Latest News

ধনকড়ের জুতোতেই পা গলাবেন কি আনন্দ বোস

অমল সরকার

আর খানিকক্ষণ পরে রাজ্যের স্থায়ী রাজ্যপাল হিসাবে দায়িত্ব নেবেন সিবি আনন্দ বোস (Governor C. V. Ananda Bose)। কেন্দ্রীয় সরকারের এই অবসরপ্রাপ্ত আমলাকে নিয়ে ইতিমধ্যে সংবাদমাধ্যমে অনেক কথা আলোচনা হয়েছে।

গত শুক্রবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতি ভবন প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তাঁর নাম ঘোষণা করার পর সেই রাতেই সিভি আনন্দ বোসের (Governor C. V. Ananda Bose) সঙ্গে টেলিফোনে খানিকটা সময় কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। প্রথম আলাপে তাঁকে এমন কিছু প্রশ্ন করতে হয় যা সাধারণত কাউকে দায়িত্ব গ্রহণের আগে করার কথা নয়। তবু করতে হয়েছিল, কারণ, আনন্দ বোসের পূর্বসূরী জগদীপ ধনকড় তাঁর কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এই প্রশ্নগুলির জন্ম দিয়ে গিয়েছেন। আরও যে সাংবাদিকেরা আনন্দ বোসের সঙ্গে কথা বলেছেন, সকলেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জানতে, বুঝতে চেষ্টা করেছেন, তিনি কি ধনকড়ের জুতোতেই পা গলাবেন?

এই প্রশ্নটি সে রাতে আমি তাঁকে সরাসরি করেছিলাম। তিনি অনেক প্রশ্নের মতো এই প্রশ্নটিরও জবাবে বলেছেন, ‘অভিযোগ তো অভিযোগই। দায়িত্ব নেওয়ার পর আগে আমাকে পরিস্থিতিটা বুঝতে হবে।’ অর্থাৎ নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেননি আনন্দ বোস।

করার কথাও নয়। কারণ, জগদীপ ধনকড়কে নিয়ে যাঁর যত আপত্তিই থাকুক না কেন, নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ, জেপি নাড্ডারা যে তাঁকে ‘জনগণের রাজ্যপাল’ মনে করতেন, সে কথা বিলক্ষণ জানেন এই প্রাক্তন আমলা।

বাংলার সেই ‘জনগণের রাজ্যপাল’-কে উপরাষ্ট্রপতি করার সিদ্ধান্ত ধনকড়ের জন্য যতটা সম্মানের, ততটা স্বস্তিদায়ক হয়েছে কি না বলা মুশকিল। বাংলার রাজ্যপাল হিসাবে তিনি ছিলেন অনর্গল কথা বলা যন্ত্রচালিত পুতুলের মতো। সেখানে রাজ্যসভা পরিচালনার সময়টুকু ছাড়া উপরাষ্ট্রপতির মুখ খোলার সুযোগ তেমন একটা নেই। অনুমান করা যায়, এতদিনে ছন্দপতনের অভিঘাত তিনি সামলে উঠেছেন।

সেই সঙ্গে নিশ্চয়ই পুলকিত বোধ করছেন যে বাংলার মতো অবিজেপি রাজ্যগুলির রাজ্যপালেরা কীভাবে তাঁকে অনুসরণের দৌড়ে নেমেছেন। স্বভাবতই কৌতুহল হল, আজ রাজভবনে প্রবেশের পর আনন্দ বোসও কি ধনকড়ের জুতোয় পা গলাবেন? আমার মতে, তেমন হওয়ার সম্ভাবনা ষোলআনার মধ্যে আঠারো আনা।

আরও পড়ুন: শপথের মুখে বিতর্কে আনন্দ বোস, ভোট পরবর্তী হিংসা নিয়ে ‘অনুসন্ধান’ টিমের সদস্য ছিলেন

কারণ, বাকিদের ছাপিয়ে ধনকড়ের উপরাষ্ট্রপতি পদে উন্নীত হওয়ার পুরস্কার প্রাপ্তির প্রধান কারণ, তিনি মোদী-শাহ-নাড্ডাদের কাঙ্খিত রাজ্যপালের (Governor C. V. Ananda Bose) মডেলটি নির্মাণ করে দিয়েছেন। তা হল, সরকারের সমান্তরাল প্রশাসন পরিচালন ব্যবস্থা কায়েম। এই সিলেবাস বা অ্যাসাইনমেন্ট, যাই বলা হোক, তা জেনেই দিল্লি থেকে কলকাতার বিমান ধরেছেন বোস।

