Latest News

প্রধানমন্ত্রীর মুখে ‘স্যানিটারি ন্যাপকিন’, সমাজের ট্যাবু ভাঙতে ইতিহাস লালকেল্লায়

অগ্নিমিত্রা পাল

নরেন্দ্র মোদীই পারেন। তিনি যেমন লালকেল্লার ঐতিহাসিক মঞ্চ থেকে শৌচাগারের কথা বলতে পারেন তেমনই স্যানিটারি ন্যাপকিনের কথাও বলতে পারেন। আসলে উনিই নতুন ভারতের দূত। যে ভারত সবাইকে সম্মান করতে জানে, আবার সবার থেকে সম্মান আদায় করতেও জানে। সবার সাথে, সবার বিকাশের স্বপ্ন দেখা মোদীজির কাছে তাই নারী সশক্তিকরণের জন্য এমন পদক্ষেপ খুবই কাঙ্খিত ছিল। কিন্তু এটা কি কেউ কোনদিনও ভাবতে পেরেছে, লালকেল্লায় স্বাধীনতা দিবসে জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধানমন্ত্রীর মুখে খুব সহজে চলে আসবে স্যানিটারি ন্যাপকিনের কথা! কেউ কি ভাবতে পেরেছিল নারীর যন্ত্রণা আর সামাজিক ট্যাবু ভেঙে দিতে এমন ইতিহাস রচনা করতে পারেন কোনও প্রধানমন্ত্রী! এখানেই রাষ্ট্রনেতা হিসেবে আলাদা নরেন্দ্র মোদী।

মাসিক, ঋতু এই শব্দ ব্যবহার নিয়ে আজও সমাজে অনেক সঙ্কোচ। সবার সঙ্গে বসে টিভিতে স্যানিটারি ন্যাপকিনের বিজ্ঞাপনও দেখতে লজ্জা পায় কত পরিবার। আজও মাসের ওই কটা দিন কত মেয়েকে লুকিয়ে রাখতে হয় নিজেকে। অস্বাস্থ্যকর পদ্ধতি মেনে চলার জন্য কঠিন অসুখের মুখোমুখি হতে হয়। স্কুল, কলেজ থেকে কর্মক্ষেত্রে এখনও ‘স্যানিটারি ন্যাপকিন’ শব্দটা মানেই ‘ফিসফিসানি’। আজও কত মানুষের কাছে মাসিক মানে ‘শরীর খারাপ’। কিন্তু ভারত যখন মঙ্গল ছুঁয়েছে, চাঁদের আঁধার দিকের সন্ধান পেয়েছে তখন তো দেশকেও বুঝতে হবে মাসিক মানে অশুচি নয়, অসুখ নয়, এ প্রকৃতির নিয়ম। নারী সশক্তিকরণের জন্যই ভেঙে দিতে হবে সামাজিক ট্যাবু। এনিয়ে অনেকেই হয়তো কাজ করছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যখন নিজের মুখে সেটা বলেন তখন তা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। আর সেটাই করলেন নরেন্দ্র মোদী। শুধু বিজেপির নয়, ভারতের নেতা মোদীজি ২০২০ সালের ১৫ অগস্ট এক নতুন স্বাধীনতার জন্ম দিলেন।

এই কাজ একজন সমাজ সংস্কারকের। এতকাল ধরে স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ মানেই ছিল নিজের সরকারের গুণগান করা। কাজের ফিরিস্তি দেওয়া। এবার ৭৪তম পবিত্র স্বাধীনতা দিবসে সেই রীতি ভেঙে ‘রিপোর্ট কার্ড’ পেশের বদলে বেছে নিলেন অনেক কঠিন এক দায়িত্ব। সামাজিক ট্যাবু ভাঙার দায়িত্ব। আজও যে বিষয়ে আলোচনা করতে বহু মানুষ ড্রয়িং রুমেও স্বচ্ছন্দ্য নন, সেই ‘সত্য’-কেই লালকেল্লা থেকে উচ্চারণ করে পৌঁছে দিলেন দেশের প্রান্তে প্রান্তে। সাধারণের কাছেও পৌঁছে গেল বার্তা, স্যানিটারি ন্যাপকিন শব্দটা অশ্লীল, অশুচি, লজ্জার নয়। প্রয়োজনের। একান্ত প্রয়োজনের।

