Latest News

আমাদের ছোটোবেলার সুপারহিরো, বড়বেলার শিক্ষক- নারায়ণ দেবনাথ

চিরঞ্জিৎ সামন্ত 

ছেলেটা হাঁ করে তাকিয়ে থাকত বইগুলোর দিকে। স্কুল থেকে ফেরার পথেই রেলব্রিজ। তাতে ওঠার মুখ লাগোয়া ছোট্ট একটা দোকান। নানারকম পত্রপত্রিকা। কমিকস। অরণ্যদেব, চাচা চৌধুরী। আর ওই ঈষৎ পাতলা ফিনফিনে মলাটের বইগুলো। হাঁদা হাসিমুখে ল্যাম্পপোস্ট ধরে উঠে পড়েছে। আর ভোঁদা প্রাণপণে দৌড়চ্ছে। পেছনে তাড়া করেছে খ্যাপা ষাঁড়। অথবা বিশাল বুকের ছাতি বিছিয়ে বীরদর্পে এগিয়ে চলেছে বাঁটুল। তার ইস্পাত কঠিন বক্ষদেশ বিদীর্ণ করতে অক্ষম হয়ে ফিরে আসছে পিস্তলের গুলি। হাঁদা-ভোঁদার বইয়ের ব্যাক-কভারে বাঁটুলের বইয়ের বিজ্ঞাপন আর বাঁটুলের বইয়ের পিছনে হাঁদা-ভোঁদা। মূল্য যতদূর মনে পড়ে ৪.৫০ টাকা বা ৫.৫০ টাকা। নয়ের দশকের গোড়ার দিক। কার্টুন নেটওয়ার্ক ছিল না সেই প্রজন্মের কাছে। ছবি আর তার সঙ্গের লেখা মিলেমিশে যে এমন একটা জগৎ তৈরি হতে পারে তার একমাত্র দিশারি ছিল ওই কমিকসের বইগুলো।
হাঁদা-ভোঁদা, বাঁটুল বা নন্টে-ফন্টে আমাদের কৈশোরকে আগলে রেখেছিল অনেকখানি। কাছকাছি বয়সের প্রায় সকলেরই। একই স্বীকারোক্তিতে আরও বেশি করে কাছাকাছি এসে পরস্পরের স্মৃতিটুকু ভাগ করে বন্ধু হয়ে উঠি প্রতিদিন। গল্প গড়াতেই থাকে। নিজের নিজের গল্প বলতে গিয়ে সবার গল্প আলাদা হয়েও যেন কিছুটা একরকম উঠতে চায়।আমার গল্পটুকু বা ভাবনাটুকু যদি ভাগ করি তাহলে সবার আগে মনে পড়ে একটি নাম। যা ওই বইগুলোর তলায় লেখা থাকত। নারায়ণ দেবনাথ। খুব ছোটবেলা থেকেই ছবি নিয়ে আমার তুমুল আগ্রহ। আঁকতে ভালোবাসি খুব। সেই সময় যা দেখি আঁকতে ইচ্ছে করে। বইয়ের পাতায় পাতায় লেখার থেকে বেশি আগ্রহ নিয়ে ছবিগুলোই দেখি। লেখার শেষে খুঁজে বের করি কোন শিল্পী এঁকেছেন সেই ছবি। এইভাবেই সেই সময়ের অলংকরণ শিল্পীদের সঙ্গে আমার প্রাথমিক পরিচয়। একটু পরে আঁকার ধরন দেখেই চিনতে পারতাম তাঁদের ছবি। নাম আর পড়তে হত না। এর মধ্যে একটা মজা পেতাম। অনেকেই হয়ত পেয়েছেন, আমার মতো যারা ছবি ভালোবাসেন।
ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে মাঝেমধ্যে হাঁদা-ভোঁদা বা বাঁটুলের বই হাতে আসত। পড়ার আনন্দ ও মজার কথা বাদই দিলাম, তারপরেও খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মন দিয়ে দেখতাম ছবিগুলো। তখন একটু বড় হয়েছি। অবাক হওয়ার পালা আর থামে না। কমিক্সের প্যানেল, টেক্সট বাবল এই ব্যাপারগুলো না জানলেও চমকে যেতাম ছবিগুলো দেখে। যতই দেখতাম নেপথ্যের মানুষটির কথা মনে হত। নারায়ণ দেবনাথ। কে ইনি! কে এই শিল্পী!  যিনি নির্মাণ করে চলেছেন এই আশ্চর্য বইগুলি।
