Latest News

শঙ্খ ঘোষ চলে গেছেন, অনুতপ্তব্রত শুনে যাওয়া হল না

শোভন চক্রবর্তী

বিবেকের দুয়ারে ঠকঠক!

হলটা কী অনুব্রত মণ্ডলের?

শতসহস্র সমালোচনা, নিন্দেমন্দ তাঁকে সচরাচর টলাতে পারেনা। তাঁর মুখনিঃসৃত বাণীকে কথামৃত বলে মাথায় করে রাখেন দলীয় কর্মীদের একটা বড় অংশ (Vote)। এ জেলা সে জেলা থেকে ভোটের আগে আগে এমন দাবিও ওঠে, তিনি যেন একবার এসে প্রি-সিজন ক্যাম্প করিয়ে যান। সেখানে সব থাকবে। টেকনিক, ছক, ডিফেন্স চেরা থ্রু বাড়ানোর কেরামতি, বিপক্ষের আক্রমণ মাঝমাঠে নির্বিষ করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি হিমোগ্লোবিনে হিল্লোল তুলে দেওয়া ভোকাল টনিক। কিন্তু তিনি নিজের গণ্ডি চেনেন। তার বাইরে যান না। গোটা বীরভূম আর সঙ্গে বর্ধমানের আউশগ্রাম, মঙ্গলকোটের মতো কিছু এলাকা। তাও দিদি বলেছেন বলে। নইলে যেতেন না!

কিন্তু একের পর এক ভোটে একের পর এক তত্ত্ব হাজির করা লোকটা এমন বদলে গেলেন কী করে? ভোট মানে তাঁর কাছে তো গুড়-বাতাসা! ভোট মানে তো তাঁর কাছে চড়াম চড়াম। ভোট মানে তাঁর কাছে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা উন্নয়ন। সব ছেড়ে অনুব্রত মণ্ডল রবিবার বলেছেন, এবার তিনি মানুষের রায় নেবেন।

মুজিব পরিবারের সকল সদস্যকে আজীবন সরকারি নিরাপত্তা, আইন করলেন হাসিনা

দুয়ারে পুরভোট। তিনি ভোট বিদ্যায় পিএইচডি করে ফেলেছেন প্রায়। তাই বিধানসভার আলিস্যি কাটাতে মাঠে নেমে পড়েছেন মণ্ডল মশাই। কর্মীদের উদ্দেশে তাঁর মেজাজি নির্দেশ, “দয়া করে কাজ করুন। আর একটা ভুল ধারণা যেন আপনাদের মনে না থাকে। পুরসভার ভোট আসছে। টাউনের প্রেসিডেন্ট আছেন। তাঁরা পুরসভা নিয়ে চিন্তাভাবনা করুন। যাঁরা ব্লক প্রেসিডেন্ট আছেন তাঁরা পঞ্চায়েত নিয়ে চিন্তাভাবনা করুন। ভোট হবে। ভোট করব। এটা কিন্তু আমি বলে গেলাম। পুরসভাতেও ভোট করব। পঞ্চায়েতেও ভোট করব। মানুষের রায়টা নেওয়া দরকার।”

এই পর্যন্ত তবু নয় একটু ধোঁয়া ধোঁয়া। প্রথম শুনলে পুরোটা স্পষ্ট হয় না। কিন্তু তাঁকে বোধহয় বিবেক এতটাই সজোরে ধাক্কা দিয়েছে যে তিনি স্পষ্ট করেই ছেড়েছেন। রবিবারের ওই মঞ্চ থেকেই বলেছেন, ‘‘অন্যায় হয়েছে। ভয়ঙ্কর অন্যায় করেছি। এ বার মানুষের রায় নেব। আপনারা পাশে থাকবেন। সহযোগিতা করবেন। মানুষ ভোট দেবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এত কাজ করেছেন। আশা করি মানুষ আর ভুল করবে না। মানুষ একবার ভুল করেছে। বারবার ভুল করবে না।’’

বাংলায় ভোট করিয়ে নেওয়ার ইতিহাস অনেক লম্বা। অনেক মানে অনেক। সেই অনন্ত আকাশে অনুব্রত নিশ্চয়ই ধ্রুবতারার মতো। সেসবে নয় পরে আসা যাবে। কিন্তু অনুব্রত মণ্ডল যা বলেছেন তার মানে কী দাঁড়ায়?

অনুব্রত মেনে নিয়েছেন, তিনি অন্যায় করেছেন। তাঁর ভাষাতে ভয়ঙ্কর অন্যায়। তিনি বলেছেন, এবার মানুষের রায় নেবেন। যার মোদ্দা কথা, এতদিন মানুষের রায় তিনি নিতে দেননি। পঞ্চায়েত, বিধানসভা, লোকসভা—নির্বাচন কমিশন তাঁকে নজরবন্দি করেছে। তাঁর সব কটা মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়েছে। আর তিনি মুচকি হেঁসে, পান চিবোতে চিবোতে বোলপুর পার্টি অফিসের কাঠের চেয়ারে বসে বলেছেন, “সে মোবাইল লিয়ে লিলে লিয়ে লেবে! ল্যান্ড ফোন নেই নাকি!”

