Latest News

রাজ্যকে ভাতে মারার ছক দিল্লির, কোন পথে হাঁটবেন দিদি

অমল সরকার

ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে, শহিদ মিনার ময়দানে, এখানে সেখানে, সুযোগ পেলেই জ্যোতি বসু কথাটি বলতেন—‘কেন্দ্রের হাতে টাকা ছাপানোর মেশিন আছে। রাজ্যের হাতে নেই। কেন্দ্রের যখন প্রয়োজন হয় ইচ্ছে মতো টাকা ছাপিয়ে নেয়। রাজ্যকে দেয় না।’ জ্যোতিবাবুর এমন অনেক কথাতেই জনসভার ময়দান হয়ে উঠত কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের (Central-State Relation) পাঠশালা।

Image - রাজ্যকে ভাতে মারার ছক দিল্লির, কোন পথে হাঁটবেন দিদি

জ্যোতিবাবুর প্রসঙ্গ এল এই কারণে, কিছুকাল আগে সামাজিক মাধ্যমে একটি দৈনিকের খবরের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়ে। তাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম করে লেখা ছিল, মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, কেন্দ্রের মতো রাজ্যের হাতেও টাকা ছাপানোর মেশিন থাকা দরকার। সেই স্ক্রিনশটের ভিত্তিতে বিজেপির কিছু নেতা মুখ্যমন্ত্রীকে বিদ্রুপ করে মন্তব্য করেন, ‘দিদির ভাইয়েরা এরপর যত ইচ্ছে টাকা ছাপিয়ে নিতে পারবে’, ‘এরপর উনি রাজ্যের হাতে সেনা বাহিনীও দাবি করবেন’ ইত্যাদি ইত্যাদি।

অর্থনীতি এবং কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক নিয়ে চর্চা করে থাকেন এমন মানুষেরা অনেকেই মনে করেন, নরেন্দ্র মোদী দেশকে যে পথে চালিত করছেন তাতে অবিজেপি শাসিত কোনও মুখ্যমন্ত্রী রাজ্য সরকারের হাতে টাকা ছাপানোর অধিকার দাবি করে বসলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এককদম এগিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ‘প্রাপ্য টাকা দিতে হবে, নইলে জিএসটি বন্ধ করতে পারি।’

সময়, পরিবেশ, পরিস্থিতি-সহ কোনও মিল নেই, তবু উপমহাদেশের ইতিহাসের এই উল্লেখ মোটেই অপ্রাসঙ্গিক হবে না অর্ধ শতাব্দী আগে শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি। যে দাবি সামনে রেখে তাঁর ডাকে স্বাধিকারের লড়াই শেষে মুক্তি যুদ্ধের রূপ নেয়। সেই দাবির একটি ছিল পূর্ববঙ্গের জন্য পৃথক রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এবং আলাদা কারেন্সি। অখণ্ড পাকিস্তানের মোট রাজস্বের সিংহভাগ যেত পূর্বাংশ অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান থেকে। বিনিময়ে পেত যৎসামান্য। যদিও একথাও একই সঙ্গে মানতে হবে পাকিস্তানের তৎকালীন পশ্চিমা শাসকেরা পূর্বাংশে যে নিষ্ঠুর জমিদারি কায়েম করেছিলেন, দিল্লির কংগ্রেস নেতৃত্ব সে পথে কোনও দিনই হাঁটেননি। কিন্তু রাজ্যগুলির প্রতি কেন্দ্রের কর্তব্যকে গোড়া থেকে প্রজা আর জমিদারের দৃষ্টিতেই দেখা হয়েছে। বিধানচন্দ্র রায়, জ্যোতি বসু হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধধ্যায় আর দিল্লির কুর্সিতে কংগ্রেস থেকে বিজেপি, সেই ট্রাডিশন সমানে চলেছে। যে কারণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলতে হয়েছে, ‘পাওনা টাকা পেতে এরপর কি দিল্লির পা ধরতে হবে?’

