Latest News

জলের অক্ষর (পর্ব পাঁচ)

কুলদা রায়

 

আমার প্রিয় উপন্যাস ভিক্টর হুগোর ‘দি হ্যাঞ্চ ব্যাক অব নতরদ্যাম’। প্রথম পড়েছিলাম ১৯৮১ সালে। ময়েনুদ্দিন স্যার পড়তে দিয়েছিলেন বাবাকে। বাবা দিল আমাকে পড়তে। কী অদ্ভুত সেই পড়া। আজও মর্মে গেঁথে আছে। এখনও অমলিন। লিখলে এরকম উপন্যাসই লিখতে হবে।

এই উপন্যাসটি পড়ে আমার প্রয়াত কবিবন্ধু গ্রীনজোরি হয়ে গিয়েছিল চিরকালের মতো।

মহৎ গ্রন্থপাঠ ঈশ্বর দর্শনের মতো অনির্বচনীয়।

 

লিখে লাভ কী?

এই প্রশ্নটি মাঝে মাঝে ভাবি। ভাবি, লেখাটি না হলে কী ক্ষতি হত!

আমি একটি গাছের নীচে দাঁড়াই। গাছটির পাতা নেই। গান নেই। বাকলগুলো তীব্র শীতে ফেটে গেছে। ফাঁকে ফোঁকরে তুষার জমে আছে। গাছটিকে প্রশ্ন করি, ও গাছ- গাছ হয়ে তোমার লাভ কী?

গাছটি কিছু বলে না। একটি কাঠবিড়ালি সুড়সুড় করে বাকল বেয়ে উপরে উঠে যায়। আবার নেমে আসে। পিটপিট করে তাকায়। গাছের ফোঁকরে ঢুকে পড়ে। হারিয়ে যায়। এই ফোঁকরটি না থাকলে কী ক্ষতি হত?

এইসব গুহ্য তত্ত্ব। তত্ত্ব এলে মাথা তপ্ত হয়ে ওঠে। হাঁসফাঁস করি। সামনের পুকুরটির উপর কে জানি সাদা রং ঢেলে গেছে। রোদ পড়ে চিকচিক করছে। কয়েকটি হাঁস ভেসে বেড়ায় এইখানে । আজ হাঁসগুলি নেই। থৈ থৈ জলে মাছ ধরতে ভাল লাগে। ঝুঁকে দেখি, কয়েকটি পালক পুকুরে আধখানি ডুবে আছে। বলছে, আয় না। আয়। একটু একটু করে পা বাড়াই। কাঁপতে কাঁপতে বাম পা’টি রাখি জলের উপরে। সাদার উপরে। ভাবি, এইবার ডুবে যাব। ডুবে গেলে কী ক্ষতি? কী লাভ মাটি উপরে দাঁড়িয়ে থেকে! আকাশ দেখা? তারার আলোতে ব্যাকুল হয়ে ওঠা। নেত্রজল মেলে দেওয়া। ‘কোথাও মায়া লাগিয়া রহিয়াছে।’

এইসব ভাবলে জলের উপরে হাঁটা যায়। হেঁটে হেঁটে পালকের গায়ে হাত রাখি। কান পাতি। এইখানে কোথাও মাছ ছিল। এখন নেই। মাছ– আমাদের হৃদয়ের মৎসকুমারী বোন- তোমরা এখন কোথায়? হাহাকার করতে করতে আমি জলের উপর দিয়ে ছুটে বেড়াই। ক্লান্ত হয়ে জলের উপর বসে পড়ি। জলকে জলের মত ভেবেছি। পদ্মপাতায় জলদেবী বসে। জল, তুমি জল হলে না কেন?

