Latest News

বিহারে বিজেপিকে ঘাড়ধাক্কা, উলটপুরাণ দেশেও সম্ভব, তবে…

অমল সরকার

বিহারের রাজনীতিতে (Bihar Politics) পরিবর্তন আসন্ন, গত ২৫ এপ্রিল দ্য ওয়াল-এর একটি প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল। নানা সম্ভাবনা হিসাবে তাতে নীতীশ কুমারের ‘ঘর ওয়াপসি’ অর্থাৎ ফের লালুপ্রসাদের (Lalu Prasad Yadav) হাত ধরার কথাও বলা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তাই হল।

Image - বিহারে বিজেপিকে ঘাড়ধাক্কা, উলটপুরাণ দেশেও সম্ভব, তবে...

এই অনুমানের জন্য রাজনীতির পণ্ডিত হওয়ার দরকার পড়ে না। রোজকার রাজনীতির খবর রাখা সকলেই বুঝতে পারছিলেন বিজেপি-জেডিইউ জোটের পিচে হঠাৎই খুব ঘূর্ণি। তার জেরেই উলটপুরাণ।

উলটপুরাণই বটে। সরকার ভাঙা-গড়াটা বিগত সাত-আট বছর ধরে বিজেপির মনোপলি হয়ে দাঁড়িয়ে দেশে। এই কাজে তারা চিবিয়ে, চুষে খাওয়ার বিলম্ব এড়াতে বিরোধী দলশাসিত সরকারগুলিকে স্রেফ গিলে নিচ্ছে। মহারাষ্ট্রে শিবসেনা জোটের সরকার খাওয়ার দৃশ্য তো গোটা দেশ টিভির পর্দায় লাইভ দেখল।

পড়শি রাজ্যের বিজেপি-বান্ধব যে কংগ্রেস বিধায়কেরা টাকার থলি-সহ এ রাজ্যে ধরা পড়লেন, এমনও তো হতে পারে যে, ঝাড়খণ্ড ও বাংলা, দুই রাজ্যেই তাঁদের খেলতে নামানো হয়েছিল। তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীর একাংশের যা টাকার খাঁই হয়েছে, তাতে এ রাজ্যেও কেনাকাটা খুব একটা কঠিন বলে মনে হয় না। কে বলতে পারে, পার্থ চট্টোপাধ্যায় টাকা জমিয়ে শিন্ডে হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন না!

বিহারে ঘটল উল্টোটা। বিজেপিকেই ঘাড়ধাক্কা দিলেন নীতীশ (Nitish Kumar)। টিডিপি, অকালি দল, শিবসেনা, অল ঝাড়খণ্ড স্টুডেন্টস ইউনিয়নের পর জেডিইউ বেরিয়ে গেল এনডিএ থেকে। অটল বিহারী বাজপেয়ি, লালকৃষ্ণ আদবানিদের ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স এখন কংগ্রেসের ইউপিএ-এর মতো, স্রেফ কাগজে-কলমে টিকে।

লক্ষণীয় হল, ‘যেতে নাহি দিব’ বলে কোনও শরিকেরই হাত চেপে ধরেননি নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহেরা। ব্যতিক্রম নীতীশ কুমার। বিজেপির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব নানাভাবেই বিহারের মুখ্যমন্ত্রীকে এনডিএ-তে ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। কারণ ভাঙনের সম্ভাব্য পরিণতিটা তাঁদের জানা। কে না বোঝে, নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) কিছুতেই চাইতে পারেন না, নীতীশ কুমারের মতো স্বচ্ছ ভাবমূর্তির একজন রাজনীতিক এবং দক্ষ প্রশাসক বলে সুখ্যাতি অর্জন করা মুখ্যমন্ত্রী ২০২৪-এ প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হোন!

২০১৪-তে প্রধানমন্ত্রিত্বে আবির্ভাবে মোদীর অস্ত্র ছিল দুর্নীতিমুক্ত, দক্ষ প্রশাসকের ভাবমূর্তি। আবার গুজরাত দাঙ্গার কলঙ্কও ছিল, নীতীশ কুমার যা থেকে মুক্ত। আর এই তো মাস কয়েক আগে নিউজ এজেন্সি এএনআই-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিহারের মুখ্যমন্ত্রীকে ‘ইমানদার রাজনীতিক’ আখ্যায়িত করে স্বয়ং মোদী গর্ব করে বলেছেন, ‘নীতীশজি আমাদের সঙ্গে আছেন।’

