Latest News

ভোলানোর ছল আর না-ভোলা মানবাধিকার

অনিকেত গুপ্ত

ডিসেম্বরের ১০। আমাদের সরকারি বা অ-সরকারি কোনও ক্যালেন্ডারেই এ দিনটিকে আলাদা করে চিহ্নিত করা থাকে না। কেন চিহ্নিত করা প্রয়োজন, তার আলোচনা জন-পরিসরেও হয় না। ১০ ডিসেম্বরের তাৎপর্য কী— আচমকা এ প্রশ্নে একশোর মধ্যে নিরানব্বই জনেরই জবাব হয়তো বিশেষ আশাপ্রদ হবে না। অথচ দিনটি নিয়ে বিস্তর আলোচনার নিশ্চিতই প্রয়োজন ছিল। ৭৩ বছর আগে এ দিনেই যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ক্লান্ত-বিধ্বস্ত পৃথিবী শুনেছিল এক পরম আশ্বাসের ঘোষণা, ভয় ও দারিদ্রমুক্ত গ্রহের স্বপ্ন আঁকা হয়েছিল সুবৃহৎ ক্যানভ্যাসে।

রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ গৃহীত হয়েছিল বিশ্ববাসীর প্রতি রাষ্ট্রগুলির সাধারণ অঙ্গীকার হিসাবে। যে অঙ্গীকার বুভুক্ষার বিপ্রতীপে খাদ্য নিরাপত্তার, উচ্ছেদের বদলে আশ্রয়ের, অশিক্ষার আঁধার থেকে শিক্ষার আলোয় ফেরার, সম্মানের সঙ্গে জীবিকা-অর্জনের, সুস্বাস্থ্যের। অঙ্গীকার সুবিচারের, লাঞ্ছনা-নিগ্রহ অবসানের। অঙ্গীকার সমতা, শান্তি, সহিষ্ণুতা, সহাবস্থানের। প্রতিটি মানুষের পূর্ণ মানবিক মর্যাদার। জন্মগত ভাবে প্রতিটি মানুষ স্বাধীন ও সমান (ফ্রি অ্যান্ড ইক্যুয়াল)—তাবড় রাষ্ট্রনেতাকে মানতে হয়েছিল বিশ্বমঞ্চের ইস্তেহার।

সাত দশক পেরিয়ে লক্ষ্যের কাছে পৌঁছোনোর বদলে প্রতিসরণ যত সুদূরবর্তী হয়েছে, ততই যেন তীব্র হয়েছে ১০ ডিসেম্বরকে ভুলিয়ে দেওয়ার খেলাও। আর তাই যে জনগণমনের জন্যে দিবস, তাদের কাছেই কেমন অচেনা থেকে গিয়েছে, এককালে চেনা-শোনা থাকলেও ক্রমে বিবর্ণ হয়ে গিয়েছে ডিসেম্বরের ১০। বিশ্বকবির বাংলাতেও সেই বিশ্ববীণা আর বাজে কই!

এ বারের কথাই ধরা যাক। রাজ্য মানবাধিকার কমিশন পর্যন্ত দিনটা বেমালুম অন্তরালে ঠেলে দিয়েছে। ন্যূনতম আনুষ্ঠানিকতারও ধার ধারছে না তারা। গত বছরের পর এ বারও মানবাধিকার দিবসে কোনও কর্মসূচি নেই খোদ মানবাধিকার কমিশনের! অনুষ্ঠান বড় কথা নয়, এমন একটা কমিশন যে এ রাজ্যে আছে, সেটাই তো ভোলার উপক্রম হয়েছে। গত বেশ কিছু বছরে প্রতিষ্ঠানটির ক্রমে ‘হিজ মাস্টার্স (বা মিস্ট্রেস’) ভয়েস’ হয়ে ওঠার করুণ কর্ম-প্রয়াসে।

