Latest News

মোদী সরকার বিচারব্যবস্থাকে মাফ করুক

বিতর্কটা (Controversy) বহুদিন ধরেই আছে। কিছুদিন হল কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী কিরেন রিজিজু তা নতুন করে খুঁচিয়ে তুলেছেন।

প্রশ্ন হল, উচ্চ আদালতে বিচারপতিদের নিয়োগ (Justice Recruitment) করবে কে? বিচারপতিরা কি নিজেরাই নিজেদের নিয়োগ করবেন? নাকি সরকারেরও এব্যাপারে জোরালো ভূমিকা থাকবে? এই প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্ট ও নরেন্দ্র মোদী সরকার স্পষ্টতই ভিন্নমত পোষণ করে।

বর্তমানে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতিদের নিয়োগ ও বদলি করে পাঁচ সদস্যের কলেজিয়াম। শীর্ষ আদালতের কলেজিয়ামের শীর্ষে থাকেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি। সেই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের অপর চারজন প্রবীণ বিচারপতি কলেজিয়ামের সদস্য হন। হাইকোর্টের কলেজিয়ামের শীর্ষে থাকেন হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি। আর থাকেন হাইকোর্টের অপর দু’জন প্রবীণ বিচারপতি। সাধারণত কোনও বিচারপতি অবসর নেওয়ার অল্পদিন আগে কলেজিয়ামের সদস্যপদ লাভ করেন। তাই কেউ বেশিদিন ওই সংস্থার সদস্য থাকতে পারেন না।

Image - মোদী সরকার বিচারব্যবস্থাকে মাফ করুক

কলেজিয়াম কোনও বিচারপতিকে নিয়োগ করার জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করে। সরকার কেবল তদন্ত করে দেখে, সেই বিচারপতিকে নিয়ে অতীতে কোনও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে কিনা। যদি দেখা যায় সব ঠিক আছে, তাহলে তাঁকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করেন।

কোনও বিচারপতিকে নিয়োগের ব্যাপারে সরকারের আপত্তি থাকলে তা কলেজিয়ামকে জানানো হয়। কিন্তু কলেজিয়াম যদি ফের একই বিচারপতিকে নিয়োগের সুপারিশ করে, তাহলে সরকার বাধ্য হয়ে তাঁকে নিয়োগ করে। অনেক সময় দেখা গিয়েছে, কোনও বিচারপতির ব্যাপারে আপত্তি থাকলে সরকার কলেজিয়ামের সুপারিশ কার্যকর করতে দেরি করে। সরকারের এই ‘দেরি করার কৌশল’ নিয়ে একাধিকবার অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন শীর্ষ আদালতের বিচারপতিরা।

সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রধান তিনটি স্তম্ভ হল আইনসভা, কার্যনির্বাহী বিভাগ ও বিচারবিভাগ। প্রতি বিভাগই স্বশাসিত।

বিচারবিভাগের স্বশাসন বজায় রাখার জন্যই কলেজিয়াম গঠিত হয়েছিল। সংসদে কোনও আইন করে ওই প্রথা চালু হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের কয়েকটি রায়ের ভিত্তিতে চালু হয় কলেজিয়াম ব্যবস্থা।

কলেজিয়াম ব্যবস্থা কখনই বিজেপির মনঃপুত ছিল না। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর আমলে বিচারপতি এমএন বেঙ্কটচালাইয়ার নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠিত হয়। সেই কমিশনের কাজ ছিল কলেজিয়াম ব্যবস্থার নানা দিক খতিয়ে দেখা। বেঙ্কটচালাইয়া সুপারিশ করেন, বিচারপতিদের নিয়োগের জন্য গঠিত হোক ন্যাশনাল জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কমিশন। তাতে থাকবেন প্রধান বিচারপতি, সুপ্রিম কোর্টের অপর দু’জন প্রবীণ বিচারপতি এবং আইনমন্ত্রী। এছাড়া নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে এক বিশিষ্ট ব্যক্তি কমিশনের সদস্য হবেন। তাঁকে নিয়োগ করবেন রাষ্ট্রপতি।

