Latest News

“সজাগ থাকার যুক্তিগুলো কাদের চক্ষুশূল?”

হিন্দোল ভট্টাচার্য

Image - "সজাগ থাকার যুক্তিগুলো কাদের চক্ষুশূল?”

না, নতুন করে কিছু বলার নেই। আমরা সবাই জানি সলমন রুশদি কে, আমরা কেউ কেউ পড়েছি তাঁর লেখা, বেশিরভাগই তাঁকে নিয়ে মিডিয়ার বিতর্কে কান পেতেছি। একদিনের প্রতিক্রিয়া দিয়েছি, কেউ কবিতা লিখেছেন, কেউ নিবন্ধ। কেউ কেউ আবার পথে হেঁটেছেন ব্যানার নিয়ে। ‘মৌলবাদ নিপাত যাক’ ধ্বনিতে মুখর করে দিয়েছি রাজপথ, ফেসবুক। তার পর ঘুমিয়ে পড়েছি। কয়েকদিন যদি কিছু না ঘটে মুড়ির মতো মিইয়ে গেছি। অপেক্ষা করে থেকেছি কিছু খবরের, মেতে উঠব বলে। খবর, আমাদের কাছে উত্তেজনা। আলোড়ন না থাকলে আমরা স্তিমিত হয়ে যাই। আর ঠিক এই কারণেই, আমাদের এ হেন সক্রিয় মৌলবাদ বিরোধিতাকে উড়িয়ে দিয়ে, সারা  বিশ্বেই মৌলবাদ বাড়ছে। আমাদের ব্যক্তিগত ঘরে যতক্ষণ আঁচ এসে না পড়ে, আমরা চুপ করে থাকি। বুঝতে পারি না। বুঝেও, বুঝি না। (Opinion Column)

এই যে রুশদির গলায় কোপ মারল এক মৌলবাদী, আসলে, সে কোপ মারল স্বাধীন কণ্ঠেই। রুশদির স্যাটানিক ভার্সেস যাদের কাছে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল, তারা ইসলামের বিশুদ্ধ মৌলবাদী। ইতিহাস সকলেই জানেন। কোপ রুশদির উপর পড়েছে, আমরা উদ্বিগ্ন। কয়েক বছর আগে কোপ পড়ল বাংলাদেশে ব্লগারের উপর। আমরা বাকরুদ্ধ। এমন অনেক কোপ পড়ছে নানা জায়গায়। কোপ না পড়লেও কোপের হুমকি পড়ছে। কোপের হুমকিও যে কোপের মতোই, তা নিয়ে নিশ্চয়ই কেউ তর্ক করবেন না। কেউ নিশ্চয়ই তর্ক করবেন না গৌরী লঙ্কেশকে কুপিয়ে মারা নিয়ে বা প্রতিনিয়ত বিজেপি-আরএসএস ও হিন্দুত্ববাদীদের নানা বিষয়ে ফতোয়া নিয়ে। নজরুল যদি এখন বাংলা ভাষায় শ্যামাসঙ্গীত লিখতেন, তাহলে হয়তো হিন্দু মৌলবাদ আর মুসলিম মৌলবাদ উভয়ে মিলেই তাঁকে হত্যা করত। তিনি যতদিন লিখেছেন, ততদিনও লিখতে পারতেন না। বেশি কিছু নয়, হুসেনের নগ্ন সরস্বতী আপনারা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে দেখুন, একটাই কথা হাজারে হাজারে বলবে— দেবদেবীদের নিয়ে নগ্ন করা কেন? আঁকুক হজরত মহম্মদকে। তখন দেখা যাবে। (Fundamentalism)

একটি বিশেষ শব্দ আছে ভারতীয় রাষ্ট্রের কাছে। ‘ভাবাবেগ’। অথচ ধর্ম-নিরপেক্ষ একটি প্রকৃত দেশ তার নাগরিকদের তো শিক্ষিত করার চেষ্টা করবে। রাম, কৃষ্ণ— এরা সব সাহিত্যের চরিত্র। রামায়ণ, মহাভারত অসামান্য মহাকাব্য। কিন্তু তা সাহিত্য। সাহিত্য হিসেবে তাকে মাথায় তুলে রাখুন। পুরাণ অসামান্য সাহিত্যের নিদর্শন। তাকে সাহিত্য হিসেবে পড়ুন। কিন্তু তা সত্য নয়। বাস্তব নয়। কেউ আকাশ থেকে বাণী শুনতে পায় না। আল্লা আছে মনের মধ্যে। এই আল্লা কে? মন। মহাবিশ্বের মন। কিন্তু ধর্ম কার লেখা? মহাবিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে আধ্যাত্মিক যোগাযোগ সম্ভব কিন্তু তা কোনও অনুশাসন তৈরি করে না। অনুশাসন তৈরি করে মানুষ, যারা ক্ষমতা ও শাসনকে একটা ম্যানুয়ালে বেঁধে ফেলতে চায়। এভাবেই ধর্ম তৈরি, ধর্মগ্রন্থ আসলে শাসনতন্ত্রের ম্যানুয়াল। কিন্তু তা মৌলবাদ যখন হচ্ছে, তখন তাকেই এক ও একমাত্র ভাবা ও ভাবানো হচ্ছে

