগ দিয়ে শোনা, ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ টুইট করা একপ্রকার বাধ্যতামূলক।

কিন্তু হায়দরাবাদে বলা মোদীর কথাটি নিয়ে প্রথম সারির মিডিয়া যতটা উত্তেজিত, বিজেপি ততটা নয়। বিজেপি নেতাদের বক্তব্য, মোদীজির ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা প্রয়াস’-এর মধ্যে সবটা বলা আছে। হায়দরাবাদে একেবারে নতুন কথা তিনি কিছু বলেননি।

প্রথম সারির মিডিয়ার ব্যাখ্যা ভিন্ন। তাদের বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রী গরিব মুসলিমদের কাছে টানার কথা বলেছেন। সেই সূত্রে পসমন্দা মুসলিমদের প্রসঙ্গ ঘুরে ফিরে আসছে।

ফারসি শব্দ পসমন্দার অর্থ হল পশ্চাৎপদ। দেশে ২৭ শতাংশ ওবিসি সংরক্ষণের প্রধান যে সুবিধার দিক রয়েছে তা হল, এই সুবাদেই প্রথম ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা সরকারি চাকরি ও শিক্ষায় কোটার সুবিধা পাচ্ছে। ওবিসি তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রধান মানদণ্ড যেহেতু অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতা, তাই ওই একটি মাত্র তালিকাতেই সংখ্যালঘু মুসলিমরাই দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ।
দেশে মুসলিমদের ৭০-৮০ ভাগই পসমন্দা শ্রেণিভুক্ত।

মিডিয়ার ব্যাখ্যা, নরেন্দ্র মোদী এই পসমন্দা মুসলিমদেরই কাছে টানার কথা বলেছেন এবং এর সম্ভাব্য ফলাফল বিরোধীদের জন্য বিপজ্জনক হতে চলেছে। কারণ, ধর্মনিরপেক্ষ শিবির যে সংখ্যালঘু ভোট ব্যাঙ্ককে হাতিয়ার করে এতদিন রাজনীতি করে এসেছে, এবার তাদের অস্তিত্ব আরও বিপন্ন হবে।

মোদীর কথাকে তাঁর ‘মন কী বাত’ ধরে নিলে এই পর্যবেক্ষণে কোনও ভুল নেই। পসমন্দা মুসলিমদের মোদী বুকে টেনে নিতে চান, নাকি কুমিরের সঙ্গে লড়াই করে জলে বাস করা কঠিন বুঝেই মুসলিমদের একাংশ বিজেপির দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছে, কোনটি প্রকৃত বাস্তব, এই অবকাশে বরং সে প্রশ্নের জবাব খোঁজার খানিক চেষ্টা করা যাক।

রাম মন্দিরের ভিত্তি প্রস্তর অনুষ্ঠানে মোদী। ফাইল চিত্র

সাংবাদিকতার সূত্রে ধর্ম এবং মণ্ডল-কমণ্ডল রাজনীতির গর্ভগৃহ উত্তরপ্রদেশ, বিহারে দীর্ঘ সময় ধরে যাতায়াতের সুবাদে বলতে পারি, সাচার কমিটির রিপোর্ট প্রকাশের পরেও মুসলিম এবং হিন্দুদের জনজাতি, পিছড়া, অতি পিছড়া বলে চিহ্নিত পশ্চাৎপদ অংশের জীবনযাত্রার মানের উল্লেখযোগ্য বদল হয়নি। তারপরও তারা বহু বছর বিজেপির দিকে ঝোঁকেনি। উত্তরপ্রদেশে মুলায়ম সিং যাদবের সমাজবাদী পার্টি, মায়াবতীর বহুজন সমাজবাদী পার্টি, খানিকটা কংগ্রেস, বিহারে লালুপ্রসাদের আরজেডির মতো দলগুলির সঙ্গেই ছিল।

