Latest News

Congress: হিন্দুত্বের প্রশ্নে নীরব, কংগ্রেস কি বিজেপির বি-টিমই থেকে যাবে?

অমল সরকার

রবিবার উদয়পুরে কংগ্রেসের (Congress) তিন দিনের চিন্তন শিবির শেষ হল। গত শুক্রবার শিবিরের উদ্বোধনী ভাষণে সনিয়া গান্ধী নরেন্দ্র মোদীর সরকারকে তুলোধোনা করেছেন। বলেছেন, মোদীর শাসনে মুসলিমরা চরম নির্মমতার শিকার এবং দেশকে পাকাপাকিভাবে ধর্মীয় মেরুকরণের পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

সনিয়ার ভাষণ শুনে অনেকেরই মনে হয়েছিল উদয়পুর থেকে এক নতুন কংগ্রেসের উদয় হবে। রবিবার সমাপ্তি ভাষণে সে কথা বলেওছেন কংগ্রেস সুপ্রিমো। বলেছেন, নব কংগ্রেসের উদয় হল। আমরা করব জয়। জয় করবই আমরা। এই ধরনের সমাবেশে সব নেতাই যা বলে ভাষণ শেষ করেন, সনিয়াও তাই-ই বলেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, কোন পথে বিজেপির মোকাবিলা করবে কংগ্রেস?

আশা করা গিয়েছিল, চিন্তন শিবির থেকে সেই প্রশ্নের জবাব, নিদেন পক্ষে আভাসটুকু অন্তত মিলবে। বাস্তবে কংগ্রেস (Congress) তার ত্রিসীমানা দিয়ে গেল না। এমনিতে শিবিরের উদ্দেশ্য ছিল সাংগঠনিক পুনর্জাগরণের পথ অনুসন্ধান। কিন্তু কোনও কাঠামো যেমন শক্তপোক্ত কাঠ বা লোহার রড ছাড়া দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, তেমনই রাজনৈতিক সংগঠনকেও মজবুত করার জন্য চাই নীতি-আদর্শ-মতাদর্শগত শক্ত অবস্থান। কংগ্রেস এতদিনে যা হারিয়েছে, তা সম্ভবত এটাই।

রবিবার সমাপ্তি ভাষণে রাহুল গান্ধী স্বীকার করেছেন, কংগ্রেস জনবিচ্ছিন্ন। কীভাবে মানুষকে দলের ছাতার তলায় ফেরানো যায়, সেই পথের অনুসন্ধান করতে হবে। প্রাক্তন কংগ্রেস সভাপতির কথাকে ধরেই এগোনো যাক। যে কংগ্রেস নেতা বলছেন দল জনবিচ্ছিন্ন, তিনি কি কখনও বোঝার চেষ্টা করেছেন তাঁর কর্মকাণ্ড এই পরিস্থিতির জন্য কতটা দায়ী?
কংগ্রেসিদের এই প্রশ্নটির জবাব খোঁজা অত্যন্ত জরুরি, কারণ, মাস তিন পরে সনিয়া-পু্ত্রই সম্ভবত ফের দলীয় সভাপতির চেয়ারে বসতে চলেছেন। মাস কয়েক আগে প্রবীণ কংগ্রেস নেতা সলমন খুরশিদের বই উদ্বোধন উপলক্ষে এই রাহুলই বিতর্কের অবতারণা করে বলেছিলেন, হিন্দুত্ব আর হিন্দুইজম এক নয়। প্রথমটি সঙ্ঘ পরিবার সৃষ্ট ধারণা। আর দ্বিতীয়টি হল হিন্দুদের ধর্মাচরণের সনাতন সংস্কৃতি।

Image - Congress: হিন্দুত্বের প্রশ্নে নীরব, কংগ্রেস কি বিজেপির বি-টিমই থেকে যাবে?