এমনিতেও কমিশন মানে সুপারিশ করতে পারে, মানা বা না-মানা অনেকাংশেই সরকারের মর্জি। তবে এককালে ধারে-ভারে জন-পরিসরে এ কমিশনের খানিক গুরুত্ব যখন তৈরি হয়েছিল, তখন সরকারকে বহু ক্ষেত্রে ঢোঁক গিলতে হয়েছে। ১৯৯৫ থেকে পরবর্তী পাঁচ-ছ’বছরে কমিশনের বার্ষিক রিপোর্ট খতিয়ে দেখলে সেটা কিছুটা উপলব্ধি করা যায়। কমিশনের নিজস্ব তদন্ত, রিপোর্টে বারবার অস্বস্তিতে পড়েছে সরকারপক্ষ। সুপারিশ যদি সরকার না-ও মানে, কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনেক সময়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার মানুষকে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার নৈতিক শক্তি জুগিয়েছে। যা-খুশি করে শক্তিশালীর পার পাওয়ার দিন শেষ— এমন ভরসা দিয়েছে আর্তজনকে।

সে-সবই আজ অতীত। সর্বশেষ রাজ্য কমিশনের যে সুপারিশটি জনস্মৃতিতে থেকে গিয়ে থাকতে পারে, সেটিও প্রায় দশক-পুরনো। অম্বিকেশ মহাপাত্রদের লাঞ্ছনায় তাঁদের ক্ষতিপূরণ দিতে রাজ্যকে বলেছিল কমিশন। রাজ্য আজও মানেনি। সে অন্য প্রসঙ্গ, কিন্তু সামান্য কৌতুকে নাগরিকের নিগ্রহে প্রবল ক্ষমতাশালীকেও ধমকের যে দরকার হয়, কমিশন সেই শেষবার সম্ভবত তা বুঝিয়ে অস্তিত্বের জানান দিয়েছিল। তার পর থেকে কমিশন কখনও সরকারকে নিরীহতম তিরস্কারের ঝুঁকিও নেয়নি।

সেই কবে থেকে রাজ্য পুলিশের এক অবসৃত কর্তা কমিশন আলো করে রয়েছেন,অথচ মানবাধিকার হরণে পুলিশের বদনামই সরকারি বিভাগগুলির মধ্যে সর্বাধিক। সব নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এক সময়ে তাঁকেই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সনও করে দিয়েছিল রাজ্য সরকার! পরে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি চেয়ারপার্সন হলেও নারদে কলঙ্কিত লিডারের সঙ্গে একদা একই মঞ্চে সংবর্ধিত হওয়ার কালি মোছার কোনও চেষ্টা দেখা যায়নি। মাঝে সুপ্রিম কোর্টের যে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি একটু সক্রিয়তা দেখিয়েছিলেন, তাঁকে সরতে হয়েছিল ভিন্নতর কেলেঙ্কারির জালে ফেঁসে।

কথা হল, কমিশন সক্রিয় থাকলেই যে মানবাধিকার পূর্ণ সুরক্ষিত হবে— এমন গ্যারান্টি নেই। কিন্তু সুরাহার সন্ধানে সাধারণের গিয়ে দাঁড়ানোর মতো একটা উঠোনও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এমনই সুকৌশলে সেই প্রতিষ্ঠানকে অন্তরালবর্তী, অপ্রাসঙ্গিক করা হয়েছে যে, সে প্রতিষ্ঠান কেন মানবাধিকার দিবসে কর্মসূচি নিচ্ছে না, এ প্রশ্ন তোলারও লোকজন মিলছে না!

