Latest News

Harassment: পেয়াদার গুরু পাপে শাসকের লঘু দৃষ্টি

গত সপ্তাহের শেষেই বোঝা গিয়েছিল, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (Aliah University) খারাপ কিছু ঘটেছে। বগটুইয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারা নিয়ে যখন রাজ্য জুড়ে হইচই চলছে, তারই মধ্যে শনিবার সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ে। তাতে দেখা যায়, আলিয়ার উপাচার্য (Aliah University VC) ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়েছেন। কয়েকজন ছাত্র তাঁকে তুই-তোকারি করছে। অশ্লীলতম ভাষায় (Slang) গালিগালাজ করছে। একজন বলছে, কান ধরে বল, আর উপাচার্য থাকব না। আর একজন উপাচার্যকে বলছে, তোর দুই গালে চড় মারব। আমার চড়ে খুব লাগে… (Harassment)।

পরে শোনা যায়, যে ব্যক্তি ওই ছাত্রদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ নন। তাঁর নাম গিয়াসুদ্দিন মণ্ডল। চার বছর আগেই তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বহিষ্কৃত হওয়ার পরে কী করে তাঁর এত দাপট বজায় থাকে তা নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন ওঠে।

রবিবার গিয়াসুদ্দিন মণ্ডল গ্রেফতার হন। জানা যায়, তিনি ২০১২-১৩ সালের শিক্ষাবর্ষে আলিয়ায় (Aliah University) ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বিশেষ মনোযোগী ছাত্র ছিলেন না। তাঁর প্রতিভা ছিল অন্যদিকে।

২০১৪ সালে গিয়াসুদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সভাপতি হন। অভিযোগ, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের হস্টেল থেকে টাকা তুলতেন। ক্যান্টিনের টাকাও নয়ছয় করেছেন। এর আগে দু’জন উপাচার্য নিগৃহীত হয়েছেন তাঁর হাতে।

২০১৭ সালে আলিয়ার তৎকালীন উপাচার্য আবু তালেব খান অভিযোগ করেন, গিয়াসুদ্দিন তাঁকে হেনস্থা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি নষ্ট করেছেন। গিয়াসুদ্দিন সেবারও গ্রেফতার হন। তাঁকে হাজতবাস করতে হয়।

২০১৮ সালে তৎকালীন উপাচার্য মহম্মদ আলি ফের গিয়াসুদ্দিনের বিরুদ্ধে হেনস্থা ও ভাঙচুরের অভিযোগ তোলেন। তখন তাঁকে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। গত শুক্রবার তিনি আর একজন উপাচার্যকে হেনস্থা করেছেন।

দেখা যাচ্ছে, হাজতবাস কিংবা সংগঠন থেকে বহিষ্কার, কিছুই গিয়াসুদ্দিনকে আটকাতে পারে না। তাঁর দাপট আগের মতোই থাকে।

গত রবিবার তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে বটে কিন্তু এর পরেও তিনি কতদূর সংযত হবেন বলা শক্ত। প্রশ্ন হল, তাঁর এই ক্ষমতার উৎস কোথায়?

সোমবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মন্তব্য করেন, ‘যে কটু কথা, খারাপ কথা বলেছে, তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’ গিয়াসুদ্দিনরা কী বলেছেন, তা ভিডিও ক্লিপে সবাই শুনেছে। ওই শব্দগুলিকে ‘কটু কথা’ বলে না। কুৎসিত গালিগালাজ আর কটু কথা এক নয়। কোনও কথা কারও শুনতে ভাল না লাগতে পারে। তখন অপছন্দের কথাকে মনে হবে কটু কথা। তার সঙ্গে গালিগালাজের সম্পর্ক নেই। একজনের কাছে যা কটু কথা মনে হবে, আর একজনের কাছে তা নাও মনে হতে পারে।

কিন্তু গিয়াসুদ্দিন ও তার দলবল যা বলেছেন, তাকে ‘কটু কথা’ বলা মানে তাঁদের অপরাধকে লঘু করে দেখানো। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘আন্ডার স্টেটমেন্ট’ করা।

