Latest News

ইরান গড়ুন ইরানিরা, বিপদ পশ্চিম থেকে গণতন্ত্র রফতানি হলেই

নীলাঞ্জন হাজরা

‘জ়ন, জ়েন্দগি, আজ়াদি’ — ইরানের বর্তমান বিদ্রোহের স্লোগান

হীরকরাজ যা জানেন, ইরানের (Iran) ‘মোল্লাতন্ত্রের’ দুঁদে, অতি উচ্চশিক্ষিত ‘মোল্লারা’ কি তা বোঝেন না?

এই প্রশ্নের উত্তর এবং উপরোক্ত স্লোগানটি আমার মতে ইরানের বর্তমান যুবা-বিদ্রোহকে অন্তত খানিকটা বোঝার পক্ষে অত্যন্ত জরুরি। দুটিতেই যথা সময়ে ফিরব।

তার আগে এক ঝলক দেখে নিই কোন ঘটনা থেকে এই বিদ্রোহের সূত্রপাত।

১৩ সেপ্টেম্বর তেহরানের ‘গশ্ত এরশাদ’ বা রাস্তায় টহল-দেওয়া নীতি-পুলিশ ২২ বছরের যুবতী মহসা আমিনিকে গ্রেফতার করে। অভিযোগ, তিনি ইসলামি পোশাকবিধি যথাযথ ভাবে না মেনেই রাস্তায় বেরিয়েছেন। ১৬ সেপ্টেম্বর পুলিশ জানায়, তিনি মৃত। ইরানের বহু শহরে এর প্রতিক্রিয়ায় যুবারা রাস্তায় নেমে ব্যাপক প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন। স্লোগান — জ়ন, জ়েন্দগি, আজ়াদি। নারী, জীবন, মুক্তি। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ এই বিদ্রোহ সমর্থ করেছেন। ইরান সরকার কঠোর হাতে এই বিদ্রোহ দমন করছে। অসমর্থিত সূত্রে এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৮৩ (এপি)।

এবার চট করে কয়েকটা পরিসংখ্যান। ২০১৬-র হিসেব অনুযায়ী ইরানে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সের মেয়েদের সাক্ষরতার হার ৮৫.৫ শতাংশ। ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি মেয়েদের ক্ষেত্রে সেই হার ৯৭.৯ শতাংশ। মোট সরকারি ব্যয়ের ২৩.১ শতাংশ ইরান সরকার খরচ করে শিক্ষা খাতে (২০২০)। তুলনামূলক ভাবে ভারতের ক্ষেত্রে এই হারগুলি হল— ৭৪.৪ শতাংশ, ৯০.২ শতাংশ এবং ১৬.৫ শতাংশ (২০২০)। এ সব তথ্যই ইউনেস্কোর।

আরও আছে— ইউনাইটেড স্টেটস ইনস্টিটিউট অফ পিস জানাচ্ছে: ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানে মেয়েদের শিক্ষার হার তিনগুণের বেশি বেড়েছে। বিপ্লবের ঠিক আগে ১৯৭৮-এ উচ্চশিক্ষায় মহিলাদের হার ছিল ৩ শতাংশ, ২০১৮-তে হয়েছে ৫৯ শতাংশ। ১৯৭৬ সালে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করা ইরানি মেয়েদের হার ছিল ৩৬ শতাংশ। ইসলামি জমানায় সেটা বেড়ে ২০১৭ সালে হয়েছে ৯৯ শতাংশ।

এ নিয়ে বিতর্কের স্রেফ কোনও অবকাশ নেই যে ইরানের ‘মোল্লাতন্ত্র’ দেশের মহিলাদের শিক্ষিত করে তুলতে চেষ্টার কোনও ত্রুটি রাখছে না। তা হলে?

