Latest News

ধর্মীয় মেরুকরণ, বিচ্ছেদ-বিভাজনে নয়া হাতিয়ার আইন-আদালত

অমল সরকার

‘অযোধ্যা রায়কে কোনও পক্ষেরই জয় বা পরাজয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। রামভক্তি বা রহিমভক্তি যাই থাকুক না কেন, আমাদের সকলকেই এখন রাষ্ট্রভক্তি দেখাতে হবে। রক্ষা করতে হবে দেশের শান্তি ও সম্প্রীতি।’ বছর তিন আগে অযোধ্যা মামলা নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট চূড়ান্ত রায় ঘোষণার পর বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)।

Image - ধর্মীয় মেরুকরণ, বিচ্ছেদ-বিভাজনে নয়া হাতিয়ার আইন-আদালত

রাম মন্দির আন্দোলনের প্রধান উদ্যোক্তা বিশ্ব হিন্দু পরিষদ যে সংগঠনের ভাবধারায় চালিত হয় সেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ বা আরএসএসের প্রধান মোহন ভাগবতও অযোধ্যা রায়ের পর ঘোষণা করেন, ‘বিশেষ কারণে আমরা রাম মন্দির আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলাম। কিন্তু এই জাতীয় আর কোনও আন্দোলনের সঙ্গে আমরা আর নেই। আমরা বরাবরের মতো সামাজিক কাজই চালিয়ে যাব।’

অযোধ্যা মামলার (Ayodhya Case) রায় যদি উল্টো হত, অর্থাৎ ভারতের সুপ্রিম কোর্ট হিন্দুপক্ষের দাবি না মানলে মোদী, ভাগবতদের প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারত, তা নিয়ে তর্ক চলতে পারে। কিন্তু বাস্তব হল, ধর্মস্থান সংক্রান্ত আন্দোলনের সঙ্গে বিজেপি এবং আরএসএস থাকবে না, এটাই তাদের ঘোষণা। ১৯৮৯ সালে বিজেপিও হিমাচলপ্রদেশের পালামপুরে তাদের জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠকে শুধু রাম মন্দির আন্দোলনকেই সমর্থন করার প্রস্তাব নিয়েছিল।

বিগত কয়েক মাস যাবৎ ভারতের অভ্যন্তরে কিন্তু সেই মন্দির-মসজিদ নিয়েই ফের বিতর্ক শুরু হয়েছে। আর তাতে আতস কাচের নিচে দেশের একটি আইনকে কেন্দ্র করে বিচার ব্যবস্থার ভূমিকাও। বস্তুত, সেই তর্ক-বিতর্কের জেরেই বিজেপির অধুনা বরখাস্ত মুখপাত্র নূপুর শর্মা ইসলামের নবি সম্পর্কে অসম্মানজনক মন্তব্য করে বসেন।

একথা ঠিক, অযোধ্যা মামলার রায়ের পর সব আশঙ্কা অমূলক প্রমাণ করে ভারত ছিল শান্ত। আদালতের রায়ে অসন্তুষ্ট পক্ষও সংযত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। কিন্তু চাপা একটা আশঙ্কা ছিলই, যা এখন ক্রমশ সত্য হতে চলেছে, তা হল, অযোধ্যা-রায়ে ইতি পড়েনি মন্দির-মসজিদ বিবাদে। বরং, বিবাদ নিষ্পত্তির জন্য আদালতের দরজা উন্মুক্ত করে দিয়েছে ওই রায়। এর পরিণতি নিয়ে দেশপ্রেমিক মানুষ মাত্রেই চিন্তিত।

বাবরি মসজিদ ধ্বংসের এ বছর তিন দশক। উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা পাঁচশ বছরের পুরনো সেই ইমারত ধ্বংসের সময়ই স্লোগান দিয়েছিল, ‘এ তো সিরফ ঝাঁকি হ্যায়, কাশী, মথুরা বাকি হ্যাঁয়।’ অর্থাৎ বাবরির পর টার্গেট হল কাশী ও মথুরার মন্দিরের জায়গা পুনরুদ্ধার। হিন্দুত্ববাদীদের দাবি, দু’জায়গাতেই মোঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব মন্দির ধ্বংস করে মসজিদ তৈরি করেন।

হিন্দুত্ববাদী ভাবধারার বাইরে থাকা বৃহত্তর হিন্দু সমাজ এবং অন্য ধর্মের মানুষও এই দাবির সঙ্গে পুরোপুরি দ্বিমত পোষণ করেন না। কিন্তু বদলা নেওয়া অর্থাৎ মসজিদ ভেঙে মন্দির নির্মাণের দাবির সঙ্গে সহমত নন তাঁরা। যেমন বাবরি মসজিদ ধ্বংসকেও তাঁরা মন থেকে মেনে নেননি। সহমত নন অযোধ্যা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায়ের সঙ্গেও।