সত্যি কথা বলতে কী, এই দুইয়ের মিল আর ফারাক নির্ধারণ করা রকেট সায়েন্সের থেকে কিছু অংশে কম নয়। কারণ, কোনও পক্ষের অবস্থানই যুক্তিগ্রাহ্য নয়। কিন্তু রাহুল মুখে যাই বলুন, বিজেপির রাজনীতির ধর্মকেন্দ্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে কংগ্রেস নেতার দলীয় কর্মসূচির ফারাক কতটুকু? কোনও একটি দিনে তাঁর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, বিজেপি সভাপতি জেপি নাড্ডার রাজনৈতির সূচির কোনও ফারাক থাকছে কি? মোদী, শাহের মতো কোনও না কোনও মন্দির সফর রাহুলের সূচিতেও থাকেই।

বিজেপির রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে নেতাদের মন্দির সফরের কোনও বিরোধ নেই। বরং তা ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। বিজেপির জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠক চলাকালে দিবারাত্র বৈদিকমন্ত্র পাঠ চলে। হিন্দু ঠাকুর-দেবতার প্রতি দলটি এতটাই অনুরক্ত এবং তাদের সবটাই ঘোষিত।

প্রধানমন্ত্রী বিদেশে গেলেও তাই হিন্দুমন্দিরে পুজো দিতে ভোলেন না। গত বছর বাংলার বিধানসভা ভোটের আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে সে দেশের মতুয়া মন্দিরে পুজো দিয়েছেন। গিয়েছিলেন প্রতাপশালী হিন্দু রাজা প্রত্যাপাদিত্যের স্মৃতি বিজড়িত একটি মন্দিরেও।

মন্দির সফরের সঙ্গে কংগ্রেসের কোনও বিরোধ নেই। অতীতেও নেতারা যেতেন। কিন্তু রাহুল গান্ধী ও তাঁর অনুচররা যেভাবে তা দলের সংস্কৃতি করে তুলেছেন সেই পরিস্থিতি আগে ছিল না। রাহুল দলের সহ-সভাপতি এবং সভাপতি হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত তাঁর মন্দির সফরের হিসেব নিলে অনুমানের ভিত্তিতেই বলতে পারি, সংখ্যাটা মোদী, অমিত শাহদের থেকে খানিক বেশি অথবা উনিশ-বিশ হবে।

যে কথা বলছিলাম, কংগ্রেসের (Congress) সঙ্গে ধর্মস্থান, উপাসনাস্থলের বিরোধ থাকার প্রশ্নই আসে না। এই দল বা নেতারা নাস্তিকতায় বিশ্বাসী নন। কিন্তু অতীতের সঙ্গে ফারাক হল, নেহরু, ইন্দিরা, রাজীব তো বটেই বাকি কংগ্রেস নেতারাও মসজিদ, মাজার, গির্জায় যেতেন। রাহুল গান্ধীর মতো মন্দির সফর তাঁদের রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না। দল ধর্মনিরপেক্ষতাকে আঁকড়ে থেকেছে।

শুধু রাহুল বা কংগ্রেস কেন, দেশের প্রথমসারির আঞ্চলিক দলের নেতা-নেত্রীরাও বাদ যান না। বিগত কয়েক বছর, বিশেষ করে ২০১৯-এর লোকসভা ভোটের পর তাঁদের দৈনন্দিন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে চোখ বোলালে মনে হবে, ভারতবর্ষে যত দর্শনীয় স্থান হল মন্দির এবং মসজিদ, গির্জা বলে এদেশে কিছু নেই। প্রায় সব দলেই হিন্দু নেতাদের ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়ে, মন্দিরে পুজো দিয়ে দলীয় কাজ শুরু করা। দিন কয়েক আগে দলের রাজ্য দফতরের উদ্বোধন করতে গুয়াহাটি গিয়েছিলেন তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বিমানবন্দর থেকে তাঁর কনভয় সোজা কামাখ্যা মন্দিরে গিয়ে থেমেছিল।

মন্দির সফরে রাহুল গান্ধীর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। তাঁর বক্তব্য, ‘আমি হিন্দু, হিন্দু মন্দিরে যাবই।’ কথা হল, তা নিয়ে কারও আপত্তি নেই। কিন্তু শুধু হিন্দু মন্দিরে কেন? দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কিংবা আম আদমি পার্টির সর্বাধিনায়ক হিসাবে কেজরিওয়ালের মুখে কি একথা সাজে? বিজেপির কোনও নেতা বললে কথাটা কানে বাজত না। কিন্তু সত্য হল, কেজরিওয়াল যে কথা মুখ ফুটে বলেছেন, বাকিদের বক্তব্যও যে তাই, সেটা তাঁদের আচরণ আর কর্মসূচিতে স্পষ্ট।