লালকেল্লা থেকে স্বাধীনতা দিবসের সকালে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “এই সরকার সব সময়েই আমাদের দেশের মেয়ে ও বোনেদের স্বাস্থ্যের বিষয়ে উদ্বিগ্ন। এবার তাই ৬ হাজার জনৌষধি কেন্দ্রের মাধ্যমে দেশের প্রায় ৫ কোটি মহিলার হাতে মাত্র ১ টাকার বিনিময়ে তুলে দেওয়া হবে স্যানিটারি প্যাড।” এই ঘোষণার ক্ষেত্রে একটা বিষয় মাথায় রাখা দরকার যে, দেশের জন্য আরও অনেক ঘোষণার সঙ্গে এর পার্থক্য যুগান্তকারী। মনে রাখতে হবে, রেশনে ২ টাকা কেজি চাল ঘোষণা করার সঙ্গে এটা তুলনীয় নয়। এর মধ্যে দারিদ্র দূরীকরণের সঙ্গে সঙ্গে প্রাধান্য পেয়েছে দেশের ‘চিন্তাধারা’ বদলে দেওয়ার দুরদৃষ্টি।

এমন ভাবেই দেশের ‘চিন্তাধারা’ বদলানোর জন্য মোদীজি স্লোগান তুলেছিলেন– ‘যাহাঁ সোচ, ওহাঁ শৌচালয়’। ২০১৪ সালের স্বাধীনতা দিবসেই লালকেল্লা থেকে বলেছিলেন দেশের সব বাড়িতে শৌচাগার নির্মাণের কথা। বলেছিলেন, “এই একবিংশ শতাব্দীতে দেশের মহিলাদের প্রতি সম্মান দেখানো যায়নি। এখনও তাঁদের শৌচকর্মের জন্য প্রকাশ্য জায়গায় যেতে হয়, অন্ধকার নামার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এর জন্য তাঁদের কতই না সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়?” লালকেল্লার ভাষণে শৌচাগারের কথা! সমালোচনার আশঙ্কা করেই সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী এর পরে বলেছিলেন, “লালকেল্লা থেকে শৌচাগারের কথা বলছি বলে অনেকে হয় তো সামালোচনা করবেন। কিন্তু আমি গরিব পরিবারের সন্তান। দারিদ্রকে আমি সামনে থেকে দেখেছি। আজ এখান থেকেই শুরু হবে গরিবের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কাজ।”

আর নারীকে সম্মান দেওয়ার কাজ মোদীজির নেতৃত্বে যে ভাবে হয়েছে তা তো ইতিহাস। বিলুপ্ত হয়েছে তিন তালাকের অভিশাপ। মহিলারা যাতে কোনও পুরুষ সঙ্গী ছাড়াই হজ করতে যেতে পারে তার ব্যবস্থা হয়েছে। আজ নৌবাহিনী এবং বিমাবাহিনীতেও মহিলারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এবার দেশের তরুণীদের বিয়ের জন্য জন্য সরকার টাকার জোগান দেবে বলেও এদিন ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এবার সবার জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবস্থাও তো এক সম্মান প্রদর্শন।

এটা ঠিক যে এই প্রজন্মের মেয়েদের পাশাপাশি ছেলেরাও অনেকে এই বিষয়টিকে স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া হিসেবেই বিবেচনা করে। তবে সমাজের সব স্তরে স্বাভাবিক বলে স্বীকৃতি মেলেনি। একজন নারী হিসেবেই জানি, এখনও মেয়েদের ঘরে, কর্মক্ষেত্রে, রাস্তাঘাটে, সহকর্মী বা বন্ধুদের আড্ডায়, গণপরিবহনে পিরিয়ড নিয়ে শঙ্কিত থাকতে হয়। খোলাখুলি কথা বলতে আজও অনেকের ভয় হয়।

না, আর ভয় নয়। সেটা কাটিয়ে দিলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী। এই বিষয়ে কথা বলার জন্য সবার আগে দরকার হয় সাহস। আর সাহস দেখিয়ে সেই সাহসটাই জুগিয়ে দিলেন নরেন্দ্র মোদী। এমন একজন সাহসী মানুষই তো প্রয়োজন দেশের। তাঁর নেতৃত্বেই সাহসী আত্মনির্ভর ভারত নির্মাণ হবে। হবেই।

মতামত লেখিকার নিজস্ব। লেখিকা রাজ্য বিজেপি মহিলা মোর্চার সভানেত্রী।

You might also like