Latest News

Food Blog: গরমকালে গ্রামবাংলার সহজ তিন পদ

সাবিনা ইয়াসমিন রিংকু

Image - Food Blog: গরমকালে গ্রামবাংলার সহজ তিন পদ

আমাদের এই বঙ্গের গাঁ-গ্রামের মানুষদের আতিথেয়তা দেখলে আশ্চর্য হতে হয়। নিজেদের দুবেলা ভালোমন্দ জুটুক বা নাই জুটুক ‘মেহমান নওয়াজি’তে কোনও ফাঁকি থাকে না। হয়ত আপনি গ্রামের পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, যাবেন কোনও পরিচিতের বাড়িতে। গন্তব্যস্থলে পৌঁছনোর আগে নানা বয়সী অচেনা মানুষদের আন্তরিক প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে আপনাকে এগোতে হবে।
কেউ বলবে “কোথা যাচ্ছ? কাদের বাড়ি?”
কেউ বলবে “এ গাঁয়ে লতুন! বামুন পাড়া যাবা বুঝি? এই রাস্তা তো বামুন পাড়াতেই গিয়ে ঠেকেছে।”
মাতৃস্থানীয়া এক মহিলা গোরুকে জাবনা দিতে দিতে উঠোন থেকেই আপনাকে বলবেন “এই ঠা ঠা রোদ্দুরে হাঁটতেছো , মাথা ঘুরে পড়ে যাবা বাপ। এসো। দাওয়ায় এসে একটুন বোসো। রোদ পড়লে যেও।”… অচেনা মানুষের প্রতি এমন উদাত্ত আহ্বান একমাত্র বুঝি এই বঙ্গদেশেই সম্ভব! কিছু কিছু পিছুডাক এড়িয়ে যাওয়া যায় না।… এটা এমনই একটা ডাক। দাওয়ায় বসবেন কি বসবেন না, এসব নিয়ে আপনি যখন দ্বিধান্বিত, ঠিক তখনই সেই মাতৃস্থানীয়া মহিলা জোরে হাঁক পাড়বেন, “অ পুতুল! তোর মামারে একখান মাদুর পেতে দে দিনি।”
আট/ন বছরের পুতুল কোত্থেকে উদয় হয়ে দাওয়ায় একটা মাদুর পেতে দেবে। “মামা এসো। বসো।”
“মামা” তখন লজ্জায় লাল। পুতুল একটা হাতপাখা এনে দেবে। সেই হাতপাখার চারধারটায় আবার কাপড়ের ঝালর লাগানো। মাঝের ঘরে ফ্যান, বিজলি বাতি… সব আছে। তবু যেচে ডাকা অতিথিকে দাওয়ায় বসিয়ে হাতপাখার হাওয়া দিতে না পারলে অতিথিসেবায় কোথায় যেন একটা ফাঁক থেকে যায়! এর মধ্যে সেই মহিলা একটা কাচের গেলাস হাতে নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াবেন। গ্লাসের কাচটা পুরু। তবু বাইরে থেকে বুঝতে অসুবিধা হবে না যে গ্লাসের ভেতরে টলটল করছে নুন, চিনি আর লেবুর শরবত।
“এই শরবতটুকু খেয়ে নাও দেখি। আরাম করে দেয়ালে হেলান দে বসো।”
আপনি বামুনপাড়ার নিতাই চক্রবর্তীর বাড়ি যাবেন বলাতে মহিলার চোখ মুখ থেকে শ্রদ্ধা ঝরে পড়বে।
“নেতাই চকোত্তির বাড়ি! সে বাড়ি আমার খুব চেনা। আমার ভাজা মুড়ি ছাড়া তেনারা অন্য কারোও মুড়ি খান না।”
“আপনি মুড়ি ভাজেন?”… এতক্ষণে কথা বলার একটা প্রসঙ্গ পেয়ে আপনি হাঁফ ছেড়ে বাঁচবেন।
“মুড়ি ভাজি। নারকেলের নাড়ু তৈয়ার করি। আর হলুদ গুঁড়ো ,লংকা গুঁড়ো… ওই সব বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিককিরি করি । ওই চেনাশোনা মানুষদের মধ্যেই। ওই যে ওই পাশে, বেড়া দেওয়া জায়গাটায় হলুদ গাছ লাগাই প্রত্যেকবার।” আঙুল তুলে দেখাবেন তিনি। “ওই হলুদ পুষ্ট হলে তুলে ধুয়ে শুকিয়ে সিদ্দ করে আবার শুকিয়ে হাটখোলা বাজার থেকে মেশিনে কুটে আনি। ওই হলুদ গুঁড়োতে একটুনও ভেজাল থাকে না। আর তেমনি পাকা রং।”
