Latest News

প্রসঙ্গ জেলা ভাগ: আওয়াম মুর্শিদাবাদ ও নাগরিক বিসংবাদ

মামুন ফারুক

গোত্রবদল কিম্বা অধুনা রাজনৈতিক কাল্টের মত এ যেন ভূখণ্ডের দলবদল। ভূখণ্ডের ভূগোল বদলে গেলে ইতিহাস বিস্মৃত হবার আতঙ্ক ঘনাচ্ছে আওয়াম মুর্শিদাবাদে। জেলা ভাগ নয়, যেন ইতিহাস বাটোয়ারা হয়ে যাবে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার রাজধানী থেকে নবাবী আমলের সুবে বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদের। তাই বাটোয়ারা (diviided) হলেও অখণ্ড থাক ‘মুর্শিদাবাদ’ (Murshidabad) নাম; এ দাবি ইতিহাসের অলিন্দে ধূলো ও লাল সুরকি ঘাটা বহরমপুরের তরুণী প্রত্নসন্ধানী নারগিস লাইলা থেকে সিরাজের লোকায়ত প্রেমে ফানা হয়ে মুর্শিদাবাদে ঘাটি গাড়া হীরাঝিল আন্দোলনের প্রধান মুখ যাদবপুরের প্রাক্তনী সমর্পিতা দত্ত কিম্বা ইতিহাস গবেষক ডঃ মৌসুমী বন্দোপাধ্যায় এমনকী জেলার প্রত্নক্ষেত্র আন্দোলনের মুখ অরিন্দম রায়েদের। মুর্শিদাবাদী ভূখণ্ডের ইতিহাস বলছে, ‘কজঙ্গলের’ নাড়িতুতো ভাই ‘মুখসুদাবাদ’ হয়ে ওঠার আগেও ইতিহাসের গরিমায় সমৃদ্ধ ছিল এই জনপদ।

খোদ ইতিহাসবিদেরাও হলফ করে বলতে পারেন না ঠিক কত শতাব্দীর প্রাচীনত্ব অঙ্গরাগের মত গায়ে মেখে জনগোষ্ঠীর, সমষ্টির কিসসা আওড়াচ্ছে এই জনপদ। আবিষ্কৃত ও আলোকিত ইতিহাসের প্রত্নধূলোর সাক্ষ্য, উত্তরপূর্বের ‘প্রাগজ্যোতিষ’ ঘেষা অসম থেকে পাহাড়ের কোল ঘেষা সমতল, দক্ষিণের সমুদ্রতট, পূর্বের অবিভক্ত বাংলা এমনকি ওড়িশা ছোঁয়া পশ্চিমি জমিন ছিল রাজা শশাঙ্কের রাজধানী।

Image - প্রসঙ্গ জেলা ভাগ: আওয়াম মুর্শিদাবাদ ও নাগরিক বিসংবাদ
শশাঙ্কের রাজধানী

৫৯৪ থেকে ৬৩৮ খ্রীস্টাব্দে এই ‘কজঙ্গল’ নামের ভূখণ্ডের ‘কর্ণসূবর্ণ’ ছিল তার রাজধানী। নদীমাতৃক সভ্যতা বিকাশের স্বাভাবিক ছন্দেই আড়াআড়ি ভাগ হওয়া মূর্শিদাবাদের মানব-জমিন ভাগ হয়েছিল রাঢ় ও বাগড়ীতে।

ভাগিরথী নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় এ জেলার ভাগ্য, ইতিহাস, আর্থসামাজিক অবস্থান বারবার বদলেছে। ‘কজঙ্গল’ থেকে ‘মুখসুদাবাদ’ জন্মান্তরের মাঝে ৭০০ থেকে ১০৬২ খ্রীষ্টাব্দে মুর্শিদাবাদি নাম না থাকলেও মুর্শিদাবাদী জমিন পুষেছে পাল সেন যুগের রাজধানী হবার গৌরব।