দিল্লি মানে নরেন্দ্র মোদী। তিনি আসলে এমনটাই চান, বুঝেছেন অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী জগনমোহন রেড্ডি। মোদী, অমিত শাহদের সামনে করজোড়ে দাঁড়ানোর অভ্যাস করে ফেলেছেন তিনি। ২০২৪-কে সামনে রেখে মোদী-শাহ জুটি সেভাবেই ঘুঁটি সাজাচ্ছেন। রাহুল গান্ধীর ভারত জোড়ো যাত্রা মানুষের মনে দাগ কেটেছে সন্দেহ নেই। কংগ্রেস এই অভিযান থেকে কতটা লাভবান হতে পারবে তা আরও অনেক অঙ্ক, সমীকরণের উপর নির্ভর করবে। কিন্তু দেশের মঙ্গল হবে, তাতে সন্দেহ নেই। বিভাজনের একবগ্গা রাজনীতির বিরুদ্ধে ভিন্ন স্রোতের জন্ম দিয়েছেন তিনি।

লক্ষণীয় হল, এই প্রথম রাহুলের কোনও কর্মসূচিকে বিজেপি সেভাবে টার্গেট করেনি। তারা নিশ্চয়ই জল মাপছে। কিন্তু ২০২৪-এর লড়াইয়ে নরেন্দ্র মোদীর সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ আঞ্চলিক দলগুলি। পশ্চিমবঙ্গ দিয়ে শুরু করে উপকূল ধরে এগোলে ওড়িশা এবং গোটা দাক্ষিণাত্যে কর্নাটক ছাড়া সর্বত্র বিজেপির প্রধান প্রতিপক্ষ আঞ্চলিক দল। এ মাসেই হয়ে যাওয়া কয়েকটি রাজ্যে কতিপয় বিধানসভা আসনের উপনির্বাচনের ফলাফলেও দেখা গেল আঞ্চলিক দল গেরুয়া শিবিরের জন্য কতটা বড় বাধা।

২০২৪-এ দিল্লিতে ফের বাজিমাৎ করার কথা বিজেপি তাই যতটা জোর দিয়ে দাবি করে থাকে, দুই আঞ্চলিক দল শাসিত ওড়িশা, ঝাড়খণ্ডের বিধানসভা ভোট নিয়ে ততটা গলাবাজি করে না তারা। খুবই তাৎপর্যপূর্ণ হল, রাজ্য-রাজ্যপাল চলমান বিরোধ, রাজ্যের পাওনা নিয়ে বিবাদে কংগ্রেস শাসিত দুই রাজ্য রাজস্থান ও ছত্তীশগড় এবং সেখানকার মুখ্যমন্ত্রীদের গলা শোনা যায় না।

আঞ্চলিক দলের শক্তি ও প্রভাব নিয়ে এই কঠোর বাস্তব মাথায় রেখেই মোদী-শাহ’রা এই সব দল শাসিত রাজ্য সরকারগুলিকে আগে ভাতে মারার রাস্তায় হাঁটছে, যাতে তারা দিল্লির কাছে বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়।

২০১৪-য় ক্ষমতায় এসে মোদী তাঁর অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি (প্রয়াত)-কে দিয়ে সহযোগিতামূলক যুক্ত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কথা বলে ক্ষমতাসীন আঞ্চলিক দলগুলিকে কাছে টানার চেষ্টা করেছিলেন। ভোটের আগে বাংলায় এসে ডবল লাড্ডু খাওয়ানোর টোপ দিয়েছিলেন। তাতে কাজ না হওয়ায় ক্রমে এই বার্তা দেওয়া হয়েছে, ন্যায্য প্রাপ্য পেতেও কেন্দ্রের অর্থাৎ বিজেপির সঙ্গে বোঝাপড়ায় আসতে হবে রাজ্যের ক্ষমতাসীন দলকে। ২০২৪-এ ফের দিল্লি বিজয় যাত্রায় বেরনো নরেন্দ্র মোদীকে লালবাতি নয়, রাজ্যে রাজ্যে সবুজ সংকেত দেখাতে হবে।

