Latest News

ভাপা রান্নার গোপন রেসিপি আর টিফিনবাক্স ভর্তি মনকেমন

সাবিনা ইয়াসমিন রিংকু

sabina yasmin ringku

টিফিনবাক্স গিন্নিদের প্রাণ। এখন অত্যাধুনিক হেঁশেলে রান্না সংক্রান্ত কতোরকম দামি দামি হাতিয়ার, তবুও টিফিনবাক্সকে চোখে হারান গিন্নিরা। ঘরে ছোটবড় নানা সাইজের একাধিক টিফিনবাক্স থাকা সত্ত্বেও রামলীলা ময়দানের রথের মেলায় জিলিপি পাঁপড়ভাজা কেনার আগে একটা টিফিনবাক্স কেনা চাই-ই চাই।
— “ও মা! বাড়িতে কত টিফিনবক্স। তাও কিনছ? আমাকে ওই খেলনা গাড়িটা কিনে দাও না মা!”
— “থাম্! ঘরভর্তি গাড়ি। আবার গাড়ি নেবে! লজ্জা করে না! এই রকম ঘটিমুখো টিফিনবাক্স আমার একটাও নেই। কী সুন্দর আদুরেপানা দেখতে!”
ছেলের গাড়ি হল কি হল না! পাঁপড়ভাজা জিলিপি খাওয়া হল কি হল না! গিন্নির আরও একখানা টিফিনবক্স কেনা হয়ে গেল! ঘটিমুখো টিফিনবক্স।

টিফিনবাক্সের নিয়মিত ব্যবহার না থাকলেও কেনা বন্ধ হয় না। এখন অনলাইনে খাবার অর্ডার করলে খাবারের সঙ্গে প্লাস্টিকের গোল গোল ডাব্বাগুলো আসে। কাউকে কিছু দিতে হলে প্রাণাধিক প্রিয় টিফিনবক্সে দেওয়ার চেয়ে ওইগুলোই বেশি ব্যবহার হয়। সুবিধে আছে। অসুবিধেও আছে। সুবিধা হল প্রাণের টিফিনবক্স দিতে হল না। অসুবিধা হল খাবার ভর্তি ডাব্বা ফেরৎ আসার সম্ভাবনা মাত্র ১ পার্সেন্ট। ডাব্বা ভর্তি করে লোটে মাছের ঝুরো দিলাম, আমিষ কিছু কি আসবে? বৌদির উঠোনের মাচায় কচি কচি লাউ ঝুলছে। অর্গানিক লাউ। হরিণা চিংড়ি দিয়ে যা স্বাদ খুলবে না! ওপরে যদি একটু ধনেপাতা কুচি ছিটিয়ে দেওয়া হয়— উফ্! ভাবনাই সার! এসব ভাবতে ভাবতে ও-দিকের গিন্নি সেই প্লাস্টিকের ডাব্বায় মাটি ভরে দুটো দোপাটি গাছ লাগিয়ে দিলেন। এ দিকের গিন্নিও কম যান না! লোটে মাছ উশুল করবেনই। তিনদিন ধরে হাতড়ে হাতড়ে একটা ট্যারাব্যাঁকা টিফিনবক্স পেলেন। তাতে কবেকার বাদ দেওয়া দুটো পেনসিল ব্যাটারি, একটা ছোট সাইজের কাঁচি আর দুটো ম্যাগির শিশির ঢাকনা ছিল। ব্যাটারি দুটো এমন চ্যাটচ্যাটে হয়ে টিফিন বাক্সের গায়ে লেগে গিয়েছে যে কাজের মাসিও সাফ করতে পারল না।
অগত্যা নিজেই হাত লাগালেন এবং অনেক বুদ্ধি প্রয়োগ করে টিফিনবাক্স থেকে গ’লে যাওয়া ব্যাটারিকে আলাদা করতে পারলেন।