২০০৬-এ সাচার কমিটির রিপোর্টের সুবাদে জানা গিয়েছিল, বাম শাসিত পশ্চিমবঙ্গেই মুসলিমরা সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে। পাশাপাশি এটাও সত্য, এই পশ্চাৎপদতাকে মেনে নিয়েই তাদের ৮০-৯০ ভাগ চোখ-কান বুজে বামফ্রন্টকে সমর্থন করত। কারণ, বাংলায় এবং অন্যত্রও এর প্রধান কারণ ছিল সুরক্ষা। বাবরি মসজিদ ভাঙা, সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের নানা প্রান্তে দাঙ্গা, তার জেরে দশ বছরের মাথায় ভয়ঙ্কর গুজরাত দাঙ্গা এবং বেশিরভাগ ঘটনাতেই সংখ্যালঘুদের জানমালের ক্ষতির মুখে সুরক্ষার নিশ্চয়তা তাদের ভাবিতে তোলে। বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভরসায় ২০১১-তে তারা বামফ্রন্টকে ত্যাগ করে। কিন্তু বিগত ১১ বছরে নানা ঘটনায় এ রাজ্যেও সুরক্ষার প্রশ্নটি ক্রমে সংখ্যালঘুদের কাছে চিন্তার হয়ে উঠছে।

Image - পসমন্দা মুসলিম দরদ ও মোদীর রাবড়ি রাজনীতি
বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ছবি। ফাইল চিত্র

এর পাশাপাশি অবিজেপি দলগুলি অস্তিত্ব সংকটের মুখে বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনীতিকেই আঁকড়ে ধরায় সংখ্যালঘুরা বুঝেছে, ভোট-রাজনীতিতে তাদের প্রাসঙ্গিকতা ফুরিয়ে আসছে।

মন্দির সফরে নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহদের থেকে কিছু কম যান না রাহুল গান্ধী (Rahul Gandhi)। বারাণসি সফরে একা নরেন্দ্র মোদীই বাবা বিশ্বনাথ মন্দিরে পুজো দিয়ে দায় সারেন না, অন্য দলের হিন্দু নেতারাও কেউ পারতপক্ষে জ্ঞানবাপী মসজিদে পা রাখেন না। মন্দিরে পুজো দেওয়ার দৃশ্য ফেসবুক লাইভ হয়, নেতা টুইট করেন, কিন্তু ইদে শুভেচ্ছা বিনিময়ের বালাই প্রায় উঠেই যাচ্ছে। কোলাকুলির ছবি প্রকাশ করতে অনেকেই দ্বিধান্বিত। রাজনীতিই এখন ধর্ম-পরিচয় জাহির করার সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম।

পুজো দিচ্ছেন রাহুল গান্ধী। ফাইল চিত্র

মোদী ও তাঁর দলের ‘মুসলিম প্রীতি’র তাজা দৃষ্টান্তটি হল হায়দরাবাদে দলের সেই বৈঠক সেরে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি ফেরার পরদিন। সেদিনই ইতি টেনে দেওয়া হল সংখ্যালঘু উন্নয়ন মন্ত্রকে মুক্তার আব্বাস নকভির মন্ত্রিত্বে। মোদীর দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় তিনিই ছিলেন একমাত্র মুসলিম মন্ত্রী। ফের রাজ্যসভায় যাওয়ার সুযাগও মেলেনি এই নেতার।

শুধু কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভাই নয়, দেশের যে ১৭টি রাজ্যে বিজেপি একক শক্তিতে সরকার চালাচ্ছে তার ১৬টিতে মন্ত্রিসভায় কোনও মুসলিম নেই। ‘সবকা সাথ’ স্লোগান দেওয়া বিজেপির লোকসভা ও রাজ্যসভা মিলিয়ে ৩৯৩ সাংসদ এবং ১৩৭৯ জন বিধায়কেরও মুসলিম নন একজনও।

