Latest News

আইন বাতিল করার সময় অন্তত বিতর্ক হওয়া উচিত ছিল

যেভাবে শুরু হয়েছিল সেভাবেই শেষ হল। কৃষি আইন (Farm Laws) তৈরি করার সময় কোনও বিতর্ক হয়নি, বাতিল করার সময়ও হল না। বিরোধীরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একেবারেই বিতর্ক ভালবাসেন না। তিনি কেবল নিজের মনের কথা অন্যকে শোনাতে ব্যস্ত। অন্যের কথা শুনতে চান না। পাছে কেউ বেয়াড়া প্রশ্ন করে, তাই সাংবাদিক বৈঠক পর্যন্ত এড়িয়ে চলেন। এভাবে বিনা বিতর্কে কৃষি আইন বাতিল হওয়ায় বিরোধীরা যে আরও গলা চড়াবেন, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই।

তিনটি কৃষি আইন নিয়ে এক বছরের বেশি সময় ধরে বিতর্ক চলছে। আইনগুলি রদ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সমাপ্তি হতে পারত। কিন্তু এমনভাবে রদ হল যে নতুন বিতর্ক দেখা দিল।

তিনটি কৃষি বিলের একটির নাম ‘দি ফারমার্স প্রডিউস অ্যান্ড কমার্স (প্রমোশন অ্যান্ড ফেসিলিটেশান) অ্যাক্ট ২০২০’। এই আইনে বলা হয়েছিল, কৃষকরা স্থানীয় কিষাণ মান্ডির বাইরে ইচ্ছামতো নিজেদের উৎপাদিত ফসল বেচতে পারবেন। কিন্তু কৃষকদের ভয়, এই আইন কিষাণ মান্ডিগুলিকে দুর্বল করে ফেলবে।

দ্বিতীয় আইনটি হল ‘ফারমার্স (এমপাওয়ারমেন্ট অ্যান্ড প্রটেকশন) এগ্রিমেন্ট অব প্রাইস অ্যাসিওরেন্স অ্যান্ড ফার্ম সার্ভিসেস অ্যাক্ট ২০২০’। এই আইনে চুক্তিচাষের পথ প্রশস্ত করা হয়েছিল। কৃষকদের অভিযোগ, এখানে কোথাও ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য দেওয়ার কথা বলা হয়নি। অর্থাৎ চাষি যে সংস্থার সঙ্গে চুক্তিতে চাষ করবে, তারা যে ফসলের ন্যূনতম একটা দাম দেবেই, এমন কোনও গ্যারান্টি নেই।

তৃতীয় আইনটি হল এসেনশিয়াল কমোডিটিস (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট ২০২০। তাতে ১৯৫৫ সালের অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইনের সংশোধন করে বলা হয়েছে, খাদ্যশস্য মজুত করার উর্ধ্বসীমা বেঁধে দেওয়ার ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের থাকবে না।

মূলত দুর্ভিক্ষ ঠেকানোর জন্য জওহরলাল নেহরুর আমলে এই আইন তৈরি হয়েছিল। তার আগে মজুতদাররা প্রায়ই বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য গুদামে রেখে বাজারে কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করত। তারপর সুবিধামতো কালোবাজারে বিক্রি করত চড়া দামে। মোদী সরকার এই আইনটি সংশোধন করতে চেয়েছিল। অভিযোগ, এর ফলে মজুতদারদের সুবিধা হত।

কৃষকরা ভেবেছিলেন, বহুকাল ধরে সরকার তাঁদের খোলাবাজারের নানা ওঠাপড়া থেকে রক্ষা করে এসেছে, এবার সেই দায়িত্ব থেকে হাত গুটিয়ে নিতে চায়। তা যাতে না হয়, সেজন্য ২০২০ সালের নভেম্বরে তাঁরা পা বাড়িয়েছিলেন দিল্লির দিকে। রাস্তা কেটে দিয়ে বা জলকামান ছুড়েও তাঁদের গতিরোধ করা যায়নি। তখন থেকে একবছর ধরে তাঁরা দিল্লির সীমান্তে অবস্থান করছেন।

আন্দোলনকারীদের মধ্যে যুবক, বৃদ্ধ, নারী, পুরুষ সকলেই আছেন। খোলা আকাশের নীচে থাকতে থাকতে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন অনেকে। কেউ কেউ মারাও গিয়েছেন। কৃষক সংগঠনগুলির দাবি, অন্তত ৭০০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

মাঝে কেন্দ্রীয় সরকার বেশ কয়েকবার কৃষকদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিল। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সরকার ধানাই পানাই করে মূল প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যেতে চাইছে। তাঁদের একটাই দাবি ছিল, তিনটি আইন প্রত্যাহার করতে হবে। এর কমে কিছুতেই তাঁরা রাজি হননি।

একবছর ধরে কৃষকরা ধৈর্যের পরীক্ষা দেওয়ার পরে মোদী হার মানলেন। তিনি তিনটি আইন রদ করার কথা ঘোষণা করলেন। এতদিন সবাই জানত, ‘মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়’। মোদী চাইলে সবই সম্ভব। কিন্তু এই প্রথমবার খুব স্পষ্টভাবে দেখা গেল, কৃষকদের সম্মিলিত শক্তির কাছে পিছু হটলেন মোদী। অর্থাৎ তিনি চাইলেই সব কিছু পারেন না।

মোদী অবশ্য সরকারের ভুল স্বীকার করেননি। তিনি বলেছেন, আইনগুলো ভালই ছিল, কিন্তু আমরা মানুষকে ঠিকমতো বোঝাতে পারিনি। অর্থাৎ তাঁর দাবি, কৃষকরা সম্পূর্ণ ভুল বুঝে আন্দোলন চালাচ্ছিলেন। একটি সরকারি নোটে বলা হয়েছে, ‘কৃষকদের একটি ছোট গোষ্ঠী’ কৃষি আইনের বিরোধিতা করছিল। আন্দোলনকারী কৃষকদের পিছনে যে জনসমর্থন ছিল, তাও সরকার মানতে চায়নি।

সরকার গণতান্ত্রিক রীতিনীতিও মানতে চায়নি। ২০২০ সালে দেশ জুড়ে যখন লকডাউন চলছে, তখন কৃষি আইন নিয়ে সরকার অধ্যাদেশ জারি করে। পরে লোকসভার অধিবেশন বসলে ওই সংক্রান্ত বিল পেশ করা হয়। বিল পাশ হতে সময় লেগেছিল মাত্র চার মিনিট। বিরোধীরা বিতর্ক চেয়েছিলেন, সরকার রাজি হয়নি।

সংসদে শীতকালীন অধিবেশনের আগে গত রবিবার সর্বদলীয় বৈঠক হয়। সেখানে কৃষি আইন এবং ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। প্রথা ভেঙে মোদী সেই বৈঠকে আসেননি। পরদিন অধিবেশনের শুরুতেই কৃষি আইন প্রত্যাহার বিল পেশ হয়। তখনও বিরোধীদের বলতে দেওয়া হয়নি।

বিরোধীরা হয়তো অভিযোগ করতেন, মোদী চাষিদের কর্পোরেট সংস্থাগুলির লোভের মুখে ঠেলে দিতে চান। হয়তো তাঁরা ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নিয়ে আইন করার কথা বলতেন। কিন্তু তার সুযোগই পেলেন না। সরকার ও বিরোধীপক্ষ একটা সমঝোতায় এলে এই দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনের সমাপ্তি হতে পারত। কিন্তু সরকারি একগুঁয়েমির জন্য আগামী দিনে ফের অশান্তির সম্ভাবনা রয়েই গেল।

You might also like