উঠোনের নারকেলগাছটার দিকে তাকিয়ে আপনি বলবেন “এই গাছটার নারকেল থেকে নাড়ু বানান?”
“হ্যাঁ। খুব মিষ্টি জল। ছবি যখন বছর তিনেকের তখন ছবির বাবা গাদামারা হাট থেকে এই এতখানি গাছটা পুঁতে ছিল”-হাতের কনুই পর্যন্ত দেখিয়ে মাতৃস্থানীয়া কথাটি বলবেন। “ঘরে দু’চারটে নাড়ু আছে। খাবা?”
উত্তরের অপেক্ষা না করে হাঁক পাড়বেন… “অ ছবি, ছবি মা রে… একটু বাইর হ। দুখান নাড়ু আন দেখি!”
ছবি!!! কয়েকমিনিট পর ছবি একটা সস্তার প্লেট হাতে নিয়ে ছবির মত এসে দাঁড়াবে।
“এইখানে পেলেটটা থুয়ে একটা পেন্নাম কর। মামা। নেতাই চক্কোত্তির আত্মীয়।”
‘মামা’ শব্দটা যে এতটা আঘাত করতে পারে সে দিনের আগে পর্যন্ত আপনার কোনও ধারণা ছিল না।
ছবির মতো সুন্দর এবং লাবণ্যময়ী মেয়েটি মনে হয় আপনার চেয়ে বছর তিন চারেকের ছোটই হবে! দিঘির মত দুখানি চোখ। তাতে কোনও ঢেউ নেই। শান্ত। দুশ্চিন্তাবিহীন। আভরণ বলতে কানে দুটো দুল। তাতেই চোখ সরানো দায়। উঠোনের করবী গাছটা থেকে এক থোকা রক্তকরবী তুলে এনে মেয়েটি যদি তার আলুথালু খোঁপায় গুঁজে নিত!
“ছবি গত বছরে কলেজে পাশ দেছে। মেয়ে চাকরি করতে চায়। এখন ঘরে বসে চাকরি পাবার পড়াশুনা করতেছে।”
ছবির সঙ্গে কথা বলার একটা সুযোগ এসেছে এতক্ষণে। “কেমন চাকরি করতে চাও ছবি?”
ছবি উঠোনে ঝরে পড়তে থাকা নিম ফুলের দিকে তাকিয়ে রিনরিনে কণ্ঠে বলে উঠবে “আমার রেডিওর আর জে হওয়ার খুব ইচ্ছে। কথা বলতে আমার খুব ভালো লাগে। কিন্তু এই অজ পাড়াগাঁয়ে থেকে ওসব চাকরি হওয়া মুশকিল।”
আপনি বিজ্ঞের মত বলবেন “এফ এম এর সবকটা অফিসই তো কলকাতায়! ওরা রেডিওতেই অডিশনের জন্য বিজ্ঞাপন দেয় মাঝে মাঝে।”
“জানি। কিন্তু আমার দৌড় তো হাবড়া কলেজ পর্যন্ত!
কলকাতায় গিয়ে থাকা, ইন্টারভিউ দেওয়া আমার পক্ষে বেশ অসুবিধাজনক।”
এই কথোপকথনের মধ্যে ছবির মা বলে উঠবেন “ছবি খুব ভালো গান করে। অ ছবি সেদিন সেই যে একটা গান তুললি না! খুব সোন্দর। ওইটা মামাকে শোনা না!”
উফ্ ! মামা ! মামা! মামা!… শব্দটা আপনার কাছে অসহ্য হয়ে উঠবে।
“আপনার হাতের তৈরি নাড়ু অসাধারণ খেতে। হালকা কর্পূরের গন্ধ পেলাম যেন মনে হল!”
ছবির মা আহ্লাদে আটখানা হবেন। বলবেন, “নাড়ুতে এটটুস কপ্পুর দিলে নাড়ু অনেকদিন ভালো থাকে।”
ওদিকে ছবি’তে মন আটকে যাবে আপনার। আপনার অবাধ্য চোখ বারবার চলে যাবে ছবির দিকে। কিন্তু ওই যে একটা শব্দ! “মামা”… পাঁচিলের মতো আপনার আর ছবির মাঝখানে লটকাবে।
আপনি এবার মাদুর থেকে উঠে পড়তে চাইবেন। “অনেক ধন্যবাদ দিদি। বাস রাস্তা থেকে এতটা দূর হেঁটে এসে সত্যিই বড্ড তেষ্টা পেয়েছিল। গলা শুকিয়ে গিয়েছিল একেবারে।” আপনি হাসবেন। ছদ্ম হাসি নয়। প্রাণের হাসি।
“দিদি বলে ডাকলে যখন, তখন চাট্টি ভাত না খাইয়ে তো ছাড়বো না! “
“না না। নিতাই কাকার ওখানে দুপুরে খাবো। সেরকমই বলা আছে।”
ছবির মা হাত ধরে আবার আপনাকে মাদুরে বসিয়ে দেবেন। আপনি এবারে ভাববেন এভাবে যত্ন করে শেষে কি ছবির জন্য একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে বলবে! নাকি পাত্র দেখবার কথা পাড়বে!

