Latest News

Bagtui Massacre: এখন যদি পঞ্চায়েত ভোট হত, বগটুইয়ের বোমা, আগুন প্রাণ কাড়ত কাদের?

অমল সরকার

  • গঙ্গার ঘাটে বিস্ফোরণে কিশোরের মৃত্যু, আহত ৩ শিশু-সহ বেশ কয়েক জন
  • পরিত্যক্ত বাড়িতে বল ভেবে খেলতে গিয়ে বিস্ফোরণ, নন্দীগ্রামে মৃত এক শিশু, আহত ২
  • ভোটের আগের দিন টিটাগড়ে বোমা বিস্ফোরণ, মৃত্যু এক জনের, আহত ১
  • বোমা বাঁধতে গিয়ে বিস্ফোরণে উড়ল দু’টি হাত
  • বিকট বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল তৃণমূল কার্যালয়, আহত কমপক্ষে ৩
  • তিন দিন পরই জন্মদিন, নাগেরবাজারে বিস্ফোরণে মৃত্যু ৮ বছরের বালকের
  • উনুনে লুকোনো বোমা, আঁচ দিতেই বিস্ফোরণে উড়ল বধূর হাত

উপরের লাইনগুলি এ রাজ্যে বিস্ফোরণের নানা ঘটনার সংবাদ শিরোনাম। বিস্ফোরণ ছাড়াও গুলি, ছুরির আঘাতে হতাহতের ঘটনাও অগুনতি। গুগলে এমন সব ঘটনার খোঁজখবর করতে গিয়ে দেখা গেল, এই ব্যাপারে আমরা রীতিমত আন্তর্জাতিক স্তরে অবস্থান করছি । মালদহ, বীরভূম কিংবা কোচবিহার বা কলকাতায় বিস্ফোরণের খবরের মাঝেই গুগলের তালিকায় ভেসে ওঠে এই সব শিরোনাম—

  • আফগানিস্তান: মসজিদে বড়সড় বিস্ফোরণ, মৃত ৩২, আহত ৫৩
  • ভয়াবহ বিস্ফোরণ বেইরুটে, নিহত অন্তত ৭৮, আহত কয়েক হাজার
  • ভয়াবহ বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল ঢাকার মগবাজার, মৃত এখনও ৭, গুরুতর আহত ১০
  • পাকিস্তানে বিস্ফোরণ, মৃত কমপক্ষে ৩০

বাংলায় বেশিরভাগ ঘটনার পিছনেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে জড়িয়ে থাকে রাজনীতি (Bagtui Massacre)। তা সে খেলতে খেলতে বোমাকে বল ভাবায় দুধের শিশুর মৃত্যুই হোক কিংবা বিস্ফোরণে দলীয় কার্যালয় উড়ে যাওয়া। শেষ কথা সেই রাজনীতি (Bengal Politics)।

শেষ কথা আরও একটি আছে। বেশিরভাগ ঘটনাতেই পুলিশ-প্রশাসন জোর গলায় দাবি করতে থাকে, ঘটনার সঙ্গে রাজনীতির যোগ নেই! কখনও বলা হয় গ্রাম্য বিবাদ, কখনও পারিবারিক গোলমাল। পুলিশেরই বয়ান মতো রামপুরহাটের বগটুইয়ের ঘটনাটিকে শেষের দুই ক্যাটিগরিতে ফেলা যায়। কিন্তু সেমসাইড গোলও তো গোল। হতে পারে আক্রমণকারী আর আক্রান্ত, এ ক্ষেত্রে দু-তরফই তৃণমূল। কিন্তু মানুষগুলোর কি জীবনের মূল্য নেই? হয়তো দু-পক্ষই নানা অপরাধে জড়িত। তাই বলে এ ভাবে বদলার নামে প্রাণে মেরে ফেলা?