কংগ্রেসের (Congress) হিন্দুত্বের পথ যে দলের ধ্বংস ডেকে এনেছে, বিজেপি পথে বিজেপির মোকাবিলার রাস্তায় হাঁটা কালিদাসী মুর্খামি, লোকসভা এবং একের পর এক রাজ্যে বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের ভরাডুবিতেই তা স্পষ্ট। আর রবিবার রাহুল গান্ধী স্বয়ং বলেছেন, কংগ্রেস জনবিচ্ছিন্ন। অর্থাৎ তাঁর নরম হিন্দুত্বের পথ যে পথ নয় সেটা রাহুলের থেকে বেশি ভাল আর কেউ বুঝেছেন বলে মনে হয় না।

কিন্তু আশ্চর্যের হল, তিন দিনের শিবিরে কংগ্রেস বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, গেরুয়া শিবিরের আগ্রাসী হিন্দুত্বের মোকাবিলায় নরম হিন্দুত্বই পথ কিনা, এসব বিষয়ে কোনও আলোচনাই প্রকাশ্যে আনল না। অথচ এই সংক্রান্ত সাব-কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন দলের প্রবীণ নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে। জানা যাচ্ছে, নরম হিন্দুত্বের পথে চলা-না চলা নিয়ে কমিটির বৈঠকে ঐকমত্যে পৌঁছোনো যায়নি। ছত্তীসগড়ের মুখ্যমন্ত্রী ভূপেশ বাঘেল সরাসরি নরম হিন্দুত্বের লাইনের পক্ষে ব্যাটিং করেছেন। বলেছেন, বিজেপিকে ঠেকাতে আমাদের আরও বেশি করে মন্দির সফর করতে হবে। হিন্দুদের উৎসবগুলিতে দলগতভাবে যোগদান বাড়াতে হবে।

বাঘেলের কথা নতুন নয়। বস্তুত ছত্তীসগড়ে তাঁর সরকারের কর্মসূচির সঙ্গে বিজেপির রমন সিংয়ের বিগত সরকার কিংবা উত্তরপ্রদেশের যোগী সরকারের কোনও ফারাক নেই। তাঁর অনুগামীরা বলে বেড়াচ্ছেন, রাম বিজেপির, এই ধারণায় বদল আনাই লক্ষ্য কংগ্রেস সরকারের। সেই কাজে তারা অনেকটাই সফল। বস্তুত, ভোট যত এগিয়ে আসছে, ততই রাম রাম করছেন ছত্তীসগড়ের কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী। ইদানীং তাঁর অনেক কর্মসূচিতেই থাকছে রাম ভজনার আয়োজন।

অযোধ্যার বাইরে ১৪ বছর বনবাসে থাকাকালে রাম অনেকটা সময় আজকের ছত্তীসগড়ের বিভিন্ন এলাকায় কাটিয়েছেন, এমনটাই বলা হয়ে থাকে। যে পথে রাম-লক্ষ্মণ-সীতার আগমন ঘটেছিল সেই পথ ও আশপাশের এলাকাকে পর্যটনের রাম সার্কিট হিসেবে গড়ে তোলার কাজ আগেই শুরু করেছে বাঘেল সরকার। ‘রাম বন গমন ট্যুরিজম সার্কিট’ নামে ওই পর্যটন রুটের আশপাশে ৭৫টি মন্দির সংস্কারের কাজ পুরোদমে চলছে। তার একটি শিভরিনারায়ণ মন্দির সংস্কারের কাজ সম্প্রতি শেষ হয়েছে। ছত্তীসগড় সরকার এই মন্দির সংস্কারে খরচ করেছে ১৩৪ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে খরচ হবে কয়েক হাজার কোটি টাকা। যে অর্থ দিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকায় রাস্তাঘাট, পানীয় জলের ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব ছিল।

