Latest News

লক্ষ্য হিন্দুত্বের সিঙ্গল ইঞ্জিন

অমল সরকার

গুজরাত বিধানসভার নির্বাচনের (Gujarat Assembly Election) প্রথম দফার ভোট আজ। প্রাক নির্বাচনী সমীক্ষা এবং সংবাদমাধ্যমের পর্যালোচনা রিপোর্ট অনুযায়ী সে রাজ্যে এখনও পদ্ম শোভায় (BJP) মুগ্ধ বেশির ভাগ মানুষ। পূর্বাভাসকে সত্য ধরে নিয়ে আমদাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক মোনা মেহতা সম্ভাব্য ফলাফলকে ‘গুজরাতি ঐকমত্য’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, ‘এটি হল, রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুর সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক বোঝাপড়া। প্রতিপক্ষ শিবিরে এই বোঝাপড়া ভাঙা বা চ্যালেঞ্জ করার কেউ নেই।’

অধ্যাপক মেহতা কথাগুলি বলেছেন অমিত শাহের (Amit Shah) বিতর্কিত ভাষণটির আগে। যে ভাষণে কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গুজরাত দাঙ্গার স্মৃতি উসকে দিয়ে বলেছেন, ‘২০০২-এ ওদের উচিত শিক্ষা দেওয়ায় রাজ্যে পাকাপাকি ভাবে শান্তি এসেছে।’

Image - লক্ষ্য হিন্দুত্বের সিঙ্গল ইঞ্জিন

অধ্যাপক মেহতা যে বোঝাপড়াকে গুজরাতি ঐকমত্য বলতে চেয়েছেন, তার রাজনৈতিক উপাদানটি হল, লাথিঝাঁটা খেয়েও সংখ্যালঘুদের মুখ বুজে থাকার বিনিময়ে অর্জিত শান্তি। গুজরাত দাঙ্গার নেপথ্যে যে বিবাদ, সেই বাবরি ধ্বংসের ঘটনায় বিচারের প্রহসন দেখে সাধারণ সংখ্যালঘু জনতা উপলব্ধি করেছে, জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে বিবাদ চলে না।

শুধু অমিত শাহ কেন, গুজরাতের প্রচারে বিজেপির স্টার বক্তা দুই মুখ্যমন্ত্রী, অসমের হিমন্তবিশ্ব শর্মা এবং উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথের ভাষণ জুড়েও আছে হিন্দুত্বের নামে নির্মমতার চিত্রনাট্য। ভারত জোড়ো যাত্রায় ব্যস্ত রাহুল গান্ধীর এক গাল দাড়ির মুখটির সঙ্গে কোটি কোটি ভারতবাসীর মিল আছে। তাদের মধ্যে হিন্দু সাধুসন্তরা তো আছেনই, আছেন গরিব কৃষক, বুভুক্ষু শ্রমিকেরাও। কিন্তু অসমের মুখ্যমন্ত্রী রাহুলের সঙ্গে মিল খুঁজে পেয়েছেন শুধু সাদ্দাম হুসেনের। দিল্লিতে শ্রদ্ধা ওয়াকারের খুনি বন্ধু আফতাব পুনাওয়ালার প্রসঙ্গ টেনে বলেছেন, ‘এমন খুনিরা অনেক শহরে জন্ম নেবে যদি না ২০২৪-এ ফের নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হন।’

সদ্য সেতু দুর্ঘটনায় শতাধিক মৃত্যুতে শোকাচ্ছন্ন মোরবিতে প্রচারে গেলে যোগীকে ‘বুলডোজার বাবা’ সম্মোধন করে স্বাগত জানায় বিজেপি। বিচারের আগেই অপরাধীদের ঘরবাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়ে একাংশের চোখে যোগী ত্রাস, অনেকের চোখে ত্রাতা। বাস্তবে ‘অপারেশন বুলডোজার’ ধর্মীয় মেরুকরণ এবং সংখ্যালঘুদের কোণঠাসা করার নয়া কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে বিজেপি শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা যোগী হয়ে ওঠার দৌড়ে মেতেছেন। গুজরাতের প্রচারে যোগী বলেছেন, ‘মোদী প্রধানমন্ত্রী না হলে রাম মন্দির নির্মাণ সম্ভব হত কি? নরেন্দ্র ভাই-অমিত ভাইরা না থাকলে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল হত কি?’