ফ্রিজে পমপমের বাবার বন্ধুর আনা কতগুলো সন্দেশ ছিল। একটাও মুখে তোলা যায়নি। একটা সন্দেশ কামড়ে রেখে দেওয়া হয়েছে। বন্ধু না ছাই! খালি বড়লোকি চাল আর মুখে বড় বড় কথা! খালপাড়ের ঝুপড়ি মিষ্টির দোকান থেকে আটার সন্দেশ নিয়ে বন্ধুর বাড়ি এসে খাসির মাংস আর বাসন্তী পোলাও খেয়ে বাড়ি গেল।

সন্দেশের রং ক্যাটকেটে গোলাপি আর সবুজ। কী দিয়ে রং করেছে বোঝা যাচ্ছে না। হাতে ধরলেই রং লেগে যাচ্ছে আঙুলে। আধখাওয়া সন্দেশটা ফেলে দিয়ে বাকি সন্দেশগুলো তোবড়ানো টিফিনবক্সে সুন্দর করে সাজিয়ে ওপরে খুব কুচি কুচি করে চেরি কিসমিস কেটে ছড়িয়ে দিয়ে ঢাকনা এঁটে পাঠিয়ে দিল এ-পক্ষ। হ্যাঁ, এবারে টিফিনবাক্স ফেরৎ এসেছিল। তবে ভেতরে কী ছিল জানতে পারা যায়নি।

এমনই মায়া টিফিনবক্সের! আলমারিতে থরে থরে সাজানো আছে দেখলেই তুমুল আনন্দ। প্রতিটা টিফিনবক্সের গায়ে খুচরো গল্প। ওই টিফিনবক্সটা হানিমুন করতে গিয়ে পুরীতে কেনা। ঐটে ময়দানে কেনা। তখন শীতকালে মেলা বসত। বইমেলার আগে। আর ওই পেতলের টিফিনবক্সটা বেনারসের জেঠিমা দিয়েছিলেন। দিতে চাইছিলেন না। পুরোনো তেঁতুল দিয়ে মাঝেমাঝে ঘষার ফলে রংটা সোনার মতো হয়েছে। জেঠিমার কাছ থেকে যখন এনেছিলাম , কী হাল ছিল টিফিনবক্সটার!
টিফিনবক্স নিয়ে গল্পের শেষ নেই।

Image - ভাপা রান্নার গোপন রেসিপি আর টিফিনবাক্স ভর্তি মনকেমন

একজন সাইকেলের হ্যান্ডেলে তিনথাক- এর টিফিনবাক্স নিয়ে কাজে যাচ্ছেন। আমরা মনে মনে টিফিনবাক্সের মন পড়ে ফেলি। ওই তো সবচেয়ে নীচেরটাতে ভাত আছে! ভাতের মধ্যে একটা কাঁচালঙ্কা শোয়ানো আছে। পেঁয়াজ নেই। চামড়ার কারখানায় টিফিনের টাইম বলে কিছু হয় না। কখন খাওয়া হবে ঠিক নেই। পেঁয়াজ দিলে পুরো ভাতটাই গন্ধ হয়ে যাবে না! দ্বিতীয় থাকে আছে ঘন ডাল। ডালে কুমড়ো, ঝিঙে, বরবটি দেওয়া। তেজপাতা, জিরে আর শুকনোলংকার ফোড়ন। দ্বিতীয় টিফিনবাক্স খোলামাত্র জিরের গন্ধে ঘায়েল হবে লোকটা। বউটা সত্যিই ভাল রাঁধে! কতদিন থেকে একটু কিসমিস আর ভাঙা কাজু নিয়ে যেতে বলছে, কী যেন রাঁধবে! আজ ওগুলো না নিয়ে বাড়ি ঢুকবে না। কিন্তু মুশকিল হল ট্রেন লেট হলে বিশুকাকার দোকান বন্ধ হয়ে যাবে।

