Latest News

Bagtui Column: পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধিজীবী ও মুসলমান সমাজ

জিষ্ণু বসু

Image - Bagtui Column: পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধিজীবী ও মুসলমান সমাজ

রামপুরহাটের মর্মান্তিক ঘটনায় রাজ্যের বুদ্ধিজীবীদের নীরবতায় বিস্ময়ে হতবাক শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। বীরভূমের দেউচা পাচামি কোল ব্লকের পরিচালন সমিতি থেকে এঁরা কেউই পদত্যাগ করেননি। কোনও পুরস্কার ফিরিয়ে দিতে কেউ আগ্রহ দেখাননি। এমনকি কাজ সেরে ফেরার পথে মোমবাতি মিছিলও কেউ করলেন না। এই তথাকথিত শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীরা মেনে নিলেন যে “টিভি ফেটে আগুন লেগেছে।”

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয়ের প্রথম ভাগের গোপালের কথা মনে পড়ে যায়। ‘গোপাল বড় সুবোধ।… যা পায় তাই খায়…।’

বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কথা আজ বারবার মনে হচ্ছে। সেই বর্ণপরিচয়, এবার দ্বিতীয় ভাগ। দশম পাঠে ভুবনের গল্প আছে। ভুবনের মাসি ভুবনের সঙ্গে যে আচরণ করেছিলেন, তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা রাজ্যের মুসলমান সম্প্রদায়ের সঙ্গে একই আচরণ করেছেন।

বুদ্ধিজীবীরা বুঝিয়েছেন, “আমরা অন্য কোথাও যাব না।” যাতে মুসলমান ভোট এককাট্টা হয়। কিন্তু রাজ্যের ৩০ শতাংশ মানুষ যে কেবল ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে, সহজলভ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছেন, জনসম্পদ হিসেবে বিকশিত হচ্ছেন না, সেকথা তাদের বলার কেউ প্রয়োজন মনে করেননি।

২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর সাচার কমিটির রিপোর্ট জনসমক্ষে এল। দেখা গেল পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অবস্থা দেশের মধ্যে একেবারে নীচের দিকে। বামেদের সংখ্যালঘু তোষণ আসলে যে ভোটব্যাঙ্ক বানানোর চেষ্টার অতিরিক্ত কিছু ছিল না সেটা সাচার কমিটির রিপোর্টে প্রমাণ হয়ে গেল। কিন্তু সুবোধ বালক গোপালের মত তথাকথিত বুদ্ধিজীবী মহল চুপ করে ছিলেন। একবারও বলেননি যে আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য আধুনিক শিক্ষা চাই। ৩০% মানুষের জন্য অন্য পাঠক্রম, ধর্মীয় শিক্ষা, অন্য পরীক্ষা কেন হবে? খ্রিস্টান মিশনারি স্কুল, রামকৃষ্ণ মিশন, ভারতসেবাশ্রম সঙ্ঘ বা বিদ্যা ভারতীর স্কুলের মতো মধ্যশিক্ষা পর্ষদ বা উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের পাঠ্যক্রমে কেন মাদ্রাসায় পড়াশোনা হবে না?

বাংলার সব সম্প্রদায়ের মানুষেরই একটা আত্মসম্মানবোধ ছিল। যত দারিদ্র্যই থাক, কারও কাছ থেকে হাত পেতে ভিক্ষা পারতপক্ষে চাইতেন না। আমার বাড়ি বারুইপুরে, ঠিকানায় লিখতে হয় ‘নিয়ার নলগড়া মসজিদ ‘। মসজিদে এসেই বাইরের লোক আমার বাড়ির খোঁজ করেন। আমিও মসজিদের উল্টোদিকে আকবর আলি চাচার বাড়ির উঠোনে খেলে বড় হয়েছি। কিন্তু সকলে আকবর আলি চাচার মত সম্পন্ন ছিলেন না, বেশিরভাগই আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষের বাস ছিল আমাদের পাড়ায়। খুব উৎসাহ নিয়ে ঈদের অনুষ্ঠান হত তাঁদের, যদিও সামর্থ ছিল সামান্য। কিন্তু তা সত্ত্বেও যদি কেউ কাউকে ভালোবেসে ১০০ টাকা ঈদি দিতেন, তা হলে সেই গরিব মানুষটি তিন বার বাড়িতে আসতেন, ‘বললেন না তো কী করতে হবে?’ মানে হাত পেতে এমনি এমনি কিছু নিতে আত্মসম্মানবোধে বাঁধছে মানুষটির।