প্রাক নির্বাচনী সমীক্ষার ফলাফল, মোদীর সভায় উপচে পড়া ভিড়, শাহের বিভাজন, ঘৃণা উসকে দেওয়া ভাষণ, বিলকিস বানোর ধর্ষক যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের জেল থেকে ছেড়ে দেওয়া, হিমন্ত, যোগীদের হিন্দুত্বের বিপণনে ঝাঁপিয়ে পড়া, কংগ্রেসের দিশাহীনতা, আপের লম্ফঝম্ফ সত্ত্বেও বিজেপি নিশ্চিত হতে পারেনি। ঝুলি থেকে শেষে পুরনো ও নতুন দু’টি অস্ত্র বের করেছে। নির্বাচনী ইস্তাহারে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালুর প্রতিশ্রুতির সঙ্গেই মৌলবাদ মোকাবিলায় বিশেষ সেল খোলার কথা জানিয়েছে তারা। এই ঘোষণা আদতে অমিত শাহের ‘স্থায়ী শান্তি’ প্রতিষ্ঠার দাবির বিপরীত হলেও তাঁর দল অসহায়। কারণ, ধর্মের সুড়সুড়ি আর ভয় ধরানোর থেকে ভোট কেনার ভাল ‘অস্ত্র’ কমই আছে।

Image - লক্ষ্য হিন্দুত্বের সিঙ্গল ইঞ্জিন

গুজরাতে বিজেপি টানা ২৭ বছর ক্ষমতায়। দল মেনে নিয়েছে, এই গুজরাত ১৪ বছর রাজ্য শাসন করা নরেন্দ্র ভাইয়ের তৈরি। উন্নয়নের যে গুজরাত মডেল ফিরি করে মোদী ২০১৪-র লোকসভা ভোট মাত করে দিয়েছিলেন, আট বছর পরে তা খাস গুজরাতে এমনই অচল যে শেষ প্রহরে মহারাষ্ট্রের থেকে টাটার বিমান তৈরির কারখানা, বেদান্ত গোষ্ঠীর দেড় লাখ কোটি টাকার চিপ তৈরির প্রকল্প ছিনিয়ে নিয়ে নিজের রাজ্যে করার কথা ঘোষণা করতে হয়েছে প্রধানমন্ত্রীকে। ভোট ঘোষণার আগের কয়েক দিন নরেন্দ্র মোদী যেন প্রধানমন্ত্রী থেকে ফের গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী বনে গিয়েছিলেন। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এতটাই আড়ালে চলে গিয়েছেন যে, তাঁর নামটি সর্বদা মনে থাকে না।

যোগী, হিমন্তের মতো এক দু’টি মুখ বাদে বিজেপি শাসিত বেশির ভাগ রাজ্যের ক্ষেত্রেই এটি সত্য, ভোটের ময়দানে মুখ্যমন্ত্রীরা যেন সচেতনভাবেই আড়ালে চলে যাচ্ছেন। সামনের সারিতে শুধুই প্রধানমন্ত্রী মোদী। এটা কি নিছকই মোদীর জনপ্রিয়তা কাজে লাগানোর চেষ্টা, নাকি একটি পরিকল্পিত প্রচার কৌশল? আমার মতে, মোদীময় প্রচারের আসল কারণ দ্বিতীয়টি।

হিমাচলপ্রদেশের প্রচারে মোদী বলেছেন, ‘অন্য কারও দিকে তাকানোর প্রয়োজন নেই। আমাকে দেখে ভোট দিন।’ ভোটের ময়দানে এই অগণতান্ত্রিক কথাটি মমতা বন্দোপাধ্যায়ও বলেছেন। তবে বিজেপি আর তৃণমূল এক নয়। তৃণমূল কার্যত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একক উদ্যোগ ও নেতৃত্বে গড়ে ওঠা দল। বিজেপি তা নয়। আশ্চর্যের হল, জনসঙ্ঘ, হিন্দু মহাসভার গর্ভগৃহে জন্ম নেওয়া বিজেপিও এখন পরিকল্পিত ভাবেই ব্যক্তিপুজোয় মেতেছে।