প্রসঙ্গত, এখনও রাজ্যটি দারিদ্রপীড়িত এলাকায়। মাওবাদীরা সেখানে সক্রিয়। আদিবাসী গ্রামে আওয়াজ উঠেছে, তাদের উপর কংগ্রেস সরকার (Congress) হিন্দুত্ব চাপিয়ে দিচ্ছে। ঢাকা পড়ে যাচ্ছে আদিবাসীদের নিজস্ব সংস্কৃতি, উপাচার, উপাসনার ব্যবস্থাদি।

বাঘেল দিন কয়েক আগেই নবসাজে সজ্জিত মন্দিরটি ভক্তদের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। রামনবমী উপলক্ষে সেখানে তিন দিনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল সরকারি উদ্যোগে।

বছর দুয়েক আগে তিনি আবার ছত্তীসগড়ের রাজধানী রায়পুরের অদূরে চাঁদখুরিতে কৌশল্যা মন্দির সংস্কার করিয়েছেন। রামের মায়ের নামে দেশে সেটিই একমাত্র মন্দির বলে ধরা হয়। সংস্কারের পর মন্দির সাধারণের জন্য খুলে দেওয়ার দিন গোটা মন্ত্রিসভাকেই চাঁদখুরিতে হাজির করেন কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রী। এমন ভক্তির নজির বিজেপি শাসিত কোনও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং গেরুয়া বসনধারী যোগী আদিত্যনাথেরও নেই। বাঘেলের সরকারের সংস্কৃতি দফতর তুলসীদাসের রামায়ণ পাঠের উপর প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে।

জানা গিয়েছে, উদয়পুরের চিন্তন শিবিরে হিন্দুত্বের মোকাবিলা বিষয়ক কমিটির বৈঠকে বাঘেলের সঙ্গে গলা মেলান পাশের রাজ্য মধ্যপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি কমলনাথ, উত্তরপ্রদেশের কংগ্রেস সভাপতি আচার্য প্রমোদ কৃষ্ণাণ প্রমুখ। তবে তাঁরা বারেবারে হিন্দুত্বের পথে বিজেপিকে কাউন্টার করার কথা বললেও একাধিক নেতা, কংগ্রেসের মূল নীতি আদর্শকেই সামনের সারিতে তুলে আনার কথা বলেছেন। তাঁদের অন্যতম হলেন মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পৃত্থীরাজ চহ্বন এবং কর্নাটকের নেতা বিকে হরিপ্রসাদ।

তাঁদের মতে, নরম হিন্দুত্ব বিজেপিরই সুবিধা করে দিচ্ছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বেকারি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রির মতো বিষয়গুলি নিয়ে লড়াই, রাজনৈতিক বিরোধ পিছনের সারিতে চলে যাচ্ছে। বিজেপির সঙ্গে কংগ্রেসের (Congress) রাজনীতির ফারাক থাকছে না। ওই নেতারা মনে করেন, কংগ্রেসের হারানো গৌরব ও শক্তি ফিরতে পারে দলের আদর্শ ও নীতির সঠিক বিপণনের মাধ্যমে।

জানা গিয়েছে, সাব-গ্রুপের বৈঠকে দু’দিন বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মোকাবিলা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু মল্লিকার্জুন খাড়গের মতো মানুষ কমিটিকে একটি মতের পক্ষে রাজি করাতে না পেরে ওয়ার্কিং কমিটির কাছে কমিটির কার্যবিবরণী পেশ করে দিয়েছেন। দেখা দেল চিন্তন শিবির শেষ হল এই বিষয়ে টুঁ শব্দটি না করেই।

উদয়পুরের চিন্তন শিবিরের আনুষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয়েছিল, নব সংকল্প শিবির। কিন্তু বিজেপির হিন্দুত্বের মোকাবিলায় দলের অবস্থান এবং ঘোষণা নব সংকল্পপত্রে স্থান পেল না।

‘নব সংকল্প-নব উদয়-আমরা করব জয়’, ডাক সনিয়ার, গান্ধী জয়ন্তীতে ভারত-জড়ো যাত্রা

You might also like