Latest News

Justice: সুশাসন বনাম প্রশাসন ও একটি শোকসভা

অমল সরকার

প্রাপ্য বেতন আদায়ের জন্য একটানা ৪২ বছর লড়াই চালিয়েছেন তিনি। আদালতের চক্কর কাটতে কাটতেই পেকে গিয়েছে চুল। এক সময়ের যুবতী শিক্ষিকা এখন হয়েছেন প্রবীণ নাগরিক। তবু লড়াই থামেনি। দীর্ঘ সেই লড়াইয়ে অবশেষে সাফল্য এল। সাফল্য এনে দিলেন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় (Justice)।

৫ মে হাওড়ার শ্যামপুর হাইস্কুলের শিক্ষিকা শ্যামলী বসুকে নিয়ে এই খরবটি ‘দ্য ওয়াল’-এ প্রকাশিত হওয়ার খানিক পরেই পরিচিত একজন ফোন করে বললেন, ‘আশা করি মরার আগে আমিও এরকম একটা সুখবর তোমাদের দিতে পারব।’ তাঁর লড়াই পেনশন নিয়ে।

আমার অভিজ্ঞতা বলে, শ্যামলী বসুকে নিয়ে খবরটি ডিজিট্যাল জুগের ভাষায় ‘ভাইরাল’, হয়েছে। অর্থাৎ অগুনতি মানুষ পড়েছেন খবরটি। পড়েছেন, কারণ শিক্ষিকার সঙ্গে মানুষ নিজের অভিজ্ঞতাকে মেলাতে পেরেছেন। আমরা সাধারণ নাগরিকেরা বেশিরভাগই এই জাতীয় কোনও না কোনও সমস্যার সঙ্গে দীর্ঘদিন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি এবং আশায় বুক বেঁধেছি, একদিন সুবিচার মিলবে।

দুর্ভাগ্যের হল, এই লড়াইয়ে বেশিরভাগ নাগরিকের প্রতিপক্ষ হল রাষ্ট্র। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এনভি রামানার দেওয়া হিসেব অনুযায়ী, দেশের বিচারালয়গুলিতে ৫০ শতাংশ মামলাতেই বাদী-বিবাদী হল সরকার। বিচারালয়ের সঙ্গে যুক্ত মহলের মতে, এই পঞ্চাশ শতাংশের আবার নব্বই ভাগ মামলার বিষয়বস্তু হল, সরকারের বিরুদ্ধে নাগরিকের নালিশ।

সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি একটি পাহাড় প্রমাণ সমস্যায় একেবারে মূল আঘাত করেছেন। তা হল, বকেয়া মামলা নিয়ে আদালতের দিকে আঙুল তোলা অর্থহীন। আরও বলেছেন বিচারপতির শূন্য পদ পূরণ, আরও বিচারপতি নিয়োগ, আরও আদালতের আয়োজন করেও বকেয়া মামলার বোঝা খুব একটা কমবে না। বোঝা কমতে পারে মামলা কমানো গেলে। আর তা সম্ভব হতে পারে, সরকার, প্রশাসন আন্তরিকভাবে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে।

প্রধানমন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রীদের উপস্থিতিতে ৩০ এপ্রিল দিল্লির বিজ্ঞানভবনে দেশের প্রধান বিচারপতি মিনিট কুড়ির ভাষণে বুঝিয়ে দিয়েছেন, দেশে সুশাসন বলে কিছু নেই। রামানার মার্জিত সহজ-সরল-সাহসী ভাষণটি শোনার সময় মঞ্চে আসীন প্রধানমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং দর্শকাশনে বসা মুখ্যমন্ত্রীদের দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোনও শোকসভায় হাজির হয়েছেন তাঁরা। বাস্তবে সেটা একটা শোকসভাই ছিল বটে। আইনের শাসনের অপমৃত্যুর শোকসভা। শাসন ব্যবস্থার অপমৃত্যুর ছবিটি ভাষণে সেদিন সুন্দর ফুটিয়ে তোলেন প্রধান বিচারপতি।

রামানা সেদিন আরও বলেন, সরকারের বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলির ৬০ শতাংশই জমিজমা সংক্রান্ত। অর্থাৎ বহুচর্চিত সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামেই সরকার-বনাম নাগরিকের জমি বিবাদে ইতি পড়েনি। স্বাধীনতার ৭৫তম বর্ষে এই তথ্যটি বুঝিয়ে দেয় দেশবাসী আসলে কী গভীর অপশাসনের শিকার। তিনি বলেছেন, প্রশাসনের দ্বারা বঞ্চিত নাগরিক বিচারালয়ের দ্বারস্থ হলে আদালত কী করবে? তাদের কথা শুনতেই হবে।

যেমন নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ফৌজদারী দণ্ডবিধি ১২৪-এ ধারাটির অবসান চেয়ে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে একাধিক মামলা হয়েছে। তার একটির মামলাকারী এডিটর্স গিল্ড। আইনের ওই ধারায় রাষ্ট্রের প্রতি কোনওভাবে ঘৃণা বা বিদ্বেষ পোষণ এককথায় রাষ্ট্রদ্রোহ বা দেশদ্রোহ বলে গণ্য হয়ে থাকে। বিদ্বেষ বলতে বোঝাবে অসম্মান, শত্রুতামূলক আচরণ এবং আনুগত্যহীনতা প্রদর্শন।

