Latest News

কিছুতেই সরকারের অনুদান নিতে চাননি, বলতেন, ‘শেষে দুঃস্থ তকমা জুটল’

মালা ঘোষ মৈত্র

আজ তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের এক অফিসার ফোন করে বলল, ‘মালাদি, আজ তোমার মনটা নিশ্চয়ই খুব খারাপ।’ আমি অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলাম। নারায়ণ দেবনাথের প্রয়াণে আমাকে ফোন করার কারণটা বলি।

তখন সম্ভবত ২০০৯ সাল হবে । দুঃস্হ শিল্পীদের পেনশনের ফাইলে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর স্বাক্ষর হয়ে গেছে । এমন সময় কমল মজুমদার (অ্যাডিশনাল ডিরেক্টর)-কে হন্তদন্ত হয়ে বললাম, ‘নারায়ণ দেবনাথের আর্থিক অবস্থা খুব সঙ্গীন। ওঁর সরকারি সহায়তা দরকার।’ স্যার বললেন, ‘তা কী করে সম্ভব? ওঁর তো কোনও দরখাস্তই নেই।’

উপায় একটা বের করা হল। ব্যাকডেটে নারায়ণবাবু যদি একটা আবেদন করেন মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর কাছে, তবে সমস্যার সমাধান হতে পারে। নারায়ণবাবুকে জানানো হল, উনি যদি ব্যাকডেটে একটা অ্যাপ্লিকেশন দেন। খুব আত্মাভিমানী মানুষটির মনে আঘাত লাগল। সরকারের কাছে নারায়ণ দেবনাথকে দুঃস্থ শিল্পীদের অনুদান ভিক্ষা চাইতে হবে? কিছুতেই উনি রাজি নন।

তখন ওঁর এক অনুরাগী একটা সাদা কাগজে বহু বুঝিয়ে ওঁর একটা স্বাক্ষর নিলেন। স্বাক্ষর দিয়ে তিনি বললেন, ‘দুঃস্থ শিল্পীদের অনুদান ভিক্ষা দিতে গিয়ে তোমরা আমাকে অসুস্থ করে দিলে।’ বারেবারে বলতেন, ‘শেষ পর্যন্ত আমার দুঃস্থ তকমা জুটল! এই কি আমার প্রাপ্য ছিল! আমার কি কোনও অবদান নেই!’

সে যাই হোক, ওই কাগজটায় আমি ওঁর বয়ানে আবেদনপত্র লিখে দিলাম । তার পরের সব কৃতিত্ব কমল স্যারের। উনি নিশ্চয়ই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে বিষয়টা বোঝাতে পেরেছিলেন। যাইহোক ওঁর মাসিক অনুদানের ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত হয়ে যায়।

পরবর্তীতে নারায়ণ দেবনাথের যা কিছু সরকারি পুরস্কার পাওয়া, সম্মান পাওয়া, প্রত্যেকটির একটা বড় ইতিহাস আছে। নারায়ণ দেবনাথ নিয়ে গবেষণা করছিলেন এক ভদ্রলোক আমার সঙ্গে এ বিষয়ে বহুবার যোগাযোগ করেছেন। সরকারের কাছে মাস পিটিশনের ড্রাফ্ট ইত্যাদি আমি তৈরি করে দিয়েছি। এত বড় একজন কার্টুনিস্ট সহজে তাঁর প্রাপ্য সম্মান পাননি। বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে তাঁর অনুরাগী গবেষকদের।

আমাকে তিনি তাঁর কমিক্সের বই গিফট করেছিলেন। সমগ্র পাতা জুড়ে একটা বড় বাটুল এঁকে দিয়েছিলেন।

ওঁর সরকারি ভাতার চেক আমি আলাদা করে তুলে রেখে দিতাম। ওঁর এক পরিচিত এসে নিয়ে যেতেন। নিয়ম ছিল, সরকারি অফিসে এসে চেক নিতে হবে। উনি কোনও দিন আসেননি রাইটার্স বিল্ডিংসে।

(লেখক পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম অধিকর্তা)

You might also like