Latest News

আন্তর্জাতিক মঞ্চে মোদীর ব্র্যান্ডিং

নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) সত্যিই দেশে ‘আচ্ছে দিন’ আনতে পেরেছেন কিনা, সেই নিয়ে নানা মত থাকতে পারে, কিন্তু একটা বিষয় নিয়ে কোনও তর্ক হবে না। সেই বিষয়টা হল ব্র্যান্ডিং (Branding)। এক্ষেত্রে মোদী সকলকে টেক্কা দিয়েছেন। নিজের ব্র্যান্ডিং তিনি যেভাবে করেন, তা থেকে কর্পোরেট সংস্থাগুলিও শিক্ষা নিতে পারে। এবার জি ২০-র আন্তর্জাতিক মঞ্চকে তিনি নিজের ব্র্যান্ডিং-এর কাজে ব্যবহার করছেন। তা নিয়ে মৃদু সমালোচনাও হয়েছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে জি-২০ গোষ্ঠীর আদৌ কোনও গুরুত্ব আছে কি? ওই গোষ্ঠীর সভাপতিত্ব পাওয়ার জন্য মোদী এমন আহ্লাদে আটখানা হচ্ছেন কেন?

১৯৯৯ সালে মোট ১৯টি দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নকে নিয়ে গঠিত হয় গ্রুপ অব টোয়েন্টি। স্থির হয়েছিল, ওই গোষ্ঠী মূলত তিনটি লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবে। বিশ্ব জুড়ে আর্থিক স্থিতাবস্থা বজায় রাখা, দূষণ রোধ এবং পরিবেশ বান্ধব উন্নয়নে সাহায্য করা। উন্নত ও উন্নয়নশীল, উভয় ধরনের দেশই জি ২০-র সদস্য। বিশ্বে মোট বার্ষিক উৎপাদনের ৮০ শতাংশ আসে ওই দেশগুলি থেকে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেরও ৭৫ শতাংশ হয় ওই দেশগুলিতে। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার দুই তৃতীয়াংশ জি ২০ গোষ্ঠীভুক্ত দেশে বাস করেন। পৃথিবীর মোট স্থলভাগের ৬০ শতাংশ জুড়ে রয়েছে ওই দেশগুলি।

Image - আন্তর্জাতিক মঞ্চে মোদীর ব্র্যান্ডিং

প্রতি বছর জি ২০ গোষ্ঠীর শীর্ষ সম্মেলন হয়। সেখানে সদস্য দেশগুলির রাষ্ট্রপ্রধান, অর্থমন্ত্রী, বিদেশমন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ অফিসাররা উপস্থিত থাকেন। গত ১৫ ও ১৬ নভেম্বর ইন্দোনেশিয়ার বালিতে ওই গোষ্ঠীর সম্মেলন হয়েছে। আগামী বছর সম্মেলন হবে দিল্লিতে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাদে জি ২০ গোষ্ঠীভুক্ত ১৯টি দেশকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি সদস্য দেশ পালা করে এক বছর গোষ্ঠীর সভাপতিত্ব পেয়ে থাকে। সভাপতিত্বের মেয়াদ শুরু হয় প্রতি বছর পয়লা ডিসেম্বর থেকে। মেয়াদ শেষ হয় পরের বছরের ৩০ নভেম্বরে। সেই নিয়ম অনুযায়ী বর্তমানে জি ২০-র সভাপতিত্বের ভার পেয়েছে ভারত। এর আগে সভাপতি ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইডোডো।

