Latest News

বাংলা সাহিত্যকে ডেলিরিয়ামের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন মধুসূদন

বুদ্ধদেব হালদার

মধ্যযুগীয় সংস্কার ও ধর্মীয় বন্ধনের নাগপাশ থেকে বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের তিনি মুক্ত করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ গতানুগতিক বাংলা কবিতা ও নাটককে দেখিয়েছিলেন বিপুল এক সম্ভাবনার পথ। তাঁর হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল নতুন বাংলা কবিতার প্রাণ। ড. শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সম্পর্কে লিখতে গিয়ে জানিয়েছেন- ‘কোন কবি এরূপভাবে নিজের হৃদপিণ্ড ছিঁড়িয়া কাব্যসরস্বতীর চরণে রক্তপদ্মের ন্যায় উপহার দেন নাই।’ তিনি যে শুধুমাত্র এক বিরাট দগ্ধ প্রতিভা ছিলেন তা কেবল নয়। এমনকী বহুমুখী জ্ঞানার্জনও তাঁর একমাত্র পরিচয় হতে পারে না কখনওই। খুব কৌশলে ও গভীর সচেতনতায় তিনি ধ্বসে যাওয়া অন্ধকার সময়ের উপর পা রেখে সৃষ্টি করেছিলেন বাংলা সাহিত্যের নতুন এক যুগ। আর এই নবকাব্য সৃষ্টির জন্য সর্বতোমুখী ‘আত্মঘাতী নিয়োগ’ করেছিলেন স্বয়ং নিজেকেই। তিনি আর কেউ নয়, আপামর বাঙালির দত্তকুলোদ্ভব কবি শ্রীমধুসূদন।
যে অস্থির ও অসাধ্য যাপনের মধ্যে দিয়ে তিনি বেঁচে ছিলেন, সেই জীবনই তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিল এক নতুন ভোরের সূচনা পর্ব। বাংলা সাহিত্যে যে অবদান তিনি রেখেছেন তা বিশ্লেষণের জন্য সমসাময়িক কালের বিরুদ্ধে হেঁটে চলা তাঁর ব্যক্তিজীবন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক বিলাসবহুল জমিদার বংশে তাঁর জন্ম। ফলে পারিবারিক শাসনহীনতার আড়ালে বেড়ে ওঠে এক বিলাসী, আমোদপ্রিয়, অমিতব্যয়ী ও স্বেচ্ছাচারী যুবক। এমনকী তাঁর জননী শ্রীমতী জাহ্নবী দেবীর জীবদ্দশাতেই বিলাসপরায়ণ পিতা রাজনারায়ণ আরও তিনটি বিবাহ করেছিলেন। ফলে এই সমস্ত ঘটনার বিবিধ অভিঘাত তাঁকে সমাজের বিপ্রতীপ স্রোতে অনেক আগেই ঠেলে দিয়েছিল।
ছাত্রাবস্থায় ক্যাপ্টেন রিচার্ডসনের মতো অধ্যাপককে পাওয়া তাঁর জীবনের প্রস্তুতি পর্বে এক বিশাল ভূমিকা রাখে। এই সময় পাশ্চাত্য সাহিত্যের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের ফলে ইউরোপীয় নবজাগৃতির মূলমন্ত্র ‘Humanism’কে অতিসহজেই আত্তীকরণ করে ফেলেছিলেন তিনি। প্রথমে হিন্দু কলেজ ও পরে বিশপস্‌ কলেজে পড়াশোনা করেন। পাশ্চাত্য সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি হিব্রু, গ্রিক, ল্যাটিন ইত্যাদি ভাষাশিক্ষাও অনুশীলন করছিলেন। আবার কালীদাস থেকে কৃত্তিবাস পর্যন্তও সফল বিচরণ ছিল তাঁর। ফলত তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের প্রাচীন ও আধুনিক সাহিত্য সম্পর্কে এক ‘বিস্ময়কর’ জ্ঞান আহরণ করেছিলেন। সমালোচকদের মতে- ‘সাহিত্য সাধনার জন্য এমন ব্যাপক প্রস্তুতি বাঙ্গালা দেশে আর কোনও কবি বা সাহিত্যিকের জীবনে দেখা যায় না।’ শিবনাথ শাস্ত্রীর মতে ১৮২৫ থেকে ১৮৪৫ সাল হল বাংলাদেশের নবযুগের সূচনাকাল। মধুসূদনের ছাত্রজীবন এই কালপরিধিরই অন্তর্ভুক্ত ছিল।