শাসনতন্ত্রের মূল ভিত্তিই হল, আমিই শেষ কথা। আমার কথা শুনে চলো, নয়তো, খাঁড়া নেমে আসবে।
তেমনই, খাঁড়া নেমে এসেছে সলমন রুশদির উপর। মৌলবাদীদের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে এই লেখককে ছদ্মনামে একপ্রকার লুকিয়ে থাকতে হয়েছে। একদল বর্বর লোক এই তথাকথিত উন্নত পৃথিবীতে ধর্মের নামে মানুষের কণ্ঠকে স্তব্ধ করছে, এটা আমরা দেখলাম। মনে মনে এবং প্রকাশ্যে আমরা বলেও ফেললাম মুসলমানরা এরকমই সন্ত্রাসবাদী। এই কথাটি যখন বললাম, তখন ভাবলাম না, হিন্দু মৌলবাদীদের কথা। এই দেশে এখন ধর্মীয় সন্ত্রাসের আবহ। এই সিনেমায় ওই দেখানো যাবে না, এই লেখা যাবে না, ওই বিজ্ঞাপনে এই সব বাদ দিতে হবে— বলছে কারা? কারা বলছে রামের বদনাম হলে বাড়ি জ্বালিয়ে আসব? কারা সত্যি সত্যি পুড়িয়ে মারছে? আমাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশে এখন যদি চলে মুসলিম মৌলবাদী হিংসা,  তাহলে আমাদের দেশে এখন চলছে হিন্দু ও মুসলিম উভয় মৌলবাদ। এ যেন নিয়ম হয়ে যাচ্ছে, বিজ্ঞাপনে দেবদেবীকে নিয়ে মজা করা যাবে না, সিনেমায় কোনও ধর্ম বা দেবতা নিয়ে কথা বলা যাবে না। বললেই হিন্দু গুন্ডারা এসে অফিস ভেঙে দেবে। দরকার পড়লে মেরেও ফেলবে। ভাবাবেগ বলে কথা। তার জন্য হিংসার মৌলিক অধিকার এদের আছে। কিন্তু শিবকে আঞ্চলিক নেতা বা দুর্গার নগ্ন রূপ দেখালেই অসুবিধা। যদি অসুবিধাই থাকে, তাহলে ঈশ্বরকে হিউম্যানাইজ বা মানুষের মতো প্রতীকী করার দরকারটাই বা কী? সেই কবে কালিদাস শিব পার্বতীর বিয়ে ও তার পরের কাহিনি নিয়ে মহাকাব্য লিখে গেছেন। পুড়িয়ে দে তবে। (Fundamentalism)

কিন্তু স্বাধীনতা হরণ বা কণ্ঠরোধ করা যদি থাকে একদিকে মৌলবাদের উদ্দেশ্য, তবে তার চরিত্র হল শাসন। ক্ষমতা দিয়ে বোঝানো, আমিই শেষ কথা। লেনিন যেমন বলেছিলেন, মার্ক্সবাদ সর্বশক্তিমান, কারণ ইহা সত্য। আমরা কি ভুলতে পারি গুমিলেভ, ব্লকের পরিণতি? ভুলতে পারি পাস্তেরনাকের কথা? আমরা স্বাধীন নই। আমরা মৌলবাদীদের ভয় পাই। যত ভয় পাই, যত নিয়ন্ত্রণ করি নিজেদের। তারপরও মৌলবাদ তত নানা ছদ্মবেশে আমাদের জীবনকে তছনছ করে দিয়ে যায়। মৌলবাদের কোনও ঈশ্বর নেই। কোনও একজন মৌলবাদী সলমন রুশদিকে আক্রমণ করেনি, তাঁকে আক্রমণ করেছে পৃথিবীর সমস্ত মৌলবাদী। তার নাম রুশদির ক্ষেত্রে হয়তো মুসলিম মৌলবাদ, কিন্তু আগামিকাল আপনাকে যে হত্যা করবে, তার নাম হিন্দু মৌলবাদ যে হবে না, এর গ্যারান্টি দিতে পারেন? (Fundamentalism)
 
নতুন কথা বলার কিছু নেই। এই সব কথাই আপনারা জানেন। আপনার ঘুমের সুযোগ নিয়েই ঘরে কেউটে সাপ ঢুকছে। ছোবল মারবে। কারণ তাঁরা সজাগ থাকতে দেবে না। স্বাধীন মত প্রকাশে তাদের আপত্তি। স্বাধীন ভাবনায় তাদের বড়ই জ্বালা। ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ পড়ে একজনের মনেও যদি সামান্য প্রশ্নের উদয় হয়, তাহলেই বিপদ। তাই, স্বাধীনতার শিকড়টাকেই তুলে ফেলো স্বাধীন কথা বলা মৌলবাদের সামনে এক স্পর্ধা।
হয়তো এই ধর্মীয় সন্ত্রাসই একদিন মানবসভ্যতার ধ্বংসের কারণ হবে।

( শিরোনামের জন্য ঋণ- কবীর সুমন)

You might also like