এখনও প্রত্নগন্ধ মেখে সাগরদিঘীর ‘মহীপাল’ তার সাক্ষী দেয়।১২০৬ থেকে পরবর্তী প্রায় ৪০০ বছর সুলতানী আধিপত্যের গৌড়ের অংশ হিসেবে মুর্শিদাবাদের ইতিহাসে স্মারক রয়েছে প্রভুত। সুলতান হোসেন শাহের আমলের খেরুর মসজিদ, আজিমগঞ্জ-নলহাটি রেলপথের অদূরে সাগরদিঘীর গোবরা সাঁকো এমনকি একআনি-চাঁদপাড়ার ঢিবিও সুলতানী আধিপত্যের প্রমান দেয়।

অধুনা মুর্শিদাবাদ গড়ে ওঠার কাহিনি তো লোকমুখে প্রচলিত। মোঘল সাম্রাজ্যের বিদর্ভের দেওয়ানের কর্মচারী মহম্মদ হাদী ওরফে মুর্শিদ কুলি খাঁ সম্রাট ঔরঙ্গজেবের নেকনজরে পড়ে মুর্শিদাবাদের দেওয়ান নিযুক্ত হন।

ব্যাংকের পরিভাষায় ‘নন পারফর্মিং আ্যসেট’ হিসেবে ধুকতে থাকা সুবে বাংলা থেকে বিপুল রাজস্ব আদায় করে মোঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের বদান্যতায় তার নামানুসারে এই ভূখণ্ডের নামকরণ করেন মুর্শিদাবাদ। পরে তিনি নবাব নিযুক্ত হন।

বিষ্ণুপুর কালীবাড়ি

এহেন মুর্শিদাবাদে ব্রিটিশ, ডাচ, আর্মেনীয়দেরও ইতিহাস ছুয়ে আছে। ব্রিটিশদের ভাষায় লন্ডনের থেকে প্রাচুর্যশালী ছিল মুর্শিদাবাদ। কলকাতায় রাজধানী পত্তনের পর স্বাধীন ভারতবর্ষের অভিমুখ বদল মুর্শিদাবাদকে ম্লান করে রাখলেও অস্ত্বিত্বের সংকটে পড়তে হয়নি কখনও।

এবার যেন জেলা ভাগের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সেই আশঙ্কায় ঘনিয়েছে। নাম অবলুপ্ত হতে পারে মুর্শিদাবাদের, এই শঙ্কাতে ইতমধ্যেই জেলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি চর্চার শরিক নাগরিকেরা মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন নাম অপরিবর্তিত রাখতে। একই সাথে জনমতের জনস্রোতের গতি প্রকৃতি আঁচ করে সাংসদ-বিধায়কেরাও ‘একটু ভেবে দেখলে হত না’ গোছের বিগলিত অনুনয় রেখেছেন ‘দিদি’র কাছে।

Image - প্রসঙ্গ জেলা ভাগ: আওয়াম মুর্শিদাবাদ ও নাগরিক বিসংবাদ
নিজামত ইমামবাড়া

কেউ কেউ ইতিহাসের প্রতি দরদ দেখিয়ে চিঠিও দিয়েছেন। তাতেও যে শঙ্কার মেঘ কাটছে এমন না। প্রাথমিক সিদ্ধান্তে মুর্শিদাবাদ জেলাকে মোট তিন ভাগে ভাগ করার চিন্তা করছে রাজ্য। তার প্রতিটির সঙ্গেই জেলার সনাতনি মুর্শিদাবাদ নাম জুড়ে রাখার পক্ষেই সওয়াল করছেন সকলে। বহরমপুরের প্রত্নসন্ধানী তরুণী নারগিস লাইলা বলছেন, ‘জেলার নাম বাদ চলে গেলে জেলার সাথে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস বিস্মৃত হবে। সালারের সোনারুন্দি রাজবাড়ী বা কান্দির জমিদার বাড়ি গুলি তাহলে মুর্শিদাবাদের ইতিহাসের অংশিদারত্ব পাবেনা? জেলার আনাচে কানাচের ইতিহাসেরা তাহলে মুর্শিদাবাদের কৌলিণ্যের বাইরে থেকে যাবে?’