সেই আত্মসম্মানযুক্ত বাঙালিকে গত দশ-এগারো বছরে রাজনৈতিক শক্তি একেবারে শেষ করে দিয়েছে। রাজ্যে শিল্প নেই, ব্যবসা নেই। সিঙ্গুরে টাটার জমিতে শিল্পও হয়নি, চাষও হয়নি। অন্য অনেক রাজ্যে গ্রামে গ্রামে ‘ফার্মার্স কোওপারেটিভ’ হয়েছে, তেজস্ক্রিয় বিকিরণ নির্ভর পেঁয়াজ, আম সংরক্ষণ কেন্দ্রের মতো যুগোপযোগী প্রকল্পও পরিচালনা করে সমবায়। এরাজ্যে কেবল রাজনৈতিক হিংসার চাষ হয়েছে। কৃষি ধীরে ধীরে অলাভজনক হয়ে গেছে। কৃষকের ছেলে পার্টির দেওয়া বাইক পেয়ে বালির লরি ধরে তোলা আদায়কে জীবিকা হিসেবে নিয়েছে।

চিটফান্ড কাণ্ডর পর থেকে এমনি এমনি টাকা পাওয়াটা এ রাজ্যে গা সওয়া হয়ে গেছে। অন্য সব রোজগারের রাস্তা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বীরভূমের মতো জেলাগুলিতে ‘উন্নয়নের’ টাকার থেকে কাটমানি, বালি আর পাথরের লরি থেকে তোলা আদায়ই উপার্জনের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে। সেই সঙ্গে যুবকদের ক্লাবের নামে মদ, মাংস আর বাইকের তেলের পয়সা দেওয়া। এই ভয়াবহ ব্যবস্থাই গত পঞ্চায়েত নির্বাচন থেকে রাজ্যের গ্রামবাংলার দুরবস্থার মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমাজের এই পচনে রাজনৈতিক শক্তি যেমন দায়ী, সমাধিক দায়িত্ব বুদ্ধিজীবীদেরও। সমাজের ক্ষতি দুর্বৃত্তদের সক্রিয়তার জন্য যত না হয়েছে তার থেকে অনেক বেশি হয়েছে শিক্ষিত ভদ্রলোক তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের নিষ্ক্রিয়তার জন্য।

লিবারেল, ধর্মনিরপেক্ষতা, মানবাধিকার ইত্যাদি প্রভৃতি এঁদের ‘স্টাইল স্টেটমেন্ট’। জেহাদি মৌলবাদের বিরুদ্ধে কথা বললে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। সেকুলার প্রোগ্রেসিভ এলিট ক্লাব থেকে বের করে দেওয়া হবে, সেই ভয়ে এঁরা সত্য কথা মেপে বলেন। নিকারাগুয়ার জন্য, ইজরায়েলের গাজা ভূখণ্ডের জন্য এঁরা অগ্নিগর্ভ ভাষণ দেন, কিন্তু বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর অমানবিক নির্যাতনের সময়ও মুখ খোলেন না।

তার মানে কি এই নয় যে এঁরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য ভাবেন বলেই সংযত! ২০০১ সালে গুজরাটের দাঙ্গার সময় এঁরা এমন কথা বলেছেন যাতে এখানেও দাঙ্গা লাগতে পারত। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে যখন মুর্শিদাবাদ-সহ বহু জেলাতে ভয়াবহ অশান্তি হচ্ছে, ট্রেনের স্টেশনের পর স্টেশন পুড়ছে, গ্রামের পর গ্রাম মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে, জাতীয় সড়কে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়ানো ট্রাকে একের পর এক আগুন লাগানো হচ্ছে, তখনও এঁরা সিএএ-র বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক কথা বলেছেন। কারণ সেদিন তাঁদের বুদ্ধি থেকে আসা জীবীকার জন্য ওই আগুন লাগানো দরকার ছিল। বাংলাদেশের হতভাগ্যদের কথা বললে তো কলকাতায় কেউ পয়সা দেবেন না। ঠিক এই কারণেই খাগড়াগড়, কালিয়াচক, জুরানপুর বা ধূলাগড়ের মত মারাত্মক ঘটনার পরেও এঁরা মৌন ছিলেন।

সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা করা মানেই গোধরা। এর যতটা না মুসলমান সমাজের প্রতি মমত্ব তার থেকে অনেক বেশি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। ২০০২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারিতে গোধরা স্টেশনে অযোধ্যা ফেরত ৫৩ জন করসেবককে ট্রেনের কামরায় জীবন্ত পুড়িয়ে মারার পরে ভয়াবহ দাঙ্গা শুরু হয়। মুসলমান সম্প্রদায়ের ৭৯০ মানুষের মৃত্যু হয়। সেই সঙ্গে ২৫৪ জন হিন্দুরও মৃত্যু হয়েছিল, যার বেশির ভাগই পুলিশের গুলিতে। দু’দিনে দাঙ্গা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। যাইহোক স্বাধীন ভারতের অত্যন্ত লজ্জাজনক ঘটনা ২০০২ সালের গুজরাটের দাঙ্গা।

এঁরা কদাচ বলেন না গুজরাতে ১৯৭৯ সালের দাঙ্গায় ৬৬০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। তার মধ্যে বেশির ভাগই মুসলমান সম্প্রদায়ের ছিলেন। কংগ্রেসের হিতেন দেশাই ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। দাঙ্গা নিয়ন্ত্রন করতে এক মাসেরও বেশি সময় লেগেছিল সেবার। ১৯৮৯ সালে বিহারের ভাগলপুর দাঙ্গায় ১০০০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, তার মধ্যে প্রায় ৯০০ জন ছিলেন মুসলমান। রাজ্যে তখন মুখ্যমন্ত্রী সত্যেন্দ্রনারায়ণ সিংহের কংগ্রেস সরকার।

১৯৮৮ সালের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের কাটরা মসজিদের দাঙ্গায় ২১ জন মুসলমান মারা যান বলে জানা গিয়েছিল। অথচ জ্যোতি বসুর তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার মাত্র ১২ জনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করে।

২০০০ সালের ২৭ জুলাই বীরভূমের নানুরে ১০ জন মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষকে হত্যা করা হয়। রাজ্যে বামফ্রন্ট শাসনে, কলকাতার তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা তখন প্যালেস্টাইনের আল-আকসা ইন্তিফাদার জন্য লড়ছেন।

২০০১ সালের ৪ জানুয়ারি ছোট আঙারিয়ায় জীবন্ত পুড়িয়ে মারা তৃণমূল সমর্থকরা বেশিরভাগ মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন। রাজ্যে তখন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বামফ্রন্ট শাসন।

বীরভূমের বগটুইয়ের ঘটনা আরও একবার প্রমাণ করল রাজ্যের রাজনৈতিক শক্তি মুসলমানদের দাবার বোড়ের মত ব্যবহার করছেন। আর এই পাপ কাজ দেখে ধারাবাহিক ভাবে চুপ করে থেকেছেন রাজ্যের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা।

জেহাদি মৌলবাদের বিরোধিতা করা আর মুসলমান বিদ্বেষ এক নয়। নিজেদের স্বার্থেই মানুষের মনের ধোঁয়াশা কাটাতে চান না তাঁরা।

(মতামত সম্পূর্ণত লেখকের নিজস্ব)
লেখক সাহা ইনস্টিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে কর্মরত। বাংলায় প্রবন্ধ, গল্প ও উপন্যাস লেখেন।

আরও পড়ুন: প্রতিহিংসায় অন্যকে না জ্বালিয়ে নিজেদের পোড়ান

You might also like