তবে একথাও ঠিক, বিজেপির একাংশ, বিশেষ করে মোদী-শাহ জুটি নীতীশ কুমারের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়ার আগে থেকেই আত্মবিশ্বাসী, ২০২৪-এ বিজেপি একাই দুই তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে ক্ষমতায় ফিরবে। একটি ভোট সমীক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান হালে তেমন ইঙ্গিতও দিয়েছে। কিন্তু নীতীশের ছকে তা ধাক্কা খেল, সন্দেহ নেই। ২০২৪-এর আগে জেডিইউ, শিবসেনা, অকালি, টিডিপির মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক দলকে বিজেপির পাশে পাওয়ার আশা কম। মনে রাখতে হবে ২০১৯-এ বিজেপির ঝুলিতে আসা ৩০৩ আসনের মধ্যে শরিকদের ভোটও ছিল। ২০২৪-এর আগে বিজেপি ছোট ছোট শরিকদের সঙ্গে নিয়ে হয়তো বিধানসভা ভোটে বাজিমাত করবে, কিন্তু সেই ক্ষুদ্র শরিকেরাই লোকসভা ভোটে দাগ কাটতে পারবে না। সেটাও বিজেপির বিপদ।

কিন্তু অনেক ভোট বিশেষজ্ঞ এরপরেও বলছেন, মোদীই ফের ভারতভাগ্যবিধাতা। এমন ভবিষ্যদ্বাণীর কারণ একটাই, বিরোধীদের দুর্দশা। ইতিপূর্বে কয়েকটি লেখায় বলেছি, নরেন্দ্র মোদী এখনও পর্যন্ত অপ্রতিরোধ্য, কারণ তাঁকে কেউ আটকানোর চেষ্টাই করেনি। তিনি সেই মসৃণ এক্সপ্রেসওয়েতে গাড়ি ছুটিয়েছেন, যে রাস্তায় সব সিগন্যাল সবুজ। ২০১৪ এবং ’১৯-এর লোকসভা ভোটের আগে বিরোধীরা যে যেখানে শক্তিশালী, মোদীকে সে সেখানে কালো পতাকা দেখিয়েছে মাত্র। নিজেদের বিবাদ ভুলে জোট বেঁধে মোদীকে আটকানোর চেষ্টা হয়নি। ফলে তাঁর দিল্লি যাত্রায় বিঘ্ন ঘটেনি। বিহারের রাজনীতির সদ্য অনুষ্ঠিত পরিবর্তনটি বিজেপি বিরোধীদের জন্য এই কারণেই প্রাসঙ্গিক এবং শিক্ষণীয়।

Image - বিহারে বিজেপিকে ঘাড়ধাক্কা, উলটপুরাণ দেশেও সম্ভব, তবে...

লালুপ্রসাদ ও নীতীশ—দু’জনেই জীবন সায়াহ্নে পৌঁছেছেন। নীতীশ ফের অবস্থান বদল না করলে বলা চলে জয়প্রকাশ নারায়ণের দুই ভাবশিষ্যের ধর্মনিরপেক্ষতার ঝাণ্ডা হাতে নিম্নবর্গের স্বার্থে রাজনীতির একটি বৃত্ত সম্পূর্ণ হতে চলেছে। লালুপ্রসাদের বড় ছেলে তেজপ্রতাপ শনিবার বাবার সঙ্গে চাচা নীতীশের একটি সাদা কালো ছবি-সহ টুইট করেন, ‘যখন কেউ তোমার পাশে থাকে না, বড়ভাই তখনও পাশে থাকে।’

সেই বড় ভাইয়ের সঙ্গ ছেড়ে ছোট ভাইয়ের নিজের দল তৈরি, বিজেপির সমর্থনে সরকার গঠন, পশুখাদ্য কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত আরজেডি সুপ্রিমোকে বিহারের রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে তাঁকে রাঁচির জেলে পাঠানোর ছলাকলা করা সত্ত্বেও শুধুমাত্র বিজেপি বিরোধিতার প্রশ্নে লালুপ্রসাদ কিন্তু নীতীশের দিকে হাত এগিয়ে দিতে কুণ্ঠা করেননি। ২০১৫-র পর ২০২২। এর আগে-পরে লালুর হাত ছেড়ে নীতীশ চলে গিয়েছেন বিজেপির সঙ্গে। অন্যদিকে, বিজেপি বিরোধী অবস্থানে অনড় লালুপ্রসাদ সব রাজনৈতিক বিরোধ পাশে ঠেলে নীতীশকে বিজেপির সঙ্গ ছাড়া করতে সমর্থনের হাত বাড়িয়েছেন।