হাঁদা ভোঁদা আর নন্টে-ফন্টে সাদাকালো। অন্যদিকে বাঁটুলের বই-এ আরও একটা গোলাপি বা কমলা ঘেঁষা রঙের ব্যবহার। কী অসামান্য সুন্দর কম্পোজিশন! এবং ডিটেলিং দেখেও চক্ষু চড়কগাছ! এমন নিখুঁত লাইন এবং লাইনকে সরুমোটা করে একটি ভল্যুম দেওয়া, যে তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। কী ভয়ানক ভালো হিউম্যান অ্যানাটমি জানতেন মানুষটি এবং জানতেন বলেই অদ্ভুত দক্ষতায় কিছুটা কমিক্যাল ডিস্টরশান করতেন। হাতের আঙুল, পায়ের আঙুলের কঠিনতর ড্রইং সবটাই তাঁর নখদর্পণে।ছোটবয়সের দেখা ছিল একরকম মুগ্ধতার দেখা। এবং মাঝেমধ্যেই কাগজে, ডায়রিতে, সেসব অনুকরণের চেষ্টা। যার ফলাফল তুমুল ব্যর্থতা। তারপর ওই বইগুলির প্রতি আর তার সঙ্গে নারায়ণবাবুর প্রতি বিস্ময় আরও বেড়ে যাওয়া। এমনিতেই কমিকস ব্যাপারটা বেশ কঠিন ও সাংঘাতিক পরিশ্রমের কাজ। সঙ্গে লাগে তুমুল দক্ষতা। তারপর যেসব কমিকস শিল্পী নিজেরাই লেখেন তাঁরা একইসাথে গল্পকার ও চিত্রনাট্যকার। বলা যায়, অনেকটা সিনেমা তৈরির মত। যেখানে পরিচালকই সব। অভিনেতাদের তিনিই নির্মাণ করছেন, অভিনয় করাচ্ছেন এবং ক্যামেরা ধরার দায়িত্বটিও তাঁর। নারায়ণ দেবনাথ এই কাজটি দশকের পর দশক ধরে করে গেছেন। এমন একটি ভাষায়, যে ভাষায় কমিক্স নিয়ে চর্চা খুব কম হয়েছে। এমন একটি সময় যখন ফটোশপ ছিল না, সম্পূর্ণটাই স্বহস্তে করতে হত। একটা ভুল লাইন দিলেও ব্যাকস্পেস দিয়ে মুছে ফেলার সুযোগ ছিল না।এখন যে কোনও ছবির রেফারেন্স চাইলেই আমরা টুক করে গুগল করে দিই, আর সেই বিষয়ে প্রায় খান দশেক ছবি চলে আসে ল্যাপটপে। তখন কিন্তু সে সুযোগও ছিল না। গুটিকয়েক বিদেশি বই, ফোটোগ্রাফ ইত্যাদিকে সম্বল করে সেই প্রজন্মের শিল্পীরা কাজ শিখেছেন। পরম নিষ্ঠায় ও সততায়। এবং আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, আমরা এত সুযোগ সুবিধা পেয়েও তাঁদের ধারেকাছে পৌঁছতে পারিনি। কমিক্স করার জন্য সমস্ত কিছুর ড্রইং জানতে হয়। মোটেও সহজ নয় কাজটি। তা শিল্পীমাত্রই হাড়ে হাড়ে জানি। কী সাংঘাতিক ভালো অ্যানিমেল ড্রইং করেছেন নারায়ণবাবু। তাঁর স্ট্রিপে উটপাখি, ভাল্লুক, শকুন, ষাঁড়, ছাগল সবকিছুই নিখুঁতভাবে বর্তমান। কেবলমাত্র লাইন ড্রইং-এ। আবারও বলছি একথা, কারণ লাইন ড্রইং-এ কোনও ফাঁকির জায়গা থাকে না। আবার একই সঙ্গে এসেছে নির্ভুল আর্কিটেকচারে বাড়িঘর, রেলগাড়ি, স্পিডবোট, জাহাজ সবকিছু। সবকিছুর ড্রইং যেন তাঁর হাতের মুঠোয়। ম্যাজিশিয়ান বলব