মানবাধিকার কমিশনের এ হাল যে রাজ্যে, সেখানে মানবাধিকারের নিরন্তর লুণ্ঠনই যে ট্রেড মার্ক, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কমিশন এখানে ভাতের হাঁড়ির একটি চাল, যা টিপলেই হাঁড়ির হাল ধরা পড়ে। ১৯৯৩-এর মানবাধিকার আইন জেলায়-জেলায় মানবাধিকার আদালতের কথাও বলেছিল। তিন দশক পরেও কোন জেলায় এমন আদালত চলছে, কেউ জানে না! অথচ এমন ব্যবস্থায় ন্যায়বিচারের দাবি পেশে মানুষ নিজের জেলায় ফোরাম পেতেন। সুরাহার আশা পেতেন। কিন্তু সাধারণকে কৃপাপ্রার্থী করে রাখা, বশে রাখার বন্দোবস্তে নাগরিকের ক্ষমতায়ন যে ক্ষমতাকেন্দ্রেই কামান দাগে! অতএব, নন্দন-বিলাসী একদা মুখ্যমন্ত্রী যেমন ‘ও সব মানবাধিকার-টানবাধিকার বুঝে নেব’ বলে পার পেয়েছেন, এখন পরিবর্তনের রাজে মানবাধিকার প্রসঙ্গটাই সরকারি লব্জে উধাও!বড় ধরনের গোলমেলে কিছু ঘটলে অর্থ ছড়ানোর বিকল্প ব্যবস্থা হয়েছে। অমুক ক্ষেত্রে এত ক্ষতিপূরণ, তমুকে তত— ক্ষমতার অলিন্দ থেকে ঠিকরে আসে উত্তমর্ণের কৃপা বিলোনো দেমাক। কিন্তু অর্জিত অধিকার আদায়ে প্রাণান্ত হয়ে যায় নাগরিকের। ভিক্টিম কমপেনসেশন স্কিমের কথাই ধরা যাক। ২০০৯-এ ফৌজদারি কার্যবিধিতে উপধারা সংযোজনের পরে ২০১২-য় এ রাজ্যেও স্কিম তৈরি হয়, ২০১৭-য় পরিমার্জিতও হয়। উদ্দেশ্য, খুন-ধর্ষণ-পাচার-অ্যাসিড হামলার মতো অপরাধের শিকার মানুষকে ন্যায়বিচারের গ্যারান্টি দেওয়ার সঙ্গেই তাঁর ক্ষতের আংশিক নিরাময়ে সরকারি তরফে ক্ষতিপূরণ প্রদান, পুনর্বাসনের সংস্থান। সরকার যেহেতু নাগরিকের নিরাপত্তার দায়িত্বে, নিরাপত্তাহানিতে এ ভাবে সরকারের দায়বদ্ধ করাও লক্ষ্য।

কিন্তু এটা যেহেতু ঠিক কৃপা-বর্ষণের চাঁদমারি নয়, বরং আইন-স্বীকৃত অধিকার-অনুশীলন, তাই এই খাতে সরকারের অর্থ বরাদ্দে বড়ই কার্পণ্য। বহু সংখ্যক প্রাপক তাঁদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হয়ে চলেছেন বছরের পর বছর। এই খাতে বকেয়া অর্থের দাবি জানাতে জানাতে ক্লান্ত নোডাল এজেন্সি, স্টেট লিগাল সার্ভিসেস অথরিটিও। এ ক্ষেত্রে রাজকোষে নাকি বড়ই টানাটানি, কিন্তু ক্লাবে অনুগ্রহ বিতরণে এবং আনুগত্য কিনতে ভাঁড়ার উপচে পড়ে!

জেলখানায় অস্বাভাবিক মৃত্যুতে আদালত নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ থেকেও বঞ্চিত হতে হচ্ছে বহু পরিবারকে। ধারণক্ষমতার চেয়ে ঢের বেশি বন্দিকে প্রাণান্তকর পরিস্থিতিতে রাখা হয় বাংলার জেলে, উল্টে আলিপুরের সুপ্রশস্ত, হেরিটেজ সংশোধনাগার রিয়েল এস্টেট বেওসার প্রাইম লোকেশন হয়ে যায়! অপরাধ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গেই অপরাধের দ্রুত বিচারের পরিকাঠামো তৈরিও সরকারের দায়িত্ব, তার বেলাতেও ফাঁকির ফর্দই বেড়ে চলে শুধু। বিচারকের অভাবে মামলা তামাদি হতে বসে, লড়াইয়ের শক্তি খুইয়ে ঋজু বিচার-প্রার্থীও এক সময়ে নতজানু হন।

