Latest News

অসুর বধ

আবহবিদরা আগেই বলেছিলেন, দুর্গাপুজোর (Durga Puja) আনন্দ মাটি করতে পারে নিম্নচাপের বৃষ্টি। সপ্তমী ও অষ্টমীর সন্ধ্যায় দু-একবার ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাতে দর্শনার্থীদের আনন্দে ভাটা পড়েনি। বৃষ্টি থামতেই তাঁরা ফের হইহই করে নেমেছেন রাস্তায়। পুজো এবার নির্বিঘ্নে কেটেছে সন্দেহ নেই। কিন্তু এর মধ্যে কলকাতার একটি পুজোর খবর জাতীয় সংবাদমাধ্যম গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে। খবরটি রাজ্যবাসীর পক্ষে লজ্জার।

Image - অসুর বধ

গত রবিবার দক্ষিণ-পূর্ব কলকাতার একটি মণ্ডপে দুর্গা প্রতিমার ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। তাতে দেখা যায়, মহিষাসুরের (Asur) সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর (Mahatma Gandhi) চেহারার যথেষ্ট মিল আছে। অসুরের মাথায় টাক। পরনে ধুতি। চোখে গোল ফ্রেমের চশমা। রবিবারই ছিল গান্ধীজির ১৫৩ তম জন্মদিন। বিশ্বজুড়ে দিনটি অহিংস দিবস হিসাবে পালিত হয়। ওইদিনই গান্ধীজিকে অসুর হিসাবে দেখিয়েছেন ওই পুজোর উদ্যোক্তারা।

দুর্গাপুজোয় অসুর হল অশুভের প্রতীক। মা দুর্গার হাতে অসুররূপী অশুভ শক্তি বধ হয়। দুর্গা হিন্দুদের দেবী হলেও তাঁর পুজোয় সব ধর্মের মানুষ আনন্দ করেন। পুজোর মধ্যে দিয়ে বার্তা দেওয়া হয়, সৃষ্টির আদি থেকে শুভের সঙ্গে অশুভের লড়াই চলছে। তাতে শেষ পর্যন্ত শুভেরই জয় হয়। এই বার্তা সর্বজনীন। তাই কোনও ব্যক্তি হিন্দু না হলেও পুজোর আনন্দে সামিল হতে তাঁর বাধে না।

এই বিতর্কিত পুজোর আয়োজন করেছে একটি ধর্মান্ধ সংগঠন। ওই সংগঠনের রাজ্য সভাপতি অবশ্য দাবি করেছেন, তাঁরা গান্ধীকে অসুর সাজাতে চাননি। কিন্তু তাঁর বক্তব্য স্ববিরোধী। তিনি একবার বলছেন, গান্ধীজির চেহারার সঙ্গে অসুরের মিল নেহাৎ কাকতালীয়। পরে আবার বলছেন, গান্ধীকে জাতির পিতা বলে আমরা মানি না। জাতির জনকের প্রতি অশ্রদ্ধা গোপন না করেই তিনি বলেছেন, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নাম পুলিশকে জানিয়ে দেওয়া এবং নেতাজিকে কংগ্রেস থেকে বিতাড়নের ঘটনার সঙ্গে গান্ধীজির নাম যুক্ত আছে। ভগৎ সিং-এর ফাঁসির সময়েও তিনি খারাপ ভূমিকা নিয়েছিলেন।

সংগঠনটির দাবি, তারা নেতাজির ভক্ত। ৯৯.৯৯ শতাংশ মানুষ নাকি তাদের সমর্থন করেছেন। কারণ তাঁরা সকলেই গান্ধীজিকে ঘৃণা করেন এবং নেতাজিকে শ্রদ্ধা করেন। নেতাজির এই স্বঘোষিত ভক্তরা সম্ভবত জানেন না, গান্ধীজির সঙ্গে হাজার মতবিরোধ সত্ত্বেও সুভাষচন্দ্র বসু তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন। কখনও তাঁকে অসম্মান করার কথা ভাবতেও পারেননি।

তাদের অভিযোগ, অসুরের মূর্তি নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে ওঠার পরে পুলিশ সক্রিয় হয়। পুলিশই মৃৎশিল্পী এনে অসুরের মূর্তিতে কিছু পরিবর্তন করে। তার প্রতিবাদে অষ্টমীতে উদ্যোক্তারা মণ্ডপের সামনে বিক্ষোভে বসেন।

আমাদের দেশে কিছু ধর্মান্ধ ব্যক্তি ও তাদের মতাদর্শে চালিত সংগঠন কখনই মহাত্মা গান্ধীর আদর্শকে পছন্দ করেনি। তাদেরই একজনের হাতে গান্ধীজি নিহত হয়েছিলেন। জানা গেছে, এবছর প্রথম এই উদ্যোক্তারা পুজো করছেন। অসুরের মূর্তির মধ্যে দিয়ে তাঁরা একটি রাজনৈতিক বার্তা দিতে চান। বিশ্ব জুড়ে অহিংসার শক্তিকে শুভ শক্তি বলে মনে করা হয়। কিন্তু জাতির জনককে অসুর সাজিয়ে উদ্যোক্তারা বলতে চেয়েছেন, তাঁরা ওই আদর্শে বিশ্বাসী নন। হিংসার পক্ষে বার্তা দেওয়ার জন্যই হয়তো অসুরের চেহারা গান্ধীজির মতো করা হয়েছে।

আমাদের দেশ তথা বিশ্বে এখন হিংসার রাজনীতির বাড়বাড়ন্ত ঘটেছে। ভারতে গত কয়েক দশকে সাম্প্রদায়িক হিংসা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। সেই সঙ্গে আছে জাতপাতের হিংসা। আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে বলা যায়, রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ চলছে দীর্ঘকাল ধরে। আরও কতদিন চলবে কেউ জানে না। চিনের সঙ্গে তাইওয়ানের সম্পর্কও ক্রমে আরও খারাপ হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে গান্ধীজির অহিংসার বাণীই মানব সভ্যতাকে পথ দেখাতে পারে। কিন্তু এই পুজোর উদ্যোক্তারা স্পষ্টতই তা বিশ্বাস করেন না।

পুজোর মধ্যে পুলিশও সেই সংগঠনের বিরুদ্ধে তেমন কড়া ব্যবস্থা নিতে পারেনি। কারণ তাহলে আরও বেশি হইচই হত। উত্তেজনা সৃষ্টি হত। পুজোর মধ্যে যা আদৌ কাম্য নয়।

তাছাড়া শুধু পুলিশ দিয়ে এই সমস্যার মোকাবিলা করা যায় না। সারা বিশ্বেই মৌলবাদ এখন বড় বিপদ। এর বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হওয়া প্রয়োজন। না হলে ধর্মান্ধদের আটকানো যাবে না। দেবীর আরাধনার মঞ্চ যাতে অশুভ শক্তির স্বার্থে ব্যবহৃত না হয়, তার জন্য সাধারণ মানুষকেই সতর্ক হতে হবে।

সেই দিক থেকে বিতর্কিত পুজোটি নিয়ে সাধারণ মানুষের উপেক্ষা এক বড় প্রাপ্তি। দেবীর আরাধনা কালে ধর্মান্ধ অসুর বধ হয়েছে মানুষের শুভবুদ্ধির কাছে। এর চাইতে বড় শক্তি আর কিছু হতেও পারে না।

সিপিএমের বুকস্টল নিয়ে রাসবিহারীতে ধুন্ধুমার, গ্রেফতার পরিচালক কমলেশ্বর, অকুস্থলে সেলিম

You might also like