Latest News

কাশ্মীরের বাকি অংশটাও কিন্তু আমাদের, রোজ পাকিস্তানকে মনে করিয়ে দেবে ভারত

রাজীব সাহা

আপাতদৃষ্টিতে ছোট্ট একটা পদক্ষেপ। কিন্তু তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী।

গত বৃহস্পতিবার ভারতের আবহাওয়া অফিসের ডিরেক্টর জেনারেল মৃত্যুঞ্জয় মহাপাত্র জানিয়েছেন, তাঁদের জম্মু-কাশ্মীর সাবডিভিশন থেকে এবার পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হবে। খুবই নিরুত্তাপ ঘোষণা। যেন নিতান্ত রুটিনমাফিক সবাইকে জানানো হচ্ছে কথাটা। এবার থেকে গিলগিট-বালটিস্তান ও মুজফফরাবাদের কথা উল্লেখ থাকবে আবহাওয়া অফিসের দৈনিক বুলেটিনে।

কোনও আবহাওয়া অফিস সাধারণত নিজের দেশের খরা, ঝড়বৃষ্টি ও তুষারপাতের পূর্বাভাস দেয়। অন্য দেশের দেয় না। ভারত বরাবরই দাবি করে এসেছে, আজাদ কাশ্মীর নামে যে জায়গাটা পরিচিত, সেটা তাদের। এবার আবহাওয়া দফতরকে দিয়ে কার্যত সেই কথাই বলানো হচ্ছে।

কৌশলটা চমৎকার। রোজ আবহাওয়া অফিস থেকে একটা করে বুলেটিন প্রকাশিত হবে আর তাতেই ইঙ্গিত দেওয়া থাকবে, কাশ্মীরের যে অংশটা পাকিস্তান দখল করে রেখেছে, সেটা কিন্তু আমাদের। সরাসরি কিছু বলা হবে না। কিন্তু কৌশলে সবই বলা হবে। এ হল একধরনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার।

বিশ্বের যেখানেই যুদ্ধ হয় সেখানেই দু’পক্ষ পরস্পরের মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য একরকমের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই চালায়। যখন সরাসরি যুদ্ধ হয় না, কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতি বজায় থাকে, তখনও ওইরকম হয়। কাশ্মীর নিয়ে প্রথমবার ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ হয়েছিল ১৯৪৭ সালে। তারপর থেকেই কাশ্মীর সীমান্তে যুদ্ধ পরিস্থিতি রয়েছে। সুতরাং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চলবেই।

’৪৭ সালে ব্রিটিশরা যখন ভারতীয় উপমহাদেশ ছেড়ে বিদায় নিল, তখন কাশ্মীরের রাজা ছিলেন হরি সিং। ব্রিটিশ ভারতে এমন অনেক করদ রাজ্য ছিল। কাশ্মীর তার অন্যতম। স্বাধীনতার পরে এই রাজ্যগুলি যোগ দিয়েছিল ভারতে অথবা পাকিস্তানে। কিন্তু হরি সিং-এর খেয়াল হল, তিনি একলা থাকবেন। কারও সঙ্গে যোগ দেবেন না।

নিজের ভুল বুঝতে তাঁর বেশিদিন দেরি হয়নি। পাকিস্তানের শাসকদের বরাবর কাশ্মীরের ওপরে খুব লোভ। তাঁরা সুযোগ খুঁজছিলেন কীভাবে হরি সিংকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায়। খুব শীঘ্র মিলে গেল সুযোগ। হরি সিং পুঞ্চের চাষিদের ওপরে নতুন একদফা কর বসিয়েছিলেন। পুঞ্চের চাষিদের এক বড় অংশ ছিল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ফেরত সৈনিক। পাকিস্তান তাদের পিছন থেকে উস্কানি দিল। তারা বিদ্রোহ করল হরি সিং-এর বিরুদ্ধে। কিছুদিন বাদে তাদের সঙ্গে যোগ দিল মুজফফরাবাদ ও মিরপুরের উপজাতি সর্দাররা। তারা মুজফফরাবাদ, পুঞ্চ ও মিরপুরের একটা অংশ জুড়ে ঘোষণা করল আজাদ কাশ্মীর।

সেই বছরটায় হরি সিংয়ের বিপদের অন্ত ছিল না। পুঞ্চের বিদ্রোহীদের সামলানোর আগেই খবর এল, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের দুর্ধর্ষ পাশতুনরা বিদ্রোহ করেছে। তাদের হাতে ছিল আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র। তারা দলবল নিয়ে সোজা চলে এল শ্রীনগরের ২০ মাইলের মধ্যে। হরি সিং দেখলেন মহাবিপদ। তিনি শরণাপন্ন হলেন জওহরলাল নেহরুর। করুণ আর্জি জানালেন, আমাকে বাঁচান। তার বিনিময়ে রাজা ভারতে যোগ দিতে রাজি হলেন।