জি ২০-র সভাপতি হওয়ার পরে মোদী এমন ভাব দেখাচ্ছেন যেন তাঁর সরকার বিরাট কিছু করে ফেলেছে। তিনি জোর করে জি ২০-র শীর্ষ পদটি ছিনিয়ে এনেছেন, ব্যাপারটা একদমই তা নয়। প্রথামাফিক যা হওয়ার ছিল তাই হয়েছে। সরকার সবাইকে বোঝাতে চাইছে মোদী জি ২০-র সভাপতি হওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের মর্যাদা খুব বৃদ্ধি পাবে। বাস্তবে তেমন কিছু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। জি ২০-র লক্ষ্য হিসাবে অনেক বড় বড় কথা বলা আছে ঠিকই কিন্তু গত ২৩ বছরে ওই গোষ্ঠী লক্ষ্যপূরণে কতদূর এগোতে পেরেছে, তা সন্দেহের বিষয়। অনেকে এমন অভিযোগও করেছেন যে, জি ২০-র অন্তর্ভুক্ত ধনী দেশগুলি গরিব দেশগুলির ওপরে নানা দায় চাপিয়ে দিয়েছে।

একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চকে মোদী যেভাবে ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি তৈরির জন্য ব্যবহার করছেন, তা ভাল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করবে না। যারা নিজেদের ভাবমূর্তি তৈরির জন্য খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তারা মূলত স্বার্থপর লোক। এই ধরনের লোকেরা বৃহত্তর স্বার্থে বেশি কিছু করে উঠতে পারে না।

অতীতে জওহরলাল নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধীর আমলে আমাদের দেশ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছে। বিংশ শতকের পাঁচের দশকে মূলত ভারতের উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন। তখন ছিল ঠান্ডা যুদ্ধের যুগ। অধিকাংশ রাষ্ট্র আমেরিকা অথবা রাশিয়ার শিবিরে যোগ দিয়েছিল। কিন্তু তৃতীয় একটি বিকল্পের সন্ধান দিয়েছিল সদ্য স্বাধীন দেশ ভারত। রাশিয়ার সঙ্গে খুব ভাল সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও আমাদের দেশ সোভিয়েত শিবিরে যোগ দেয়নি। নেহরু সরকার স্বাধীনভাবে, দেশের স্বার্থের দিকে নজর রেখে বিদেশনীতি প্রনয়ণ করেছিল। তা দেখে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল আরও অনেক রাষ্ট্র।

কিন্তু বর্তমান সরকার তেমন কোনও ভূমিকা নিতে পেরেছে বলে জানা যায় না। বরং একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চকে যেভাবে মোদীর ব্র্যান্ডিং-এর কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, তাতে দেশের সম্মানহানি হওয়ার সম্ভাবনা।

ভারত জি ২০-র যে লোগোটি প্রকাশ করেছে, সেই নিয়েও বিতর্ক আছে। লোগোয় দেখা যাচ্ছে পদ্মফুলের ছবি। মোদী বলেছেন, পদ্ম হল আশাভরসার প্রতীক। আমরা বোঝাতে চাইছি, যত কঠিন পরিস্থিতি আসুক, পদ্মফুল ফুটবেই। আমরা সমবেত চেষ্টায় পৃথিবীকে আরও সুন্দর করে তুলব। কিন্তু বিরোধীরা বলছেন, পদ্ম তো বিজেপির নির্বাচনী প্রতীক। একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চের প্রতীক হিসাবে পদ্মের ছবি ব্যবহার করা কি ঠিক হয়েছে? বিজেপি পালটা বলছে, পদ্ম হল ভারতের জাতীয় ফুল। বেশিরভাগ ভারতীয়ের কাছে ওই ফুলটি পবিত্রতার প্রতীক।

বিজেপি যাই বলুক, একটা নৈতিক প্রশ্ন থেকেই যায়। বিজেপির নির্বাচনী প্রতীককে জি ২০-র লোগোয় ব্যবহার না করলেই কি চলছিল না? ওখানে তো অশোকস্তম্ভ বা ভারতের আর কোনও জাতীয় প্রতীকের ছবিও দেওয়া যেত।

জি ২০-র মঞ্চে যে অনাচার চলছে, তা নিয়ে বিরোধীদের আরও সরব হওয়া উচিত। নইলে মোদী সরকারের মতো তাঁরাও দেশবাসীর কাছে অপরাধী হয়ে থাকবেন।

খেলা দেখা জাতি

You might also like