Latest News

CPM: সিপিআই-সিপিআই(এম) মিশে যাওয়া সময়ের দাবি

দেবাশিস ভট্টাচার্য

বুধবার থেকে কেরলে কান্নুরে শুরু হয়েছে সিপিআই(এম)-এর (CPM) ২৩ তম পার্টি কংগ্রেস। ক’দিন পরেই হবে আর এক কমিউনিস্ট পার্টি সিপিআইয়ের পার্টি কংগ্রেস। এই সন্ধিক্ষণে ভারতে কমিউনিস্ট পার্টিতে ভাঙন এবং আজকের পরিস্থিতিতে তাদের পৃথক অস্তিত্বের অসাড়তা নিয়ে খানিক আলোচনা প্রাসঙ্গিক মনে হল।  

অবিভিক্ত কমিউনিস্ট পার্টির শেষ পার্টি কংগ্রেস হয়েছিল ১৯৬১ সালে বিজয়ওয়াড়ায়। কমিউনিস্ট পার্টির পার্টি কংগ্রেসে মূলত রাজনৈতিক ও একটি সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করা হয়। রাজনৈতিক রিপোর্টে থাকে আন্তর্জাতিক, জাতীয় ও বিভিন্ন রাজ্য পরিস্থিতির মূল্যায়ন। ১৯৫০-এর দশকে কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে মতভেদ চলছিল। সেই মতভেদের মূল কারণ ছিল কংগ্রেস সম্পর্কে মূল্যায়ন কী হবে।

 ১৯৬৩ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি ও চিনের  কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে মতভেদ তৈরি হয়। যাকে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন মহাবিতর্ক বা গ্রেট ডিবেট বলে। সেই মহাবিতর্কের ফলে বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে ভাঙন ধরে।

কিছু কমিউনিস্ট পার্টি সোভিয়েতের পক্ষে যায়। কিছু দেশের কমিউনিস্ট পার্টি আবার সিপিসি-র পক্ষে যায়। ১৯৬১ সালের ১৪ জুন চিনের কমিউনিস্ট পার্টি সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টিকে ২৫ পয়েন্টের একটি চিঠি লেখে। সেই চিঠির জবাবে সোভিয়েতের কমিউনিস্ট পার্টি এক মাস পর ১৪ জুলাই পাল্টা চিঠি দেয়। সেই সময়ে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ছিলেন নিকিতা ক্রুশ্চেভ। চিনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মাও সে তুঙ।

এই মহাবিতর্কে ১৯৬৪ সালের গোড়ায় ভারতে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির জাতীয় পরিষদ থেকে ৩২ জন নেতা ওয়াক আউট করেন। তাঁরা বলেন, ‘সিপিআই আর বিপ্লব করতে পারবে না, আমরা বিপ্লব করতে চাই’। তাঁরাই পরবর্তী কালে সিপিআই (এম)-এর নেতা হিসেবে পরিচিত হন। এই নেতারা ১৯৬৪ সালের এপ্রিলে অন্ধ্রপ্রদেশের তেনালিতে একটি কনভেনশন ডাকেন। যে নেতারা সেদিন এই তেনালি কনভেনশন ডেকেছিলেন, যেখান থেকে সিপিআই (এম) দলের সূত্রপাত হয়, সেই নেতারা তখন চিনের কমিউনিস্ট পার্টির মূল্যায়নকে সমর্থন করেন।

CPM
সিপিএম পার্টি কংগ্রেসে পতাকা উত্তোলন

বিপরীতে শ্রীপদ অমৃত ডাঙ্গে, রাজেশ্বর রাওয়ের নেতৃত্বাধীন যে অংশ, যাঁরা সিপিআই-তে থেকে যান তাঁরা সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টিকে সমর্থন করেন। জাতীয় প্রশ্নে কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক কী হবে, কংগ্রেস দলের শ্রেণিচরিত্র কেমন এসব নিয়ে আন্তঃপার্টি বিবাদ ’৪৯ সাল থেকে চলছিলই। ডাঙ্গে, রাজেশ্বর রাওরা মনে করতেন, কংগ্রেস ধর্মনিরপেক্ষ তো বটেই, তারা জাতীয়তাবাদী, দেশপ্রেমিক বুর্জোয়াদের প্রতিনিধিত্ব করে। সেটা সিপিআই (এম) নেতৃত্ব মানতে চাইত না।

আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের মতভেদ এবং জাতীয় স্তরে কংগ্রেসের সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে— এই দুটি প্রশ্নে পার্টি ভাগ হওয়ার পর গঙ্গা, কাবেরী দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। ৫৮ বছর পর এই প্রশ্নের আর কোনও যৌক্তিকতা নেই। কারণ, সোভিয়েত ইউনিয়নও নেই, সেই কমিউনিস্ট পার্টিও নেই। চিনের কমিউনিস্ট পার্টিও আর সেই ২৫ পয়েন্টের চিঠি নিয়ে মাথা ঘামায় না।

