Latest News

মাথার উপর পাক বাহিনীর গোলা বর্ষণ চলছে, মোটর সাইকেলে ছুটলাম সিগন্যাল সারাতে

আনন্দময় বাগচী

(অবসরপ্রাপ্ত উইং কম্যান্ড, ভারতীয় বায়ুসেনা)

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১। ভারতের পূর্বাঞ্চলের সেনা প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার উপস্থিতিতে পাকিস্তানের সেনা কর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল একে নিয়াজি যুদ্ধের ১৩ দিনের মাথায় আত্মসমর্পণের দলিলে সই করেন। জন্ম হয় স্বাধীন বাংলাদেশের। আগামীকাল সে দেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর সঙ্গেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতীয় সেনার যুদ্ধ বিজয়ের পঞ্চাশ বছর। বীরগাথায় দ্য ওয়াল-এর শ্রদ্ধার্ঘ্য।

যুদ্ধ হবে হবে এই আবহ তখন তৈরি হয়ে গেছে। হেড কোয়াটার্স থেকে বিভিন্ন অর্ডার আসছে। শোনা যাচ্ছে হামলার ছক কষছে পাকিস্তান। কিন্তু যতক্ষণ না হামলা শুরু করছে পাল্টা জবাব দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে না। এই আবহের মধ্যেই ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তানের বিমান দেখা গেল আকাশে।

তখন স্কোয়াড্রন লিডার বিমানগুলির দিকে আঙুল দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘ওই দেখ ওরা এসে গেছে’। সত্যি বলছি দেখে শান্তি হয়েছিল। যুদ্ধ হবে হবে এই পরিস্থিতির থেকে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়া অনেক ভাল। যাই হোক, এরপর টানা ১৪ দিন পাকিস্তানের বিমানগুলি সঙ্গে লড়াই চলল আমাদের বিমান বাহিনীর।

১৯৭১-এর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সেই দিনগুলির কথা খুব মনে পড়ে। আমি তখন সবে কয়েক মাস বিমান বাহিনীতে যোগ দিয়েছি। সিগন্যাল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব সামলাচ্ছি পাঞ্জাবের পাঠানকোট এয়ারবেসে। বর্ডারের খুব কাছেই ছিল আমাদের এয়ারবেস। পাকিস্তানের উদ্দেশ্যই ছিল ভারতের পশ্চিম অংশে যত এয়ারবেস আছে তা বোম্বিং করে নষ্ট করে দেওয়ার। যাতে ভারতীয় সেনা বিমান উড়তে না পারে এবং তাদের পাল্টা আক্রমণ করতে না পারে।

পাকিস্তানের সেই ইচ্ছা পূরণ হয়নি। আমরা যারা গ্রাউন্ডে কাজ করতাম, সবসময় সজাগ থাকতাম যাতে কোনওভাবেই এয়ারবেস নষ্ট না হয়। সামান্য ক্ষতি হলেই তৎক্ষণাৎ তা মেরামতি করে ফেলতাম। নানান সময়ে নানান অসুবিধা সামনে এসেছে, কিন্তু তা খুব দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে গেছেন গ্রাউন্ড স্টাফরা। আমি তখন সিগন্যাল অফিসার।

একটা ঘটনা বেশ মনে আছে। ক্যাম্পে খবর এল পাকিস্তানের বোমার আঘাতে আগুন লেগে গেছে ট্রান্সমিটারে। ক্যাম্পের থেকে একটু দূরেই ছিল এই ট্রান্সমিটার রুম। তৎক্ষণাৎ সেই ট্রান্সমিটার না সারালে পুরো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। শোনা মাত্রই বাইক নিয়ে ছুটলাম ট্রান্সমিটার ঠিক করতে। যাচ্ছি যখন, মাথার উপর গোলা বর্ষণ চলছে। ভয়ে সাময়িক হাত কেঁপে যাচ্ছিল। পরক্ষণেই মনে জোর ফিরে এল। তখন বোমা বর্ষণ তোয়াক্কা না করেই পৌঁছে গেলাম ট্রান্সমিটার রুমে। ঠিক করার পর, কর্মীদের মধ্যে কী উল্লাস। আজও মনে পড়ে সেই কথা।