bagtui massacre

বগটুইয়ের ঘটনার পরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন, রাজ্যে বেআইনি অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান শুরু করতে হবে। বিস্ফোরণ যখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন বোমা-বন্দুক উদ্ধারের নির্দেশ দিতে বগটুইয়ে এতগুলি প্রাণ অকালে চলে যাওয়ার পর কেন তাঁর বোধোদয় হল, সে প্রশ্ন মুখ্যমন্ত্রী নিজেকে করলে তবেই রাজ্যের মঙ্গল।

অনুমান করা যায়, সোমবার অফিস খুললে পুলিশকর্তারা উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের হিসেব এবং গ্রেফতারের সংখ্যা প্রকাশ করবেন। তবে বিস্ফোরণের ঘটনা যেভাবে কালীপুজোয় পটকা ফাটানোর পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে, তাতে এই আশঙ্কা অমূলক নয় যে রাজ্যকে সত্যিই বোমা-বন্দুক মুক্ত করতে হলে পুলিশকে বাকি কাজ বন্ধ রাখতে হবে। তার চাইতেও বড় প্রশ্ন, অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশ সত্যিই কতদূর অগ্রসর হবে। শহরতলিতে শাসকদলের এক কাউন্সিলরকে যেভাবে ভরসন্ধ্যায় মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে খুন করা হল, তাতে সহকর্মী শোভন চক্রবর্তীর দিন কয়েক আগের লেখা থেকে ধার নিয়ে বলছি, ‘মানুষের মুণ্ডু এখন বোঁটার ফুল, ইচ্ছে হলেই ছিঁড়ে নেওয়া যায়।’

আরও পড়ুন: মানুষের মুণ্ডু এখন বোঁটার ফুল, ইচ্ছে হলেই ছিঁড়ে নেওয়া যায়

অস্ত্র উদ্ধার নিয়ে সংশয়ের আরও একটা কারণ, বছর ঘুরলেই পঞ্চায়েত নির্বাচন। এ রাজ্যে ভোট এখন এমনই উৎসব যে বোমা বিস্ফোরণ সেখানে পরবে বাজি ফাটানোয় পরিণত হয়েছে। অভিজ্ঞতা বলে, রাজ্যে এখন পঞ্চায়েত নির্বাচন চললে বগটুইয়ে তৃণমূলের বোমা, আগুনের শিকার হত বিরোধীরা। অবশ্য তারা আদৌ সেখানে আছে কি না, সে প্রশ্নের জবাব মেলা কঠিন।

bagtui massacre

একজন পাঁচজনের খাবার খেয়ে নিলে বদহজম যেমন অবধারিত, তেমনই কোনও এলাকা বিরোধীশূন্য করে দেওয়া মানেই বিরোধিতা-মুক্ত হয়ে যাওয়া নয়। ঘরোয়া বিবাদই একটা সময়ে এক পক্ষকে কেমন প্রতিপক্ষ করে তোলে, আনিসের গ্রাম তার প্রমাণ। বিগত সব ক’টি নির্বাচনে তৃণমূল সেখানে বিপুল মার্জিনে এগিয়ে থাকলেও রাজ্যের দুই মন্ত্রীকে গ্রামবাসীদের বিক্ষোভের মুখে ফিরে আসতে হল। অদূরেই থাকেন শাসক দলের স্থানীয় বিধায়ক। প্রতিবাদীদের মুখোমুখি হওয়ার সাহস হয়নি তাঁর। বাম সন্ত্রাসের মোকাবিলা করে টিকে থাকা কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত আনিসদের এলাকা এবং লাগোয়া আরও কিছু গ্রাম বিগত কয়েক বছরে কোন জাদুমন্ত্রে ভোটের বাক্সে তৃণমূল হয়ে গেল–তা আর কেউ না জানুক, এলাকাবাসী জানেন!