Image - ইরান গড়ুন ইরানিরা, বিপদ পশ্চিম থেকে গণতন্ত্র রফতানি হলেই

তা হলে প্রথমেই মনে আসে হীরকরাজার সেই কথা—এরা যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে! এত বিপুল হারে শিক্ষিত মহিলারা ‘হিজাব’ পরার সরকারি হুকুম মানবেন কেন? এখানে চট করে বলে নিই, এই হিজাব কথাটা দুটো অর্থে ব্যবহৃত হয়। ফার্সি-ইংরেজি অভিধান খুললে দেখা যাবে, হিজাব মানে চাদর বা পর্দা। দুটোর কোনওটা ব্যবহারেরই — চাদর দিয়ে সর্বাঙ্গ মুড়ে রাখার কিংবা পর্দার আড়ালে থাকার— কোনো আইন কিন্তু ইরানে নেই। আইন কী বলছে? তা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই একাধিকবার বদলেছে। এবং মেয়েদের পোশাক-বিধি বিভিন্ন আইনের নানা ধারা জড়িয়ে তাড়িয়ে তৈরি। ১৯৯৬-এর ইসলামি দণ্ড বিধির ৬৩৮ নং পরিচ্ছেদ অনুযায়ী ‘যে সব মহিলারা ইসলামি হিজাব ছাড়া জনপরিসরে বেরবেন তাঁদের ১০ দিন থেকে দুই মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড কিংবা ৫০ হাজার থেকে ৫ লক্ষ রিয়াল জরিমানা হবে।’ আবার এই আইনেই বলা আছে শরিয়া আইন কেউ লঙ্ঘন করলে বিচারক তাঁকে ৭৪ ঘা চাবুক মারার দণ্ডও দিতে পারেন। (সূত্র: জাস্টিস ফর ইরান, ২০১৪)। এ ক্ষেত্রে হিজাব পরা মানে ‘ভদ্র-সভ্য’ ভাবে পোশাক পরা, সংক্ষেপে ইরানের মেয়েদের জন্য তার অর্থ হাত-পা ও মুখ ছাড়া শরীরের অন্য কোনও অঙ্গ দেখা যাওয়া চলবে না। দেখেছি শহরের বহু মহিলা জিন্স ও ফুলহাতা জ্যাকেট পরেন, মাথায় স্কার্ফ — যাকে ফার্সিতে বলে রুস্যারি।

কাজেই বাধ্যতামূলক হিজাবের বিরুদ্ধে যে ইরানের শিক্ষিত মহিলারা ফেটে পড়বেন তাতে অস্বাভাবিক কী আছে? তাঁদের সমর্থনে এগিয়ে এসেছেন পুরুষেরাও। আসবেন নাই বা কেন? শুধু তো মেয়েদের শিক্ষার হারেই নয়, সামগ্রিক ভাবেই ইরান নাগরিকদের সাক্ষর করে তোলার ক্ষেত্রে অনেক উন্নয়নশীল দেশের থেকে এগিয়ে। যেমন, ২০১৫ সালের হিসেবে ইরানে সাক্ষরতার হার ছিল ৮৭.১৭ (তূলনায় ভারতে ৭২.২৩)। (সূত্র: World Population Review)।

শিক্ষিত মন ‘অত্যাচারী’ শাসকের হুকুম কিছুতেই মেনে নেবে না। এইখানে প্রশ্ন তুলতেই হবে, যে কথা হীরকরাজ জানেন, ইরানের দুঁদে ‘মোল্লারা’ তা জানেন না? এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? যদি জানেন, তা হলে তাঁরা ছেলেদের তো বটেই মেয়েদেরও শিক্ষিত করে তোলার জন্য এত চেষ্টা চালাচ্ছেন কেন?

এই আমরা ঢুকে পড়লাম সস্পূর্ণ এক অন্য সম্ভাবনায়। ২০১৫ সালে ২১ দিন ধরে ইরানে ঘুরে ঘুরে, মূলত ইরানি বন্ধুদের বাড়িতে থেকে বা সে দেশের বিষয়ে নানা পরিসংখ্যান নিয়ে আমার কখনও মনে হয়নি সাংঘাতিক এক অত্যাচারী শাসনতন্ত্র কায়েম করা ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য।

এর একটাই উত্তর আমার মনে এসেছে — ইরানের শিয়া শাসকরা সভ্যতা ও আধুনিকতার যে সংজ্ঞাতে বিশ্বাস করেন তার সঙ্গে পশ্চিমি ধনতান্ত্রিক পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আদর্শের একটা মৌলিক তফাত আছে। যেমন আছে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, আজকের চিন, কিউবা বা ভিয়েতনামের সমাজতন্ত্রের মৌলিক আদর্শের সঙ্গেও।

