Latest News

পুলিশেরও অগ্নিপরীক্ষা

গভীর রাতে দরজায় ধাক্কা। দরজা খুলতেই হুড়মুড় করে বাড়িতে ঢুকে পড়ল চারজন। তাদের একজনের পরনে পুলিশের পোশাক। অপর তিনজন সিভিক ভলান্টিয়ার (Civic Volunteer)। পুলিসের পোশাক পরা লোকটি বাড়ির কর্তা সালেম খানকে (Salem Khan) বন্দুক দেখিয়ে আটকে রাখল। বাকিরা তরতর করে উঠে গেল ওপরে। আনিস খান (Anis Khan) নামে এক যুবক ছিল তিনতলায়। তাকে ছাদ থেকে ছুড়ে ফেলে দিল আততায়ীরা। তারপর নীচে এসে পুলিশের পোশাক পরা লোকটিকে বলল, স্যার, কাজ হয়ে গিয়েছে।

শুক্রবার রাতে আমতার খাঁ পাড়ায় এমনটাই ঘটেছিল। ২৮ বছর বয়সি আনিসের মৃত্যুর কথা জানাজানি হতে রাজ্য উত্তাল হয়ে উঠেছে। রোজ কলকাতায় মিছিল, অবরোধ ইত্যাদি হচ্ছে। হাইকোর্টে শুরু হয়েছে মামলা। কিন্তু ঘটনার পরে তিন-চারদিন পেরিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও খুব জরুরি দু’টি প্রশ্নের জবাব মিলছে না।

প্রথম প্রশ্ন, খুনিরা কারা?

পুলিশ বলছে, আনিস খানের বাড়িতে তারা যায়নি। তাহলে কারা গেল? খুনিদের ধরা দূরে থাক, এখনও তাদের চিহ্নিত করতে পারেনি পুলিশ।

দ্বিতীয় প্রশ্ন, কেন খুন হতে হল আনিসকে?

তিনি বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হন। নাগরিকত্ব আইন বিরোধী আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন। অনেকে বলছেন, জমিজমা নিয়ে প্রতিবেশীর সঙ্গে তাঁর বিরোধ ছিল। তিনি মহকুমার চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়েও সরব ছিলেন। বিশেষ করে বেসরকারি ব্যবস্থার দৌরাত্ম্য এবং সরকারি আয়োজনের অপদার্থতা নিয়ে তিনি মুখর ছিলেন।

মাস কয়েক আগে বিহারে একটি ছোট শহরের স্থানীয় সাংবাদিক প্রথমে নিখোঁজ হন। দু’দিন পর তাঁর দেহ মেলে। সেই তরুণ সাংবাদিক এলাকার নার্সিংহোমের বেআইনি কারবারের বিরুদ্ধে খবর করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন।

আনিসের ক্ষেত্রে পুলিশ এখনও নির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না, খুনের মোটিভ কী হতে পারে।

এই হত্যাকাণ্ডে অনেকের মনে পড়ছে রিজওয়ানুরের কথা। পার্ক সার্কাসের বাসিন্দা রিজওয়ানুর ভিন্ন ধর্মে বিয়ে করেছিলেন। তাঁর স্ত্রীর বাবা ছিলেন ধনী ব্যবসায়ী। পুলিশ নাকি সেই ব্যবসায়ীর পক্ষ নিয়ে বিয়ে ভাঙার জন্য চাপ দিচ্ছিল রিজওয়ানুরকে।

আনিস খুনের ঘটনাতেও অনেকে পুলিশকে কাঠগড়ায় তুলছেন। অভিযোগ, শুক্রবার রাতে নিহতের বাড়ি থেকে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ এসেছিল অনেক দেরিতে।

কেউ পুলিশের পোশাক পরে এসে খুন করে গিয়েছে, এমন অভিযোগ পাওয়ার পরে তো পুলিশের অনেক বেশি তৎপর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই তৎপরতা দেখা যায়নি কেন?

মৃত আনিসের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে শুরু হয়েছে টানাহেঁচড়া। তৃণমূলনেত্রী দাবি করেছেন, আনিস তাঁদের দলের ঘনিষ্ঠ ছিল। ছাত্র পরিষদের দাবি, আনিস তাদের সমর্থক। বামেদের দাবি, আনিস ছিলেন তাদের সঙ্গে।এমনও শোনা যাচ্ছে, মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি আব্বাস সিদ্দিকির আইএসএফে যোগ দিয়েছিলেন।

অনেকে বলছেন, আনিসের রাজনৈতিক পরিচয় জানা জরুরি নয়। খুনিদের শাস্তি হওয়াই জরুরি।

যে কোনও খুনের ঘটনায় অপরাধীদের শাস্তি পাওয়া উচিত। কিন্তু আনিস হত্যার ঘটনার বিশেষ তাৎপর্য আছে। এখানে অপরাধীরা পুলিশ ও সিভিক ভলান্টিয়ার সেজে গিয়েছিল। এরপরে কোথাও সত্যি সত্যি পুলিশ গেলেও হয়তো মানুষ বিশ্বাস করবে না। ভাববে, তারা জাল পুলিশ হতে পারে। তাদের সঙ্গে সহযোগিতা করবে না।

এই ধরনের খুনের ঘটনায় সমাজে একপ্রকার বিভাজন সৃষ্টি হয়। একশ্রেণির মানুষ ভাবে, তারা বঞ্চিত। তাই তাদের ঘরের কেউ খুন হলে পুলিশ গুরুত্ব দেয় না। সমাজের একাংশ যদি নিজেদের অবহেলিত ভাবতে থাকে, তাহলে স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

তাই আনিস কাণ্ডের তদন্ত হতে হবে দ্রুত ও স্বচ্ছ। তার চেয়েও বড় কথা, শুধু পুলিশের তদন্ত রিপোর্টেও সন্তুষ্ট থাকলে চলবে না। এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকাও খতিয়ে দেখতে হবে মুখ্যমন্ত্রীকে। প্রয়োজনে পুলিশকে প্রশ্ন করতে হবে।

মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, তদন্তে যারাই দোষী সাব্যস্ত হোক, রেয়াত করা হবে না। সেই প্রতিশ্রুতিও অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে।

You might also like