Latest News

Mamata Banerjee: সেই নদিয়া, সেই ধর্ষণ, সেই মমতা, ভুলে গিয়েছেন শুধু মুখ্যমন্ত্রী মমতা

অমল সরকার

দিনটা ছিল ৭ জানুয়ারি, ১৯৯৩। মহাকরণ অর্থাৎ রাইটার্স বিল্ডিংসের দোতলায় মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন মমতা বন্দ্যোাধ্যায় (Mamata Banerjee)। ২০১১-র মে মাসে যে ঘরে পা রেখে মুখ্যমন্ত্রীর ইনিংস শুরু করেছিলেন তিনি।

তিন দশক আগের সেই দিনটিতে তিনি কেন্দ্রের নরসিংহ রাও সরকারের মন্ত্রী। যদিও এর দিনকয়েক আগে ব্রিগেডের সমাবেশ মঞ্চে বামফ্রন্টের ‘মৃত্যুঘণ্টা’ বাজিয়ে মন্ত্রিত্ব থেকে ইস্তফা দেন সিপিএমের বিরুদ্ধে অলআউট লড়াই করবেন বলে।

আরও পড়ুন: হাঁসখালি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর ‘প্রেগন্যান্ট, লাভ অ্যাফেয়ার’ মন্তব্য, যা বললেন বুদ্ধিজীবীরা

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সেদিন বামফ্রন্ট সরকারের পুলিশ চ্যাংদোলা করে তুলে লালবাজারে নিয়ে গিয়েছিল। তার আগে-পরের ঘটনা অনেকেই মনে করতে পারবেন।

কিন্তু সোমবার মিলন মেলার সরকারি অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে হাঁসখালির ঘটনা নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যা বললেন, তা শুনে মনে হল, ১৯৯৩- এর ৭ জানুয়ারির কথা মনে রাখেননি তিনি।

কী হয়েছিল সেদিন?

নদিয়ারই একটি বোবা-কালা মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, ধর্ষণকারীরা সিপিএমের সমর্থক। তাই পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিতে চাইছে না।

mamata banerjee

ঘটনাটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জানান, নদিয়ার তখনকার যুব কংগ্রেস নেতা, আজকের মন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাস। মেয়েটির মাকে সঙ্গে করে কলকাতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে নিয়ে আসেন উজ্জ্বল। সেই মহিলাকে সঙ্গে নিয়ে সটান মুখ্যমন্ত্রীর অফিসে হাজির হন আজকের মুখ্যমন্ত্রী, সেদিনের জননেত্রী মমতা।

এই ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সব দিনে সিপিএমের হাতে নির্যাতিত, বামফ্রন্ট সরকারের দলতন্ত্রের শিকার নিপীড়িত মানুষের ভরসা হয়ে উঠেছিলেন মমতা। কঠিন অসুখে বড় ডাক্তার দেখানোর মত লোকে একবার তাঁর কাছে পৌঁছতে চাইত। লোকে মনে করত, প্রশাসন কানে তুলুক বা না তুলুক, মানুষের মাঝে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ অন্তত করা যাবে।

নদিয়ার সেই মেয়েটিও অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছিল ধর্ষণের ফলে। সিপিএমের কিছু নেতা, এমনকি মহিলা নেত্রীরাও এই ধরনের ঘটনায় ধর্ষিতা, নির্যাতিতার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন। এই ব্যাপারে তাঁরা ছিলেন পুরোমাত্রায় গেরুয়াবাদী মানসিকতার। নিউ ব্যারাকপুরে রেলের ধারের ঝুপড়ির বাসিন্দা এক ধর্ষিতা মহিলা সম্পর্কে এক নেত্রী যেমন মন্তব্য করেছিলেন, ‘মহিলার চরিত্র ভাল না।’ কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী বা প্রশাসনের শীর্ষ স্তর থেকে ঘটনাটিকে লঘু করে দেখানোর চেষ্টা হয়নি। যদিও তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকা সেদিন ভাল ছিল না, বললে কম বলা হয়। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।

হাঁসখালির নিয়ে সোমবার মুখ্যমন্ত্রী যে ভাষায় ঘটনাটিকে লঘু করে দেখানোর চেষ্টা করলেন তা এক কথায় অকল্পনীয়। মৃতা নাবালিকা যদি অন্তঃসত্ত্বাও হয়ে থাকে তাহলেও সেটা ধর্ষণই। আইনের কথা ছেড়েই দিলাম, ন্যূনতম সংবেদনশীলতা, মানবিকতাবোধ থাকলে কারও সম্পর্কে এমন করে বলা যায় না।

গোটা দেশজুড়েই বয়স নির্বিশেষে মহিলারা যৌন নির্যাতনের শিকার। এই ব্যাপারে কোন রাজ্য এগিয়ে, পিছিয়ে কোন রাজ্য, এই বিতর্ক অনর্থক এবং ততধিক বিরক্তিকর। মুখ্যমন্ত্রীর মুখ থেকে অমন অবজ্ঞা, চরিত্র নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ সংশয় জাগিয়ে তোলা শুধু অনৈতিক নয়, অন্যায়।

যেমন অন্যায় করেছিলেন সেদিন জ্যোতি বসু। তিনি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, মমতা বন্দ্যোাধ্যায়কে তাঁর ঘরের সামনে থেকে সরিয়ে দিতে, যাতে তিনি নির্বিঘ্নে অফিসে ঢুকতে পারেন। পুলিশ তাঁর নির্দেশ পালন করেছিল। অত্যন্ত কুৎসিতভাবে একজন মহিলা নেত্রীকে রাইটার্স বিল্ডিংস থেকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছিল।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা দু-দণ্ড শুনলেই সেদিন প্রকৃত প্রশাসকের ধর্ম পালন করতেন জ্যোতি বসু। কিন্তু মার্কসবাদী মুখ্যমন্ত্রীর বিচিত্র যুক্তি ছিল, বিনা অ্যাপয়েনমেন্টে তিনি কারও সঙ্গে দেখা করেন না।

অবাক করলেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীও। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অগ্নিকন্যা, বিরোধী নেত্রী হিসেবে নির্মাণে যে ঘটনা, দিন, আন্দোলন মাইলস্টোন হয়ে আছে, ৭ জানুয়ারি, ১৯৯৩ তার মধ্যে একটি। সোমবার মিলন মেলার অনুষ্ঠানে রাজ্যের ১১ বছরের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা শুনে মনে হল, দশক তিন আগের সেই ঘটনা মনে রাখেননি তিনি।

অবশ্য অতীতকে ভুলে যাওয়াই ক্ষমতার অসুখের সবচেয়ে বড় উপসর্গ।

You might also like