Latest News

সরকারের উচিত মানুষকে এবারও সাগরমেলায় যেতে নিরুৎসাহী করা

প্রবাদ আছে, সব তীর্থ বার বার, গঙ্গাসাগর (Gangasagar) একবার। অর্থাৎ জীবনে বড় জোর একবার গঙ্গাসাগর দর্শন হতে পারে। তার বেশি নয়। আগেকার দিনে গঙ্গাসাগরের পথ ছিল বিপদসঙ্কুল (risky)। বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুণ্ডলা (Kapalkundala) উপন্যাসের শুরুতে তার বর্ণনা আছে। সেই পথে বহু তীর্থযাত্রীর মৃত্যু হত। তারপরে কেটে গিয়েছে অনেক দিন। গঙ্গাসাগর এখন আর দুর্গম নয়।

কিন্তু করোনা অতিমহামারীর মধ্যে ওই মেলা নিয়ে অন্য একরকম বিপদের আশঙ্কা ঘনিয়েছে।

এমনিতে মহামারী পরিস্থিতিতে কোথাও বড় ধরনের জমায়েতে নিষেধ করা হয়। কারণ সেখান থেকে রোগ সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে। আমাদের দেশে গত কয়েক মাস ধরে করোনা গ্রাফ ছিল নিম্নমুখী। কিন্তু সম্প্রতি আবার উঠতে শুরু করেছে। কোভিড আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। তার ওপরে উদ্বেগের নতুন কারণ হয়ে উঠেছে ওমিক্রন।

কোভিডের এই নতুন ভ্যারিয়ান্ট আগের যে কোনও ভ্যারিয়ান্টের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ছোঁয়াচে। তার মাধ্যমেই দেশে অতিমহামারীর তৃতীয় ঢেউ আসতে পারে। কয়েকটি রাজ্যে আগেভাগে কোভিড নিয়ে সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে। জারি হয়েছে নাইট কার্ফু। আমাদের পশ্চিমবঙ্গেও আগামী দিনে কোভিড নিয়ে কড়াকড়ি হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।

এই অবস্থায় গঙ্গাসাগরের মেলায় দেশের নানা প্রান্ত থেকে হাজার হাজার তীর্থযাত্রী জড়ো হবেন। এর ফলে কোভিড আরও ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। রাজ্য সরকার অবশ্য মেলায় কোভিড রোগীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা করেছে। শোনা যাচ্ছে, কেউ কোভিডে আক্রান্ত হলে তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা হবে। কোভিড কন্ট্রোল রুম খোলা হচ্ছে। এসবই সাধু উদ্যোগ।

কিন্তু কোভিড রুখতে তা কতদূর কার্যকরী হবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।

মেলায় এসে যাঁরা কোভিডে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়বেন, তাঁদের না হয় সরকার চিকিৎসা করবে। কিন্তু কোভিড রোগীদের তো এক বড় অংশই হন অ্যাসিম্পটোম্যাটিক। তাঁদের শরীরে কোনও উপসর্গ থাকে না। তাঁদের বেলায় কী হবে? তাঁরা নিজেরা অসুস্থ হবেন না, কিন্তু মেলায় রোগ ছড়াবেন। অনেকে হয়তো মেলায় অসুস্থ হবেন না, কিন্তু ফেরার পথে তাঁদের শরীর খারাপ হবে। কেউ কেউ হয়তো ভিন প্রদেশে বাড়িতে ফিরে অসুস্থ হয়ে পড়বেন। এরকম ক্ষেত্রে রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা কীভাবে রোধ করা যাবে?

গত জুন মাসে হরিদ্বারে কুম্ভ মেলা হয়েছিল। হাজার হাজার তীর্থযাত্রী জড়ো হয়েছিলেন। পরে অনেকে বলেছিলেন, ওই জমায়েত করোনার সুপার স্প্রেডার হয়ে উঠেছে। ওই মেলাকে কেন্দ্র করে গজিয়ে উঠেছিল জাল সার্টিফিকেট চক্র। তারা টাকার বিনিময়ে বহু মানুষকে নকল করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট দিত। সেই সুযোগে যে কত করোনা রোগী মেলায় ঢুকে পড়েছিল কেউ জানে না।

দেশে যাই ঘটুক মেলা বন্ধ করা সম্ভব নয়। কারণ এর সঙ্গে বহু মানুষের ভাবাবেগ জড়িত। কিন্তু অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজ্য সরকারের উচিত যথাসম্ভব ছোট মাপে মেলা করা। মানুষ যাতে অন্তত এবছরটা মেলাকে এড়িয়ে যান, সেজন্য আবেদন জানানো উচিত। শোনা যাচ্ছে, সাগরে ভার্চুয়াল স্নানের ব্যবস্থা করেছে প্রশাসন। মেলা প্রাঙ্গন থেকে কিছু দূরে ড্রোনের মাধ্যমে তীর্থযাত্রীদের ওপরে জল ছিটানো হবে। তাতে সমুদ্রে ডুব না দিয়েও তীর্থযাত্রীরা সাগর স্নানের পূণ্যের অধিকারী হবেন। এরকম ব্যবস্থা আরও অনেক জায়গায় করা উচিত। তাহলে সাগরমুখী মানুষের সংখ্যা নিশ্চয় কমবে।

সাগরমেলার আগে আজ্য সরকার দরাজ হয়ে পুণ্যার্থীদের আহ্বান জানাচ্ছে। মনে হচ্ছে, সরকার বলতে চায়, সবাই মেলায় আসুন, আপনাদের অভ্যর্থনা করার জন্য আমরা তৈরি। অতিমহামারী পরিস্থিতিতে এই মনোভাব ঠিক নয়।

সরকার যদি নেতিবাচক মনোভাব দেখাত, তাহলে বিরোধীরা হয়তো সমালোচনা করতেন। কেউ কেউ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হিন্দুবিদ্বেষী বলে কটাক্ষ করতেন। কিন্তু সরকার চালাতে গেলে সমালোচনাকে ভয় পেলে চলে না। কখনও সখনও অপ্রিয় হওয়ার ঝুঁকি নিয়েও পদক্ষেপ নিতে হয়। মমতা সরকার সেই সাহস দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে।

You might also like