রাজ্যসভার সাংসদদের মধ্যে নকভি ছিলেন একমাত্র মুসলিম সাংসদ। তাঁকে উপরাষ্ট্রপতি করার জল্পনায় তো আগেই ইতি পড়ে গিয়েছে।

বিচারপতি সাচারের কমিটির অন্যতম সুপারিশ ছিল সংসদে, বিধানসভায় মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি। কিন্তু দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিজেপির সংখ্যালঘু নীতির কারণে উল্টো পথে হাঁটছে দেশ।

এ বছর মার্চে ৩২৫ আসন বিশিষ্ট উত্তরপ্রদেশ বিধানসভার ভোটে বিজেপির একজনও মুসলিম প্রার্থী ছিলেন না। অমিত শাহের কথা অনুযায়ী, পাঁচ কোটি মুসলিমের রাজ্যে তারা কাউকেই বিজেপির প্রার্থী হওয়ার যোগ্য মনে করেননি। আর মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ তো ভোটের আগে এই কথাটি বলে যা বোঝানোর বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, ‘আশি ভাগ মানুষ (উত্তরপ্রদেশের জনসংখ্যার আশি শতাংশ হিন্দু) পাশে আছে। কুড়ি ভাগের (জনসংখ্যার সংখ্যালঘু অংশ) সমর্থন না পেলেও চলবে।’ আগের বারের মতো যোগীর এবারের সরকারেও একমাত্র মুসলিম মন্ত্রী বিধান পরিষদের এক সদস্য।

মুসলিম জনসংখ্যায় দ্বিতীয় স্থানে আছে অসম। হিমন্ত বিশ্বশর্মার মন্ত্রিসভাও মুসলিম মুখ বিহীন।

সংসদের ছবিটা কেমন? স্বাধীনতার ৭৫তম বর্ষপূর্তির সময় দেশে জনসংখ্যার ১৫ শতাংশ মুসলিমের সংসদে প্রতিনিধিত্ব থমকে ৪.৯ শতাংশে। শতাংশের হিসাবে সংসদে তারা সবচেয়ে বেশি, প্রায় নয় শতাংশ ছিলেন ১৯৮০-তে গঠিত লোকসভায়।

নরেন্দ মোদী গত আট বছরে দেশ উল্টো পথে ধাবিত। মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা, বিদ্বেষ ছড়ানো, সামাজিক বয়কট, হিংসার ঘটনায় বিচার-ব্যবস্থা, প্রশাসনের ধারাবাহিক নীরবতা সামাজিক বন্ধনকে নিষ্ক্রিয় করে তুলেছে।

হাথরাশ ধর্ষণের ঘটনা কভার করতে যাওয়া কেরলের সাংবাদিক সিদ্দিক কাপ্পান প্রায় দু’বছর জেলে বন্দি। দিনের পর দিন খারিজ হয়ে যাচ্ছে জামিনের আর্জি।

বিজেপি শাসিত রাজ্যে ‘বুলডোজার-বিচার’-এ মুসলিম প্রতিবেশী ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়ার ঘটনায় কয়েক প্রজন্মের নিকট হিন্দু প্রতিবেশী চুপ। উল্টো ঘটনা ঘটাও তাই অস্বাভাবিক নয়।

নুপুর শর্মা নিরুদ্দেশ। অথচ, মহম্মদ সম্পর্কে তাঁর অবমাননাকর মন্তব্যের জেরে প্রতিবাদে পথে নামা সংখ্যালঘুদের অনেকে এখনও বাড়িছাড়া—কেউ পালিয়ে বেড়াচ্ছে, কারও ঘর-বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মুহূর্তে গৃহহীন দুধের শিশু থেকে শয্যাশায়ী অসুস্থ প্রবীণ-সহ গোটা পরিবার। স্বাধীনতার ৭৫ তম বর্ষে ‘বুলডোজার বিচার’ আর ‘সপরিবার সাজা’—মোদীর ভারতে দেশবাসীর ‘বিশেষ প্রাপ্তি!’