সবচেয়ে ওপরের টিফিনবক্স-এ আছে তেলাপিয়ার পাতলা ঝোল। কাঁচালংকা বাটা দেওয়া। দু’ফালি বেগুন ভেজে মাছে দেওয়া আছে। ওপরের টিফিনবাক্স’য় ঢাকনা আছে বলে ট্যালটেলে ঝোল জাতীয় রান্নাগুলোর জন্য প্রথম থাকটাই উপযুক্ত। (Food Blog)

এই থাক্ থাক্ টিফিনবাক্সের থাকেও কত গল্প! মায়ের বাড়ি থেকে কখনও আসছে রুই মাছের কোপ্তা, হাঁসের ডিমের কালিয়া এবং লুচির পায়েস। কখনও অসুস্থ প্রিয়জনের কাছে যাচ্ছে জল দিয়ে ধোওয়া আটার রুটি, পেঁপে গাজর আর বড় বড় আলু দেওয়া চিকেন স্টু নিয়ে।

প্রতিবেশীর সঙ্গে তরকারি চালাচালি ছাড়াও ছোট সাইজের সিঙ্গল গোল টিফিনবাক্সে ‘ভাপা’ তৈরি হয়। ইলিশভাপা। চিংড়ি ভাপা। কাঁকড়া ভাপা। ডিম ভাপা। পোস্ত ভাপা। সিম ভাপা। এমনকি চিকেন ভাপাও! ভাপা তৈরির পদ্ধতিটা একটু গভীরভাবে ভেবে দেখলে মারাত্মক। সরাসরি আগুন লাগে না ভাপার গায়ে। আগুনের ওপরে একটা কোনও পাত্র বসিয়ে তাতে খানিকটা জল দিয়ে বন্ধ টিফিনবাক্সটি রেখে দিতে হয় প্রায় তিরিশ মিনিট মতো। ভেতরে মশলায় মাখানো আমিষ অথবা নিরামিষ দগ্ধে দগ্ধে নরম হয়ে ওঠে। আমরা যেমন সংসারের আগুনে ভাপা হই! বারবার সেদ্ধ হতে হতে একদিন সব অহংকার, আসক্তি, রাগ, ঘৃণাবোধ চিরকালের মতো নষ্ট হয়ে যায়!

আলাদা করে সরিয়ে রাখা খুচরো টাকাপয়সা, সূচসুতো, পেনসিল ব্যাটারির স্থান হয় রংচটা অথবা টোপসা খাওয়া টিফিনবাক্সে। টিফিনবাক্স নিয়ে মেয়েরা ভীষণ আবেগতাড়িত, কাতর। অনেকটা নিজের সন্তানের মতোই চোখে হারায় সাধের টিফিনবাক্সকে। বড়মাসি এখনও কেন টিফিনবক্সটা ফেরত দিল না! কিছু দেওয়ার দরকার নেই, টিফিনবক্সটা যেন তাড়াতাড়ি ফেরৎ দেয়!
সন্ধ্যেবেলায় ছোটদিদার কাঁপাকাঁপা গলায় ফোন “অ মেজবউমা টিপিনবাক্সটা সেদিনই দিলে না কেন? কাল সকালে গনা’র হাত দিয়ে অবশ্যই পাঠিয়ে দেবে।” যেন টিফিনবাক্স নয় দিদার ধুকপুক করা হৃদয়খানি জমা আছে মেজবউমার কাছে!
মেজবউমা অবশ্য বলেনি যে সেদিন দিদার হাতের অসাধারণ কাঁটাচচ্চড়ি খেয়ে সেই টিফতাবাক্স ধুয়ে তাতে ছোট ননদের পাঠানো তিলের নাড়ু রেখে দিয়েছে। আর ছোট ননদের টিফিনবাক্সটাতে মেথিচিকেন রেঁধে প্রাণের বন্ধু সুনন্দা’কে পাঠিয়েছে। এইভাবে টিফিনবাক্স বারেবারে হাতবদল হয়। হারিয়ে যায়। আবার ফিরেও আসে। আর সেই টিফিনবাক্সের ভেতরে চিঠি আর চিরকুট পাওয়া গেলে টিফিনবাক্সটা হয়ে যায় “দ্য লাঞ্চবক্স”। মেরে সাজন, ও মেরে সাজন… মনে পড়ছে? নিমরত কৌর এবং ইরফান খানের সেই অসাধারণ ছবিটার কথা! দেখা না থাকলে সিনেমাটা দেখেই নিন।