প্রশাসনের শীর্ষে যিনি বসে আছেন, তিনি যদি গুরুতর অপরাধকে লঘু করে দেখান, তাহলে অপরাধীরা প্রশ্রয় পায়। তাই একবার হাজতবাস করার পরেও গিয়াসুদ্দিনের দাপট কমে না। তিনি ফের দলবল নিয়ে উপাচার্যের ঘরে ঢুকে পড়তে পারেন।

তৃণমূলের জমানায় বারবারই খবরের শিরোনামে এসেছে শিক্ষক নিগ্রহ। সেই ২০১২ সালে, যখন তৃণমূল সবে ক্ষমতায় এসেছে, তখন রায়গঞ্জ ইউনিভার্সিটি কলেজে অফিসিয়েটিং প্রিন্সিপাল ও এক শিক্ষককে মারধর করা হয়। টিএমসিপি-র ছাত্ররা ওই ঘটনায় জড়িত ছিল।

কয়েক বছর আগে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় তৃণমূলের দাপুটে নেতা আরাবুল ইসলাম কলেজের এক শিক্ষিকাকে জলের জগ ছুড়ে মারেন। ২০১৮ সালে রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের শিক্ষক ভাস্কর দাসকে চড় মারেন টিএমসিপি নেতা গৌরব দত্ত মুস্তাফি। কোনও ঘটনাতেই অপরাধীরা হয় শাস্তি পায়নি অথবা লঘু শাস্তি পেয়েছে।

গুরুপাপে লঘু দণ্ড দিলে অন্যায়ের প্রতিকার হয় না। তা লঘু দৃষ্টি দিয়ে দেখা আরও বড় বিপদ। শিক্ষক নিগ্রহ নিশ্চয় গুরুতর অপরাধ। তার শাস্তিও সেই অনুপাতে হওয়া চাই। সেটা মুখ্যত বিচার বিভাগের কাজ। আমরা আমাদের বিচার ব্যবস্থাকে জানি। দীর্ঘসূত্রিতাই যেখানে শেষ কথা। কিন্তু শাসক, প্রশাসক অপরাধকে কী চোখে দেখছে সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে শিক্ষক নিগ্রহের ঘটনাগুলিতে শীর্ষ স্তর থেকে কখনও বলা হয়েছে ‘ছোট ঘটনা’, কখনও বলা হয়েছে, ‘বাচ্চা ছেলেদের কাজ।’ এসব কথায় অনুচ্চারিত বার্তাটি হল, ভয় নেই  আমরা আছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে, কলেছে, কখনও কখনও স্কুলেও এমন সব নৈরাজ্যের খবর, ছাত্র পরিচয়ধারী গুন্ডাদের দৌরাত্ম্য সম্পর্কে শাসক দলের নেতা-মন্ত্রীরা ওয়াকিবহাল নন, মেনে নেওয়া কঠিন। বরং, সমাজ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিও টেপ শুনে বুঝতে অসুবিধা হয় না, কেমন হরিহর আত্মা সম্পর্ক তাদের।

যাঁরা আলিয়ার উপাচার্যকে ঘেরাও ও গালিগালাজ করেছিলেন, তাঁদের সকলকেই গ্রেফতার করা উচিত। একা গিয়াসুদ্দিনকে গ্রেফতার করে ব্যাপারটা ধামাচাপা দিলে হবে না। শিক্ষকের গায়ে যারা হাত তোলে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া দরকার। তবেই ভবিষ্যতে শিক্ষায়তনগুলি দাপুটে নেতাদের হাত থেকে রেহাই পাবে। সেজন্য তাদের আশ্রয়, প্রশ্রয় দাতাদেরও দলীয় ও প্রশাসনিক ক্ষমতার ডানা ছাঁটা জরুরি।

আরও পড়ুন : এসএসসির উপদেষ্টাদের হেফাজতে নিতে পারবে সিবিআই, নির্দেশ হাইকোর্টের

You might also like