এর ইঙ্গিত আমি পেয়েছিলাম ত্যাবরিজ় থেকে তেহরান ট্রেনযাত্রার রাতে ত্যাবরিজ় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, স্পষ্টতই ইরানির ইসলামি শাসনের সমর্থক মহম্মদ ফক্র্‌-এর সঙ্গে কথোপকথনের সময়। দীর্ঘ সময় ধরে অধ্যাপক ফক্র্‌ আমায় মোল্লাতন্ত্রের মূল সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক যুক্তি-কাঠামোটি বোঝান। এক কথায় বলতে গেলে তা হল, মুসলমান সাংস্কৃতিক কাঠামোর মধ্যেই আধুনিক উন্নয়ন।

কিন্তু ধর্ম কি নেহাতই ব্যক্তিগত অভিরুচির বিষয় নয়? আমি জিজ্ঞেস করি। অধ্যাপকের উত্তর কৌতূহলোদ্দীপক— সমস্ত দিক থেকে ন্যায্য একটি দুনিয়ায় অবশ্যই তাই। কিন্তু সে দুনিয়ায় প্রথমেই বন্ধ করতে হবে পশ্চিমি পুঁজিবাদী সংস্কৃতির নিরন্তর বিজ্ঞাপনের বোমাবর্ষণ। যে বিজ্ঞাপন শৈশব থেকেই মানুষের মনে তৈরি করে দেয় সভ্যতা আর উন্নয়নের বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট ধারণা। ক কিংবা খ কিংবা গ নামক ক্রিমটি মাখলেই ছোট্ট মেয়েটি সুন্দরী হবে, নতুবা নয়, ওরা যখন এই বিজ্ঞাপনের বোমা হামলা বন্ধ করবে, আমরা বন্ধ করব মুসলমান সাংস্কৃতিক রীতিনীতিগুলি বাধ্যতামূলক করা, যে সংস্কৃতি চামড়ার সৌন্দর্যে নয়, হৃদয়ের সৌন্দর্যে বিশ্বাস করে। ‘অন্তঃসারশূন্য বস্তুবাদী হামলা আটকাতে’, অধ্যাপক মনে করেন, কিছু কিছু রীতি বাধ্যতামূলক হওয়া জরুরি।

এই যুক্তির মধ্যে যেমন সত্যের একটা দানা আছে, তেমনই আছে জনসাধারণের কিসে ‘ভাল’ হবে তা ঠিক করার দায়িত্ব সম্পূর্ণ রাষ্ট্র নিজের হাতে নিয়ে নেওয়ায় চরম স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা কায়েম হওয়ার সাংঘাতিক আশঙ্কা। আর সে আশঙ্কা যে আছে, তা নিয়ে ইসলামি শাসকদের মধ্যেও যথেষ্ট সচেতনতা আছে। রয়েছে প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই এ নিয়ে মত বিরোধ। পশ্চিমি সংবাদমাধ্যমে এটা সচরাচর প্রচারিত হয় না। কিন্তু বাস্তব এই যে ইরানের শাসনতন্ত্রের একাংশ এই ধর্মীয় বিধিনিষেধের বাড়াবাড়ির বিরোধী।

যেমন, আমি যখন ইরানে গিয়েছিলাম সে দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন হাসান রুহানি। ২০১৩ থেকে ২০২১ তিনি এই পদে ছিলেন। একটু খোঁজ করলেই দেখা যাবে, তিনি এমন মন্তব্যও করেছেন জনপরিসরে, ‘কোরানে হিজাব পরার কথা বলা আছে মহিলাদের সুরক্ষার জন্য কিন্তু আমরা সেটাকে মহিলাদের বিরুদ্ধে মুগুরের মতো ব্যবহার করেছি।’ মধ্যপন্থী রুহানি এ নিয়ে কট্টরপন্থীদের সঙ্গে রীতিমতো সংঘাতে গিয়েছেন বারংবার।