নেহরু আর দেরি করলেন না। বিমানে সৈন্য পাঠিয়ে দিলেন শ্রীনগরে। তারা পাশতুন বিদ্রোহীদের তাড়িয়ে দিল। কাশ্মীরে ভারতীয় সেনা দেখে চটে গেল পাকিস্তান। সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানি সেনাও ঢুকে পড়ল কাশ্মীরে। দুই দেশে লেগে গেল যুদ্ধ। ভারত রাষ্ট্রপুঞ্জের কাছে আবেদন জানাল, বিরোধ মেটাতে সাহায্য করুন। রাষ্ট্রপুঞ্জ সঙ্গে সঙ্গে বলল, দু’পক্ষ এখনই যুদ্ধ থামাক। তারপর আলোচনা হবে। ততদিনে জয় এসে পড়েছে ভারতীয় সেনার হাতের মুঠোয়। পাকিস্তানি সেনা তাড়া খেয়ে পালাচ্ছে। আর কিছুদিন যুদ্ধ চললেই তারা কাশ্মীর সীমান্ত পেরিয়ে পালাত। এমন সময় রাষ্ট্রপুঞ্জের কথা শুনে নেহরু থামালেন যুদ্ধ। পাকিস্তানি সেনা তখন আজাদ কাশ্মীরে অবস্থান করছিল। সেখানটা তারা দখল করে রইল।

অনেকে বলেন, আগেভাগে রাষ্ট্রপুঞ্জে যাওয়া ভারতের ভুল হয়েছিল। যুদ্ধটা চূড়ান্তভাবে শেষ করলে ভাল হত। নেহরুকে রাষ্ট্রপুঞ্জে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন তাঁর বন্ধু মাউন্টব্যাটেন। সেজন্যই কাশ্মীরটা পুরোপুরি উদ্ধার করতে পারেনি ভারত। তার জের এখনও চলছে।

স্বাধীনতার ঠিক পরেই নেহরু সরকার কাশ্মীর নিয়ে দু’টো ভুল করেছিল। এক নম্বর ভুল পাকিস্তানিদের তথাকথিত আজাদ কাশ্মীর দখল করে থাকতে দেওয়া। দু’নম্বর ভুল ছিল ৩৭০ ধারা। সংবিধানের ওই ধারায় কাশ্মীরিদের কয়েকটি বাড়তি অধিকার দেওয়া হয়েছিল। তার ফলে কাশ্মীরিদের এক বড় অংশ নিজেদের ভারতীয় বলে ভাবতে শেখেনি। কাশ্মীরে জমি কেনা সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞার ফলে সেখানে বিনিয়োগও করতে পারেনি কোনও সংস্থা।

একদিকে ভারত রাষ্ট্র থেকে মানসিক বিচ্ছিন্নতা, অন্যদিকে অনুন্নয়ন। দুইয়ের প্রভাবে কাশ্মীরে জন্ম হয়েছে উগ্রপন্থার। সম্প্রতি ৩৭০ ধারা বিলোপ করে উগ্রপন্থার শিকড় কেটে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু শুধুমাত্র তাতে হবে না। যতদিন তথাকথিত আজাদ কাশ্মীরের অস্তিত্ব থাকবে, ততদিন কাশ্মীরি যুবকদের উস্কানি দেওয়া চলবেই। জায়গাটা দীর্ঘদিন ধরেই জঙ্গিদের মুক্তাঞ্চল। পাকিস্তানি সেনা ওখানে কাশ্মীরি যুবকদের প্রশিক্ষণ দেয়। বিভিন্ন সময় সেখানে আল কায়েদা ও তালিবানের অস্তিত্বের কথাও জানা গিয়েছে।

৩৭০ ধারা বিলোপের পরেই প্রশ্ন উঠেছিল, মোদী সরকার কি নেহরু জমানার দ্বিতীয় ভুলটিও সংশোধন করবে? অর্থাৎ আজাদ কাশ্মীর থেকে তাড়িয়ে দেবে পাকিস্তানি সেনাকে?

আজাদ কাশ্মীরের অবস্থান সামরিক দিক থেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ। তার আয়তন খুব বেশি নয়। ১৬৮০ বর্গ কিলোমিটার। পাকিস্তান, চিন ও আফগানিস্তান, তিনটি দেশের সঙ্গে তার সীমান্ত রয়েছে। দাবি করা হয়, ওই এলাকাটি স্বশাসিত। বাস্তবে পাকিস্তানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে তার ওপরে। আজাদ কাশ্মীর যদি ভারতের নিয়ন্ত্রণে আসে, তাহলে জম্মু-কাশ্মীরে নিশ্চিতভাবেই জঙ্গিবাদের অবসান ঘটবে।

মোদী সরকার কি সেই চেষ্টা করবে? অসম্ভব নয়। যদিও এই কোভিড সংকট কাটিয়ে উঠে কবে কাশ্মীরের দিকে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারবে বলা মুশকিল। ততদিন কিন্তু দু’পক্ষের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ থেমে থাকবে না।

চলতি সপ্তাহের শুরুতেই পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, সেপ্টেম্বরে ভোট হবে গিলগিট বালটিস্তানে। ভারত তখনই খুব আপত্তি করেছিল। ওই জায়গাটা তো আমাদের। তোমরা ওখানে ভোট করার কে? পাকিস্তান যথারীতি কান দেয়নি। তাই ভারতও দিল পালটা। পাকিস্তানের ওপরে চাপ সৃষ্টির জন্য ঘোষণা করল, এবার থেকে রোজ আবহাওয়া দফতরের বুলেটিনে আজাদ কাশ্মীরের কথা উল্লেখ থাকবে।

পাকিস্তান নিশ্চয় ব্যাপারটা ভালভাবে নেবে না। আজাদ কাশ্মীর নিয়ে দুই দেশের মধ্যে অশান্তি বাড়বে। তার শেষ কোথায় হবে কে বলতে পারে।

You might also like