Latest News

জীবন, জনস্বাস্থ্য আগে, পুর নির্বাচন স্থগিত করুক রাজ্য

রন্তিদেব সেনগুপ্ত

গত ২৪ ডিসেম্বর এই রাজ্যে কোভিড সংক্রমণে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৮৫০। মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় ২৯ ডিসেম্বর তা হয়েছে ১০৮৯। এর ভিতর ২৮ ডিসেম্বর থেকে ২৯ ডিসেম্বর এই ২৪ ঘন্টায় সংক্রমণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য ভাবে লাফিয়ে বেড়েছে।

গত ২০ দিনে (এই হিসাবটা ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত) এই রাজ্যে ওমিক্রম ভ্যারিয়েন্ট আক্রান্তের সংখ্যা ১১। এদের ভিতর পাঁচজনের বিদেশ যাত্রার সাম্প্রতিক কোনও ইতিহাস নেই। এই হিসাব সরকারিভাবেই প্রকাশিত এবং তা আশঙ্কিত এবং আতঙ্কিত করার মতই। বোঝাই যাচ্ছে, তৃতীয় দফায় কোভিড সংক্রমণ যেমন দ্রুত ছড়াচ্ছে, তেমনই ওমিক্রনের শঙ্কাও দেখা দিচ্ছে রাজ্যে।

শুধু এই রাজ্য নয়, অন্যান্য রাজ্যেও করোনার তৃতীয় ঢেউটি আছড়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এবং এই আশঙ্কা দেখা দিতেই বেশ কয়েকটি রাজ্য সরকার আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা চালু করে দিয়েছে কয়েকটি রাজ্য। করোনার প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউয়ের অভিজ্ঞতাটি কারও কাছেই সুখপ্রদ নয়। সেই অভিজ্ঞতাটি মনে রেখেই আকাশের কোণে সিঁদুরে মেঘ দেখলে আগাম সতর্কতা নেওয়াই প্রয়োজন।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও কোভিড সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতি নিয়ে সতর্ক করেছেন রাজ্যবাসীকে। ওমিক্রন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও তিনি প্রকাশ করেছেন। এবং এই পরিস্থিতিতে আবার কিছু কড়া বিধিনিষেধ চালু করার ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি। একথা মেনে নেওয়া ভাল আরও একবার সম্পূর্ণ লকডাউন ঘোষণা করা আর সম্ভব নয়।

সম্ভব নয় এই কারণেই যে, সম্পূর্ণ লকডাউনের কারণে দেশের অর্থনীতিতে যে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, সেই ক্ষত এখনও নিরাময় করা যায়নি। সেই ক্ষত কতদিনে সম্পূর্ণ নিরাময় করা যাবে, তাও কেউ জানে না। এইরকম অবস্থায় আরও একবার লকডাউন ঘোষণা করার অর্থ হল, দেশের অর্থনীতিকে পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া।

এই কথাটি মনে রেখে কেন্দ্র বা রাজ্য কোনও সরকারই করোনা মোকাবিলা করার জন্য সম্পূর্ণ লকডাউনের পথে পা বাড়াবে বলে মনে হয় না। অর্থনীতির কথা মাথায় রেখে সম্পূর্ণ লকডাউন ঘোষণা সমীচীনও হবে না।

তাহলে এই পরিস্থিতিতে রাজ্যে যখন দ্রুত গতিতে বাড়ছে করোনা সংক্রমণ, তখন তার মোকাবিলায় কী পদক্ষেপ নিতে পারে রাজ্য সরকার? যা করতে পারে রাজ্য সরকার, বা যা রাজ্য সরকারের অবিলম্বে করা উচিত, তা হল জনসমাগম ঘটতে পারে এমন যে কোনও রকম কার্যক্রমকে আপাতত পুরোপুরি স্থগিত করে দেওয়া। তাতে প্রাথমিকভাবে সংকমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাটি অনেকটাই রোধ করা যায়।

করোনার তৃতীয় ঢেউটি যখন চোখ রাঙাতে শুরু করেছে, তখন এই রাজ্যে বেশ কয়েকটি পুরসভার নির্বাচনের নির্ঘণ্ট প্রকাশ করেছে রাজ্য নির্বাচন কমিশন। জানুয়ারি মাসের ২২ তারিখ কয়েকটি এবং ফেব্রুয়ারি মাসের ২৭ তারিখ কয়েকটি পুরসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করা হয়েছে।

এর ভিতরেই ১৯ ডিসেম্বর কলকাতা পুরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। ২০২১-এ মে মাসে রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের পর এই রাজ্যে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ কীভাবে আছড়ে পড়েছিল, কী নিদারুণ মৃত্যুমিছিল প্রত্যক্ষ করা গিয়েছিল, তা এত দ্রুত রাজ্যবাসী বিস্মৃত হয়েছে বলে মনে হয় না। তাও বিধানসভা নির্বাচনের সময় স্বাস্থ্যবিধির কোনোরকম তোয়াক্কা না করেই যেভাবে সবকটি রাজনৈতিক পক্ষ মিটিং মিছিল সমাবেশে লোক জড়ো করে নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রদর্শন করেছিল, তার কারণেও যে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে রাজ্য মৃত্যুমিছিল প্রত্যক্ষ করেছিল, তাও অস্বীকার করা যায় না।