Image - রাজ্যকে ভাতে মারার ছক দিল্লির, কোন পথে হাঁটবেন দিদি

২০১৯-এ বিরোধী অনৈক্যের সুযোগে এভাবেই জয় হাসিল করেছিলেন মোদী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে ব্রিগেডের মঞ্চ থেকে ১৯ দলের নেতারা মোদীকে গদিচ্যুত করার শপথ নিলেও বাস্তবে রাজ্যে রাজ্যে তারা তাঁকে কালো পতাকা দেখিয়েই দায়িত্ব সারে। আটকানোর চেষ্টা করেনি কেউ। সেই সুযোগে বাংলাতেও দুই থেকে একলাফে ১৮ আসন ছিনিয়ে নিতে পেরেছিল বিজেপি।

তারপরও বিজেপি বিরোধিতার প্রশ্নে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সততা, নিষ্ঠা নিয়ে সংশয় দানা বাঁধেনি যা তাঁর দল উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ না নেওয়াতে হয়েছে। জগদীপ ধনকড়ের জয় নিয়ে সংশয় ছিল না। কিন্তু তৃণমূলের ভোটদানে বিরত থাকার সিদ্ধান্তকে দলের কর্মী-সমর্থক থেকে সাধারণ মানুষ ধনকড়কে ঘুরিয়ে সমর্থন হিসাবেই দেখেছে।

ফলে ন্যায্য পাওনা নিয়ে কেন্দ্র-রাজ্য দর কষাকষি, মিঠে-কড়া তরজার মাঝে যে প্রশ্নটি ক্রমশ দানা বাঁধছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও কি লড়াই চালিয়ে যাবেন, নাকি জগনমোহনের পথে হাঁটবেন?

একদিকে, চরম অর্থসংকট, অন্যদিকে, সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ, প্রথমসারির নেতাদের কেউ কেউ জেলে, কারও কারও বিরুদ্ধে ইডি, সিবিআইয়ের তদন্ত—সব মিলিয়ে দল ও সরকার নিয়ে তৃণমূল এমন কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি আগে। সারদা, নারদের ধাক্কা সামলে দেওয়া গিয়েছে গরিব মানুষের কাছে পরিষেবা পৌঁছে দিয়ে। গত বিধানসভা ভোটের আগে দুয়ারে সরকার কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সেই কাজে আরও গতি আসে। ভোটের বাক্সে বাজিমাৎ করে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প আর লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ঘোষণা। তারজন্য যে আর্থিক রসদের প্রয়োজন, তাতেই এবার টান পড়তে শুরু করেছে। আর এই সময়ই কেন্দ্রীয় প্রকল্পে ন্যায্য পাওনা আটকে দিয়েছে দিল্লি। এমনকী সংবিধান স্বীকৃত একমাত্র আয় প্রকল্প একশো দিনের কাজের টাকাও দিচ্ছে না মোদী সরকার।

আর এই সুযোগে কালিদাসি রাজনীতির পালে হাওয়া লেগেছে। উদ্বাহু নৃত্য শুরু করেছেন বিজেপি নেতারা। অতি উৎসাহী একজন কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা নয়ছয় হচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে বসেছেন। আসলে বলা হচ্ছে, রাজ্যকে টাকা দিও না।

কথাগুলি নতুন নয়। বামপন্থী দলগুলি বাদে বাংলার প্রথমসারির সব দলই এই কালিদাসি রাজনীতি করেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর কলকাতা সফরে আসা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহর হাতে বামফ্রন্ট রাজ্যের দাবিদাওয়া সম্বলিত স্মারকলিপি তুলে দিয়েছিল। যদিও বিরোধী নেত্রী থাকাকালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উল্টো পথে হাঁটতেন।

সরকারি টাকার নয়ছয় কখনই কাম্য নয়। আবার অনিয়ম, দুর্নীতি যেমন নতুন নয় এবং দল নির্বিশেষে সব রাজ্যে তা আছে, কেউ কারও থেকে কম নয়। তাই বলে প্রকল্পের টাকা বন্ধ করে রাজ্য সরকারকে শায়েস্তা করার নামে রাজ্যবাসীকে ভাতে মারার এই ঘৃণ্য রাজনীতি কতদিন চলতে পারে?

