Latest News

খেলা দেখা জাতি

২০ নভেম্বর কাতারে শুরু হয়েছে ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ২০২২ (Editorial on football)। চলবে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ইতিমধ্যে কলকাতাকে গ্রাস করেছে ফুটবল জ্বর। টিভিতে, ইন্টারনেটে বিশ্বকাপের প্রতিটি খেলা দেখানো হচ্ছে। পাড়ায় পাড়ায় উড়ছে ব্রাজিল অথবা আর্জেন্টিনার পতাকা। অনেক জায়গায় দেওয়ালও সেজে উঠেছে বিশ্বকাপের রং-এ। রবিবার বিশ্বকাপের উদ্বোধন উপলক্ষে ফানুস ওড়ানো হয়েছে মহানগরীতে।

কলকাতা সারা দেশে ফুটবলের মক্কা বলে পরিচিত। সেখানে বিশ্বকাপ নিয়ে এই উন্মাদনা স্বাভাবিক।

শহরের সঙ্গে তাল মিলিয়েছে জেলাও। সেখানেও বিশ্বকাপের দর্শকদের মধ্যে রয়েছে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ভাগাভাগি। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, কেরল ও অন্যান্য রাজ্যেও টের পাওয়া যাচ্ছে ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপের উত্তাপ। টিভি চ্যানেলে খেলা দেখানোর জন্য অনেক টাকা লেনদেন হয়েছে। মিডিয়া কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন পাচ্ছে। এই সবের মাঝে একটা প্রশ্ন বরাবরের মতোই ঘুরেফিরে আসছে। ফুটবল বিশ্বকাপে ভারত নেই কেন? আর কতদিন আমাদের দর্শকরা অন্য দেশের খেলা নিয়ে মাতামাতি করবেন?

এবারের বিশ্বকাপে মোট ৩২টি টিম অংশগ্রহণ করেছে। তার মধ্যে আছে মরক্কো ও তিউনিশিয়ার টিম। দু’টি দেশই অত্যন্ত গরিব। মরক্কোর জনসংখ্যা মাত্র ৩ কোটি ৭০ লক্ষ। তিউনিশিয়ার লোকসংখ্যা ১ কোটি ২১ লক্ষ। তার মধ্যে থেকে তারা আন্তর্জাতিক মানের ১১ জন প্লেয়ারকে তৈরি করতে পারে। কিন্তু আমরা প্রায় ১৪০ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে বিশ্বকাপ খেলার মতো ১১ জন ফুটবলারকে খুঁজে পাই না কেন?

ভারতে ফুটবল নিয়ে আবেগের কমতি নেই। কিন্তু আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতীয় ফুটবল দলের অবস্থা খুব করুণ। ২০২২ সালে ফিফা র‍্যাঙ্কিং-এ ভারতের স্থান হয়েছে ১০৬ নম্বরে।

আমাদের অবস্থা কিন্তু বরাবর এত খারাপ ছিল না। ১৯৪৮ সালে লন্ডন অলিম্পিকে খালি পায়ে ভেলকি দেখিয়েছিলেন ভারতীয় ফুটবলাররা। ১৯৫০ সালে ফিফা বিশ্বকাপে খেলার জন্য ভারতীয় দল যোগ্যতা অর্জন করেছিল।
কিন্তু বিশ্বকাপে খালি পায়ে খেলার অনুমতি দেওয়া হয় না। তাই ভারতীয় দল খেলতে পারেনি।

সেবার ভারতের বিশ্বকাপে না খেলার সম্ভবত অন্য কারণও ছিল। তখন দেশ সবে স্বাধীন হয়েছে। লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তুর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে সরকারকে। আরও নানা সমস্যায় শিশু রাষ্ট্র জর্জরিত। সেই অবস্থায় দেশনেতারা সম্ভবত বিপুল টাকা খরচ করে ভারতীয় দলকে বিশ্বকাপে পাঠাতে চাননি। কিন্তু তখনকার ভারতীয় ফুটবলাররা আন্তর্জাতিক স্তরে খেলার যোগ্য ছিলেন। আরও আগে ১৯১১ সালে মোহনবাগানের যে টিম সাহেবদের হারিয়ে আইএফএ শিল্ড জয় করেছিল, তার ফুটবলাররাও সম্ভবত আন্তর্জাতিক মানেরই ছিলেন। ছ’য়ের দশকেও ভারতীয় ফুটবলের গৌরব কিছু পরিমাণে অবশিষ্ট ছিল। ১৯৬২ সালে জাকার্তা এশিয়াডে ফুটবলে সোনা জিতেছিল আমাদের দেশ। ক্যাপটেন ছিলেন চুনী গোস্বামী। টিমে ছিলেন পিকে ব্যানার্জি, জার্নেইল সিং, তুলসীদাস বলরাম, অরুময় নিগম প্রমুখ।

ভারতীয় ফুটবলের একটা সোনালি অতীত আছে। কিন্তু ছ’য়ের দশকের পরে আমরা ক্রমশ পিছিয়ে পড়েছি। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক ফুটবল অনেক এগিয়ে গিয়েছে। কেন এমন হল খুঁজে বার করা জরুরি।

আটের দশক থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মানচিত্রে বার বার শীর্ষস্থান দখল করেছে ভারত। সাম্প্রতিক কালে অ্যাথলেটিকসেও আমাদের খেলোয়াড়রা আন্তর্জাতিক সম্মান পাচ্ছেন। অর্থাৎ আমাদের ক্রীড়াবিদদের শারীরিক সক্ষমতার কমতি নেই। কিন্তু ফুটবল নৈপুণ্যে ভারতীয়দের এত পিছিয়ে পড়ার কারণ কী?

পরাধীন আমলেও আমাদের ফুটবলাররা যে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, স্বাধীন দেশে তা পারছেন না কেন?

এই প্রশ্নের জবাব খুঁজে পাওয়া জরুরি। তাছাড়া বিশ্ব ফুটবলে কৃতী দেশগুলি থেকেও শিক্ষা নিতে হবে। দেশের প্রতিটি প্রান্ত থেকে সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়দের খুঁজে আনা দরকার। ছোট থকেই তাদের দিতে হবে বিশেষ প্রশিক্ষণ। সম্ভবত তাহলেই বিশ্বকাপে ঠাঁই না পাওয়ার লজ্জা থেকে রক্ষা পাবে আমাদের দেশ।

You might also like