এই আট বছরে যাদের জয় শ্রীরাম বলতে বাধ্য করা হল, দাঁড়ি, পোশাক দেখে পিটিয়ে মারা হল, গরুর মাংস নিয়ে ছুতোনাতা কারণে গণহত্যা করা হল, তারা কি পসমন্দা অর্থাৎ গরিব মুসলমান নয়?

Image - পসমন্দা মুসলিম দরদ ও মোদীর রাবড়ি রাজনীতি
উত্তরপ্রদেশে বিক্ষোভ। ফাইল চিত্র

লখনউ-সহ উত্তর ভারতের শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত সম্পন্ন মুসলিমরা বহুকাল বিজেপিকে ভোট দিয়ে আসছে। গুজরাত দাঙ্গার অভিজ্ঞতা থেকে সে রাজ্যের বণিক-সহ মুসলিমদের সব সম্প্রদায় বুঝে গিয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরিবাকরি করে শান্তিতে বাঁচতে হলে কুমিরের সঙ্গে বোঝাপড়া করে নেওয়াই ভাল। মুজফফরপুরের দাঙ্গার পর উত্তরপ্রদেশের মুসলিমরাও এই একই সত্য উপলব্ধি করতে শুরু করেছে।

উত্তরপ্রদেশ এবারের বিধানসভা ভোটের ফলাফল বিশ্লেষণ করে সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ ডেভেলপিং সোসাইটিস দেখিয়েছে, আট শতাংশ মুসলিম বিজেপি-কে ভোট দিয়েছে। তাদের সিংহভাগের সমর্থন সমাজবাদী পার্টি পেলেও বিএসপি এবং কংগ্রেস প্রায় মুছে যাওয়ায় একা অখিলেশের পক্ষে এক ভোট ধরে রাখা এখন কঠিন।

এই পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘু, বিশেষ করে মুসলিমদের প্রতি বিজেপি তাদের রাবড়ি রাজনীতি নিয়ে আরও সক্রিয় হয়ে উঠতে চাইছে। রাবড়ি তৈরিতে কড়াইয়ের নিচে আগুন আর উপরে বাতাস করতে হয়। উত্তরপ্রদেশ—পসমন্দা মুসলিমরা যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেখানে একদিকে আগুনের আতঙ্ক তৈরি করা হচ্ছে, অন্যদিকে, রেশন সামগ্রী-সহ সরকারি সুবিধাদি তাদের পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

নরেন্দ্র মোদী জানেন, এই হত-দরিদ্র মানুষগুলির আর ধর্ম আঁকড়ে থেকে তাঁর দল ও সরকারকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। কারণ, আতঙ্ক, সামাজিক বঞ্চনা, অবমাননা থেকে মুক্তি দিতে পাশে কেউ নেই। বাপ-ঠাকুদার ভিটে ছেড়ে তারা কোথায় যাবে!

কেন্দ্রে, ১৭টি রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায়। এখনই রব উঠেছে মোদী কম করে আরও পাঁচ বছর থাকবেন। এই বাস্তবতার মুখে পসমন্দা অর্থাৎ অতি পিছড়া মুসলিমদের বিজেপিকে আশ্রয় করা অসম্ভব নয়। মোদী সেটা জানেন, বোঝেন বলেই সত্যটাকে ঘুরিয়ে দিতে উল্টে ওদের কাছে টানার কথা বলেছেন। কে না জানে নিজের ভাবমূর্তি নিয়ে মানুষটি কতটা সচেতন। ‘মোদী ভাল, বিজেপি খারাপ’, জাতীয় একটা ধারণা ধীরে ধীরে তৈরি করা হচ্ছে।
আসলে ভালমানুষি হল মোদীর সবচেয়ে বড় মুখোশ!

‘সবচেয়ে অসুখী বোধ করছিলাম, শিক্ষাক্ষেত্রে প্রায় পুকুর চুরির মতো ব্যাপার ঘটছিল বলে’

You might also like