Latest News

নজর ভোটের দিকে, উত্তরপ্রদেশে হিন্দুত্বের তাসই খেললেন মোদী

আমাদের প্রধানমন্ত্রী একদা স্লোগান দিয়েছিলেন, ‘সব কা সাথ সব কা বিকাশ’ (Sab Ka Sath Sab Ka Bikash)। যোগী আদিত্যনাথ এবং বিজেপির অন্যান্য শীর্ষ নেতা এখনও মাঝে মাঝে ওই স্লোগান দেন। তাঁরা বোঝাতে চান, বিজেপি সরকার জাতিধর্ম নির্বিশেষে সকলের পাশে আছে, সবার উন্নয়নের জন্যই কাজ করতে চায়। কিন্তু সোমবার বারাণসীতে গিয়ে মোদী বোঝালেন, এসব কথার কথা মাত্র। উন্নয়ন নয়, তাঁর দলের ভরসা হিন্দুত্বে। হিন্দুত্বের কার্ড খেলে সেই আটের দশকের শেষদিক থেকে বাড়বৃদ্ধি ঘটেছে বিজেপির। উত্তরপ্রদেশের ভোটেও কোভিড মোকাবিলা, বেকারত্ব দূরীকরণ কিংবা আইন-শৃঙ্খলার কথা বিশেষ তুলবে না মোদীর দল। তার বদলে মেরুকরণের অস্ত্রে বাজিমাত করতে চাইবে।

সোমবার মোদী তাঁর নির্বাচন কেন্দ্র বারাণসীতে কাশী বিশ্বনাথধাম করিডোরের উদ্বোধন করেন। ২০১৯ সালের মার্চে তিনি ওই প্রকল্পের শিলান্যাস করেছিলেন। এরপর প্রায় তিনবছর ধরে কাশী বিশ্বনাথের মন্দির থেকে গঙ্গা পর্যন্ত ৪০০ মিটার দীর্ঘ এবং ৭৫ মিটার চওড়া সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। তার জন্য ভাঙা পড়েছে ৩২০ টি বাড়ি। মোট ১১১১ জনকে পুনর্বাসন দিতে হয়েছে। মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা। সরকারের দাবি, এই প্রকল্প বারাণসীকে তার প্রাচীন গৌরব ফিরিয়ে দিয়েছে।

সোমবার বারাণসীতে ডমরু বাজিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানানো হয়। ডমরু একটি প্রাচীন বাদ্যযন্ত্র। মোদী গেরুয়া বসন পরে গঙ্গায় ডুব দেন। তাঁর গলায় ছিল রুদ্রাক্ষের মালা। পরে তিনি কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরে পুজো দেন। যে শ্রমিকরা প্রকল্পের কাজে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের উদ্দেশে পুষ্পবৃষ্টি করেন। তাঁদের সঙ্গে বসে ছবিও তোলেন।

ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বারাণসীর মানুষ যুগ যুগ ধরে হানাদারদের মোকাবিলা করেছেন। এই পবিত্র শহরকে কেউ ধ্বংস করতে পারেনি। এরপরে তিনি ঔরঙ্গজেব ও শিবাজির প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁর কথায়, “যখনই ঔরঙ্গজেব আসে, তখনই শিবাজির অভ্যুদয় হয়। রাজা সুহেলদেবের মতো সাহসী যোদ্ধা সালার মাসুদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন।”

মোদীর ভাষণের মধ্যে হিন্দুত্বের সুর স্পষ্ট। শিবাজি বহুকাল ধরেই হিন্দুত্ববাদীদের হিরো। ঔরঙ্গজেব হলেন ভিলেন। এই ধরনের সরলীকরণের সঙ্গে ইতিহাসবিদরা সবসময় একমত হন না। কিন্তু মেঠো রাজনীতিতে এসবই চলে।

আর কয়েকমাস পরেই উত্তরপ্রদেশে ভোট হবে। যে দল কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসতে চায়, তার কাছে ওই রাজ্যের ভোট খুব গুরুত্বপূর্ণ। সোমবার মোদী উত্তরপ্রদেশে বিজেপির প্রচারের সুর বেঁধে দিয়ে গেলেন বলা যায়। গত পাঁচ বছরে যোগী আদিত্যনাথ সরকারের রেকর্ড খুব একটা ভাল নয়। সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকনমি নামে একটি সংস্থা গত সেপ্টেম্বর মাসে জানায়, যোগী ক্ষমতায় আসার পরে উত্তরপ্রদেশে বেকারত্ব বেড়েছে। ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে সেখানে বেকারের সংখ্যা ছিল ৪০ লক্ষ। ওই বছরেই যোগী ক্ষমতায় আসেন। ২০২১ সালের মে থেকে অগাস্টের মধ্যে রাজ্যে বেকারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬ লক্ষ। অর্থাৎ যোগীর শাসনকালে বেকারত্ব বেড়েছে ৩.৭৫ শতাংশ থেকে ৪.৮৪ শতাংশ।

উত্তরপ্রদেশে অপরাধের হারও উদ্বেগজনক। বিশেষত সেখানে মেয়েদের বিরুদ্ধে অপরাধের সংখ্যা খুবই বেশি। মুখ্যমন্ত্রী পুলিশকে ঢালাও ‘এনকাউন্টার’-এর অর্ডার দিয়ে রেখেছেন। পুলিশ মেরেওছে অনেককে। কিন্তু তাতে অপরাধ কমেনি।  কিন্তু এনকাউন্টারগুলো প্রমাণ করেছে, রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষে যিনি বসে আছেন, তাঁর আইন-আদালতের ওপর বিশেষ আস্থা নেই।

যোগীর আমলে পুলিশ বহু লোককে সন্ত্রাসদমন আইনে আটক করেছে। দেশের মধ্যে যে রাজ্যগুলিতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক দেশদ্রোহিতার মামলা হয়েছে উত্তরপ্রদেশ তার মধ্যে অন্যতম। অভিযোগ, যোগী সরকার প্রতিবাদীদের দেশদ্রোহী বলে ছাপ মেরে জেলে ঢুকিয়ে রেখেছে।

বিজেপি নেতৃত্ব সম্ভবত বুঝেছেন, উত্তরপ্রদেশে হিন্দুত্বের কার্ড খেলা ছাড়া উপায় নেই। কারণ উন্নয়নের কথা বলে বিশেষ সুবিধা হবে না। উত্তরপ্রদেশে বিজেপির এক্সপেরিমেন্ট সফল হলে ২০২৪-এর লোকসভা ভোটেও নেতারা নিশ্চয় মেরুকরণের ওপরেই ভরসা রাখবেন।

You might also like