Latest News

BG Press: হেরিটেজ বিক্রির হাটে বিজি প্রেস, ইতিহাস-ঐতিহ্যের বুকে হাতুড়ি

ডাঃ স্বপন কুমার গোস্বামী

Dr. Swapan Goswami

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক সুকান্ত চৌধুরীর সুলিখিত এক নিবন্ধ ‘এক অমূল্য ইতিহাস অন্তর্হিত হওয়ার আগে যদি সচেতন হই’– শিক্ষিত গুণীজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও তাতে অশিক্ষিত প্রমোটার বাহিনীর কোনওপ্রকার হেলদোল দেখা দেবে না এ বিষয়ে নিশ্চিত। কারণ এখানে হেরিটেজ বিজি প্রেস (BG Press) ধ্বংসের মূল হোতা রাজ্য সরকার। কাজেই বিজি প্রেসের মতো ঐতিহ্যমণ্ডিত প্রতিষ্ঠানের শতবর্ষ উদযাপনের বদলে সেটাকে ধ্বংস করে সেখানে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট তৈরি করা সময়ের অপেক্ষা মাত্র।

মুদ্রণের (Printing) ইতিহাসের স্থায়ী সংগ্রহশালা পাশ্চাত্যের প্রথম মুদ্রাকর গুটেনবার্গের (Johannes Gutenberg) জার্মানির মাইনৎসে গড়ে উঠেছে। মুদ্রণের প্রথম যুগের পীঠস্থান অ্যান্টওয়ার্পে, মুদ্রণের আদি জন্মভূমি বেজিং বা দক্ষিণ কোরিয়ার চেয়াংজুতে মুদ্রণ সংগ্রহালয় গড়ে উঠলেও অশিক্ষিতের পশ্চিমবঙ্গে এই জাতীয় স্থায়ী মুদ্রণ সংগ্রহশালা তৈরি করতে দেওয়া হবে না।

আরও পড়ুন: আজ কেরলে শুরু সিপিএমের পার্টি কংগ্রেস, সঙ্গী বিতর্কিত কে-রেল, কী সেটা?

সুকান্তবাবু লিখেছেন, ‘বিজি প্রেস এবং অন্যান্য সরকারি ছাপাখানা মুদ্রণযন্ত্র ও আনুষঙ্গিক সামগ্রীর অমূল্য আকর।’ বিজি প্রেসের জমি নিলামের সঙ্গে সেগুলিও নিলামে তোলা হলে ভারতীয় মুদ্রণের ইতিহাসের উপাদান রক্ষার শেষ সম্ভাবনা অন্তর্হিত হবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে সারা বিশ্ব। তাই এশিয়ার একদা বৃহত্তম ওয়েস্ট বেঙ্গল গভর্নমেন্ট প্রেসের ঐতিহ্য মণ্ডিত সামগ্রীর বিলুপ্তি না ঘটিয়ে ওই প্রকল্পের মধ্যেই এক মুদ্রণ সংগ্রহালয় গড়ে তোলা দরকার। ইতিহাস বলবে বিজি প্রেস বিল্ডিংয়ের মধ্যে প্রিন্টিং প্রেসের সংগ্রহালয় কেউ তৈরি করবে কি না।

BG Press

ঐতিহ্যমণ্ডিত শতবর্ষ প্রাচীন বিজি প্রেসের মধ্যে রয়েছে একটি মুল্যবান গ্রন্থাগার যার বইয়ের সংগ্রহ ঈর্ষনীয়। হাজার হাজার বইয়ের এই অমূল্য সংগ্রহশালাটি করোনাকাল থেকে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। তারপরে আমফান ঝড় জলে বইগুলির কী অবস্থা কে জানে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকার কি এই বিরাট লাইব্রেরিটি সংরক্ষণ করবে না বইগুলি কিলোদরে বিক্রি করে দেবে, সেটাই বা কে জানে। এই লাইব্রেরিটি বাঁচাতে না পারলে, এর বইগুলির যথোপযুক্ত ব্যবস্থা অবলম্বন না করলে বইপ্রেমিকদের এক বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে।

BG Press

বিজি প্রেসের কর্মীরা এই লাইব্রেরিটিকে বুক দিয়ে এতকাল আগলে রেখেছেন। এই বইগুলির ভবিষ্যৎ কল্পনা করে বা পরিণতি চিন্তা করে চোখের জল ফেলছে। যারা বিজি প্রেসের বিশাল এলাকার জমি নিলামে কিনবে তারা এই গ্রন্থাগারের সম্মান রাখবে কি না মা সরস্বতীই জানেন।

BG Press

কারণ এখানে সরস্বতীর কমলবনে মত্ত হাতির তাণ্ডব চলবে। যারা টাকা দিয়ে জমি কিনবে তারা ওইসব ফালতু সেন্টিমেন্টের ধার ধারে না। লাইব্রেরি বিল্ডিং ভেঙে বহুতল উঠলে অনেক লাভ। বই শুধুই জায়গা জুড়ে থাকবে।