আপনার সমস্ত আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়ে ছবির মা বলে উঠবেন- “আমরা গরীব মানুষ। তোমাকে ভালো কিছু খাওয়াতে পারবো না। কিন্তু ভাইকে না খাইয়ে আমি কিছুতেই বাড়ির বাহির হতে দিবো না।
আমরা যা খাবো, তুমিও আমাদের সঙ্গে তাই খেও।”
আপনি ভাববেন এই যুগে এমনও হয়! শুধু একটা ডাককে মান্যতা দেওয়ার জন্য এতো যত্ন, সম্মান আর ভালোবাসা পাওয়া যায়!
ছোট্ট পুতুল বলে উঠবে, “মামা আপনার আর নিস্তার নাই। মায়ের হাতের রান্না আপনাকে আজ খেতেই হবে।”
ভাত, নিমফুল দিয়ে মুগডাল, উচ্ছে পাতার বড়া আর গাছের কাঁচা আম দিয়ে বাটা মাছের ঝাল।
আপনার গলাটা কেমন ধরে আসবে না! ঢোক গিলতে ব্যথা ব্যথা লাগবে না?
এটাই তো বাংলার আসল রূপ। কোমল, দয়াময়ী, প্রেমময়ী। দুবেলা দুমুঠো অন্ন ঠিকই জুটে যাবে। এই চরম দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বাজারেও না খেয়ে মরতে হবে না কাউকে। তৃষ্ণার্ত ঠোঁটের কাছে জল, দুটো মিষ্টি কথা সমস্তটাই তুলে রাখা আছে আমাদের জন্য ।
শুভ নববর্ষ। নতুন বছর ভালো কাটুক। আশা পূরণ হোক সবার।

Image - Food Blog: গরমকালে গ্রামবাংলার সহজ তিন পদ

নিমফুল ডাল

উপকরণ: সোনামুগ ডাল দু কাপ, ফ্রেশ নিমফুল এক কাপ, আদা বাটা, শুকনো লংকা, কাঁচা লংকা, পাঁচফোড়ন এক চা চামচ, তেল, নুন, হলুদ গুঁড়ো

