Latest News

জলের অক্ষর পর্ব ১৩

কুলদা রায়

মানুষের মনে ধর্মবোধ কী করে জাগে এ বিষয়ে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন তিনটি কারণের কথা বলেছেন-
১. ভয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোগ-ব্যাধি, পশুদের আক্রমণ, যুদ্ধ, জীবন-জীবিকার মধ্যে যে অনিশ্চয়তা দেখা যায়। সেইসব বিপত্তির কারণে মানুষ অসহায় বোধ করে। ভয় পায়। এর থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য মানুষ মনে করে এইসব নিয়ন্ত্রণ করছে কোনও এক অদৃশ্য শক্তি। তাকে খুশি করতে পারলে বিপত্তির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। সেই অদৃশ্য শক্তির নাম ঈশ্বর, গড বা আল্লাহ বা জিহোভা। তাঁকে স্তুতির জন্যি তৈরি হয় ধর্ম।
২. সমাজে ন্যায়নীতির
একটা মানদণ্ড তৈরি করার জন্য মানুষের মধ্যে ধর্মবোধ তৈরি হয়। যেমন সদা সত্য কথা বলবে। মিথ্যে বললে নরকে যাবে। কাউকে ঘৃণা করবে না। ঈশ্বর ঘৃণাকারীকে পছন্দ করেন না ইত্যাদি… তিনি ঘৃণাকারীকে পাপ দেবেন।
৩. যে বিষয় স
ম্পর্কে এখনও যুক্তি তৈরি করা যায়নি, সেগুলোকে ঈশ্বরের অলৌকিকত্ব হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়। ফলে এই অলৌকিক শক্তির প্রতি বিশ্বাস না করে উপায় নেই- এই ভাবনা থেকেও মানুষের মনে ধর্মবোধ জাগে। 

বিজ্ঞান ভয়ের কারণগুলো ব্যাখ্যা করতে পারছে। আবিষ্কার করছে তার নিদান। যেমন রোগাক্রান্ত হলে মানুষ যতটা না ঈশ্বরের উপর নির্ভর করে, তার চেয়ে বেশি ছোটে ডাক্তারের কাছে। রাষ্ট্র মানুষের জীবন-জীবিকার দায়িত্ব নিলে আর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে অসহায় বোধ করে না। ফলে তাদের মধ্যে ধর্মবোধ আর তেমন জাগে না। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের মৌলিক অধিকারসমূহ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় আইনের শাসন কায়েম করে তবে সমাজে ন্যায়নীতির মানদণ্ড তৈরি হয়। এক্ষেত্রে ধর্মের উপর পুরোটা নির্ভরশীল না হলেও চলে।
বিজ্ঞান দিন দিন এই জগতের নানা বিস্ময়ের ব্যাখ্যা আবিষ্কার
করতে সক্ষম হচ্ছে। ফলে এ নিয়ে ভীত হওয়ার কিছু নেই। 

এমনকি ঈশ্বরকে বাদ দিয়েও যে ধর্ম হতে পারে- সেটা বৌদ্ধরা প্রমাণ করেছে। বৌদ্ধধর্মে ঈশ্বরের বালাই নেই। আবার ধর্মকে বাদ দিয়েও ঈশ্বর হতে পারে। সেরকম ঈশ্বরের কথা বলেছেন আইনস্টাইন। এই ঈশ্বরের পুজো হয় না। অনুভূতি হয়। এ হল রবীন্দ্রনাথের নিভৃত প্রাণের দেবতা। যেখানে বিস্ময়ে ভয় নয়, জাগে প্রাণ। সৃষ্টি হয় আনন্দ। ভালোবাসা। প্রেম। যে ফুলটি ফোটে- মনে হয় ফুলটি আমি। যে শিশুটি টলোমলো পায়ে হাঁটতে হাঁটতে পড়ে যায়, কেঁদে ওঠে, আবার উঠে পড়ে- হেসে ওঠে, মনে হয় এই শিশুটিও আমি। আর শিশুটির মা বলে উঠছে- আহা বাছা! সেই মাও আমি। ওর বাবা মানুষটিও আমি। আকাশের তারাটিও আমি। আমিই সকল কিছু। আমিই সে। সে-ই আমি।
এই আমি তাহলে কে?
একটি প্রাকৃতিক সুশৃঙ্খলা মাত্র। একেই স্পিনোজা বলেছেন ঈশ্বর। আইনস্টাইন এই ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন। এই ঈশ্বর কাউকে উদ্বিগ্ন করে না। নরকের ভয় দেখায় না।