কোনও দেশপ্রেমিক নাগরিকের আইনের এমন বিধানে আপত্তি থাকার কথা নয়, নেইও। সমস্যা হল, সরকারের সমালোচনাকেই রাষ্ট্রদ্রোহ বলে চালিয়ে নিরপরাধ নাগরিককে বছরের পর বছর জেলে আটকে রাখা হচ্ছে। অভিযোগ সাজানো এবং অভিসন্ধিমূলক বুঝতে অসুবিধা হয় না। অভিযোগ প্রমাণের হার সাকুল্যে এক শতাংশও নয়। কিন্তু সরকারের তাতে কিছু যায় আসে না। প্রতিবাদীকে বিনা বিচারে, জামিন অযোগ্য ধারায় আটকে রেখে মুখ তো বন্ধ করে দেওয়া গেল।

বর্তমান প্রধান বিচারপতি ধারাটির অপব্যবহারের কথা বলতে গিয়ে সরকারকে সেই কাঠুরিয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন, যাকে এক টুকরো কাঠ কেটে আনতে বলায় গোটা বনটাই সাফ করতে লেগে যান। শনিবার মোদী সরকার ফের সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছে, তারা আইনটি বহাল রাখার পক্ষে। এই ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের একটি বৃহত্তর বেঞ্চের রায় হাজির করে সরকার বলেছে, বর্তমান আদালতের আর এই ধারার ভাল-মন্দ বিচারের এক্তিয়ার নেই।

আইনি দৃষ্টিতে হয়তো বা সরকারের কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু বৃহত্তর প্রশ্নটি হল, ঔপনিবেশিক শাসনে স্বাধীনতাকামী, মুক্তিকামী মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, মানবাধিকার হরণের লক্ষ্যে তৈরি আইন একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বহাল রাখা উচিত, কি অনুচিত– এই প্রশ্নের মীমাংসা করতে আদালতের দরজায় কড়া নাড়তে হবে কেন। বিষয়টি আইনি নয়, নৈতিক এবং রাজনৈতিক। সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। তর্ক-বিতর্কের জন্য আছে সংসদ, বিধানসভা।

প্রধান বিচারপতি রামানা সেদিন লক্ষণরেখা নিয়ে সব পক্ষকে সতর্ক করেছেন। ইঙ্গিত করেছেন, বিচার ব্যবস্থায় সরকার হস্তক্ষেপ করেছে। আক্ষেপ করেছেন, আদালতের রায় সরকার কানে তুলছে না।

অপশাসনের এটা একটা দিক। প্রশাসন-শাসন-সুশাসনের প্রশ্নে আর একটি দিক যা সম্ভবত অনেক বড় বিপজ্জনক প্রবণতা, তা হল, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক নানা প্রশ্নে আদালতকে সরকারের ঢাল করে তোলা। অযোধ্যা বিবাদের কথাই ধরা যাক। মোদী জমানার শুরুতেও হিন্দুত্ববাদী শিবিরের বক্তব্য ছিল, অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণের সিদ্ধান্ত সরকারকে নিতে হবে। এ ব্যাপারে আদালতের কিছু করণীয় নেই।

হঠাৎ করেই সেই একই গলায় আদালতের প্রতি আস্থা জ্ঞাপনের রহস্যটা আজও স্পষ্ট হয়নি। অথচ, রাজনৈতিক পথেই মন্দির-মসজিদ নিয়ে ধর্মীয় বিবাদের স্থায়ী মীমাংসা করা যেত। আড়াইশো বছরের জায়গায় না হয় আরও আড়াই দশক লাগত। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মামলারই নিম্ন আদালতের রায় ঘোষণায় তিন দশক লাগল।

মন্দির-মসজিদ বিবাদে হিন্দুত্ববাদীদের একটি স্লোগান হল, ‘অযোধ্যা তো ঝাঁকি হ্যায়, মথুরা-কাশী বাকি হ্যায়।’ প্রায় চারশো কোটি টাকা ব্যয়ে বারাণসীতে বিশ্বনাথ মন্দির চত্ত্বরের নবসাজের হালে উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। উত্তরপ্রদেশের উপ মুখ্যমন্ত্রী, হিন্দুত্বের জাগ্রত মুখ কেশবপ্রসাদ মৌর্য দিন কয়েক আগে ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এর পর মথুরা-সহ সব বিতর্কিত স্থানেই মন্দির এবং লাগোয়া চত্বরের সংস্কার, সৌন্দর্যায়নের কাজ করা হবে। সেই সঙ্গে জানান, মন্দির-মসজিদ বিবাদের মীমাংসা করবে আদালত। তার জন্য মন্দির সাজানোর কাজ থমকে থাকবে না। মৌর্যের কথায় স্পষ্ট, তাঁরা আশা করছেন, অযোধ্যা মামলার রায়কে সামনে রেখে বাকি বিতর্কিত এলাকায় মসজিদ সরিয়ে নেওয়ার রায় আদায় করে নেওয়া যাবে।

