Latest News

সুব্রতদা মুখ্যমন্ত্রী হলে কেমন দেখতে হতো বাংলা, অজানাই থেকে গেল

অমল সরকার

নেতা নেত্রীদের দাদা দিদি সম্বোধন করা আমার কোনও কালেই পছন্দ নয়। কিন্তু সুব্রত মুখোপাধ্যায়কে (Subrata Mukhopadhyay) সুব্রত দা বলে সম্বোধন করতাম। এছাড়া উপায় ছিল না। কারণ, সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের বলতে গেলে ডাকনাম ছিল সুব্রতদা।

হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবরটা শুনে সেদিন মন খারাপ হল, খানিক অবাকও হলাম। কারণ তার কয়েকদিন আগে ফোনে কথা হল। সুব্রতদা নিজেই ফোন ধরতেন। এখনকার কম বয়সি মন্ত্রী, নেতাদের মত পুলিশ কিংবা অফিসারদের দিয়ে ফোন ধরাতেন না। সাংবাদিকদের বয়স, প্রতিষ্ঠানের নাম পরিচিতি নিয়ে ভাবতেন না।

সুব্রতদা এবছর পরিষদীয় রাজনীতিতে হাফ সেঞ্চুরি করেছেন। ১৯৭১ সালে রাজ্য বিধানসভায় প্রবেশ করেছিলেন সর্বকনিষ্ঠ বিধায়ক হিসেবে। সে বছরই সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের মন্ত্রিসভায় স্বরাষ্ট্র এবং তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের রাষ্ট্রমন্ত্রী হন। তাঁর রাজনীতির এই ৫০ বছর নিয়েই দ্য ওয়ালের সঙ্গে খোলামেলা আড্ডা দেবেন, এমনটাই কথা হল সেদিন। বললেন, দিন চার পাঁচ পরে ফোন করো।

সেই ফোন করার আগেই সুব্রতদা হাসপাতালে ভর্তি হন। বৃহস্পতিবার চলেই গেলেন।

তাঁর রাজনীতির ৫০ বছর নিয়ে বর্ষীয়ান এই নেতার খানিক আক্ষেপ-অনুশোচনা ছিল বিষয়টি তেমন আলোচনায় না আসায়। এ বছর বিধানসভা ভোটের মুখে বালিগঞ্জের তৃণমূল প্রার্থী সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বেশ কয়েক ঘণ্টা ঘোরাঘুরি, গল্পআড্ডা দেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। দুপুরে একডালিয়া এভারগ্রিনের অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ কথা হয় আমাদের। কথায় কথায় বললেন, জানো তো, পুরনো সাংবাদিকরা একে একে বসে যাওয়ায় আমার মতো প্রবীণ লোকেদের খানিক সমস্যা হচ্ছে। বললেন, ভোট নিয়ে প্রায় দু’ডজন সাংবাদিককে ইন্টারভিউ দিলাম। দু’একজন ছাড়া কেউই জানে না এবছর পরিষদীয় রাজনীতিতে আমি পঞ্চাশে পা দিলাম।

সেদিন কথায় কথায় সুব্রতদাকে আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আপনি দশ বছর রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অধীনে কাজ করছেন। আপনি কলকাতার সফল মেয়র। আপনি তো মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতাধারী নেতা। মুখ্যমন্ত্রী হতে না পারায় আপনার কোনও অনুশোচনা হয় না? সুব্রতদা বললেন, আমি যদি আজ কংগ্রেসে থাকতাম, তাহলে অবশ্যই মুখ্যমন্ত্রী পদের জন্য লড়াই করতাম। কিন্তু আমার আদি পার্টিটা বাংলাতে প্রায় উঠেই গেছে। আর মমতার অধীনে কাজ করতে কোনও সমস্যা হওয়ারই কথা নয়। কারণ মমতা দল গড়েছে, দলকে ক্ষমতায় এনেছে। এ দলে মমতাই শেষ কথা। এটা মনে রেখেই তৃণমূলে কাজ করতে হয়।

প্রসঙ্গক্রমে এমন কথাও উঠল, ভোটের পর বিজেপি যদি তৃণমূলকে ভাঙাতে আপনাকে মুখ্যমন্ত্রী করার প্রস্তাব দেয়, তাহলে কি রাজি হবেন? সুব্রতদা হাসতে হাসতে বললেন, ওদের কালচারের সঙ্গে আমি মানিয়ে নিতে পারব না। ওদের তো সবই দিল্লি। দিল্লির নেতাদের এমন দাপট আমি কংগ্রেসেও দেখিনি।

সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ হল না। হলে, পশ্চিমবঙ্গের চেহারা কেমন হত সেটা কিন্তু রীতিমতো আলোচনা, গবেষণার বিষয় হতে পারে। আজ যে ঝকমকে কলকাতা আমরা দেখছি, মহানগরীর সেই রূপ বদলের নায়ক বৃহস্পতিবার রাতে চলে গেলেন। ২০০০ থেকে ২০০৫ এই পাঁচ বছরে কলকাতার নতুন কলকাতা হয়ে ওঠার যাত্রা শুরু হয়েছিল। কংগ্রেসে সুব্রত মুখোপাধ্যায় পরিষদীয় রাজনীতির পাশাপাশি শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দীর্ঘদিন ছিলেন আইএনটিইউসি-র রাজ্য সভাপতি। সেই সুবাদে তিনি ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের সম্মেলনে যোগদানের সূত্রে পৃথিবীর সব আধুনিক শহর দেখেছেন। ফলে আধুনিক শহর সম্পর্কে তাঁর একটা স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়েছিল। তারই প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল মেয়র হিসেবে তার পাঁচ বছরের কাজকর্মে। শুধু কলকাতার পানীয় জলের সমস্যা, জঞ্জাল পরিষ্কার, জল নিকাশি ব্যবস্থা গড়ে তোলা কিংবা ভাঙা রাস্তা সারাইয়ের মতন উন্নয়নের কাজই নয়, কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ক কালচার তিনি বদলে দিয়েছিলেন। তাঁর সময়তেই ‘আসি-যাই-মাইনে পাই’ সংস্কৃতির অবসান ঘটে পুরসভায়।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম মন্ত্রিসভায় তিনি পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতরেরও মন্ত্রী ছিলেন। কেন তাকে জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতর থেকে পরবর্তীকালে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল তা গভীর রহস্যাবৃত। কিন্তু মন্ত্রী হিসেবে রাজ্যের হাজার হাজার গ্রামে তিনি বিশুদ্ধ পানীয় জল পৌঁছে দিয়েছিলেন। সুব্রতদার এই কৃতিত্বের পেছনে ছিল দুটি গুণ। এক, তিনি কাজের মানুষ চিনে নিতে পারতেন। দক্ষ অফিসারদের বসাতেন উপযুক্ত কাজে। কিন্তু বড় ধরনের গোলমাল না হলে তাঁদের কাজকর্মে কখনও হস্তক্ষেপ করতেন না।
তাঁর এই উদার মানসিকতা রাজনীতিতেও তাঁর পরিচিতি প্রভাবের বিরাট ব্যপ্তি ঘটিয়েছিল। সদা হাস্যময় বর্ণময় চরিত্র ছিলেন। সবসময় স্ফূর্তিতে থাকতেন। আমার তাই মাঝে মাঝে মনে হত সুব্রতদা হলেন একমাত্র বাঙালি যাঁর পেটে আমাশা বাসা বাঁধতে পারেনি। নইলে এমন প্রাণশক্তি কোথা থেকে পান মানুষটা। তিনি সকলের সঙ্গে মিশতে পারতেন। সব দলের সঙ্গেই ছিল দারুণ সম্পর্ক। ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে ছেলের মত ভালোবাসতেন। আবার পদে পদে বিপাকে ফেলা সত্বেও জ্যোতি বসুরও স্নেহধন্য ছিলেন।

গত শতকের ষাট-সত্তরের দশকে বঙ্গ রাজনীতিতে প্রিয়-সুব্রত জুটির নাম লোকের মুখে মুখে ঘুরত। ছাত্র পরিষদের দুই নেতা সুব্রত মুখোপাধ্যায় ও প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সিকে রীতিমতো সমীহ করে চলতেনন বিমান বসু, অনিল বিশ্বাস, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, শ্যামল চক্রবর্তী, সুভাষ চক্রবর্তীদের মতো বাম ছাত্র-যুব নেতারা। সেইসব রক্তঝরা আন্দোলনের দিনেও ব্যক্তিগত সম্পর্ক রক্ষায় সুব্রত মুখোপাধ্যায় ছিলেন মডেল।

আরও পড়ুন: ‘চিত্ত যেথা ভয় শূন্য…’ ছাপতে না দিয়ে বাড়াবাড়ি করেছিলাম

আগেই বলেছি, জরুরি অবস্থার সময়ে তিনি ছিলেন সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের মন্ত্রিসভার তথ্য-সংস্কৃতি এবং পুলিশ মন্ত্রী। পুলিশ তখন ব্যাপক ধরপাকড় চালাচ্ছে। সেইসব দিনেও মন্ত্রী সুব্রত ঘনিষ্ঠ বামপন্থী বন্ধুদের পুলিশের থাবা থেকে রক্ষা করেছেন। তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী হিসেবে খবরের কাগজে কী ছাপা হবে আর কী ছাপা হবে না, সে সিদ্ধান্ত তাঁকে নিতে হত। ‘চিত্ত যেথা ভয় শূন্য….’ রবি ঠাকুরের কবিতার এই লাইন তিনি তখন ছাপতে দেননি। এজন্য নানা সময়ে অনুশোচনা অনুতাপ করেছেন, ভুল স্বীকার করেছেন, ক্ষমা চেয়েছেন। এ বছর ২৬ জুন জরুরি অবস্থার বর্ষপূর্তিতে ‘দ্য ওয়াল ‘- এ কলম ধরেছিলেন। সে লেখাতেও ছিল জরুরি অবস্থার দিনগুলিতে নিজের কিছু সিদ্ধান্তের জন্যে অনুশোচনা, ক্ষমাপ্রার্থনা।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকাসুখপাঠ

You might also like