অন্যদিকে, প্রায় ১৭ বছর বিজেপির সঙ্গে ঘর করা সত্ত্বেও একমাত্র কৃষি বিল বাদে নরেন্দ্র মোদীর সরকারের কোনও বড় সিদ্ধান্তেই সায় দেননি জেডিইউ নেতা। ডিমনিটাইজেশন দিয়ে শুরু, শেষ অগ্নিপথে। মাঝে তিন তালাক বিরোধী আইন, কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার, সিএএ-এনআরসি— নীতীশের বিজেপি বিরোধিতার তালিকা দীর্ঘ।

বিজেপির সঙ্গ ছাড়ার আগে নরেন্দ্র মোদীর দলিত, পিছড়া, ওবিসি দরদী ভাবমূর্তির ফানুসটিও তিনি ফুটো করে দিয়েছেন জাত গণনার দাবি তুলে। উচ্চবর্ণের সঙ্গে বিজেপির স্বাভাবিক সম্পর্ক ধাক্কা খাওয়ার আশঙ্কায় নিজে ওবিসি এবং একদা চা-ওয়ালা নরেন্দ্র মোদী কিছুতেই জাত গণনায় সায় দেননি। বিহারে সেই গণনার কাজ শুরু হয়েছে। সমীক্ষার ফল বলে দেবে নিম্নবর্গের মানুষ আর্থ-সামাজিক মানদণ্ডে কোথায় দাঁড়িয়ে। যাকে বলা হচ্ছে মণ্ডল-রাজনীতির দ্বিতীয়-পর্ব। তাতে বিহারের রাজনীতি নয়া মোড় নেওয়া অসম্ভব নয়।

প্রশ্ন হল, বিহারে যা হল, তা কি গোটা দেশে সম্ভব? ৪৭ বছর আগে বিহারের মাটি থেকেই জয়প্রকাশ নারায়ণ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের একজোট হওয়ার ডাক দিয়েছিলেন। সেই ভারতে নেহরু কন্যার তাঁবেদার বাহিনী বলে বেড়াত, ‘ইন্দিরা ইজ ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া ইজ ইন্দিরা।’ আজকের ভারতে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর দিল্লির মসনদে আসীন হওয়াকে তাঁর চাটুকাররা দেশের প্রকৃত স্বাধীনতা প্রাপ্তি বলে থাকে। জরুরি অবস্থা পরবর্তী নির্বাচনে ইন্দিরার কী দশা হয়েছিল সকলের জানা। আর তা সম্ভব হয়েছিল, বিভেদ ভুলে বিরোধীরা হাতে হাত রাখায়।

Image - বিহারে বিজেপিকে ঘাড়ধাক্কা, উলটপুরাণ দেশেও সম্ভব, তবে...

গত বছর বাংলায় বিধানসভা ভোটের সময় এক সাক্ষাৎকারে অমিত শাহ জানান, বাংলার পর তাঁদের লক্ষ্য উপকূলবর্তী বাকি রাজ্যগুলি। এখন বাংলা ও কর্নাটক ছাড়া ওই অঞ্চলের আরও কোনও রাজ্যে গেরুয়া বাহিনী স্বস্তিতে নেই। তামিলনাড়ু ও কেরল মিলিয়ে লোকসভার ৫৯টি আসনের একটিতেও বিজেপি নেই। বাংলায় ২০১৯-এর লোকসভা ভোটের পাওয়া ১৮ আসন বিধানসভা ভোটের ফলাফলের নিরিখে পাঁচে নেমে এসেছে। আর কর্নাটকের সরকারটি কেনাকাটার ফসল।

ওড়িশায় নবীন পট্টনায়েকের রাজনীতি বড় বিচিত্র। তিনি সর্ব ভারতীয় রাজনীতিতে বিজেপির পাশে। কিন্তু নিজের রাজ্যে পদ্মের চাষ আটকে রেখেছেন। উত্তরপ্রদেশ, বিহার, গুজরাত, রাজস্থান, হরিয়ানা এবং মধ্যপ্রদেশ মিলিয়ে লোকসভার ২০৪ আসনের মধ্যে এনডিএ-র ঝুলিতে আছে ১৬৩ আসন। বিহারের উলটপূরাণের প্রভাব এই সব রাজ্যে পড়বে না, কে বলতে পারে?