শুধু নরেন্দ্র মোদীর কেন্দ্রীয় সরকার বা বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিই নয়, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিরত থাকার কৌশল নিয়েছে রাজনীতি নির্বিশেষে সব সরকারই। কর্ণাটকে হিজাব বিতর্কের কথাই ধরা যাক। শিক্ষাঙ্গনে এই পোশাক বাতিলের ঘোষণার প্রতিক্রিয়া সরকারের ভাবনায় ছিল না, তা হতে পারে না। আলাপ-আলোচনা ছাড়াই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে তারা আসলে রাজনৈতিক লাভ ওঠাতেই এই ভাবে এগিয়েছে, যাতে অসন্তুষ্ট পক্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয়। হাইকোর্টের রায় হাতিয়ার করে বিধানসভা ভোটের মুখে বিভাজনের রাজনীতিকে আরও প্রসারিত করতে চেয়েছে রাজ্যের বিজেপি সরকার।

কারণ, ধর্মীয় বিভাজন, অশান্তি যত বাড়বে, সংখ্যালঘুদের যত অসন্তুষ্ট করা হবে, ততই সন্তুষ্টি সংখ্যাগুরুদের, এই অঙ্ক মাথায় রেখে চলছে বিজেপি শাসিত ভোটমুখী সব রাজ্যই। কিন্তু ইউনিফর্মের দোহাই দিয়ে হিজাব বাতিল আসলে সামাজিক এবং ধর্মীয় বৈচিত্র, বৈশিষ্টকে কলমের খোঁচায় নসাৎ করা, যা মোটেই সুশাসনের নজির হতে পারে না।

পশ্চিমবঙ্গের দিকে চোখ ফেরানো যাক। এ রাজ্যে দীর্ঘদিন স্কুল শিক্ষক পদে নিয়োগ থমকে থাকার প্রশ্নে সরকার ও শাসক দল কথায় কথায় আদালতের দিকে আঙুল তুলে থাকে। কিন্তু নিয়োগ আটকে যাওয়ার দায় কি আদালতের? নাকি বেতনের বোঝা না বাড়াতে প্যানেল-অনিয়ম পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত এই প্রশ্নেরও জবাব খোঁজা জরুরি। অনিয়মের নমুনাগুলিতে চোখ বোলালে দুধের শিশুও বোঝে, দুনিয়ার কোনও আদালত তা নজর করার পরে চোখ বন্ধ করে রাখতে পারে না।

ভোট-পরবর্তী হিংসা, আনিস হত্যাকাণ্ড, হালে ধর্ষণের অভিযোগে হওয়া একাধিক মামলায় আদালতের তরফে তদন্তে নজরদারির সিদ্ধান্তে স্পষ্ট, প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমছে। বিরোধী শাসিত রাজ্যে কথায় কথায় আদালতের দরজায় কড়া নাড়া বিজেপির পরিচিত রাজনৈতিক কৌশল। মামলাকারী রাজনৈতিক দলের তালিকা তৈরি হলে দেখা যাবে, পদ্ম শিবিরের ত্রিসীমানায় কোনও দল নেই। অস্বাভাবিক মৃত্যুকে খুন বলে সিবিআই তদন্তের দাবি তোলা, কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালিত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে ময়নাতদন্ত করানোর দাবি আদায়কে তারা বড় রাজনৈতিক ফায়দা মনে করে।

মুখ্যমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, কথায় কথায় মামলা (Justice) হচ্ছে। এ রাজ্যে বিগত কয়েক বছরে কার্যত আদালতের শাসন কায়েম হওয়ার দায় তাঁর প্রশাসনের কতটা, সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজাও কম জরুরি নয়। মাস কয়েক আগে সুপ্রিম কোর্টের একটি বেঞ্চ মামলা ফিরিয়ে দিয়ে মামলাকারীদের উদ্দেশে বলে, আদালতে এসেছেন কেন? আদালত কি শাসনকার্য চালায়? বিচারপতিরা কি ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন? দেশে সরকার আছে, সংসদ আছে। তারা কী করছে? তাদের কাছে যান।

প্রধান বিচারপতি রামানাও প্রধানমন্ত্রী-মুখ্যমন্ত্রী-বিচারপতিদের সম্মেলনে বলতে গেলে এই প্রশ্নটাই ছুড়ে দিয়েছেন। দুর্ভাগ্যের হল, দল নির্বিশেষে দেশের সব সরকারই এখন প্রশাসনকে জনতার দুয়ারে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলছে তখনই তীব্রতর সুশাসন নিয়ে হাহাকার। তাই ভিড় বাড়ছে আদালতে। যদিও আমরা ভোট দিয়ে বিচারপতিদের নির্বাচিত করিনি!

বারেবারে মেজাজ হারালেন প্রধান বিচারপতি রামানা, গতকাল কী হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে

You might also like