পঞ্চায়েত ভোটে দেখা গিয়েছিল বীরভূমে জেলাপরিষদে ৪২টি আসনের মধ্যে ৪১টি আসন বিনাপ্রতিদ্বিন্দ্বিতায় জিতেছে তৃণমূল। একটি আসনে যাও বা প্রার্থী হয়েছিলেন কেউ তাও আবার প্রত্যাহার হয়ে যায়। ফলে বিয়াল্লিশে বিয়াল্লিশ। সমিতি, গ্রামসভা তো অনেক দূরের কথা! সেই ভোটের পরে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, দু’একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটতেই পারে। আঠেরোর পঞ্চায়েতকে শান্তিপূর্ণ প্রমাণ করতে বাম জমানার ২০০৩-এর পঞ্চায়েতকে শিখণ্ডি করে ‘আমরা কতটা মহান’ প্রমাণে মরিয়া হয়ে নেমেছিল গোটা তৃণ-কূল!

অনুব্রত কি তাঁদের সেসব তুলনামূলক গণতান্ত্রিক অমোঘ যুক্তিগুলিকেই কেটে দিলেন? একথা ঠিক যে বাম জমানাতেও এই রেওয়াজ ছিল। সরকার থেকে চলে যাওয়ার পর কখনও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের গলায় অনুতাপ শোনা গিয়েছে, কখনও গৌতম দেবকে বলতে শোনা গিয়েছে কেন আরামবাগে অত ভোটে জিততে গেছিল, কেন দিনের পর দিন কলেজের ছাত্র সংসদগুলিতে ভোট হয়নি! সেদিক থেকে অনুব্রত একটা ব্যাপারে নিঃসন্দেহে প্রশংসা পেতে পারেন। তা হল বাম নেতারা তাঁদের পাপের কথা স্বীকার করেছিলেন মসনদ থেকে চলে যাওয়ার পর। অনুব্রতর বিবেক কিন্তু জেগে উঠেছে বিপুল ভোটে প্রত্যাবর্তনের ছ’মাসের মধ্যে। যখন তৃণমূল আরও গনগনে। যখন তৃণমূল বাংলার বাইরে ফুটপ্রিন্ট রাখতে চাইছে!

এই তো বছর সাড়ে তিন আগের কথা। পঞ্চায়েত ভোটের আগে তাঁর ডায়লগ শুনে যখন অনেকে শঙ্কিত তখন কলম ধরেছিলেন প্রয়াত কবি শঙ্খ ঘোষ। বাংলা সাহিত্যের ‘স্যার’ লিখেছিলেন—

“যথার্থ এই বীরভূমি, উত্তাল ঢেউ পেরিয়ে এসে পেয়েছি শেষ তীরভূমি।

দেখ খুলে তোর তিন নয়ন, রাস্তা জুড়ে খড়্গ হাতে দাঁড়িয়ে আছে উন্নয়ন’।

সেই কবিতা প্রকাশিত হওয়ার পরেই অনুব্রত বলেন, ‘‘বড় বড় কথা বলছেন কবি? এ কোন কবি? আমরা তো কবি বলতে জানতাম রবীন্দ্রনাথ-নজরুল। এ কোন নতুন কবি উঠে এসেছেন যে, আমার উন্নয়ন নিয়ে কথা বলছেন!’’ এটুকুতেই থামেননি অনুব্রত। কবির নাম নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছিলেন, ‘‘কবির নাম শঙ্খ রাখা ঠিক হয়নি। শঙ্খ নামের অপমান করেছেন উনি। এখনও বলছি, রাস্তায় উন্নয়ন দাঁড়িয়ে আছে।’’

অনুব্রত একবার শুরু করলে থামেন না। শঙ্খবাবুর মতো মানুষকে সরাসরি নিশানা করে যখন বীরভূমের নিয়ন্ত্রক বাছা বাছা বিশেষণ মণিমুক্তর মতো ছড়িয়ে দেন তখন সমালোচনার দাবানল তো হবেই। কিন্তু তার বিন্দুমাত্র তাত অনুব্রতবাবুর গায়ে স্পর্শ করে না! তিনি পাল্টা জবাব দেন, “যখন অনুব্রত মণ্ডল রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে, তখন শঙ্খ ঘোষ কবিতা লেখেন। শঙ্খ একটা পবিত্র জিনিস। সব পবিত্র কাজে শঙ্খ লাগে। তাই শঙ্খ ভুল করলে দেবতাদের অসম্মান হয়। সেই কারণেই বলেছি ওঁর নাম শঙ্খ রাখা উচিত হয়নি।’’

আশাও করা যায় না অনুব্রতর এ হেন কথার পর শঙ্খবাবু প্রতিক্রিয়া দেবেন। দেনওনি। শঙ্খবাবু চলে গেছেন। কিন্তু অনুব্রতর অনুতাপ শুনে যেতে পারলেন না।

তবে বহমান রাজনীতিতে যা যা সব হচ্ছে, তাতে কৌতূহল জাগেই, এ কি সত্যিই অনুতাপ? নাকি এটাও কৌশল? ভোট করানোর নতুন কোনও প্যাঁচ নয়তো? হয়তো স্পর্ধার মোড়ক সরিয়ে বিনয়ের ব্র্যান্ডিং করছেন কেষ্টবাবু। কে জানে!

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like