দিল্লি, পাঞ্জাব তো নয়ই, বিজেপি এমনকী হরিয়ানায় সরকার চালালেও দল সেখানে ভাল অবস্থা নেই। উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথের ক্ষমতায় টিকে যাওয়ার মধ্যেই বিরোধীদের সাফল্যের সমীকরণ লুকিয়ে। সমাজবাদী পার্টি সরকার গড়তে না পারলেও আসন ও ভোট অনেকটা বাড়িয়ে নিয়েছেন অখিলেশ যাদব। ৬৪ আসন বেড়েছে তাঁর, বিজেপির কমেছে ৫৭। বিভেদ ভুলে লোকসভা ভোটে সেখানে এসপি-বিএসপি-কংগ্রেস জোট করলে গেরুয়া শিবিরের অঙ্ক ওলটপালট হওয়া অসম্ভব নয়।

Image - বিহারে বিজেপিকে ঘাড়ধাক্কা, উলটপুরাণ দেশেও সম্ভব, তবে...

তারপরেও মোদী ও বিজেপির বিজয় রথ থমকাবে কিনা, তার অনেকটা নির্ভর করছে কংগ্রেসের উপরও। আঞ্চলিক দলগুলির কংগ্রেস বিরোধিতার কারণ অজানা নয়। বিগত কয়েক বছর শতাব্দীপ্রাচীন দলটিকে আঞ্চলিক দলগুলির হেলাফেলা করার পিছনে বিজেপির উস্কানিই একমাত্র কারণ নয়। আসলে সংসদে দ্বিতীয় বৃহত্তম দলটির মাঠে-ময়দানের লড়াইয়ের উপস্থিতি নগণ্য। সনিয়া গান্ধী দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের সামনে আশার আলো তুলে ধরতে ব্যর্থ। কংগ্রেস তেড়েফুঁড়ে উঠলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, কেজরিওয়াল, কেসিআররা উপেক্ষা করতে পারবে না সবচেয়ে প্রাচীন দলটিকে।

আসলে নির্বাচন হল, মন্দের ভাল বেছে নেওয়ার ব্যবস্থা। আদর্শ সরকার হল সোনার পাথরবাটির মতো, এক কথায় অসম্ভব। জনগণের মৌলিক চাহিদাগুলি মেটাতে পারাটাই কোনও সরকারের টিকে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। নরেন্দ্র মোদীর সরকার এক্ষেত্রে বিরাট এক বিস্ময়। দারিদ্র্য, বেকারি, খাদ্যসামগ্রী-সহ নিত্যপণ্যের আকাশছোঁয়া দাম সত্ত্বেও টিকে যাচ্ছে বিরোধীদের অনৈক্য, রাজপথে অনুপস্থিতি এবং বিকল্প, বিশ্বাসযোগ্য কর্মসূচির অভাবে। স্বাধীনতার ৭৫তম বর্ষে দুর্নীতি, খুন-ধর্ষণের মরুদ্যানে পরিণত হয়েছে ভারত। কোনও দলই তা থেকে মুক্ত নয়। আরও বড় বিপদ, মোদী-শাহের জমানায় অপরাধের তুলনায় খুনি, ধর্ষকের ধর্ম প্রধান বিচার্য হয়ে উঠেছে। ধর্মনিরপেক্ষ সর্বভারতীয় দল হিসাবে এই ভারতকে সঠিক পরে চালিত করতে কংগ্রেস ব্যর্থ।

সমস্যা হল, কংগ্রেস তার নিজের শক্তি বুঝতে ব্যর্থ। স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস, গান্ধীজয়ন্তীর দিনে বিচ্ছিন্ন, অসংগঠিত নানা অনুষ্ঠান, জাতীয় পতাকা উত্তোলন ইত্যাদিতে টের পাওয়া যায় ঝোপজঙ্গলে ঢাকা পড়ে থাকা মনসার থানের মতো পাড়ায় পাড়ায় কংগ্রেস আছে। আর সেটা সবচেয়ে ভাল জানেন, বোঝেন নরেন্দ্র মোদী। তাই মাত্র দু’টি রাজ্যে ক্ষমতাসীন দলটিই তাঁর কাছে টার্গেট নন্বর ওয়ান।

নারীশক্তির প্রথম ধাপ কন্যাশ্রী, প্রকল্পের বর্ষপূর্তিতে টুইট-শুভেচ্ছা মুখ্যমন্ত্রীর

You might also like