রাজ্যগুলির বিরুদ্ধে দিল্লির একটি হাস্যকর, অযৌক্তিক, ভিত্তিহীন অভিযোগ, কেন্দ্রীয় প্রকল্পের নাম বদলে দেওয়া হয়েছে। কথা হল, টাকার গায়ে মহাত্মা গান্ধীর ছবি ছাপা হয়, নরেন্দ্র মোদীর নয়। অথচ ৩৩টি কেন্দ্রীয় সাহায্যপ্রাপ্ত প্রকল্পের অনেকগুলিরই নামের গোড়ায় ‘প্রধানমন্ত্রী’ শব্দটি বসানো হয়েছে। প্রচারে তাঁর সহাস্য ছবি প্রদর্শন একপ্রকার নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। হালে মিড মিল প্রকল্পের নাম রাখা হয়েছে পিএম (প্রধানমন্ত্রী) পোষণ স্কিম। আদর্শ স্কুল তৈরির প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে পিএম শ্রী বিদ্যালয়। অথচ বেশিরভাগ প্রকল্পেই মোট খরচের ৪০ শতাংশ অর্থ রাজ্যের। তাহলে প্রকল্পের নাম ‘বাংলার বাড়ি’, নির্মল বাংলা’ হলে আপত্তি করা হবে কেন? প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীদের ছবিই বা কেন ছাপা হবে না?

Image - রাজ্যকে ভাতে মারার ছক দিল্লির, কোন পথে হাঁটবেন দিদি

এমনিতেই সংবিধানে ক্ষমতার বণ্টনের পদ্ধতি কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে আর্থিক ব্যবধান তৈরি করে রেখেছে। সংবিধান কেন্দ্রকে রাজস্ব আদায়ের বাড়তি ক্ষমতা দিয়েছে। অথচ নাগরিক কল্যাণ, উন্নয়নের গুরুদায়িত্ব সঁপে রেখেছে রাজ্যগুলির ঘাড়ে। যদিও প্রধানমন্ত্রীর মতো এবং মুখ্যমন্ত্রীদেরও মানুষের জন্য কাজ করে ভোটে জিতেই ক্ষমতার কুর্সিতে বসতে হয়। সেখানে কোনও ছাড় নেই। পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়, ২০১৮-’১৯ সালে, রাজ্যগুলির হাতে ছিল মোট সম্পদের মাত্র ৩৭.৩ শতাংশ। সেই অর্থ দিয়েই ব্যয়ের ৬২.৪ শতাংশের ভার বইতে হয়েছে তাদের।

রাজ্যগুলির বাড়তি টাকার প্রয়োজন হলে রিজার্ভ ব্যাংকের অনুমতি নিয়ে বাজার থেকে টাকা ধার নিতে হয়। চড়া সুদে সেই ধার শোধ করতে হয়। কেন্দ্রের দরকার পড়লে সেই রিজার্ভ ব্যাংকই টাকা ছাপিয়ে দেয়। রাজ্যের দেনার বোঝা নিয়ে যাঁদের রাতের ঘুম ছুটেছে, তাঁরা কেন্দ্রের ধারের অংকটা (১৫২,১৭, ৯১০. ২৯ কোটি) জানার চেষ্টা পর্যন্ত করেন না, যা প্রতিদিন ১৪০ কোটি ভারতবাসীর মাথায় চাপছে।

রাজীবের হত্যাকারীদের ক্ষমা, সনিয়াদের অনন্য নজির

You might also like