প্রণালী: কড়াইতে মুগডাল শুকনো ভেজে নিন। তারপর ডাল ধুয়ে নুন হলুদ দিয়ে সেদ্ধ করে নিতে হবে। সেদ্ধ করার সময় একটা কাঁচা লংকা দিয়ে দিতে হবে। ডাল সেদ্ধ হয়ে গেলে ডালঘুটনি দিয়ে ডাল মোলায়েম করে নিতে হবে।
এবার কড়াইতে খুব অল্প সর্ষের তেল গরম করে বেছে নেওয়া নিমফুলগুলো একটু ভেজে নিতে হবে।
গরম তেলে নিমফুল দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হেঁশেলে একটা দারুণ গন্ধ পাক খাবে। দেখবেন কী যে ভালো লাগবে! ফুলগুলো একটু ভাজা হলেই তুলে নেবেন ।
পুড়িয়ে ফেলবেন না যেন! এবার আর এক চা চামচ তেল অ্যাড করে গরম করুন। তেল গরম হলে পাঁচফোড়ন এবং শুকনো লংকা ফোড়ন দিন। আদাবাটা দিন। ডাল ঢেলে দিন। নিমফুলগুলো ডালের মধ্যে দিয়ে দিন। ডাল ফুটে উঠলে গ্যাস অফ করে দিন।

উচ্ছে পাতার বড়া

উপকরণ: পাঁচ ছ ‘টা উচ্ছে পাতা, কাঁচালংকা কুচি, হাফ কাপ বেসন, হাফ কাপেরও কম চালের গুঁড়ো, নুন, এক চিমটে হলুদ গুঁড়ো, ভাজার জন্য সর্ষের তেল।

প্রণালী: উচ্ছে পাতাগুলো ধুয়ে কুচিয়ে নিন। এবার একটা বড় বাটিতে বেসন, চালের গুঁড়ো, নুন, হলুদ, কাঁচালংকা কুচি, কুচনো উচ্ছে পাতা একটু জল দিয়ে মেখে নিন। তারপর কড়াইতে অল্প সর্ষের তেল গরম করুন। ওই মিশ্রণ অল্প অল্প করে নিয়ে চ্যাপ্টা চ্যাপ্টা করে অনেকক্ষণ ধরে ভাজুন। ডুবো তেলে না ভাজার জন্য সময়টা একটু বেশিই লাগবে।

Image - Food Blog: গরমকালে গ্রামবাংলার সহজ তিন পদ

কাঁচা আম দিয়ে বাটা মাছের ঝাল

উপকরণ: বাটা মাছ ৪ টে, ১ টা মাঝারি সাইজের কাঁচা আম, সর্ষে বাটা ১ টেবিল চামচ, ১ টা শুকনো লঙ্কা, ৩ তে কাঁচা লঙ্কা, ১ চা চামচ পাঁচফোড়ন, নুন, অল্প চিনি,হলুদ গুঁড়ো, সর্ষের তেল।

প্রণালী: মাছগুলোতে নুন হলুদ মাখিয়ে ভেজে নিন।
কাঁচা আমটা ছোট ছোট টুকরো করে নিন।
এবার গ্যাসে কড়াই বসিয়ে কড়াইতে সর্ষের তেল গরম করুন। পাঁচফোড়ন এবং শুকনো লংকা তেলে ছাড়ুন। আমগুলো দিয়ে একটু জল দিন। নুন হলুদ দিন। আম নরম হলে সর্ষেবাটা দিয়ে দিন।
নেড়েচেড়ে ভাজা মাছগুলো দিয়ে দিন। আর একটু জল দিয়ে কিছুক্ষণ ফোটান। চিনি দিন। নামানোর আগে কাঁচা লংকা চিরে মাছে দিয়ে দিন।

You might also like