Image - ধর্মীয় মেরুকরণ, বিচ্ছেদ-বিভাজনে নয়া হাতিয়ার আইন-আদালত

লক্ষণীয় হল, অযোধ্যার মন্দির-মসজিদ বিবাদের নিষ্পত্তি শেষ পর্যন্ত আদালতে হলেও এর পিছনে ছিল আদবানির রামরথ ছোটানো সহ এক বিশাল সুপরিকল্পিত আন্দোলন। কাশী, মথুরার ক্ষেত্রে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ সেই জাতীয় কোনও রথযাত্রা বা অভিযানের ডাক দেয়নি। তারা আদালতের দরজায় কড়া নাড়ছে। কাশীতে মন্দির লাগোয়া জ্ঞানবাপী মসজিদ চত্ত্বরে হিন্দু দেবদেবীকে সারা বছর পুজো করার অনুমতি চেয়ে বারাণসীর আদালতে মামলা হয়েছে। মথুরায় মামলা হয়েছে শাহি ইদগা মসজিদ সরিয়ে শ্রীকৃষ্ণ জন্মস্থান ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে। আর এভাবেই ভারত এক নতুন ধর্মীয় সংঘাতের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। যা দেখে আরএসএস প্রধান ভাগবত বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্ন তুলেছেন, ‘মসজিদের নিচে মন্দির খুঁজে বেড়াচ্ছেন কেন? ইতিহাস তো সকলের জানা। মুসলিম শাসকেরা অনেক মন্দির ধ্বংস করেছিল। তাই বলে আজ কি দেশের মুসলিমদের সাজা দেওয়া যায়?’

কিন্তু আশ্চর্যের হল, হিন্দুত্ববাদীদের মস্তিষ্ক বা বিশ্ববিদ্যালয় বলে পরিচিত আরএসএসের প্রধান যাই বলুন না কেন, তাঁদেরই সহযোগী সংগঠন তাজমহল, কুতুব মিনারের মতো ইমারতের ইতিহাস নিয়েও প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। কুতুব মিনার তৈরির সময় হিন্দু ও জৈন মন্দির ভাঙার অভিযোগ করা হয়েছে আদালতে।

অযোধ্যা মামলার রায় ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছিলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের এই রায় প্রমাণ করে দিয়েছে, বিতর্ক যাই থাকুক না কেন, শেষমেশ তার সমাধান হবে আইনের মাধ্যমেই।’

প্রধানমন্ত্রীর মুখে এর চাইতে ন্যায্য কথা আর কী হতে পারে? কিন্তু এ দেশে আইন-আদালতের ভূমিকা ক্রমশ প্রশ্নের মুখে এসে দাঁড়াচ্ছে। কাশী, মথুরার উপাসনস্থল নিয়ে বিতর্কে হিন্দুত্ববাদীরা নিশানা করেছে ১৯৯১ সালের প্লেসেস অফ ওরশিপ (স্পেশ্যাল প্রভিশন) অ্যাক্টকে। এক কথায় আইনটির উদ্দেশ্য দেশের ধর্মীয় উপাসনাস্থলগুলিকে রক্ষা করা।

ভারতের সেই সময়কার কংগ্রেস সরকারের তৈরি এই আইনে বলা হয়, ১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট ধর্মীয় উপাসনাস্থল অর্থাৎ মন্দির, মসজিদ, গির্জা ইত্যাদি যে অবস্থায় ছিল সেই রকমই থাকবে। সেগুলির কাঠামো এবং চরিত্র বদল করা যাবে না। দেশে তখন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ-সহ একাধিক হিন্দুত্ববাদী সংগঠন অযোধ্যার পাশাপাশি কাশী ও মথুরার মন্দিরের জায়গা পুনরুদ্ধারের দাবিতে তোলপাড় ফেলে দিয়েছে। আইনের পরিধির বাইরে রাখা হয় শুধু অযোধ্যা বিবাদ, যেহেতু সেটি বহু পুরনো মামলা।

নরসিংহ রাওয়ের নেতৃত্বাধীন সেই কংগ্রেস সরকার ছিল সংসদে সংখ্যালঘু। বিজেপি বাদে ভারতের বাকি দলগুলি এই আইন তৈরিতে সরকারের পাশে দাঁড়ায় তখন। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসবি চবন তখন লোকসভায় বলেছিলেন, ‘স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ে দেশের বন্ধুত্ব ও সম্প্রীতির ঐতিহ্য মারাত্মক আক্রমণের মুখে পড়েছিল। স্বাধীনতার পর, আমরা অতীতের ক্ষত নিরাময়ের কাজ শুরু করেছি এবং আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সদিচ্ছার ঐতিহ্যের অতীত গৌরব ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হয়েছি।’ অযোধ্যা মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্টও ধর্মনিরপেক্ষতার ঐতিহ্য অটুট রাখার লক্ষ্যে আইনটির অপরিসীম গুরুত্ব স্বীকার করে।