২০১১-র ভোটে তৃণমূলকে বিপুল সমর্থন জুগিয়েছিলেন বাংলার মানুষ। তার পরেও বাম এবং একদা জোটসঙ্গী কংগ্রেসের বিধায়ক ভাঙানো, পঞ্চায়েত, পুরসভায় দলবদল ঘটিয়ে সেগুলি দখলে নিয়ে তৃণমূল সর্বশক্তিমান হয়েছে বটে, কিন্তু ক্রমে দুর্বল হয়েছে অন্য ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি। ওই ময়দানি রাজনীতি এড়ানো গেলে হয়তো রাজ্য-রাজনীতি অন্য খাতে বইত। তৃণমূলকে সেমসাইড গোলও খেতে হত না।

bagtui massacre

অবশ্য বঙ্গ-রাজনীতির এটাই ক্রনিক ডিজিজ। সিপিএম, তৃণমূল, কংগ্রেস, বিজেপি তো দূরের কথা, এসইউসি, আরএসপি, ফরওয়ার্ড ব্লক–অতীতে যে যেখানে শক্তিশালী ছিল, সেই এলাকাকে তারা মুক্তাঞ্চল বানিয়ে নিয়েছিল। বাসন্তী, গোসাবায় আরএসপি, কুলতলি, জয়নগরে এসইউসি, হুগলির গোঘাট, মুর্শিদাবাদের লালবাগে ফরওয়ার্ড ব্লকের সন্ত্রাস পুরনো খবরের কাগজের পাতা ওল্টালেই জানা যাবে।

কুলতলিতে এক বার এক সাংবাদিককে জ্যান্ত পুঁতে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। কারণ সেই সাংবাদিক সিপিএম-ঘনিষ্ঠ একটি সংবাদপত্রে চাকরি করতেন। যেমন, কেশপুর, গড়বেতা, আরামবাগ একটা সময় ছিল সিপিএমের মুক্তাঞ্চল। ওই সব এলাকাতেই পাল্টা মারের মুখে সে পার্টি ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যায় পরবর্তীতে।

আরও একটু পিছনের দিকে তাকানো যাক, যখন বাংলার রাজনীতির সিংহভাগ জুড়ে সিপিএম আর কংগ্রেস। তৃণমূলের জন্মই হয়নি। বিজেপিও আজকের মতো পল্লবিত নয় এ রাজ্যে। ১৯৮৯। রাজ্য বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু জানান, ১৯৮৮ থেকে ’৮৯, এই এক বছরে রাজ্যে ৮৬ জন রাজনৈতিক কর্মী খুন হয়েছেন। জ্যোতিবাবুর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, নিহতদের ৩৪ জন সিপিএম, ১৯ জন কংগ্রেস, ৭ জন আরএসপি, দু’জন ফরওয়ার্ড ব্লক এবং বাকিরা অন্য দলের সমর্থক।

এত গেল সাধারণ সময়ের পরিসংখ্যান। ভোট মানেই বহু মায়ের কোল খালি হওয়া, বহু মহিলার বিধবা হওয়া যেন স্বতঃসিদ্ধ এই রাজ্যে। ২০০৩-এর পঞ্চায়েত ভোটের কথা ভোলার নয়। ভোটের দিন শুধু মুর্শিদাবাদেই খুন হন ৩৫ জন। সে বছর সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা একশো ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ২০১৩-র তৃণমূল জমানায় পঞ্চায়েত নির্বাচন দশ বছর আগের সেই নির্বাচনেরই পুনরাবৃত্তি বলা চলে। হাজার হাজার আসন বিরোধীশূন্য। তবু ভোটের বলি পঞ্চাশের বেশি মানুষ। ২০১৮-র ভোটেও কম-বেশি একই রকম।