এ দেশে ভোটের ময়দানে ব্যক্তির ভূমিকার অসংখ্য নজির আছে। ভোটদান-সহ রাজনীতির আর পাঁচটা ব্যাপারেও ভারতবাসী সমর্পণ মানসিকতায় আচ্ছন্ন। তাতে বেশির ভাগ সময়ই নীতি আদর্শের বালাই থাকে না। তাই ব্যক্তি পুজোর কার্যকারিতা উপলব্ধি করেই কংগ্রেস সভাপতির চেয়ারে বসে দেবকান্ত বড়ুয়া বলেছিলেন, ‘ইন্দিরা ইজ ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া ইজ ইন্দিরা।’

যদিও ইন্দিরা এবং মোদীকে এক বন্ধনীতে রাখা চলে না। দেবকান্ত বড়ুয়া যে ইন্দিরার ভজনা করেছিলেন, তিনি সাহস আর যোগ্যতার জোরে আদি কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে নিজের দল গড়েছিলেন। আর নরেন্দ্র মোদীর কৃতিত্ব তিনি অটলবিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আদবাণীদের তৈরি ভারতীয় জনতা পার্টিকে মোদীর বিজেপি হিসাবে গড়ে নিচ্ছেন।

মোদী ভজনা এমন পর্যায়ে গিয়েছে যে, গুজরাতে প্রধানমন্ত্রী কার্যত দাবি করছেন, তাঁকে নিয়ে কিছু বলা যাবে না। সমালোচনা করলেই তিনি কাঁদুনি গাইছেন, আমি সাধারণ পরিবার থেকে এসেছি বলেই আমাকে অপমান করা হচ্ছে। আর তাঁর দল বলছে, নরেন্দ্র মোদীকে নিন্দামন্দ করা গুজরাতের অসম্মান।

বিজেপির সচেতন ভাবে মোদী-কেন্দ্রিক দল হয়ে ওঠার পিছনে আসলে কাজ করছে তাদের সিঙ্গল ইঞ্জিন ব্যবস্থা কায়েমের অনুশীলন। নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহরা কেন্দ্র ও রাজ্যে বিজেপির সরকার প্রতিষ্ঠার কথা বলতে গিয়ে ডবল ইঞ্জিন সরকারের কথা বলছেন বটে। সেটা মুখের কথা। তাঁদের মনের কথাটি ধরা পড়ে সাম্প্রতিক অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে। একটু গভীরে নজর করলে দেখা যাবে, বিজেপির প্রচারে ক্রমে সিঙ্গল ইঞ্জিনের ভাবনা উদ্ভাষিত।

বোঝা যাচ্ছে, বিজেপির এক দেশ-এক-জাতি তত্ত্বের অনুচ্চারিত অংশটি হল এক সরকার। গত মার্চে উত্তরপ্রদেশ-সহ পাঁচ রাজ্য এবং সদ্য অনুষ্ঠিত হিমাচলের নির্বাচন এবং গুজরাতে চলতি ভোটে বিজেপির প্রচারে রাজ্যের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্প, যেগুলির হাত ধরে মোদীর নাম ও ছবির বিপণন হয়েছে, এবং প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা আছে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারের মহিমা।

এই সম্ভাবনা আর অমূলক বলা চলে না যে, মোদীর বিজেপির পরবর্তী লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন এবং কেন্দ্রকে আরও ক্ষমতাধর করে রাষ্ট্রপতি-কেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েম। ২৭ বছর ক্ষমতাসীন গুজরাতে বিজেপির প্রচার খুঁটিয়ে নজর করলে বোঝা যাবে, হিন্দুত্ব সেই ইঞ্জিনের একমাত্র জ্বালানি।

গুজরাতে ভোট শুরুর মুখে টুইটে প্রচার মোদী, সিসোদিয়ার

You might also like