Latest News

সাম্প্রদায়িকতার চিকিৎসা এবং সম্প্রীতির শুশ্রূষা

সোমবার দুটি বিপরীতধর্মী ঘটনার সাক্ষী থেকেছে প্রতিবেশী দুটি দেশ, ভারত ও বাংলাদেশ। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে এক বিশাল সমাবেশ থেকে সে দেশে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক (Communalism) হিংসার ঘটনার বিপরীতে হেঁটে সম্প্রীতি আগলে রাখার শপথ নিয়েছেন সাধারণ নাগরিকরা। ‘সম্প্রীতি বাংলাদেশ’ নামে একটি নাগরিক সংগঠনের ডাকে সে দেশের ৭১টি সংগঠন তাতে অংশ নেয়।

ঠিক ওই সময়ই এ দেশের সামাজিক মাধ্যমে একজন খেলোয়াড়কে রবিবারের ক্রিকেট ম্যাচে পাকিস্তানের কাছে ভারতের নির্মম পরাজয়ের জন্য লাগাতার আক্রমণ করা হচ্ছিল। খেলেছেন ১১ জন। কিন্তু পরাজয়ের দায় চাপানো হল একজনের উপর। কারণ তিনি মুসলমান। ধর্ম পরিচয়টিকে হাতিয়ার করে তাঁকে পাকিস্তানি সাব্যস্ত করার চেষ্টা হল। তাতে খানিক উস্কানির কাজ করেছেন পাকিস্তানের এক মন্ত্রীও। তিনি মন্তব্য করেছেন, পাকিস্তানের জয়ে ভারতের মুসলমানরাও খুশি। অর্থাৎ মুসলমান মাত্রেই পাকিস্তান-প্রেমী, এমন ধারণা আরও একবার ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা হল।

দীর্ঘদিন ধরেই এ দেশে মনোজগতে সযত্নে একটি প্রচারকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার নানা আয়োজন সক্রিয়। তা হল, ভারতে মুসলমান মাত্রেই দেশদ্রোহী এবং পাকিস্তানের সমর্থক। লক্ষ্যনীয়, উদার অর্থনীতির পথে হাঁটা শুরুর পরবর্তী তিন দশক যাবৎ এই কাজটির জন্য প্রধান হাতিয়ার করা হচ্ছে ক্রিকেটকে। অখণ্ড ভারতের অধুনা তিনটি দেশের ক্রিকেটে পারদর্শিতায় শুধু নাম-ডাক আছে, তাই-ই নয়, খেলাটিকে ঘিরে বিপুল অর্থের লেনদেনও চলে আসছে। সেই কারণে খেলাটিকে এখন কর্পোরেট ক্রিকেট বলাই বাঞ্ছনীয়।

অপপ্রচার, উন্মাদনা, অন্ধ দেশপ্রেম, জাতীয়তাবোধ ইত্যাদি ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে বিশেষ ভূমিকা নিয়ে থাকে। সেই কারণে নাগরিকরা সকলেই আর নিছকই দর্শক বা ক্রিকেটপ্রেমী নয়, একাংশকে সুকৌশলে যোদ্ধা হিসাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যারা মাঠের হার-জিৎকে গোলা-বারুদের যুদ্ধের সঙ্গে এক করে দেখতে অভ্যস্ত। তাই ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচের দিন সংখ্যালঘু মহল্লার দিকে বাড়তি নজরদারি, সুরক্ষার আয়োজন পুলিশ-প্রশাসনের অতিরিক্ত দায়িত্ব হয়ে উঠছে।

মানতেই হবে, এই রাজ্যে পুলিশ-প্রশাসন নিষ্ঠার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করেছে। দুর্গাপুজোর মধ্যে বাংলাদেশে হিন্দুদের মন্দির-প্যান্ডেলে ধর্ম-সন্ত্রাসীদের হামলার ঘটনার আঁচ এ রাজ্যে পড়েনি। সেজন্য রাজ্যবাসী এবং পুলিশের পাশাপাশি রাজ্য প্রশাসনের রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও কৃতিত্ব প্রাপ্য।