১৮৪৩ সালের জানুয়ারি মাসে মধুসূদনের বন্ধুমহলে হুলুস্থুল জনরব পড়ে গেল যে তিনি খ্রিস্টান হওয়ার জন্য মিশনারিদের কাছে আশ্রয় নিয়েছেন। যদিও ঘটনা ছিল অন্যকিছু। শিবনাথ শাস্ত্রী ‘রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ’ বইতে লিখেছেন- “ইত্যবসরে তাঁহার জনকজননী তাঁহার এক বিবাহের প্রস্তাব উপস্থিত করিলেন। একটি আট বৎসরের বালিকা, যাহাকে চিনি না জানি না, তাহাকে বিবাহ করিতে হইবে, এই চিন্তা মধুকে ক্ষিপ্ত-প্রায় করিয়া তুলিল। তিনি পলায়নের পরামর্শ করিতে লাগিলেন।” এবং বলাইবাহুল্য এই বিবাহভীতিই তাঁকে প্রথমে বিদেশ-পলায়নের স্বপ্ন দেখায়। পরে মিশনারীদের বিবিধ সাহায্যের মিথ্যে প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাসে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণে তৎপর হয়ে ওঠেন। কিন্তু বিধর্মী হয়ে এই দেশে আত্মীয় ও বন্ধু-পরিজনহীন থাকা তাঁর পক্ষে ক্রমশ অসহ্য হয়ে উঠছিল। ফলে একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে মাদ্রাজ চলে যান। সেখানে বিভিন্ন সংবাদপত্রে ইংরেজি ভাষায় লিখতে শুরু করলেন। ১৮৪৯ সালে প্রকাশ করলেন ‘Captive Ladie’। কবিত্বশক্তি ও ইংরেজি ভাষাভিজ্ঞতার যথেষ্ট প্রশংসা হলেও মহাত্মা বেথুনের মতো অভিজ্ঞ ইংরেজগণ তাঁকে নিজ মাতৃভাষাতেই সাহিত্য চর্চার পরামর্শ দিলেন। এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর সচেতন মস্তিষ্কের ক্রিয়াকর্ম। নিছক কোনও অনুতাপ বা আপশোশের জায়গা থেকে নয়, তিনি কলম ধরলেন বাংলা সাহিত্যকে নতুন দিশা দেখানোর জন্যই। ইতিমধ্যেই মাদ্রাজে বসবাসকালে তিনি একজন ইংরেজ মহিলাকে বিয়ে করেছিলেন। তাকে পরিত্যাগ করে পুনরায় অন্য আরেক বিদেশি ফরাসী মহিলাকে বিবাহ করলেন। এবং ১৮৫৬ সালে আবার দেশে ফিরে এলেন। ততদিনে সেখানে তার পিতা-মাতা গত হয়েছেন। তাঁদের সম্পত্তিও দখল করেছে অন্যেরা। পরিচিত সকলেই তাঁকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। এমন একটা অবস্থায় দেশে ফিরে তিনি মিশতে শুরু করলেন একদল নব্যবঙ্গের সঙ্গে। স্বদেশে এসেও বিদেশিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ল।বন্ধু গৌরদাস বসাক তাঁকে নিয়ে গেলেন পাইকপাড়ার রাজার কাছে। পরিচয় ঘটল যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের সঙ্গে। এই সময় সংস্কৃত ‘রত্নাবলী’ নাটকের ইংরেজি অনুবাদ করেন তিনি। এই অনুবাদ বেলগাছিয়া রঙ্গালয়ে শিক্ষিত ব্যক্তিদের সামনে অভিনয়ের ফলে মধুসূদন পরিচিত হয়ে উঠলেন। কিন্তু তার থেকেও বেশি যা ঘটল তা হল- সংস্কৃত নাটকের রীতি ও দোষগুণ ভালো করে বুঝতে পারলেন তিনি। আর তাই নতুনভাবে বাংলা নাটক রচনার উৎসাহ জাগল তাঁর মনে। ১৮৫৮ সালে লিখলেন প্রথম নাটক ‘শর্মিষ্ঠা’। বেলগাছিয়া রঙ্গালয়ে মহা সমারোহে তা অভিনীত হতে থাকল। এরপর গ্রিক পুরাণকাহিনি অবলম্বন করে লিখলেন ‘পদ্মাবতী’ নাটক(১৮৬০)। লিখলেন ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ ও ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নামের দুটি প্রহসন। এছাড়া লিখলেন ‘কৃষ্ণকুমারী'(১৮৬১) ও ‘মায়া কানন'(১৮৭৪)। ‘কৃষ্ণকুমারী’কে মধুসূদনের শ্রেষ্ঠ নাটক বলা হয়ে থাকে। প্রথমে এর নাম ছিল ‘ভগ্নশিব মন্দির’। রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পরিমণ্ডলে রচিত হয়েছে এই নাটকটি। প্রায় ১২ বছর পর বেঙ্গল থিয়েটারের জন্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে লেখেন- ‘মায়া কানন’। বাংলার পাঠক নতুন তেজস্বিতা ও নতুন ছন্দে চমকে উঠলেন। ‘পদ্মাবতী’ নাটকেই তিনি প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার করেন। আর আধুনিক বাংলা কাব্যজগতে প্রবেশের সিংহদ্বার ছিল এই অমিত্রাক্ষর ছন্দই।