মমতা বন্দ্যোপাধায়ের দল ও প্রশাসন কি ২০২৩-এর পঞ্চায়েত ভোটে এই খুনোখুনি, হানাহানির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে আগ্রহী? আন্তরিকতা নিয়ে সংশয়ের কারণ, পুরভোটের আগে শাসকদল ও প্রশাসনের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও অভিজ্ঞতার বিস্তর ফারাক।

bagtui massacre

মনে আছে, ২০০৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্টের বিপুল জয়ের পরে জ্যোতি বসু বলেছিলেন, ‘আমরা অনেক আসন পেয়েছি। কিন্তু অনেক মানুষ আমাদের ভোট দেননি। সেটা চিন্তার কারণ। এই মানুষের কাছে আমাদের যেতে হবে।’ জ্যোতিবাবু সে দিন পার্টি ও সরকারের জন্যে যে বিপদের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ক’দিন পরই তা মিলে গিয়েছিল। সে বার, তৃতীয় বারের জন্যে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বুদ্ধদেববাবু শপথ নেন ১৮ মে। আর সিঙ্গুরে জমির প্রশ্নে তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে মানুষ পথে নামেন ২৫ মে। ব্যবধান মাত্র এক সপ্তাহের!

তৃণমূল সরকারের তেমন দশার উপসর্গ হয়তো এখনও ততটা প্রস্ফুটিত নয়। তবে ভুলে গেলে চলবে না, টিবির মতো প্রাণঘাতী ক্ষয়রোগের প্রাথমিক লক্ষণ শুকনো কাশি, যা বেশিরভাগ মানুষ উপেক্ষা করে থাকেন।

কোনও সন্দেহ নেই, বাংলার ২০২১-এর রায় ভাল কাজের প্রতিদানেরই ভোট। আর সেই নির্বাচনকে নিশ্চয়ই কেউ পঞ্চায়েত, পুরসভার মতো লুঠতরাজের ভোটও বলবেন না।

সেই নির্বাচনের বছর ঘোরার আগেই এ কী শুরু হয়েছে রাজ্যে? দলীয় রাজনীতির বাইরে সম্বৎসর যারা পুলিশের আচার-আচরণ নিয়ে চর্চা করে থাকেন, তাঁদের অনেকেই বলছেন, বিধানসভা ভোটের পর থেকে পুলিশ অকারণেই অতিসক্রিয়, বেপরোয়া। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনেও হিংস্র আচরণ করছে।

আবার সেই পুলিশই জায়গা বিশেষে নজিরবিহীন নিষ্ক্রিয়, নিধিরাম। বগটুইয়ের ঘটনায় ওসি, এসডিপিও-কে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি তাতে আটকানো অসম্ভব, যদি পুলিশকে দলের কথায় চলতে হয়। যদিও, ‘আমাদের পুলিশ’, ‘আমার পুলিশ’ একটা সময় আর কারওই থাকে না, নিজের হয়ে যায়। পুলিশ তখন মনে করে পুলিশিংটা তার মর্জি।

আর এমন ধারণার পিছনে চলমান রাজনীতি বড় ভূমিকা নিয়ে থাকে। শাসকদল যখন বিপুল সংখ্যাধিক্যে ক্ষমতাসীন হয় তখন সবচেয়ে পুলকিত হয় পুলিশই। আইনরক্ষকদের এমন আচরণের কারণ অনুধাবনে গবেষণার প্রয়োজন পড়ে না। শাসকদল সারা বছর পুলিশকে যে ভাবে ব্যবহার করে, তাতে তারা মনে করে, বিধানসভা ভোট যতই কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে হোক না কেন, শাসকের উত্থান-পতন তাদেরই হাতে। কারণ, পঞ্চায়েত ও পুরভোটে যে তাদের ছাড়া গতি নেই শাসকের। আর এমন ভাবনাজনিত আচরণ একটা সময় এমন জায়গায় পৌঁছয় যে পুলিশ আর তখন সেপাই থাকে না, শাসক হয়ে যায়। পুলিশ তখন মনে করে, এখন যা খুশি করা যায়। সেই পুলিশ বোমা-বন্দুক-গোলা-বারুদ কতটা উদ্ধার করবে, তা নির্ভর করছে শাসকদল ও প্রশাসনের সদিচ্ছার উপরেই।

You might also like