Latest News

অর্বাচীন হুজুগ নয়, নৈতিক জোরের দিন

নীলাঞ্জন দত্ত

বিজ্ঞাপন আর বিপণনজীবীদের সক্রিয়তার দৌলতে আজকাল আমাদের ক্যালেন্ডারে ‘দিবস’-এর অভাব নেই। ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসটা অবশ্য এদের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছে। কিন্তু একে হারিয়ে যেতে দিলে সমূহ বিপদ, যাঁরা এই দিনটিকে কোনও গুরুত্বই দেন না, তাঁদেরও।

কারণ, এই দিবসটি আমাদের অধিকারের সঙ্গে জড়িত, অধিকারগুলোকে এক বার নতুন করে ঝালিয়ে নেওয়ার দিন। নইলে, দিনকাল যা পড়েছে, কেউ এসে বলতেই পারে, এটা হিন্দুদের দেশ, এখানে ‘কেরেস্টান’ ভ্যালেন্টাইনস ডে পালন করার কোনও অধিকার আপনার নেই। ব্যস, গেল আপনার ভালবাসাবাসির উদযাপন। বা ওয়ার্ল্ড বিফ ডে উপলক্ষে একটুখানি গোমাংস রান্না করেছিলেন বন্ধুদের নেমন্তন্ন করে তারিয়ে তারিয়ে খাবেন বলে, আর কে বা কারা এসে আপনার ফ্রিজ খুলে যেই সেটা আবিষ্কার করল, ওমনি টানতে টানতে নিয়ে গেল থানায়।

তাই মানবাধিকার দিবসটা আমাদের সবার কাছেই একটা বিশেষ দিন হওয়া উচিত। এমনকী যাঁরা ওসব ‘মানবাধিকার-টানবাধিকার’ ফুৎকারে উড়িয়ে দেন, তাঁদেরও। এবং অনেকে যেমন মনে করেন, এই ‘দিবস’টাও অন্য বহু দিবসের মতো একটা সাম্প্রতিক হুজুগ, সেটাও ঠিক নয়।

গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সমিতি বা এপিডিআর, পঞ্চাশে পা দিয়ে আজ যা ভারতের সবচেয়ে দীর্ঘায়ু অধিকার সংগঠন। জরুরি আবস্থায় তার উপরে জারি হওয়া নিষেধাজ্ঞা উঠতে না উঠতেই সেই ১৯৭৭ সালের ১০ ডিসেম্বর কলকাতায় (এবং সম্ভবত দেশে) প্রথম রাজপথে মানবাধিকার দিবস পালন করেছিল। সুসজ্জিত ট্যাবলো নিয়ে মিছিল হয় সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার থেকে শ্যামবাজার অবধি। সেটা ছিল ৩০তম আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস, তা মনে রেখে ৩০টি রঙিন গ্যাস বেলুন দিয়ে ট্যাবলো সাজানো হয়েছিল। ১৯৪৮ সালের এই দিনেই রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদে ‘মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা’ গৃহীত ও ঘোষিত হয়।

এপিডিআর পরবর্তীকালে এই সনদকে তার লক্ষ ও উদ্দেশ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়, কেবল একটি অনুচ্ছেদ সম্পর্কে সম্মত না হয়ে। সেটি হল, অনুচ্ছেদ ১৭, যাতে সম্পত্তির অধিকারের কথা বলা হয়েছে। অনুচ্ছেদটি মাত্র দু’টি বাক্যের:

১। প্রত্যেকেরই একক ভাবে এবং অন্যান্যদের সঙ্গে যৌথভাবে সম্পত্তির মালিক হওয়ার অধিকার আছে।

২। কাউকেই তার সম্পত্তি থেকে যথেচ্ছ ভাবে বঞ্চিত করা যাবে না।

মানবাধিকারের ঘোষণা চূড়ান্ত রূপ পাওয়ার আগে যখন তা নিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জে বিতর্ক চলছিল, সেই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার শিবিরের দেশগুলি এর বিরোধিতা করে বলে, এই অধিকারকে (সম্পত্তির) কখনওই অ্যাবসোলিউট বা পরম বলে মেনে নেওয়া যায় না, যেহেতু উৎপাদনের উপকরণের উপরে ব্যক্তিগত মালিকানাই শোষণের ভিত্তি, এবং সমাজে শোষণ বজায় থাকলে আর সবার সমান অধিকারের কথা বলে কী লাভ?