সংবিধান চালুর অল্প কয়েক বছর পর থেকেই রাজ্যপালেরা কেন্দ্রীয় সরকারের পোষা তোতা, বেতনভুক ভৃত্য। একটা সময় দিল্লির প্রভুদের নির্দেশে রাজ্যপালেরা এবেলা-ওবেলা সরকার ভেঙেছেন, গড়েছেন। সংবিধানের ৩৫৬ নম্বর অনুচ্ছেদ হাতিয়ার করে নির্বাচিত রাজ্য সরকারের পতন একটা সময় রাজনীতির স্বাভাবিক ঘটনায় পর্যবসিত হয়েছিল। এ পর্যন্ত যে ১৩৬ বার অনুচ্ছেদটির অপপ্রয়োগ হয়েছে তারমধ্যে ৯৮ বার তা করেছে কংগ্রেস দিল্লির কুর্সিতে থাকার সময়। ফলে রাজ্যপালদের সম্পর্কে দিল্লির ‘চাকরবাকর’ কথাটির প্রয়োগ নতুন নয়।

তাই বলে বিজেপি জমানাতেও তাঁদের কেবলই আজ্ঞাবহ ভৃত্য গণ্য করলে খাটো করা হবে। নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহদের জমানায় অবিজেপি দল শাসিত রাজ্যে তাঁরা অনেকটাই আধা সেনার কমান্ড্যান্টের ভূমিকায় অবতীর্ণ। এই রাজ্যপালেরা এখন শুধু কেন্দ্রের আজ্ঞাবাহক নন, দিল্লির লড়াকু যোদ্ধা।

নাহলে ‘পাড়ার দাদা’ হয়ে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মস্তানি করে ঘেরাও হয়ে যাওয়া কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে উদ্ধার করতে রাজ্যপাল ধনকড় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটে যেতেন না। যেন তিনিই পুলিশ, তিনিই নগরপাল। রাজ্যপাল তথা আচার্যের সাংবিধানিক মর্যাদা, শিষ্টাচার মাথায় রাখলে ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে উপাচার্যকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হুঁশিয়ারি দিতেন না।

রাজ্যপাল-রাজ্য সরকার সংঘাতের ইতিহাস লেখা হলে সবচেয়ে দীর্ঘ অধ্যায়টি হবে সম্ভবত বাংলায় বিরোধের পর্ব। তবু এ রাজ্যে অতীতে কোনও রাজ্যপাল আমলা-অফিসারদের কথায় কথায় রাজভবনে তলব করে হুকুম জারি করে ব্যতিব্যস্ত করেননি। মাতেননি সমান্তরাল প্রশাসন চালানোর নেশায়। কথায় কথায় টুইট করে অফিসারদের হুঁশিয়ারি দেননি, রাজ্য সরকারের নিন্দামন্দ করতে মাতেননি। খুঁটিয়ে পরীক্ষা করলে দেখা যাবে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধনকড় সেই সব বিষয়ে রাজ্য সরকারকে বেইজ্জত করার চেষ্টা চালিয়েছেন যা নিয়ে বিজেপির নেতা-নেত্রীরা তাঁর কাছে নালিশ ঠুকেছেন। ফলে ধনকড়কে আদৌ বাংলার রাজ্যপালের দায়িত্ব পালনের জন্য এসেছিলেন নাকি, দিল্লি প্রেরিত কেন্দ্রীয় টিমের স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলেন, তা নিয়ে চর্চা চলতে পারে। এখন জানা যাচ্ছে, এমন একটি কেন্দ্রীয় টিমের সদস্য হিসাবে বিজেপির দেওয়া ভোট-পরবর্তী হিংসার তথ্য-তালাশ করতে গত বছর রাজ্য ঘুরে গিয়েছেন রাজ্যপালের চেয়ারে বসতে চলা আনন্দ বোস।

সংবিধান বলছে, রাজ্যপালকে রাজ্য সরকারের পরামর্শ মেনে পদক্ষেপ করতে হবে। যেমন সরকারি কর্মচারীরা সরকারের বেতনভুক আজ্ঞাবাহক। তাই বলে বেআইনি, অনৈতিক নির্দেশ, সিদ্ধান্ত, পরামর্শ মানতে কেউই বাধ্য নন। রাজ্যপালেরাও নন।

আনন্দ বোস ‘দ্য ওয়াল’ কে সেদিন স্পষ্ট বলেছেন, ‘স্বার্থের সংঘাত (রাজ্য সরকার বনাম রাজ্যপাল) হলে হবে। গণতন্ত্রে কাজ করতে গিয়ে সংঘাত হতেই পারে। অনেক সময় তা অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। সংঘাত, মতবিরোধ নিয়ে বিচলিত হওয়ার কিছু দেখছি না।’

কথাটি একশো ভাগ খাঁটি। বিরোধ হতেই পারে। গোপালকৃষ্ণ গান্ধীকে বামফ্রন্ট সরকার বাংলায় রাজ্যপাল করে এনেছিল। সেই তিনি নন্দীগ্রামে জমি আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশের গুলিচালনার প্রতিবাদ করে গোটা ঘটনাকে হাড়হিম করা সন্ত্রাস বলে প্রেস বিবৃতি দিয়েছিলেন। বাংলার রাজভবন থেকে প্রতিবাদের অমন নজির নেই বললেই চলে। কিন্তু তিনিও রাজভবনে সাংবাদিকদের ডেকে টিভি ক্যামেরার সামনে সরকারের নিন্দামন্দ করেননি।