ভাপা মুরগি

উপকরণ: একটা টিফিনবাক্স, ২৫০ গ্রাম চিকেন (হাড় ছাড়া বা হাড় সমেত- যা ইচ্ছে), একটা বড় পেঁয়াজ কুচি কুচি করে কাটা, আদা রসুন বাটা ২ চা চামচ, কাঁচালংকা বাটা, সাদা সর্ষে বাটা ১ টেবিল, পোস্ত বাটা ১ চা চামচ, হলুদ গুঁড়ো, লংকা গুঁড়ো, নুন, ৩টে ছোট এলাচ, সর্ষের তেল ২ টেবিল চামচ।

Image - ভাপা রান্নার গোপন রেসিপি আর টিফিনবাক্স ভর্তি মনকেমন

প্রণালী: টিফিনবাক্সের মধ্যেই ধুয়ে রাখা চিকেন নিয়ে ওর মধ্যে সর্ষে বাটা, পোস্ত বাটা, হলুদ গুঁড়ো, লংকা গুঁড়ো, নুন, এক চা চামচ সর্ষের তেল আর খুব অল্প একটু জল দিয়ে ভাল করে মেখে মিনিট দশেক রেখে দিন।
এবার একটা কড়াইতে বাকি সর্ষের তেলটুকু গরম করে ছোট এলাচ ফোড়ন দিয়ে পেঁয়াজকুচি হালকা বাদামি করে ভেজে নিন। ওর মধ্যে আদা-রসুন বাটা এবং কাঁচালংকা বাটা দিয়ে মশলার কাঁচা গন্ধটা মেরে নিন। তারপর তেলসহ সব মশলা টিফিনবক্সের চিকেনের মধ্যে ঢেলে দিয়ে চামচ দিয়ে খুব ভাল করে মিশিয়ে নিন। এবার প্রেশারকুকারে অল্প জল দিয়ে একটা স্ট্যান্ডের ওপর টিফিনবক্সটা রেখে তিনটে বা চারটে সিটি দিয়ে নিন। (Food Blog)

গন্ধরাজ ভাপা ইলিশ

উপকরণ: একটা স্টিলের টিফিনবক্স, ৪ টুকরো ইলিশ মাছ, সাদা সর্ষে বাটা ২ টেবিল চামচ, ১ চা চামচ গন্ধরাজ লেবুর রস, নুন, হলুদ গুঁড়ো, কাঁচা লংকা, ৪টে গন্ধরাজ লেবুর পাতা, সর্ষের তেল।

প্রণালী: স্টিলের টিফিনবাক্সের মধ্যে মাছ ,সর্ষে বাটা, নুন, হলুদ গুঁড়ো, লেবুর রস, সর্ষের তেল— সব একসঙ্গে ভাল করে মেখে নিন। এবার লেবুপাতাগুলো হাত দিয়ে একটু কচলে মাছের ওপরে দিন, কাঁচালংকাগুলো চিরে ওর মধ্যে দিয়ে দিন। একটা কড়াইতে কিছুটা জল গরম করতে দিন। টিফিনবাক্সটা জলের ওপরে রেখে একটা ঢাকনা দিয়ে কড়াইটা ঢেকে দিন। ১৫ মিনিট পর গ্যাস বন্ধ করে দিন। আরও ১৫ মিনিট পর টিফিনবাক্স খুলে গন্ধরাজ ভাপা ইলিশ গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন। (Food Blog)

You might also like