কংগ্রেস সম্পর্কে মূল্যায়নে যে মতপার্থক্য হয়েছিল, সেই মূল্যায়নেরও অবসান হয়েছে। ২০০৪ সালের ২২ মে মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বে যখন ইউপিএ-১ সরকার গঠিত হয়েছিল। তাতে সিপিআই(এম)-ও বাইরে থেকে সমর্থন দিয়েছিল। এমনকি ১৯৯৬ সালের মে মাসে লোকসভা ভোটের পর যখন জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী করার বিষয়ে সিপিআই (এম) যদি রাজি হতো তাহলে তো তিনি প্রধানমন্ত্রী হতেন কংগ্রেস দলের সমর্থনে।

১৯৭১ সালে কেরলে ভিএস অচ্যুদানন্দন মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। তাঁকে কংগ্রেস সমর্থন করেছিল। সেই সময়ে ডাঙ্গে একটা স্লোগান দিয়েছিলেন, ‘কেন্দ্রেও কেরল ধাঁচের সরকার গড়ো।’ কেরল ধাঁচের সরকার মানে কমিউনিস্টরা মাথায় থাকবে, কংগ্রেস সমর্থন করবে, সঙ্গে থাকবে। ’৯৬ সালে সিপিআই (এম) জ্যোতিবাবুকে প্রধানমন্ত্রী করার বিষয়ে রাজি হতো তাহলে সেই ডাঙ্গের স্লোগানই কাজে লাগত।

কান্নুরে সিপিএমের পার্টি কংগ্রেসের উদ্বোধনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

১৯৯৬-এর পর ২০০৪ হয়ে ২০১৬—বাংলার বিধানসভা ভোটে সিপিআই (এম)-এর নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্টের সঙ্গে কংগ্রেসের বোঝাপড়া হচ্ছে। এখন আর কংগ্রেস সম্পর্কে সিপিআই (এম)-এর সেই ছুৎমার্গ, আপত্তি নেই। তারা মনে করে এখন বিজেপির মতো একটি শক্তির উত্থান হয়েছে। কংগ্রেসের সঙ্গে মতপার্থক্যের সময়ে জনসঙ্ঘের সেই ক্ষমতা ছিল না যা আজকে বিজেপির হয়েছে। বিজেপির মতো শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের মোকাবিলা করতে গেলে কংগ্রেসের সঙ্গে থাকতে হবে। এবং এ নিয়েও কোনও সন্দেহ নেই, কান্নুর পার্টি কংগ্রেসের খসড়া দলিল যিনি পড়েছেন, যাঁর চলমান রাজনীতিতে আগ্রহ রয়েছে, তিনি বুঝবেন ‘বামপন্থীদের শক্তিকে সংহত করে গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে একত্রিত’ করতে বলার অর্থ কংগ্রেসকে নিয়েই। যা চব্বিশের লোকসভা ভোটের দিকে তাকিয়ে বলা হয়েছে।

যেহেতু এখন আর ১৯৬৪ সালের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি কোনওটাই বিদ্যমান নেই। আজকের দিনে দরকার কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যের ঐক্য। সেই ঐক্য যদি হয় তাহলে সারা ভারতে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা অনেক বামপন্থী সমর্থক, কমিউনিস্ট সমর্থক—যাঁরা কিছুটা হতাশ হয়ে রয়েছেন নির্বাচনী ফলের পরিপ্রেক্ষিতে, তাঁরা কিছুটা উৎসাহিত হবেন।

সিপিআই(এম)-এর ২৩ তম পার্টি কংগ্রেস যেখানে হচ্ছে সেই কেরলে পার্টি সদস্য গোটা দেশে দলের মোট সদস্যের ৫৩ শতাংশ। সেখানে পশ্চিমবঙ্গের সদস্য হল মোট সদস্যের ১৬ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায় পার্টি কী ব্যবস্থায় আছে। বেশিরভাগ পার্টি কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়েছে কেরল ও পশ্চিমবঙ্গে। একটা সময়, পাঞ্জাব, অবিভক্ত বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ুতে দুই কমিউনিস্ট পার্টির বেশ ভাল প্রভাব ছিল। যা বিলীন হয়ে গিয়েছে। তাই এখন, কমিউনিস্ট শক্তির পুনর্জাগরণ শুধু ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, চাই একত্রীকরণ।

ক’দিন পরেই শুরু হবে সিপিআইয়ের পার্টি কংগ্রেস। আছে সিপিআই (এমএল)-এর মতো পার্টি। আজকের ভারতবর্ষে ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক শক্তি মহা বিপদের মধ্যে পড়েছে। বামপন্থীরা খুবই সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। কমিউনিস্ট পার্টিগুলির কাছে তাই সময়ের দাবি হল, একত্রীকরণ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অতীতের বিরোধ, বিতর্ক, নীতিগত মতপার্থক্য যখন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে, তখন একত্রীকরণ মোটেই অসম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন শুধু বর্তমান নেতৃত্বের উদারতা। বহু বছর আগেই সিপিআই নেতৃত্ব এই ব্যাপারে তাদের ইচ্ছার কথা জানিয়ে রেখেছে। স্বভাবতই সিপিআই(এম)-কে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে।

লেখক সাংবাদিক। মতামত ব্যক্তিগত।

You might also like