Latest News

বিচারপতির বিচার

কনটেমপট অব কোর্ট (Contempt of Court)। যাকে বাংলায় বলে আদালত অবমাননা। আইনের চোখে তা গুরুতর অপরাধ। কোনও ব্যক্তি আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হলে তিন মাস জেল হতে পারে। কেউ যদি আদালত এবং বিচারকদের প্রতি অসম্মানজনক আচরণ করেন, তিনি আদালত অবমাননা করেছেন ধরে নেওয়া হয়।

Image - বিচারপতির বিচার

কলকাতা হাইকোর্টের (Calcutta High Court) এক বিচারপতি রাজ্যের একজন প্রথমসারির রাজনীতিক তথা সাংসদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি, কারও কারও মতে, হুমকি দিয়েছেন। ওই রাজনীতিক ফের বিচার ব্যবস্থার সমালোচনা করলে তাঁকে তিন মাসের জন্য জেলে পুরে দেবেন।

বিচারপতির মুখে এমন মন্তব্য শোভা পায় কিনা তা একটি ভিন্ন বিতর্ক। তবে জনমানসে বিচারপতি সম্পর্কে যে ভূমিকা বদ্ধমূল তা হল, তাঁরা বিবাদ, বিতর্ক থেকে শতহস্ত দূরে অবস্থান করে এগুলির বিচার করবেন। তিনি বৃহত্তর জনজীবন থেকে নিজেকে দূরে রেখে পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় থেকে সুবিচারের ব্যবস্থা করবেন। সেই ভূমিকা পালন করতে গিয়ে সংবিধান ও আইনে লিপিবদ্ধ ক্ষমতাই তাঁর শক্তির উৎস। আর ক্ষমতা, অধিকার হল এমন এক শক্তি, তা যত জাহির করা হয়, ততই লঘু হয় ধার-ভার। ভূলুণ্ঠিত হয় অধিকার, ক্ষমতার সঙ্গে সম্পৃক্ত সম্মান, মর্যাদা।

মানুষ মাত্রেই ভুল করে। বিচারপতি ব্যতিক্রম নন। যেমন ব্যতিক্রমী হতে পারে না তাঁর ভুল ধরা।

বিচারকের বা বিচার ব্যবস্থার সমালোচনা করলেই কি কেউ আদালত অবমাননার দায়ে শাস্তি পেতে পারেন?

প্রশ্নটা বহু পুরনো। স্বাধীন ভারতের জন্মলগ্ন থেকেই চলছে। তা আবার ঘুরেফিরে এসেছে এক কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতির টিভি ক্যামেরার সামনে আস্ফালন দেখার পর।

ইতিহাসে আছে, ১৯৫১ সালের ১৮ মে তৎকালীন অস্থায়ী সংসদে সংবিধান সংশোধন বিল নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল। সেই সময় বিআর আম্বেদকর মন্তব্য করেন, মাদ্রাজ প্রদেশ বনাম চাপকাম দোরাইরাজন এবং বেঙ্কটরামানা বনাম মাদ্রাজ প্রদেশের মামলায় সুপ্রিম কোর্টের দু’টি রায় ‘চূড়ান্ত অসন্তোষজনক’। সর্বোচ্চ আদালতের সমালোচনা করার জন্য অস্থায়ী সংসদ তাঁকে তিরস্কার করে। তার উত্তরে আম্বেদকর যা বলেছিলেন, তা স্মরণীয় হয়ে আছে।

তাঁর কথায়, ‘আমি বিচারকের রায় মানতে বাধ্য। কিন্তু তাঁর রায়কে সম্মান করতে বাধ্য নই। প্রত্যেক আইনজীবীরই বিচারককে বলার অধিকার আছে যে, আপনার রায় যথাযথ নয়। আমি সে অধিকার ত্যাগ করতে রাজি নই।’

১৯৮১ সালে কেরল হাইকোর্টের রজত জয়ন্তী পালন উৎসবে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি ভি আর কৃষ্ণ আয়ার। তিনি ভাষণে বলেন, ‘আমাদের দেশে যিশুরা প্রায়ই ক্রুশবিদ্ধ হন। বারাব্বাসদের কোনও শাস্তি হয় না। এর জন্য বিচার ব্যবস্থাও কিছু পরিমাণে দায়ী।’ বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টে আছে, যিশু খ্রিস্টের বিচারের সময় বারাব্বাস নামে এক কুখ্যাত অপরাধীকেও আদালতে আনা হয়েছিল। রোমান গভর্নর যিশুকে মৃত্যুদণ্ড দেন। কিন্তু বারাব্বাসকে মুক্তি দিয়েছিলেন। বারাব্বাসের কথা উল্লেখ করে প্রাক্তন বিচারপতি বোঝাতে চেয়েছিলেন, বিচারব্যবস্থার গাফিলতিতে অনেক সময় ভাল মানুষ শাস্তি পায়। কিন্তু অপরাধীরা দিব্যি ছাড়া পেয়ে যায়।

এই মন্তব্যের পর জোর বিতর্ক হয়েছিল যে, প্রাক্তন বিচারপতিকে কি আদালত অবমাননার দায়ে শাস্তি দেওয়া উচিত? শেষে কেরল হাইকোর্ট মন্তব্য করে, ‘কেউ যদি সংযতভাবে আদালতের সমালোচনা করেন, তাহলে আদালত অবমাননা হয়েছে বলে ধরা যায় না। গণতন্ত্রে কোনও প্রতিষ্ঠানই সমালোচনার উর্ধ্বে নয়।’

এর পরেও কয়েকবার আদালত অবমাননা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। ২০১০ সালে বিচারপতি ভি আর কৃষ্ণ আয়ার এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন, আমলা বা জনপ্রতিনিধিরা ক্ষমতার অপব্যবহার করলে আদালত তার বিহিত করতে পারে। কিন্তু বিচারব্যবস্থা এবং বিচারকদের সংশোধন করার একটাই পন্থা আছে। তা হল মানুষের সমালোচনা।

এইসব বিতর্ক থেকে একটা কথা পরিষ্কার। গণতান্ত্রিক দেশে বিচারব্যবস্থা সমালোচনার উর্ধ্বে নয়। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলির মতো আদালতও জনগণের টাকায় চলে। তার কোনও রায় পছন্দ না হলে আমজনতা সমালোচনা করতেই পারে। তবে সমালোচনার নামে যা তা বলা নিশ্চয় কাম্য নয়।

বিচারকের কোনও রায়ের বিরুদ্ধে কিছু বলার থাকলে ভদ্রভাবে বলতে হবে। মেঠো বক্তৃতায় মানুষকে উত্তেজিত করার জন্য সীমা অতিক্রম করা চলবে না। বিচারপতিরও মেঠো রাজনীতিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া অবাঞ্ছিত, অনাকাঙ্খিত আচরণ।

কর্তব্যপথের কর্তব্য

You might also like