কিন্তু তাতেই দুশ্চিন্তামুক্ত হয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকা যায় না। দুর্ভাবনার বিষয় হল, সামাজিক মাধ্যমের ঘেরাটোপকে হাতিয়ার করে যেভাবে নাগরিকদের একাংশকে এমন বিভেদ সৃষ্টির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে বৃহত্তর নাগরিক সমাজের থেকে কাঙ্খিত পাল্টা প্রতিরোধবার্তা অনুপস্থিত। মহম্মদ শামির দেশপ্রেম, খেলোয়াড় হিসাবে তাঁর লড়াই-অর্জনকে দূরে ঠেলে দিয়ে যেভাবে তাঁকে দেশদ্রোহী এবং পাকিস্তানপ্রেমী সাব্যস্ত করার চেষ্টা হল, তার বিরুদ্ধে ক্রিকেট দুনিয়ার কতিপয় পরিচিত মুখের প্রতিবাদ সাধুবাদ প্রাপ্য। ক্রীড়া জগতের বাইরে কিছু মানুষও মুখ খুলেছেন। কিন্তু প্রতিবাদটির যে সর্বজনীনতা বাঞ্ছনীয় ছিল, তা দেখা যায়নি।

বাংলাদেশে পুজোর মধ্যে কী ঘটেছে, এতদিনে সবই জানা। সে দেশের সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ এবং প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, এমনকী বিরোধী দলগুলিও এক বাক্যে বারে বারে ঘটনার নিন্দা করেছে। সবচেয়ে লক্ষ্যনীয় এবং শিক্ষনীয় হল সেদেশের সাধারণ নাগরিকদের ভূমিকা। গত কয়েকদিনে দেশটির নানা প্রান্তে সম্পীতি রক্ষার সপক্ষে অসংখ্য সমাবেশ, পদযাত্রা ইত্যাদি সংগঠিত হয়ে চলেছে। কারণ, হামলার সংঘটিত ঘটনাগুলি এক জটিল অসুখের ইঙ্গিত দেয়। তা হল, সে দেশের অসাম্প্রদায়িক চরিত্রটিকে ধ্বংস করার প্রয়াস।

যে কোনও জটিল অসুখের নিরাময়ের জন্য সুচিকিৎসার পাশাপাশি সমানতালে শুশ্রূষারও প্রয়োজন, যা মূলত পরিবার-পরিজন-প্রতিবেশীর কর্তব্য। সাম্প্রদায়িকতার অসুখ নিরাময়েও সেটিই গোড়ার কথা। বাংলাদেশে দুর্গাপুজোয় মণ্ডপে হামলা, সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর হামলার ঘটনাগুলি ধর্ম অবমাননার কারণে ঘটেনি, বরং, হিংসার বাতাবরণ তৈরির লক্ষ্যে ইসলাম অবমাননার জিগির তোলা হয়েছিল কুমিল্লায় মণ্ডপের বাইরে অস্থায়ী হনুমান মূর্তির পায়ে কোরান রেখে দিয়ে।

এই অসুখ তথা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ধর্ম-সন্ত্রাসীদের পুলিশ গ্রেফতার করেছে। একইসঙ্গে নাগরিক উদ্যোগে নিষ্ঠাভরে শুরু হয়েছে আক্রান্তদের শুশ্রূষা অর্থাৎ মানসিক বল জোগানোর কাজটি। ঢাকার সোমবারের সম্প্রীতি সমাবেশ তেমনই এক উদ্যোগ। প্রতিবেশী হিসাবে আমাদের কর্তব্য, খানিক ময়না তদন্ত করে নেওয়া, এ দেশে সাম্প্রদায়িকতার মোকাবিলা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজে প্রশাসনিক উদ্যোগে চিকিৎসা এবং সংখ্যাগুরু সহ-নাগরিকরা কি শুশ্রূষার কাজটি নিষ্ঠা, আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করতে পারছি কিনা।

You might also like