ডান, বাম, হিন্দুত্ববাদী, মধ্যপন্থী কোনও রাজনৈতিক পক্ষ স্বাস্থ্যবিধিকে কখনই বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করেনি। বরং স্বাস্থ্যবিধিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেই নিজেদের শক্তি প্রদর্শন বরাবর তাদের বেশি আগ্রহ দেখা দিয়েছে।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কলকাতার পুরসভা নির্বাচনেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। রাজনৈতিক মিছিল, মিটিং, জনসভায় সরকার যতই বিধি আরোপের চেষ্টা করুক না কেন, সেই বিধি অনায়াসে ভঙ্গ করতে খোদ শাসক ও বিরোধী, কোনও পক্ষই কোনও রকম দ্বিধা করেনি।

আমাদের দেশের সমস্যাটি হল এই যে, এই দেশে কোনও রাজনৈতিক শিবিরের কাছে কোনও কালেই জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের বিষয় দুটি গুরুত্ব পায়নি। কোনও রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইস্তেহারে বা কর্মসূচিতে জনস্বাস্থ্য বা পরিবেশ কোনও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পায়নি। মাঝেমাঝে কোনও রাজনৈতিক নেতা বা মন্ত্রী বছরে দু’একদিন ঝাড়ু হাতে রাস্তায় নেমেছেন শুধুমাত্র প্রচারের আলোটা নিজের দিকে টানতে। সরকারি কর্মসূচিতেও এই বিষয়গুলি মোটের উপর অবহেলাতেই থেকেছে।

অথচ পাশ্চাত্যের দেশগুলিতে কিন্তু সমস্ত রাজনৈতিক পক্ষের কাছেই বিষয়গুলি সবিশেষ গুরুত্ব পায়। কারণ তারা জানে, জনস্বাস্থ্য বা পরিবেশের সুরক্ষা দেশের জনগোষ্ঠীর পক্ষে কতটা কল্যাণকর। এই বোধটি আমাদের দেশের রাজনৈতিক পক্ষগুলির মধ্যে আসেনি।

ফলে এটুকু বোঝাই যায়, যতই করোনার তৃতীয় ঢেউ চোখ রাঙাক না কেন, যতই ওমিক্রন হানার সম্ভাবনা আরও বেশি হোক না কেন, জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি মাসের পুরসভা নির্বাচনগুলিতে যাবতীয় সরকারি বিধি ভঙ্গ করেই শাসক ও বিরোধী সব রাজনৈতিক পক্ষই নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করতেই ব্যস্ত থাকবে এবং তারপরে যদি…

এই পরিস্থিতিতে একমাত্র রাজ্য সরকারই পারে এই অপরিনামদর্শিতার হাত থেকে রাজ্যটিকে নিরাপদ রাখতে। আর তা একমাত্র সম্ভব যদি রাজ্য সরকার অবিলম্বে রাজ্য নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসের পুরসভা নির্বাচনগুলিকে অন্তত তিনমাসের জন্য স্থগিত ঘোষণা করে।

রাজ্যের শাসকদলকে বিশেষ করে মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক স্বার্থ কখনই জনস্বাস্থ্যের থেকে অধিক গুরুত্ব লাভ করতে পারে না। জনস্বাস্থ্যকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়েই এই ভাবনাটি রাজ্য সরকারের অবিলম্বে করা উচিত। আরও দেরি হয়ে যাওয়ার আগে।

এইরকম একটি সিদ্ধান্ত যদি রাজ্য সরকার গ্রহণ করে, মনে হয় না, কোনও বিরোধী পক্ষই তাতে আপত্তি জানিয়ে বসবে। গত দু’বছর ধরে এই পুরসভাগুলির নির্বাচন আটকে আছে একথা ঠিক। আরও তিনমাস যদি স্থগিত থাকে, খুব একটা মহাভারত অশুদ্ধ হবে বলে মনে হয় না।

রাজনৈতিক কারণেও এখন শাসক দলের এই নির্বাচন নিয়ে তাড়াহুড়ো না করাই ভালো। যে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল প্রায় সাইনবোর্ডে পরিণত হতে চলেছে, সেখানে তিন মাস পরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও শাসক দলের ফলাফলে হেরফের হবে ঘটবে না।

মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, করোনার তৃতীয় ঢেউ মোকাবিলায় কী ধরনের কড়াকড়ি করা হবে সে বিষয়ে ভাবনাচিন্তা এবং পর্যালোচনা শুরু হবে ৩ জানুয়ারি থেকে। বোঝাই যাচ্ছে বর্ষশেষ এবং নববর্ষের আনন্দ অনুষ্ঠানগুলিকে মুখ্যমন্ত্রী আপাতত ছাড় দিতে চান।

এই ভাবনাটিও কিন্তু ঠিক নয়। সংকটের পূর্বাভাস পেয়ে এখন সতর্ক হওয়ার সময়। করোনার তৃতীয় ঢেউ মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপটি আর অপেক্ষা না করে মুখ্যমন্ত্রী অবিলম্বে নিন। পশ্চিমবঙ্গবাসীর স্বাস্থ্যটি সুরক্ষিত করুন তিনি।

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত।)

You might also like