Image - ধর্মীয় মেরুকরণ, বিচ্ছেদ-বিভাজনে নয়া হাতিয়ার আইন-আদালত

ভারতের বিভিন্ন আদালতে সেই আইনটিই এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। বিজেপির একজন আইনজীবী নেতা-সহ একাধিক ব্যক্তি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন আইনটির মৌলিক কিছু অংশ বাতিলের দাবি নিয়ে। তাঁরা দাবি করছেন, আইনটি সংবিধানে উল্লেখিত ধর্মাচরণের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।

আশ্চর্যের হল, সুপ্রিম কোর্টের যে বিশেষ বেঞ্চ অযোধ্যা মামলার রায়ে আইনটির ভূয়সী প্রশংসা করেছে সেই বেঞ্চের এক বিচারপতিও সম্প্রতি উপাসনাস্থল সুরক্ষার আইনটির বিরোধিতা করে হওয়া মামলাটি গ্রহণের পক্ষে সায় দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, আইনে বলা আছে ধর্মীয় উপাসনাস্থলের চরিত্র বদল করা যাবে না। কিন্তু চরিত্র বিশ্লেষণ করা যাবে না, এমন কথা বলা নেই।

এক ধাপ এগিয়ে বারাণসীর আদালতে বিচারক জ্ঞানবাপী মসজিদ চত্ত্বরে পুজোআচ্চা করার আর্জি জানিয়ে দায়ের করা পাঁচ মহিলার মামলা শুনতে রাজি হয়েছে। এরপর মথুরা নিয়ে হওয়া মামলায় এমন রায় হওয়া অসম্ভব নয়। হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি নানা সময়ে দাবি করেছে, তিন হাজারের বেশি মন্দির নানা সময়ে ভাঙা হয়েছে। ফলে ক্রমে এই সংক্রান্ত মামলার পাহাড় জমবে, তাতে সন্দেহ নেই।

বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় হল, বারাণসীর আদালতের রায় নিয়ে শুধু বিজেপি নয়, সিপিএম-সহ কয়েকটি বাম দল বাদে প্রথমসারির সব দলই বিষয়টি আদালতের বিচারাধীন বলে এড়িয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বলেছে, আদালতের এই রায়ে তাদের এক ধাপ অগ্রগতি হল। বোঝাই যাচ্ছে, শুধু বিজেপি নয়, কংগ্রেস, তৃণমূল-সহ সব দলই হিন্দু ভাবাবেগে আঘাতের কথা মাথায় রেখে এই বিবাদে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করছে না।

বিজেপির অবস্থান বরং স্বচ্ছ। তারা স্পষ্টই বলেছে, মানুষ আদালতের কাছে বিচার চাইতেই পারে। তাতে রাজনৈতিক দলের আপত্তি করার কী থাকতে পারে? এই কথার পিঠে কথা আসছে, তাহলে কি জনমতের দোহাই দিয়ে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিজেপি সরকার এই আইনে হিন্দুত্ববাদীদের অপছন্দের ধারাগুলি বাতিল করে দিতে পারে?

আইন, অধিকার, এসব নিয়ে সত্যিই কোনও প্রশ্ন তোলা চলে না। কিন্তু দেশ আবার শুধু আইন-আদালত দিয়েও চলে না। দেশ আসলে চলে বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে। বোঝাপড়া তৈরি হয় সহনশীলতার শক্তির জোরে। ভারতে ক্রমশ সেটাই তলানিতে ঠেকছে, মাথাচাড়া দিচ্ছে অসহিষ্ণুতা।

আদালতে মামলা ঠুকলেই রাতারাতি নিষ্পত্তি হয়ে যাবে, তা নয়। অযোধ্যার মন্দির-মসজিদ বিবাদের আইনি লড়াই আড়াইশ বছর গড়িয়েছিল। কিন্তু তালাবন্ধ বাবরি মসজিদের ভিতর সেই ১৯৪৯ সাল থেকেই বিরাজমান ছিল রামলালার মূর্তি। সেই বাবরি মসজিদ আজ নিশ্চিহ্ন।

আর বারাণসী? সেখানে অক্ষত জ্ঞানবাপী মসজিদের পাশে এখন ঝকঝক করছে নব রূপে সজ্জিত কাশী বিশ্বনাথ মন্দির। প্রায় চারশ কোটি টাকা ব্যয়ে রূপবদল হয়েছে মন্দির চত্ত্বরের। এরপর মথুরা-সহ বিতর্কিত ধর্মীয় স্থানগুলিতে হয়তো একই পথে হাঁটার চেষ্টা হচ্ছে। নব সাজে সজ্জিত মন্দিরের জৌলুসে ঢাকা পড়ে থাকবে আইন-আদালত-মামলা-মোকদ্দমার জটে জড়িয়ে থাকা মসজিদ। ধর্মীয় মেরুকরণ, বিচ্ছেদের রাজনীতিতে আইন-আদালত নয়া হাতিয়ার হিন্দুত্ববাদীদের।

কংগ্রেসের শীর্ষ পদের লড়াই থেকে সনিয়া, রাহুলরা কেন সরে দাঁড়ালেন

You might also like