তবে শেষ পর্যন্ত তারা দ্বিতীয় বাক্যটির সারবত্তা মেনে নেয় এবং সোভিয়েত প্রতিনিধিদলের নেতা সমাজতান্ত্রিক আইনবিশারদ ভিশিনস্কি তাঁর শেষ অধিবেশনের বক্তৃতায় এই নিয়ে আর জেদাজেদি করেননি। আসলে, সোভিয়েত প্রতিনিধিদের সম্পূর্ণ ভাবে সম্পত্তির অধিকারের বিরোধিতা করার বিশেষ কারণও ছিল না। এর অনেক আগেই, ১৯৩৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের নতুন সংবিধান বা ‘স্তালিন সংবিধান’ পাস হয়ে গেছে, যার প্রধান প্রণেতা ছিলেন ভিশিনস্কিই। তার ১০ নম্বর অনুচ্ছেদে নাগরিকদের বসতবাটি-সহ স্বোপার্জিত, সঞ্চিত বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার দেওয়া হয়েছিল।

অন্য দিকে, এপিডিআর-এর মতো সংগঠন সম্পত্তির অধিকার স্বীকার করুক বা না করুক, আজকের বিশ্বজোড়া অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে গলা মিলিয়ে যখন সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের মতো উন্নয়নের নামে উচ্ছেদের মুখোমুখি হওয়া মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছে, তখন তো আসলে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উপরে রাষ্ট্র বা কর্পোরেট পুঁজির আক্রমণের বিরোধিতাই করেছে।

সোভিয়েতরা বরং সম্পত্তির অধিকারের সঙ্গে যুক্ত আর একটা সংশোধনী প্রস্তাব এনেছিল। তা হল, মানবাধিকার ঘোষণার ২২ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে যোগ করা হোক যে, কোনও দেশের কোনও নাগরিককেই তার সম্পত্তি বা শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকলে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। এই সংশোধনী ভোটে হেরে যায়। বিপক্ষে যারা ভোট দেয়, তাদের মধ্যে ছিল সদ্যস্বাধীন ভারত এবং পাকিস্তান।

ভারত আর সোভিয়েত ইউনিয়নের অবস্থান কিন্তু একটা ব্যাপারে মিলে গিয়েছিল। তা হল, ‘বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে’ মতপ্রকাশ বা অন্যান্য রাজনৈতিক অধিকারের উপরেও লাগাম পরানো যায়। নইলে ভবিষ্যতে ফাসিবাদের মতো বিষাক্ত মতাদর্শের প্রচার রোখা যাবে কী করে, ভিশিনস্কি প্রশ্ন তোলেন। ইউরোপ-আমেরিকার গণতন্ত্রের পূজারিরা অবশ্য এই বক্তব্যকে তেমন আমল দেননি। তাঁরা বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্ত করেই ফাসিবাদের পুনরুত্থান আটকানো যাবে।

ভারতের প্রতিনিধি শ্রীমতি হংস মেহতা রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার কমিশনে প্রথম থেকেই বলে আসছিলেন, যে মানবাধিকার ঘোষণার ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে “কা‌উকে‌ই খেয়ালখুশিমতো গ্রেপ্তার বা অন্তরীণ করা কিংবা নির্বাসন দে‌ওয়া যাবে না” বাক্যটির সঙ্গে “আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ছাড়া” কথাগুলি জুড়ে দিতে হবে। আসলে ভারতের সংবিধানসভায় তত দিনে এই ফর্মুলা গৃহীত হয়ে গেছে, মুখে যতই বলা হোক না কেন, দেশের নাগরিকদের অধিকার যাতে অবাধ না হয় তা নিশ্চিত করতে।

তাই এক সময়ে রাওলাট আইনের চরম বিরোধিতা করা জাতীয় নেতারা ক্ষমতা পেয়ে একের পর এক এমন আইন করে গেছেন, যাতে বিচার না হতেই কেবল সন্দেহের বশে সরকারের অপছন্দ মানুষদের দীর্ঘ দিন আটক রাখা যায়। ভারতের মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মীরা তখনই এতে অশনি সঙ্কেত দেখেছিলেন। তৎকালীন ‘অল ইন্ডিয়া সিভিল লিবার্টিস কাউন্সিল’ বার বার ভারত সরকার এবং রাষ্ট্রপুঞ্জের কাছে এ বিষয়ে প্রতিবাদপত্র পাঠায়। কিন্তু শেষরক্ষা হয় না। মানবাধিকার ঘোষণায় না থাকলেও ১৯৬৬-তে যখন রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদে ইন্টারন্যাশনাল কভেনান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিকাল রাইটস পাস হয়, তখন ভারত সরকারের মনোবাঞ্ছাই পূর্ণ হল।

সুতরাং, ভারতের সংবিধানই বলুন আর আন্তর্জাতিক কভেনান্টই বলুন, ইউএপিএ-র মতো আইন করতে কিন্তু কোনও বাধা নেই, যাতে ভারাভারা রাও-এর মতো কবিকে বা স্ট্যান স্বামীর মতো সমাজসেবীকেও বিনাবিচারে জেলে আটকে রাখা যায় বা মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া যায়।

তাই সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার সেই আদি ও অকৃত্রিম অনুচ্ছেদ ৯-কে ব্যানারের সামনে বড় বড় করে লিখে রেখেই মানবাধিকারের মিছিলে এগোতে হবে: “কা‌উকে‌ই খেয়ালখুশিমতো গ্রেফতার বা অন্তরীণ করা কিংবা নির্বাসন দে‌ওয়া যাবে না।” এর আইনি জোর থাকুক বা না থাকুক, নৈতিক জোর তো আছে।

You might also like