সমুদ্র দেখেছি বেশ বড়বেলায়। তার আগে সমুদ্র পেরিয়ে গিয়েছি আকাশ দিয়ে। তারও আগে সমুদ্র চিনেছি মাইকেলের মহাকাব্যে।

জ্যাক লন্ডনের ‘দি সী উলফ’ পড়ে বাঘা লারসেনের সমুদ্রের জলদস্যুগিরি দেখেছি। দেখে গা শিউরে উঠেছে। তার কাছে মহানুভবতা বলে জীবনে কোনও শব্দ থাকতে নেই। আছে মহাশক্তিধর শব্দটি। মহাশক্তি অর্জন করে মহাদানবের মতো বাঁচতে হবে।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অলৌকিক জলযান’ পড়ে অর্চিকে ভালোবেসে ফেলেছি। হায় মেয়েটি, ছোটো বাবুকে পাখির ছানার মতো সমুদ্রে আশ্রয় দিয়েছে। তার কাছে শক্তি নয়- কোমলতাই জীবনের মানে।

‘সমুদ্র মানুষ’ উপন্যাসটি অলৌকিক জলযানের আগের পর্ব। কিন্তু ‘সমদ্র মানুষ’ অতীন লিখেছেন পরে। ‘অলৌকিক জলযান’ লেখার পরে অতীনবাবুর অর্চির আগের কাহিনিটুকু বলতে ইচ্ছে করেছিল বোধ হয়। একজন বড় লেখকের হাতে একটা কাহিনির আগে পরে বহু কাহিনি থাকে। তার শুরুও নেই– শেষও নেই। অশেষ করে লেখেন। লিখতে লিখতে বোঝেন, তিনি সারা জীবনে একটিমাত্র কাহিনিই লিখছেন। সেই কাহিনিটিই তার আগে তাঁর পূর্বসূরীরা লিখেছেন। পরে অন্যরা লিখবেন।

অমর মিত্রের ‘ধনপতির চর’ উপন্যাসে পর্তুগিজ বংশদ্ভুত পেদ্রো নামের বুড়ো মানুষটি এক টুকরো দ্বীপের উপর পা ছড়িয়ে বসে আছে। তার বয়সের গাছ-পাথর নেই। দ্বীপটিকে পিঠ দিয়ে জাগিয়ে রেখেছে একটি অলীক কাছিম। কাছিমটি যে কোনও সময় হুস করে সরে গেলেই দ্বীপটি জলে ডুবে যাবে। এই আশঙ্কা থেকেও চরটি ধনপতি নামে হুলস্থুল্ভাবে পরিচিত আছে। দ্বীপটি দখলের লড়াই করছে নানাজনে। এখানে বহুদূর থেকে বউ ছেলে মেয়েকে রেখে জেলেরা মাছ ধরতে আসে। মাছের মরশুমে কোনও এক জেলেনিকে নিয়ে এই দ্বীপে ঘর করে। আর পেদ্রোকে মহাশক্তিধর মনে করে। তাকে বিনতি করে। এই পেদ্রো তাদের কাছে কোনো মানুষ নয়– সেই অলীক কাছিম। আর এসব নিয়েই অসামান্য করে বর্ণিত হয়েছে এইসব লেখা।

আজ বেশ কদিন ধরে প্রতিদিনই সমুদ্রের কাছে আসছি। বড় বড় ঢেউ ছুটে আসছে। গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে জলকণা আছড়ে পড়ছে তীরে। আর অসংখ্য শঙ্খচিল নীচু হয়ে উড়ছে।

একটি শিশু এই সমুদ্রতীরে আমাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়েছে। মুখে কথা নেই। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। তারপর সেই বালি, ঢেউয়ের গুঁড়ো আর শঙ্খচিলের ভেতর দিয়ে হেঁটে এসে আমার আঙুলগুলো ধরেছে। ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে। ফিক করে হেসে তার মাকে বলছে, দিস ইস আ পিপল। নো ডেমোন।

(লেখক নিউইয়র্ক নিবাসী গল্পকার)

(স্কেচটি করেছেন তাজুল ইমাম)

পরের পর্ব মাসের চতুর্থ রবিবার…

https://www.four.suk.1wp.in/kuloda-roy-opinion-blog-joler-okkhor-part-four/

 

 

You might also like