জেলা ভাগ হলে কান্দি মহকুমার ভরতপুর ১ ও ২, খড়গ্রাম, বড়ঞা, কান্দি এই ৫টি ব্লক ছাড়াও বহরমপুরের উপকন্ঠের খানিকটা এবং লালবাগ মহকুমার নবগ্রাম সে জেলায় যেতে পারে। একই ভাবে জঙ্গীপুরে থাকবে ফারাক্কা, সামশেরগঞ্জ, সুতি ১ ও ২, রঘুনাথগঞ্জ ১ ও ২, সাগরদীঘি ছাড়াও ভারত বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সীমান্তের লালগোলাও। বাকি ডোমকল মহকুমার চারটি ব্লক, লালবাগ মহকুমার তিনটি ও বহরমপুরের সিংহভাগ নিয়ে একটি জেলা।

ইতিহাস গবেষক, মুর্শিদাবাদ জেলা সংগ্রহশালার কিউরেটর ড. মৌসুমী বন্দোপাধ্যায়ের মত, ‘জেলা ভাগ হোক প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে। কিন্তু প্রতিটা জেলার নামে যেন মুর্শিদাবাদ থাকে। তাহলে ইতিহাসও বাঁচে, প্রশাসনের সুবিধাও হয়।’

জেলা ভাগে রাজনৈতিক ফয়দা না খুঁজলেও বিরোধী শিবিরও নিমরাজি হয়ে স্বাগতই জানাচ্ছেন। বাম-কংগ্রেস এমনকি বিজেপিরও একাংশের দাবি, জেলা ভাগে সাধারণ মানুষের সুবিধা হবে। প্রশাসনিক কাজে বা যেকোনো কাজে পথশ্রম ও অর্থের খরচ বাঁচবে সাধারণ মানুষের।

Image - প্রসঙ্গ জেলা ভাগ: আওয়াম মুর্শিদাবাদ ও নাগরিক বিসংবাদ
সোনারুণ্ডি রাজবাড়ি

মুর্শিদাবাদের ফারাক্কা থেকে অধুনা সদর বহরমপুরের দূরত্ব ৮৬ কিলোমিটারের বেশি, খড়গ্রাম থেকে বহরমপুর প্রায় ৫০ কিমি। তাই জঙ্গীপুর সদর হলে যেমন ফারাক্কা থেকে বিড়ি বলয় সামশেরগঞ্জ, সুতি, রঘুনাথগঞ্জের বাসিন্দাদের সুবিধা, তেমনই কান্দি জেলা হলে আধেক রাঢ়বাসীর অনায়াস যাতায়াত হয়। এই শর্তেই অনেকেই জেলা ভাগকে স্বাগত জানিয়েছেন। কিন্তু নাম ‘মুর্শিদাবাদ’ থাক বলেই বলছেন মুর্শিদাবাদ জেলা ইতিহাস ও সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্রের সম্পাদক অরিন্দম রায়।

জেলা বাটোয়ারা হলে কি ‘মুর্শিদাবাদ’ নামও খণ্ড-বিখণ্ড হবে? প্রশ্ন ঘুরছে জেলার সর্বত্রই। এর মাঝে আশার আলো প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তাদের। নাম না প্রকাশের শর্তে জেলার এক কর্তার দাবি, ‘মুর্শিদাবাদ থাকছে মুর্শিদাবাদেই’।

বাঁকুড়ার ঘোড়াকে কি বিষ্ণুপুরের কবিরা আর নিজেদের সম্পদ ভাববেন না?

You might also like