এছাড়া বিজি প্রেসের এক মূল্যবান ‘পাবলিকেশন ডিভিশন’ আছে যেটা ইতিহাসের মূল্যবান আকর। ব্রিটিশ আমলের ‘সুপারিনটেন্ডেন্ট অফ প্রিন্টিং’ ব্রিটিশ সাহেব হলেও ‘খনার বচন ও কৃষি কাজ’, ‘চিত্রে ইতিহাস’ থেকে ‘ইন্ডো টিবেটান ডিক্সনারি’, ‘ডে’জ অফ জন কোম্পানি’ জাতীয় মহা মূল্যবান বই এই পাবলিকেশন ডিভিশন থেকে প্রকাশ করেছিলেন।

BG Press

পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষা অধিকারের যাবতীয় বই এখান থেকে ছাপা হত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি এখান থেকে প্রকাশিত হয়ে চলেছে সেটি হল ‘ক্যালকাটা গেজেট।’ পাবলিকেশন সেকশনে এরকম লাখ লাখ অমূল্য ডকুমেন্ট ডাম্প হয়ে পড়ে আছে পুরোপুরি ধ্বংসের অপেক্ষায়।

পশ্চিমবঙ্গের ‘অ্যানিম্যাল ফার্মে’ প্রকৃত শিক্ষিত মানুষের বড়ই অভাব– যারা এই সবের মূল্যায়ন করতে পারে। বিজি প্রেস নিলামে তুলতেই যারা ব্যগ্র তারা ঐতিহ্য সংরক্ষণ নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবিত নয়। দার্জিলিংয়ের বিজি প্রেস আগেই বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। আলিপুর জেল প্রেস তুলে দেওয়া হয়েছে।

BG Press

ইংরেজ আমলে সরকারের যাবতীয় ছাপার কাজের জন্য বেঙ্গল গভর্নমেন্ট প্রেস গঠন করা হয়েছিল ডালহৌসি স্কোয়ার অঞ্চলে। ১৯২৩ সালে বেঙ্গল গভর্নমেন্ট প্রেস আলিপুরে সাড়ে পাঁচ একর জমির ওপরে নির্মিত বিশাল প্রাসাদোপম বাড়িতে ৩৮, গোপাল নগর রোডের স্থায়ী ঠিকানায় স্থানান্তরিত হয়। ২০২২ সালে ওয়েস্ট বেঙ্গল গভর্নমেন্ট প্রেসের শতবার্ষিকী উৎসব পালনের বদলে বুলডোজার দিয়ে ধ্বংসলীলা শুরু হয়ে গেল রাজ্য সরকারের সৌজন্যে।

BG Press

সরকারি গেজেট, বাজেট, নানান ধরনের ফর্ম, সরকারি ক্যালেন্ডার, পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষা অধিকারের যাবতীয় বইপত্র, রাজ্য লটারির টিকিট, ব্যালট পেপার, কোশ্চেন পেপার এবং কনফিডেন্সিয়াল কাগজপত্র ছাপার বিশাল পরিকাঠামো ছিল এই বিজি প্রেসের। যে জন্য এক সময়ে বিজি প্রেসের এশিয়ার বৃহত্তম প্রেস তকমা মিলেছিল।

লাইনো মনোকাস্টিং প্রভৃতি বিভাগের ও মেশিন সেকসনের বিরাট বিরাট দৈত্যের মত একতলা সমান উঁচু ছাপার মেশিনে নিমেষে লাখ লাখ ব্যালট পেপার ছাপা হয়ে যেত। একবার ইম্প্রেসনেই ধুতি কাপড়ের মত বিরাট আকারের মত কাগজে ব্যালট ছেপে বেরিয়ে আসত। রিডিং সেকসনে নিমেষে প্রুফ দেখার কাজ হয়ে যেত। এরপরে কাটিং বাইন্ডিং সব মিলিয়ে এলাহি ব্যাপার ছিল।

এই প্রধান বিল্ডিংকে ঘিরে বিশাল চত্বরে নানা দুষ্প্রাপ্য ফুল-ফলের গাছ ছিল। আম, জাম, বেল, বাসক, গাঁদাল, কাঁঠাল, নাগচম্পা, কামিনী কাঞ্চন, মহুয়া, সপ্তপর্ণী ইত্যাদি বহু ধরণের গাছ। বাহারি ফুল ও পাতাবাহার গাছে রাস্তার দুপাশ সাজানো ছিল।

বিজি প্রেসের পশ্চিম দিকে ছিল সুপারিনটেন্ডেন্ট অফ প্রিন্টিংয়ের বাংলো। এই বাংলোর সামনে ফুলের বাগান, পিছনে কিচেন গার্ডেন, দোলনা ও টেনিস কোর্ট ছিল। সাহেব সুপারিন্টেনডেন্ট থাকাকালীন এই বাংলোর সামনের রাস্তায় কর্মচারীদের প্রবেশ নিষেধ ছিল। এই পথ ছিল কেবল গেজেটেড অফিসারদের গাড়ি চলার জন্য।

এই বাংলোয় কর্মজীবনে বিজি প্রেসের মেডিক্যাল অফিসার থাকাকালীন কুড়ি বছর বাস করার সৌভাগ্য হয়েছিল। এই বাংলো বুলডোজার দিয়ে ভেঙে মাঠ বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। হেরিটেজ তকমা পাওয়া এই বিজি প্রেস আজ সরকারি উদ্যোগে বুলডোজারের ঘায়ে ক্ষতবিক্ষত।

(লেখক বিজি প্রেসের অবসরপ্রাপ্ত মেডিক্যাল অফিসার। মতামত ব্যক্তিগত)

You might also like