না, অমানুষিক পরিশ্রম ও নিষ্ঠার ফলেই এই অসাধ্যসাধন সম্ভব। আরও বেশি করে বলব, কারণ বিদেশি কমিক্সগুলোতে একরকম রিয়েলিস্টিক ছবি আমরা দেখে এসেছি। ইন্দ্রজাল কমিকসের কিছু কাজও বেশ ভালো। নারায়ণবাবু নিজেও কিছু রিয়েলিস্টিক রঙিন সিরিয়াস কমিকস সফলভাবেই করেছেন। কিন্তু আরও কিছু জনপ্রিয় কমিক্স যেমন চাচা চৌধুরীর কমিকসের ড্রইং, রঙিন হয়েও নারায়ণবাবুর ড্রইং-এর তুলনায় নিতান্তই ফিকে।বাংলা কমিকসের ড্রইংকে এক আন্তর্জাতিক উচ্চতায় নিয়ে গেছিলেন নারায়ণ দেবনাথ। তাঁর স্পিচ বাবলগুলোও তিনি নিজের হাতে লিখতেন। অসামান্য হস্তাক্ষরে। এই স্পেস ম্যানেজমেন্ট ও কম্পোজিশন সেন্স দেখে অবাক হতে হয়। টিনটিনের কমিকসের জন্য গোটা একটা টিম ছিল। অ্যাসটেরিক্স লিখতেন গোসিনি আর আঁকতেন ইউদেরজা। কিন্তু আমাদের নারায়ণ দেবনাথ ওয়ান ম্যান আর্মি। তাঁকে তো সুপার হিরো না বলে উপায় নেই!
এই যে একের পর এক কমিকস একা হাতে নির্মাণ করে গেছেন তিনি, বাঁটুল, হাঁদা-ভোঁদা, নন্টে ফন্টে ছাড়াও আরও বেশ কিছু চরিত্রদের নিয়ে, এটিই তাঁর একজীবনের পক্ষে যথেষ্ট অধিক হতে পারত। কিন্তু দানবিক প্রতিভার অধিকারী ছিলেন এই প্রবাদপ্রতিম মানুষটি। তাঁকে শুধু কমিকস শিল্পী হিসেবে চিহ্নিত করলে ভয়ানক ভুল হয়ে যাবে। এই সব কিছুর সমান্তরালেই, শুরু থেকে তিনি একজন চূড়ান্ত দক্ষ ইলাস্ট্রেটর ও প্রচ্ছদ শিল্পী। যে পরিমাণ বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন সেই সংখ্যাটিও বিপুল। তাঁর প্রচ্ছদের কাজ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রিয়েলিস্টিক ও রঙিন। বিদেশি ক্লাসিকস-এর অনুবাদ বইগুলিতে তাঁর করা প্রচ্ছদ চোখে লেগে থাকে। যে প্রচ্ছদগুলোর নীচে থাকত তাঁর অননুকরণীয় সাক্ষর। একটু বড় বয়সে যেগুলো আরও বেশি করে খুঁজে দেখেছি আর অবাক হয়েছি এই ভেবে যে, এই মানুষটি এতকিছু পারতেন কীভাবে! কৈশোরেই মুগ্ধ হয়েছি ওঁর করা টারজানের ইলাস্ট্রেশন দেখে। অনেক শীর্ষচিত্রের নামাঙ্কনও ওঁর নিজের করা। সেগুলিও দেখবার মত। কমিকস শিল্পী হিসেবে তাঁর জুড়ি নেই ঠিকই, কিন্তু নারায়ণ দেবনাথ ছিলেন একজন টোটাল আর্টিস্ট। শুধু ছোটোবেলার নয়, আমাদের বড়বেলারও আইকন। শিক্ষাগুরু।মনে পড়ে প্রথম যেদিন কয়েকজন বন্ধু মিলে ওঁর বাড়ি যাই আমাদের সুপারহিরোকে সামনাসামনি দেখবার জন্য, উনি ভালোবেসে আমার স্কেচবুকে নিজে হাতে বাঁটুলের ছবি এঁকে দিয়েছিলেন। এভাবেই উনি ছোটোদের কাছে টেনে নিয়ে আপন করে নিতে পারতেন এক লহমায়। সে এক স্মরণীয় দিন, স্মরণীয় মুহূর্ত। সে কথা পরে লিখব কখনও।
আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমরা কোনওদিন আমাদের রাজ্যের যোগ্য শিল্পীদের নিয়ে মাথা ঘামাইনি। ঘামাতে চাইনি। তবুও প্রায় শেষ বয়সে এসে নারায়ণবাবু কিছু স্বীকৃতি পেলেন। রাজ্য সরকার ও রাষ্ট্রের তরফ থেকে। এই আমাদের আনন্দ। তবে এই পুরস্কারটুকু দিয়ে তো নারায়ণ দেবনাথকে মাপা যায় না। তার কাজ একটা প্রজন্মের কৈশোরকে গড়ে দিয়েছে। আরেকটা কথা বলতেই হয়। তাঁর সুদীর্ঘ শিল্পীজীবনের বিপুল সংখ্যক কাজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে ছিল। সেসব পরম ভালোবাসায় একত্রিত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন যে মানুষটি তিনি আমাদের শান্তনুদা। শ্রী শান্তনু ঘোষ। তাঁর এই উদ্যোগটির জন্য তাঁকে অসংখ্য সাধুবাদ জানাই বারেবারে, কারণ এই কাজটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল আগামীর জন্য।
 পরিশেষে দু একটা কথা বলতে ইচ্ছে হয়। নারায়ণ দেবনাথ একটা জগৎ তৈরি করেছিলেন। তাঁর নিজস্ব জগৎ। একটা নস্টালজিয়া। তাঁর একটা নিজস্ব স্বাদ আছে। গন্ধ আছে। ওই গোলাপি স্যান্ডোর বাঁটুলের গায়ে কোনও রং ছিল না। হাঁদা ভোঁদা পুরোটাই সাদাকালোয়। রঙের প্র‍য়োজন পড়েনি তাতে। অথচ খামতির লেশমাত্র ছিলনা। রং ছিল আমাদের চোখে। মাথায়। নারায়ণবাবু সেই রং আমাদের তৈরি করতে শেখাতে পেরেছিলেন। ইদানীং ওঁর অনেক কমিকসে হয়ত কোনও অজ্ঞাত বাণিজ্যিক স্বার্থে অতি কুৎসিত বর্ণপ্রয়োগ দেখি কিছু প্রকাশনার তরফ থেকে। যেটি ওঁর করা নয়। জানিনা এর সঠিক কারণ। এতে মূল আর্টওয়ার্কের শিল্পগুণ তো নষ্ট হয়ই, তাছাড়া আমরা পরবর্তী প্রজন্মকে এভাবে দেখাবই বা কেন এই কাজগুলো। বাঁটুল ও অন্যান্য চরিত্রগুলো নিয়ে যে অ্যানিমেশন সিরিজ হয়েছে সেগুলোও খুব উচ্চমানের নয়। কাহিনি ও চিত্রকল্পের অনাবশ্যক অতিরঞ্জন। ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এগুলোর প্রয়োজন নেই। এতে মূল চরিত্র ও গ্রাফিক্সের মেজাজ ও দর্শনটি নষ্ট হয়।যেমন মনে হয় টিনটিনের থ্রিডি সিনেমা যতই কারিগরি নৈপুণ্যে সাংঘাতিক হোক না কেন, তা হার্জের স্ট্রিপের মূল রস থেকে অনেকখানি বঞ্চিত। একইভাবে বাঁটুল, হাঁদা ভোঁদারাও দ্বিমাত্রিক দৃশ্যরসে পরিপূর্ণ। মোনোকালার বা বাইকালারেই এদের আবহমান ভিস্যুয়ালস্কেপ। পরবর্তীকালে যদি নারায়ণবাবুর মতো শিল্পীর কাজ নিয়ে নতুন পরীক্ষানিরীক্ষা করতেই হয়, তার আগে যেন আমরা দশবার ভাবি যে সেটা কতখানি রুচিসম্মত হচ্ছে।

 

লেখক পেশায় চিকিৎসক, নেশায় চিত্রশিল্পী, কার্টুন দলের সদস্য
You might also like