এই সংঘাতে কার জয় হবে, তা ঠিক করতে হবে ইরানের মানুষকেই। বর্তমান বিদ্রোহ সেই ঠিক করারই একটা অঙ্গ।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও একাধিক কিছু। খুব সংক্ষেপে, ইরানের ইসলামি শাসকরা মানুষকে শিক্ষিত করেছেন, কিন্তু চাকরি দিতে পারছেন না। বিশ্বব্যাঙ্কের পরিসংখ্যান, ২০২১ সালে ইরানে বেকারত্বের হার (মোট কর্মক্ষম মানুষের) ১১.৫ শতাংশ (তুলমূল্যে, ভারতে ওই হার ৬ শতাংশ)। বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত যুবক যুবতী, কিন্তু চাকরি নেই। কাজেই জীবনের সব ক্ষেত্রেই তাঁদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে। শিক্ষিত বেকার মনের মত বারুদ আর হয় না। সেই বারুদে আগুন ধরিয়েছে মহসার মৃত্যু। জ়ন, জ়েন্দগি, আজ়াদি— নারী, জীবন, মুক্তি। এই যুবারা নারীর ওপর ইসলামের নামে চালানো জুলুমের অবসান চান ঠিকই, কিন্তু সেটাই একমাত্র দাবি নয়। তারই পাশাপাশি চান জীবনের হাল ফেরাতে। অসহনীয় বেকারত্ব থেকে মুক্তি। বিদ্রোহ বহুমাত্রিক।

এইখানেই, পশ্চিমি দেশগুলি, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক ভয়ঙ্কর ভূমিকা। ইরানের আধুনিক ইতিহাসে মার্কিন সরকারের হস্তক্ষেপ দীর্ঘকালীন ও ধারাবাহিক। আমরা খুব সংক্ষেপে কয়েকটি উদাহরণ মাত্র উল্লেখ করতে পারি। যেমন, ১৯৫১ সালে যখন ইরানে রাজত্ব করছেন আপাদমস্তক দুর্নীতিতে ডুবে থাকা স্বৈরাচারী মহম্মদ রেজ়া শাহ পহলবি, ইরানের সংসদ ‘মজলিস’ বিপুল ভোটে জয়ী মহম্মদ মোসাদ্দেঘ নামের একজনকে প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ করে। ইরানে সে সময়ে প্রধান তেল উৎপাদনকারী ব্রিটিশ কোম্পানি অ্যাংলো ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানির (এআইওসি) বিপুল ভর্তুকি বাতিল করে দিয়ে এআইওসি-র জাতীয়করণ করেন। পাশাপাশি চালু করেন ব্যাপক ভূমি সংস্কার। তাঁর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে পৌঁছয়। ইরানে প্রথম একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের তদ্বিরে মার্কিন সরকার ও সিআইএ ‘অপারেশন এজ্যাক্স’ চালিয়ে মোসাদ্দেঘকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে সারা জীবনের মতো গৃহবন্দি করে। সে সময় সারা ইরান জুড়ে সহসা মোসাদ্দেঘ বিরোধী ব্যাপক বিদ্রোহ দেখা দেয়। ২০১৭ সালে মার্কিন সরকারের প্রকাশিত নথি জানাচ্ছে হাজার হাজার ডলার খরচ করে সিআইএ এই বিদ্রোহে ‘ভাড়া করা’ ভিড় সামিল করেছিল।

১৯৭৯ সালে মহম্মদ রেজ়া শাহকে বিদায় করে ইসলামি বিপ্লব সংগঠিত হওয়ার পর থেকে সিআইএ এবং মার্কিন সরকার ধারাবাহিক ভাবে ইরানে হস্তক্ষেপ করে চলেছে। ইরানের ওপর চাপানো হয় কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ। অভিযোগ ইরান পশ্চিম এশিয়ায় ‘সন্ত্রাসবাদীদের’ অর্থ ও অস্ত্র সাহায্য করে। তদুপরি পরমাণু বোমা বানানোর ক্ষেত্রে ইরানের বিজ্ঞানীদের অগ্রগতি পশ্চিমি রাষ্ট্রপ্রধানদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। দীর্ঘ ৩৬ বছর অবরোধের পর, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক হুসেন ওবামার চেষ্টায় ২০১৫ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য এবং জার্মানির সঙ্গে ইরানের পরমাণু চুক্তি হওয়ায় এই অবরোধ কিছুটা শিথিল হয়। এর মূল কৃতিত্ব ইরানের তুলনামূলক ভাবে নরমপন্থী প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির এবং ওবামার বিচক্ষণতা।

