Latest News

এই নেতারা জল ছাড়া বাঁচতে পারেন না

আমাদের রাজ্যে এখন ঘর ওয়াপসি-র পালা চলছে। গত কয়েক বছরে যে নেতারা তৃণমূল ছেড়ে বিজেপির দিকে পা বাড়িয়েছিলেন, তাঁরা ‘ঘরে’ ফিরতে চাইছেন। তাঁদের মধ্যে মুকুল রায় ও তাঁর পুত্রকে দলে ফিরিয়ে নিয়েছেন তৃণমূলনেত্রী। আরও কয়েকজন দলবদলু নেতা তৃণমূলের কর্তাব্যক্তিদের কাছাকাছি ঘুরঘুর করছেন। সুযোগ পেলেই পুরানো দলে ভিড়বেন। তাঁদের অনেকে ভোটের আগে বলছিলেন, তৃণমূলে দম বন্ধ হয়ে আসছে। কিন্তু মমতা একা ২০০-র বেশি আসন পাওয়ার পরে বিজেপিতেও তাঁদের শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা দেখা দিয়েছে। বুক ভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্যই তাঁরা আগের দলে ফিরতে চাইছেন।

ডোমজুড় বিধানসভা কেন্দ্রের হেরে যাওয়া বিজেপি নেতা রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে ইদানীং খুব জল্পনা-কল্পনা হচ্ছে।। মাঝে একদিন শোনা যায়, তিনি তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষের সুকিয়া স্ট্রিটের ফ্ল্যাটে গিয়েছেন। রবিবার তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মাতৃবিয়োগ হয়। সেদিন পার্থবাবুর বাড়িতে যান রাজীব। তিনি বলছেন, এসবই সৌজন্য সাক্ষাৎকার। তাঁকে যাতে দলে ফিরিয়ে না নেওয়া হয় সেজন্য সরব হয়েছেন তৃণমূলের আর এক সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। ডোমজুড়ে রাজীবের বিরুদ্ধে পোস্টারিং চলছে। তাঁকে ‘গদ্দার’ বলা হচ্ছে।

এরপরে আছেন শোভন-বৈশাখী জুটি। বৈশাখীদেবী ইতিমধ্যে বলেছেন, শোভনের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আন্তরিক সম্পর্ক আছে। কঠিন সময়ে মমতা শোভনের পাশে থেকেছেন। সেই শুনে আবার কটাক্ষ করেছেন বেহালা পূর্বের বিধায়ক রত্না চট্টোপাধ্যায়। ভোটের আগে শোভনবাবুরা তৃণমূলনেত্রীর বিরুদ্ধে কী মন্তব্য করেছেন মনে করিয়ে দিয়েছেন।

সোনালি গুহ ইতিমধ্যে দলে ফেরার জন্য দিদির কাছে আর্জি জানিয়ে রেখেছেন। আরও কয়েকজন ছোট-বড়-মাঝারি নেতা বিজেপি থেকে তৃণমূলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়ে আছেন বলে শোনা যাচ্ছে। সোমবার বিধানসভায় বিজেপির পরিষদীয় দলের বৈঠকে ২৪ জন বিধায়ক অনুপস্থিত ছিলেন। এই অনুপস্থিতি নিয়েও শুরু হয়েছে কানাকানি।

ভোটের আগে তৃণমূলে এমন হচ্ছিল। দলের কে কে তলে তলে বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বোঝা যাচ্ছিল না। ভোটে হারার পর বিজেপিতেও ওইরকম শুরু হয়েছে।

এই দলবদলের সঙ্গে নীতি বা আদর্শের কোনও সম্পর্ক নেই। দলবদলুরা কেউ কেউ বলছেন বটে যে, জনসেবা করার জন্য নতুন দলে যোগ দিয়েছেন, কিন্তু সেকথা শিশুরাও বিশ্বাস করবে না। যাঁরা বিজেপিতে গিয়েছিলেন, তাঁরা কেউ হিন্দুত্বের টানে যাননি। যাঁরা তৃণমূলে ফিরছেন, তাঁরাও কেউ ধর্মনিরপেক্ষতার টানে ফিরছেন না। মুকুল রায় বলেছেন, বিজেপি মেরুকরণের রাজনীতি করছে। কিন্তু সেকথা জেনেই তো তিনি ২০১৭ সালে বিজেপিতে গিয়েছিলেন। মাথায় গেরুয়া টিকা লাগিয়ে তো ঘুরেছেন তিনিও। ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানও দিয়েছেন। বিজেপি ভোটে হারতেই তাঁর বোধোদয় হল?

আসলে তাঁদের কথা শুনে কে কী ভাবল, তাতে এই ধরনের রাজনীতিকদের কিছু যায় আসে না। তাঁরা চান ক্ষমতা। মাছ যেমন জল ছাড়া বাঁচতে পারে না, তাঁরাও তেমনি ক্ষমতা ছাড়া থাকতে পারেন না। সরকারে উঁচু পদ, লাল আলো লাগানো গাড়ি, নিরাপত্তারক্ষী, এসব না পেলে তাঁদের দম আটকে আসে। তাই যে করে হোক ক্ষমতা পেতে চান। কয়েকমাস আগেই যাঁর নামে কটু কথা বলেছেন, প্রয়োজনে তাঁরই দরজায় হত্যে দিতে তাঁদের কুণ্ঠা নেই।

ভারতের রাজনীতিতে ‘আয়ারাম-গয়ারাম’ নামে একটা কথা আছে। বিধায়ক কেনাবেচা, দলবদল ও রাজনীতিকদের পালটি খাওয়া বোঝাতে ওই কথাটি ব্যবহার করা হয়। হরিয়ানায় গয়া লাল নামে এক রাজনীতিক ছিলেন। ১৯৬৭ সালে তিনি নির্দল প্রার্থী হিসাবে বিধানসভা ভোটে জেতেন। তারপর কংগ্রেসে যোগ দেন। পরে কংগ্রেস ছেড়ে যোগ দেন বিরোধী দলে। এইভাবে ১৫ দিনের মধ্যে তিনবার দলবদল করেন গয়া লাল। শেষে তিনি ফেরেন কংগ্রেসে। কংগ্রেসের তৎকালীন বড় নেতা রাও বীরেন্দ্র সিং গয়া লালকে নিয়ে সাংবাদিক বৈঠক করেন। তখনি বীরেন্দ্র সিং বলেন, “গয়ারাম আভি আয়ারাম হো গিয়া”।

আমাদের পশ্চিমবঙ্গে এইরকম আয়ারাম গয়ারামের রাজনীতি আগে ছিল না। এবার ভোটের আগে থেকে শুরু হয়েছে। আগামী দিনে এই আয়ারাম-গয়ারামের রাজনীতি আরও কুৎসিত আকার নিতে পারে।

You might also like