ফলে ধনকড় চাইলে রাজ্যপাল হিসাবে শিষ্টাচার মেনে সরকারের কাজকর্ম নিয়ে সরব হওয়ার শিক্ষা পূর্বসূরীদের কর্মধারা থেকে নিতেই পারতেন। কিন্তু তিনি সে পথে হাঁটেননি, কারণ, দিল্লির প্রভুরা তাঁকে নিশ্চয়ই সে পথ পরিহার করতে বলেছিলেন।

আসলে সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়ের জেরে অপছন্দের সরকার ফেলে দেওয়ার খামখেয়ালিপনা এখন বন্ধ। বিজেপি তাই ভিন্ন পথ ধরেছে। তাহল, ক্রমাগত নির্বাচিত রাজ্য সরকারকে রাজভবন থেকে কালিমালিপ্ত করে সমান্তরাল প্রশাসনিক ব্যবস্থা কায়েম। বার্তা স্পষ্ট, ঘোমটার আড়ালে নয়, কেন্দ্রের দলদাসগিরি করতে হবে প্রকাশ্যে।

ধনকড়ের দেখানো সেই পথেই তেলেঙ্গানা, তামিলনাড়ু, কেরল, ঝাড়খণ্ডের রাজ্যপালেরা বিধানসভায় পাশ হওয়া জনস্বার্থবাহী বিল আটকে রেখে রাজ্যবাসীর সঙ্গেই যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। নানা অছিলায় সাংবাদিকদের ডেকে রাজ্য সরকারের মুন্ডপাত করছেন, যেমনটি করতেন ধনকড়। কেরলের রাজ্যপাল আচার্য হিসাবে নিজের ক্ষমতা জাহির করতে ২৪ ঘণ্টার নোটিসে উপাচার্যদের পদত্যাগ করার হুকুম জারি করছেন। আদালত সেই নির্দেশের উপর স্থগিতাদের জারির পর ক্ষিপ্ত রাজ্যপালের প্রশ্ন, উপাচার্যরা কোন সাহসে আচার্যের নির্দেশ অমান্য করে হাইকোর্টে গেলেন। রাজভবন শো-কজের চিঠি ধরিয়েছে উপাচার্যদের হাতে।

কেরলের রাজ্যপাল এমনকী সমস্ত রকম সাংবিধানিক সীমা ছাড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি লিখে তাঁর সমালোচক মন্ত্রীদের বরখাস্ত করার সুপারিশ করেছেন। সরকারের মুন্ডচ্ছেদ করতে তিরুবনন্তপুরমের রাজভবনে এখন সাংবাদিক বৈঠক লেগেই আছে। এমনকী গত সপ্তাহে একেবারে রাজনীতিকের ঢঙে কেরলের রাজ্যপাল অপ্রিয় প্রশ্ন করা সাংবাদিকদের রাজভবন থেকে বের করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি পর্যন্ত দিয়ে বসেছেন।

অনেকের ধারণা, ধনকড়ের বাংলা ছেড়ে যাওয়া এবং তাঁর উপরাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনে তৃণমূল ভোটদানে বিরত থাকায় রাজ্যপালকে নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুশ্চিন্তা দূর হয়ে গিয়েছে। নতুন রাজ্যপাল সম্পর্কে তিনি ও তাঁর দল ব্যতিক্রমী নীরবতা পালন করায় এই ধারণা আরও বদ্ধমূল হয়েছে।

আমার কিন্তু মনে হয়, কেন্দ্রের বর্তমান শাসকেরা রাজ্যপালদের যে ভূমিকায় দেখতে চান তার ব্যত্যয় ঘটার আশা কম। আনন্দ বোস আমলাগিরি করে আসা মানুষ। ধনকড় ছিলেন আইনজীবী। দু’জনের কাজের ধারায় তাই ফারাক হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু উদ্দেশ্য ভিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা কম।

একটা কথা বলা দরকার, ‘বোবা-কালা’ রাজ্যপাল মোটেই কাঙ্খিত নয়। পশ্চিমবঙ্গের চলমান রাজনীতি, প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি, অনাচার, রাজনৈতিক হিংসার কথা বিবেচনায় রাখলে একজন সক্রিয় রাজ্যপালই কাঙ্খিত। ফলে সংঘাত অনিবার্য। তা নিয়ে লড়াই সংবিধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও মঙ্গল। ধনকড়ের জুতোয় পা গলালে তা ঝগড়ায় পর্যবসিত হবে।

আর যদি দেখা যায়, সব আশঙ্কা মিথ্যা প্রমাণ করে আনন্দ বোসকে (Governor C. V. Ananda Bose) নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের মহানন্দে দিন কাটছে, তাহলে পাঁচজন কারণ অনুসন্ধান, অঙ্ক, সমীকরণ খোঁজার চেষ্টা করতেই পারে, যা তৃণমূলের জন্য সুখকর নাও হতে পারে। লোকে বলতেই পারে, ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়!’

You might also like