প্রথমবার ক্ষমতায় এসেই নরেন্দ্র মোদী ন্যাশনাল জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কমিশন গঠনে উদ্যোগী হন। সেজন্য সংবিধান সংশোধন করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে এক গুচ্ছ আবেদন জমা পড়ে সুপ্রিম কোর্টে। তাতে বলা হয়, সংবিধান সংশোধন করে বিচারব্যবস্থার স্বশাসন খর্ব করার চেষ্টা হচ্ছে। ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, ওই সংবিধান সংশোধন বেআইনি। কলেজিয়াম ভেঙে দেওয়ার জন্য যে চেষ্টা হচ্ছিল, তা তখনকার মতো বন্ধ হয়ে যায়।

কিন্তু মোদী সরকার অত সহজে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। তাই নতুন করে কলেজিয়াম প্রথার সমালোচনা শুরু হয়েছে। কিরেন রিজিজু বলেছেন, কলেজিয়াম যে পদ্ধতিতে বিচারপতিদের নিয়োগ করে, তা অস্বচ্ছ। অনেক সময় একজন বিচারপতির মতই সেখানে গুরুত্ব পায়। তিনি তাঁর পরিচিত বিচারপতিদের মধ্যে কাউকে নিয়োগ করেন। এমনটা হওয়া উচিত নয়। যিনি যোগ্যতম, তাঁকেই নিয়োগ করা উচিত।

একইসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘পৃথিবীতে আর কোথাও বিচারপতিরা বিচারপতিদের নিয়োগ করেন না’। তাঁর বক্তব্য, বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাপক রাজনীতি হয়। যদিও তা প্রকাশ্যে আসে না।

আইনমন্ত্রীর কথার জবাব দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়। তিনি বলেন, কোনও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানই একশ ভাগ নিখুঁত নয়। আমাদের কলেজিয়াম ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে হবে। প্রকাশ্যে ওই প্রথার নিন্দা করে লাভ নেই।

সংসদীয় গণতন্ত্রে বিচারবিভাগের কাজ অনেকটা রেফারির মতো। আইনসভা বা আমলাতন্ত্র ঠিকমতো আইন মেনে কাজ করছে কিনা, তা দেখার দায়িত্ব আদালতের। আইনমন্ত্রীর মতে, বিচারপতিরা নিজেরাই যেভাবে নিজেদের নিয়োগ করেন, তা অসঙ্গত। কিন্তু সরকার যেভাবে বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নাক গলাতে চাইছে, তাই বা কতদূর সঙ্গত? যে রেফারি সরকারের ওপরে নজর রাখবে সরকার নিজেই তাকে নিয়োগ করতে চায়। এমন হলে তো রেফারির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের ধারণা, নির্বাচন কমিশনের কাজে সবসময় নিরপেক্ষতা বজায় থাকছে না। দাবি উঠেছে, উচ্চ আদালতে নিয়োগের জন্য যেমন কলেজিয়াম ব্যবস্থা আছে, নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের জন্যও তেমন কিছু করা হোক। অর্থাৎ একদিকে সরকার যখন উচ্চ আদালতে কলেজিয়াম ব্যবস্থার বিলোপ চাইছে, অন্যদিকে অনেকে ভাবছেন, অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানেও ওই ব্যবস্থা চালু হওয়া উচিত।

গত ২৪ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ প্রশ্ন তুলেছে, অরুণ গোয়েলকে ‘এত দ্রুত’ নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ করা হল কীভাবে? তাঁর ফাইল কীভাবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অনুমোদন লাভ করল? কেন এই তাড়াহুড়ো?

কোনও প্রতিষ্ঠানের স্বশাসন না থাকলে এই ধরনের প্রশ্ন উঠবেই। মোদী সরকার বরাবর চেষ্টা করে যাতে প্রতিটি সংস্থাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসা যায়। এমন প্রবণতা গণতন্ত্রের পক্ষে ভাল নয়।

কুমারীত্ব পরীক্ষা বন্ধেও কড়া হোক সুপ্রিম কোর্ট

You might also like