বাংলা নাটককে নতুন পথে এগিয়ে দিয়ে হাত দিলেন বাংলা কবিতায়। মধ্যযুগীয় ঘ্যানঘ্যানানি ও ধর্মের পোশাক ছাড়িয়ে বাংলা কাব্যসাহিত্যকে দিলেন নতুন প্রাণ। প্রচলিত পয়ারের বেড়া ভেঙে না বেরতে পারলে মধুসূদন দত্তের পক্ষে কখনওই বাংলা কবিতাকে নতুন যুগে উত্তরণ করানো সম্ভব হত না। তিনি ক্রমান্বয়ে লিখলেন- ‘তিলোত্তমা সম্ভব'(১৮৬০), ‘মেঘনাদ বধ'(১৮৬১), ‘ব্রজাঙ্গনা'(১৮৬১), ‘বীরাঙ্গনা'(১৮৬২), ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী'(১৮৬৬) প্রভৃতি। শুধু যে বিষয়বস্তুকে নতুনভাবে দেখতে শিখিয়েছিলেন তা নয়, সম্পূর্ণ নতুন ছন্দ ও প্রণালীতে রচনা করেছিলেন একের পর এক সাহিত্য।
তাঁর সাহিত্য নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে সমালোচকেরা জানাচ্ছেন- “তাঁহার লেখনী যখন ‘মেঘনাদে’র বীররস চিত্রণে নিযুক্ত ছিল, তখন সেই লেখনীই অপরদিকে ‘ব্রজাঙ্গনা’র মধুররস চিত্রণে ব্যাপৃত ছিল। …একই চিত্রকর একই সময়ে কিরূপ এরূপে দুইটি চিত্র চিত্রিত করতে পারে!” -সত্যিই তা বিস্ময়ের।
বস্তুত মধুসূদন নিজের প্রকৃতিকে দুই ভাগ করে ফেলেছিলেন অনেক আগেই। সেজন্যই বোধহয় জীবনব্যাপী অতৃপ্তি ও অশান্তির মধ্যে থেকেও কবিতা লিখতে পেরেছিলেন।
এমন নয় যে তিনি উনবিংশ শতাব্দীর বিচ্ছিন্ন কোনও এক মনীষী। সমসাময়িক কালে নাট্য আন্দোলন ও নতুন সাহিত্য সৃষ্টির প্রচেষ্টার সঙ্গে তিনি নিজেকে গভীরভাবে সম্পৃক্ত করে নিয়েছিলেন। এবং খুব সচেতন হয়েই বাংলা সাহিত্যে তুমুল পরিবর্তন এনে নতুন যুগ তৈরি করে দিতে পেরেছিলেন। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের পুরোধা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অনায়াসে। শুধু নাটক বা কবিতা নয় এমনকি গদ্য রচনাতেও তিনি সচেষ্ট হয়েছিলেন। কিন্তু তা সম্পূর্ণ করে যেতে পারেননি। হোমারের ইলিয়াড কাব্যের বাংলা গদ্যরূপ দিতে চেয়েছিলেন তিনি। লিখেওছিলেন কিছুটা। কিন্তু শেষপর্যন্ত অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ১৮৭১ এ লেখা ‘হেকটর্‌-বধ’ তাঁর একমাত্র অসমাপ্ত গদ্য রচনা।
মধ্যযুগীয় রীতি-সংস্কার ও দেবদেবী নির্ভর কাহিনিকে পিছনে ফেলে এক অনন্যসাধারণ আত্মবিশ্বাসে নতুন পথ আবিষ্কার করেছিলেন তিনি। বাংলা ছন্দকে পয়ারের বেড়ি ছাড়িয়ে যে নতুন রীতিতে মুক্তি দিলেন, শুধুমাত্র সেকারণেই তিনি কাব্যসাহিত্যের ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হতে থাকবেন। নতুন ভাবনা ও দ্যোতনায় লেখা মহাকাব্যের কথা নাহয় ছেড়েই দিলাম। তাঁর কবিতা ও নাটক পরবর্তীকালে প্রায় প্রত্যেক সাহিত্যকারকেই প্রভাবিত করেছিল। কাজেই যে রচনা-রীতিকে তিনি বহুযুগ পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েছিলেন, তাতে একথা বলাই যায় যে বাংলা সাহিত্যকে ডেলিরিয়ামের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন মধুসূদন।

 

বুদ্ধদেব হালদার শূন্য পরবর্তী দশকের বিশিষ্ট কবি ও গদ্যকার। কৃত্তিবাস সহ বিভিন্ন সাময়িক পত্রপত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে তাঁর মূল্যবান কবিতা ও গদ্য। পেয়েছেন একাধিক সাহিত্য সম্মাননাও

You might also like