এমন গোলা বর্ষণের মধ্যে প্রায়ই বেরিয়ে পড়তে হত আমাদের। যেহেতু গ্রাউন্ড সাপোর্ট ছিল আমাদের হাতে তাই সেটা ঠিক রাখতেই হত। এমনই একদিন এটিএসের থেকে খবর এল এডি২১০সি-র একটা অ্যান্টেনা বোমার আঘাতে নষ্ট হয়ে গেছে। এই এডি২১০সি-র মাধ্যমেই ভারতীয় সেনা বিমান দিক ঠিক রেখে এয়ারবেসে পৌঁছাত। হাতে এক ঘন্টা সময়, তার মধ্যেই পাকিস্তান থেকে ফিরবে আমাদের বিমানগুলি। যা করতে হবে এই এক ঘণ্টার মধ্যেই। বাইরে তখন সমানে বোমা-গুলি চলছে। তার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম, যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ঠিক করতে হল ওই অ্যান্টেনা।

১৪ দিন আমাদের রোজ কিছু না কিছু ঘটনা ঘটত। আমাদের লক্ষ্য ছিল একটাই কোনভাবে এয়ারবেস নষ্ট করতে দেওয়া যাবে না। এই পরিস্থিতিতে মাথায় থাকত একটাই কথা, ‘যে গুলি আসছে তা আমার লাগবে না’, এই মন্ত্র নিয়েই সেনারা লড়াই করেন।

এই সময়ে আমাদের খুব সাহায্য করেছে আশেপাশের মানুষেরা। যা যা প্রয়োজন তা পেয়ে যেতাম আশেপাশের গ্রাম থেকেই। একটা কথা মনে পড়ে, কী করে জানি না আমাদের বিমানের ওড়ার খবর চলে যাচ্ছিল পাকিস্তানের কাছে। খবর আসে ইন্টেলিজেন্স থেকে। সেইদিনই একদল বাহিনী আসে ব্যাপারটা খতিয়ে দেখার জন্য। অনেক খোঁজ করে দেখা যায়, দূরে পাহাড়ে এক জায়গা থেকে রাতে আলো দেখা যাচ্ছে। স্থানীয়দের সহায়তার সেখানে পৌঁছে দেখা গেল ওটা ছিল এক সন্ন্যাসীর হুঁকোর আগুন। সেই আগুন দেখেই এয়ারবেসের খবর পেত পাকিস্তানীরা।

এভাবেই ১৪ দিন টানা লড়াই চলেছে। পাকিস্তানের উদ্দেশ্যই ছিল পশ্চিম দিকে আমাদের ব্যস্ত রাখা, যাতে আমাদের সাহায্য পূর্ব পাকিস্তানে না পৌঁছায়। কিন্তু শত্রুদের সেই ইচ্ছা পূরণ হয়নি। আমাদের এয়ারবেস ধ্বংস করতে পারেনি। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে যুদ্ধের জন্য সহযোগিতা আকাশ পথে রুখে দিয়েছিলাম আমরা।

তারপর যখন বাংলায় ফোর্ট উইলিয়ামে এসে একবার বাংলাদেশে যাওয়ার সুযোগ এসেছিল। কিন্তু কাজের চাপে যেতে পারিনি। তবে ওই দেশে সেই সময় লড়াই করা বাঙালির সঙ্গে কলকাতায় দেখা হয়েছে। গল্প করেছি। তাঁদের চোখে মুখে ছিল কৃতজ্ঞতার ছাপ। তাঁরা বলেছিল, তাঁদের দেশের সবাই আমাদের খুব শ্রদ্ধা করে।

বাঙালি হিসেবে সবসময়ই মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গর্ববোধ হয়। একটা জাতি এভাবে লড়াই করতে পারে তা না দেখলে বোঝা সম্ভব নয়। সেই সময় প্রায় ৯০ হাজারেরও বেশি পাক সেনা বন্দি হয়েছিল। যা বিশ্বের যুদ্ধের ইতিহাসে দ্বিতীয় নেই। ৫০ বছর পরও সেই দিনগুলো চোখে ভাসে।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা সুখপাঠ

You might also like