পৃথিবীর সব বর্বর হিংস্র অমানবিক ঘটনা ঘটিয়েছে ধর্ম-সম্প্রদায়গুলো। এদের কারণেই হিন্দু খুন করেছে মুসলমানকে, মুসলমান খুন করেছে হিন্দুকে। সবই করেছে ঈশ্বরের নামে, আল্লার নামে। অথচ ঈশ্বর আল্লা একই জিনিস। যদি তিনি সৃষ্টিকর্তা হন তবে তিনি এই দুপক্ষকেই সৃষ্টি করেছেন।
এদেশের গোঁড়া সেক্যুলার লোকও
 একটা পর্যায়ে ধর্মীয় মৌলবাদী, রেসিস্ট, সাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠে। এদের মুখ ফসকে বেরিয়ে পড়ে- লোকটা মুসলমান হলেও ভালো। অথবা হিন্দু হলেও ভালো। অর্থাৎ হিন্দুর কাছে মুসলমান মানেই খারাপ। মুসলমানের কাছে হিন্দু মানেই হল খারাপ। এটাই হল বাস্তবতা। এটাই আমরা ইনহেরিট করে চলেছি। কেউ আর মানুষ হতে চাইছে না। সব ধর্মের ষাঁড় হয়ে উঠেছে।

ভারতে বিজেপি-আরএসএস আর বাংলাদেশে জামায়াত ও তাদের সাঙ্গোপাঙ্গোরা এই বর্বর ধর্ম-সাম্প্রদায়িকতার নেতৃত্ব দিচ্ছে। ঈশ্বরের কশাইয়ের দায়িত্ব পালন করে চলেছে এরা।
বাবরি মসজিদ নিয়ে যে
কাণ্ডটা হয়েছে বা চলছে সেটা আমাদের এই চরম বর্বরতারই একটি উদাহরণ। অথচ বিদেশে চার্চ বিক্রি হয়। অন্য ধর্মের লোকজন সেটা কিনে তাদের ধর্মশালা বানায়। কেউ কিছু মনে করে না। চিনে উইঘরে কয়েক হাজার মসজিদ গুঁড়িয়ে দিয়েছে। তাতে কিছু যায় আসেনি কারও। কিন্তু এই দু-তিন দেশে হলে রক্তগঙ্গা বয়ে যেত।একটি হত্যা দিয়ে আরেকটি হত্যাকে চাপা দেওয়া হচ্ছে। তারপর নতুন আরেকটি হত্যার দিকে এগিয়ে যাওয়া হচ্ছে। চারিদিকে হত্যার উৎসব। যে কোনও মুহূর্তে যে কেউ মারা পড়তে পারেন। এখন গুপ্ত হত্যার চেয়ে প্রকাশ্য হত্যার উৎসব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
মানবিকতা এখন পণ্যে
পরিণত হয়েছে। যখন মানবিকতা পণ্যে পরিণত হয় তখন দিকে দিকে হিটলারের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প গড়ে ওঠে। মানুষজনও এই ক্যাম্পে বিনা আতঙ্কে প্রবেশের জন্য ঘরে ঘরে প্রস্তুতি নেয়।

প্রতিবাদ প্রতিরোধ নয়- মানুষ কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে মরে যেতে ভালোবাসে।

(লেখক নিউইয়র্ক নিবাসী গল্পকার)

(স্কেচটি করেছেন তাজুল ইমাম)

পরের পর্ব এই মাসের চতুর্থ রবিবার…

জলের অক্ষর পর্ব ১২

You might also like