ঠিক সেই মুহূর্তে আমি ইরানে। ত্যাবরিজ় থেকে ট্রেনে তেহরান ফেরার সময় সহযাত্রী সেই অধ্যাপক ফক্র্‌-কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এই চুক্তি কি তবে এবার ইরানকে বিশ্বের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনবে। অধ্যাপক এক অদ্ভুত উত্তর দিয়েছিলেন, ‘‘দেখা যাক। মার্কিন সরকারের সদিচ্ছার উপর আমার পক্ষে আস্থা রাখা কঠিন।’

কী আশ্চর্য! ওবামার পর ক্ষমতায় এসেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক কূটনীতির সমস্ত রীতিনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এক তরফা ভাবে এই চুক্তি বাতিল করে দিয়ে আগের থেকেও কঠোর অবরোধ চালু করে দেন। আমার শিরাজ়ি বন্ধু সোমাইয়ে আমায় লেখে, ‘কিচ্ছু পাওয়া যাচ্ছে না। জিনিসের দাম আগুন। হাসপাতালে ওষুধ পর্যন্ত নেই।’

Image - ইরান গড়ুন ইরানিরা, বিপদ পশ্চিম থেকে গণতন্ত্র রফতানি হলেই

২০২০ সালে বাগদাদে মার্কিন সরকার ড্রোন হামলা চালিয়ে ইরানের উচ্চতম সামরিক নেতৃত্বের অন্যতম মেজর জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করে কোনও রাখঢাক না করেই। ট্রাম্পের ইরান-নীতির মূল কথা ছিল ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’। ট্রাম্প গিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হয়েছেন জো বাইডেন। এখনও অবরোধ চলছে।

১৯৭৯ সাল থেকে আজ অবধি পশ্চিমের এই কঠোর ধারাবাহিক অর্থনৈতিক অবরোধ মাথায় নিয়েই ইরানকে চলতে হয়েছে। মার্কিন ‘চূড়ান্ত চাপ’ নীতির কী প্রভাব পড়েছে ইরানের অর্থনীতিতে তার একটাই উদাহরণ দিই— ২০১৭ সালে ইরান প্রতিদিন ২৫ লক্ষ ব্যারেল তেল রফতানি করত। ২০২০ সালে এসে সেটা দাঁড়ায় ৪ লক্ষ ব্যারেলে। মুদ্রাস্ফীতির হার ৪২ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছে। অর্থনীতিতে হাহাকার। চাকরি নেই। মানুষ ক্ষোভে ফুঁসছেন।

এই ‘চূড়ান্ত চাপ’ নীতির রাজনৈতিক ফল— পশ্চিমি দেশগুলির সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী মধ্য বা নরমপন্থীদের পিছু হটা। চরম পশ্চিমবিরোধী এব্রাহিম রয়িসির প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন ২০২১ সালে।

২০১৯ সালে সারা ইরান জুড়ে একদফা বিদ্রোহের বান ডেকেছিল। এখন ফের। ইরানের মানুষ ইরানের ভবিষ্যৎ গড়বেন। ইরানের সরকারের সঙ্গে তাঁদের দফায় দফায় বোঝা পড়া হবে। এটা স্বাভাবিক। এটাই কাম্য। আমার আশা— শেষ অবধি পিছু হটবেন কট্টরপন্থীরা। কিন্তু আমার আশঙ্কা এখানেই যে, তার পিছনে ওয়াশিংটনের কলকাঠি নড়ছে না তো? ইরানের মানুষের একশো ভাগ ন্যায্য ক্ষোভের সুযোগ নিয়ে ইরানে ‘রেজিম চেঞ্জ’ করার নানা ছক কষা চলছে না তো নানা বন্ধ ঘরে? এই সব শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বন্ধ ঘর থেকে উন্নয়নশীল দুনিয়ায় ‘গণতন্ত্র’ রফতানি করার ভয়ঙ্কর ফল আমরা দেখেছি নিকারাগুয়া, ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া সহ দেশের পর দেশে। রক্তস্রোত। ইরানে দেখতে চাই না।

লেখক সাংবাদিক। মতামত ব্যক্তিগত

ইডেনে সেদিন রেফারি সুধীনদা আমাকে ও দিলীপকে লাল কার্ড না দেখাতেই পারতেন

You might also like