প্রতিস্পর্ধী মতামতকে শত্রু দাগিয়ে চলে দেশদ্রোহ, ইউএপিএ’র নাগপাশে বন্দি করার খেলা। রাজনৈতিক বন্দির সংজ্ঞা বদলে ফেলা হয় ক্ষমতার অহঙ্কারে। কারা-কুঠুরি, পুলিশ লক-আপ হয়ে ওঠে হত্যাপুরী। সংসদে পেশ হওয়া হিসাব, ২০১৯-এর এপ্রিল থেকে ২০২০-র মার্চ অবধি এ রাজ্যে হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ১২২ জনের। এমন মৃত্যু চলছে ধারাবাহিক ভাবেই। মানবাধিকার দিবসের আগের দিন, ৯ ডিসেম্বরও উলুবেড়িয়া উপসংশোধনাগারে অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে বিচারাধীন এক বন্দির।

রাজ্যের ৬০টি জেলখানায় পূর্ণ সময়ের চিকিৎসকের পদই মাত্র ২৯টি। তার ২৫টিই ফাঁকা যেখানে বহু বছর ধরে, সেখানে জেল-যাত্রা অকালমৃত্যুর তালিকাই অবধারিত দীর্ঘতর করে তোলে। জেলে ওয়ার্ডার-ফার্মাসিস্ট-ওয়েলফেয়ার অফিসার মিলিয়ে ১৩০০-র বেশি শূন্যপদ, নিয়োগ হয়নি তিন বছর আগে হাইকোর্টের নির্দেশের পরেও। এই অবস্থায় বার বার বেসামাল হয়ে পড়েছে কারা-প্রশাসন, বিহিতের বদলে নেমে এসেছে চরম দমনমূলক ব্যবস্থাই। গত বছর যেমন দমদম জেলে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন ৫ বন্দি।

একদা পুলিশ হেফাজতে ভিখারি পাশোয়ানের গুমখুনে প্রবল মুখর নেত্রী শাসকের আসনে বসে যে পুলিশকে সতর্ক করার প্রয়োজনই মনে করেননি, তার প্রমাণ এই সে দিনের নদিয়াও। কালীগঞ্জ পূর্বপাড়ার বছর তেতাল্লিশের আব্দুল গনি শেখ রাজমিস্ত্রির জোগাড়ে হিসেবে কাজে যেতেন ভিন রাজ্যে। আচমকা তাঁকে ধরেছিল নদিয়ার ভীমপুর থানার পুলিশ, বাড়িতে জানানো বা অ্যারেস্ট মেমো দেওয়ার তোয়াক্কাই করেনি। জানানো হল তখনই, যতক্ষণে সেই যুবক লাশ হয়ে গিয়েছেন। সেই লাশের সুরতহাল, ময়নাতদন্তে বাড়ির লোকের বাধ্যতামূলক হাজিরার বিধিও মানেনি প্রশাসন। উল্টে চলছে ধমকে-চমকে বাড়ির লোককে ‘সিধে’ করার খেলা!

‘খেলা’ যে কী নির্মম, জানেন বেলেঘাটায় পুলিশের মারে এগারো বছর আগে নিহত তৃণমূলকর্মী রবীন্দ্রনাথ দাসের (তোপি) স্ত্রী সাধনাও। দোষী পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা এগোনো যাচ্ছে না, কারণ, সরকার সে জন্যে প্রয়োজনীয় অনুমোদনই দিতে চাইছে না। অথচ এই সে দিনই তোপির নাম তৃণমূল ভবনের সামনে শহিদ-তালিকায় জ্বলজ্বল করেছে!

এই অবস্থায় সরকারি ব্যবস্থাপনা বা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে মানবাধিকার দিবসের কর্মসূচি হওয়াটাই হত সবচেয়ে ক্রুর পরিহাস। শেষ বিচারে জাগ্রত জনমতই কিন্তু মানবাধিকারের আসল রক্ষাকবচ।

You might also like