Latest News

মোদী দলেও কি সবকা সাথ?

অমল সরকার

সেনায় চুক্তিতে নিয়োগকে কেন্দ্র করে অর্ধেক দেশ অশান্ত। এখনও পর্যন্ত যে ১৩-১৪টি রাজ্যে অগ্নিপথ প্রকল্পের (Agnipath Scheme) বিরুদ্ধে তরুণরা পথে নেমেছেন তার অনেকগুলিতেই বিজেপি ক্ষমতায়।

Image - মোদী দলেও কি সবকা সাথ?

মাস সাত-আট আগে তিন বিতর্কিত কৃষি আইনের (Farm Law) প্রতিবাদে দেড় বছর ব্যাপী কৃষক-বিদ্রোহ প্রত্যক্ষ করেছে দেশ। রাজ্য ভিত্তিতে হিসাব কষলে দেখা যাচ্ছে, কৃষক বিদ্রোহের চাইতে অনেক দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়েছে অগ্নিপথ বিরোধী আন্দোলন। তার কারণ কৃষি আইনের বিপদ মানুষকে বোঝাতে সময় লেগেছিল। সেনায় নিয়োগের নয়া স্কিমের মতো তা সোজাসাপ্টা ছিল না। তুলনায়, অগ্নিপথের মধ্যে কোনও আইনি মারপ্যাঁচ নেই। তার উপর বিষয়টি দেশের তরুণ সমাজের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত।

এই আন্দোলন থেকে যে সত্যটি সবচেয়ে প্রকট, তা হল, দেশের প্রধান সমস্যা বেকারত্ব। তরুণ ছেলেমেয়েরা কাজ চায়। আর স্বাধীনতার ৭৫তম বছরেও দেশে সেনাবাহিনীই কোটি কোটি তরুণের কাছে চাকরির সেরা ঠিকানা। জুতো সেলাই থেকে চণ্ডী পাঠ, সেনায় আছে সব ধরনের কাজের সুযোগ। তাতে যতই ঝুঁকি থাক, আর প্রাণ সংশয়ের কথা বলে যতই আমরা দেশপ্রেমের কথা বলি না কেন, সত্য এটাও, বহু ছেলেমেয়ে এই আশা নিয়ে নিজেদের শারীরিক ও মানসিকভাবে তৈরি করে, যে কোথাও না হোক, সেনাবাহিনীতে একটা কিছু জুটে যাবে।

চাকরির সেই সেরা সুযোগটা ধরেই টান মেরেছেন নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। তিনি এক কোপে চাকরির পূর্ণমেয়াদে ছেদ ঘটাতে চান। কুড়ি বছরের পরিবর্তে কাজের মেয়াদ হবে চার বছরের।

তাই প্রতিবাদটা স্বাভাবিক। প্রতিবাদ করতে গিয়ে যাঁরা হিংসার আশ্রয় নিয়েছেন, আইনের পথেই তাঁদের বিচার হওয়া দরকার। কিন্তু প্রতিবাদটা তাতে মিথ্যা, অন্যায্য হয়ে যায় না।

রবিবার অগ্নিপথের নিয়োগ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করে দেওয়া হয়েছে। জানাই ছিল, সরকার কালক্ষেপ করবে না। বরং কারা ‘অগ্নিপথ’-এ যোগ দিয়ে ‘অগ্নিবীর’ হওয়ার সুযোগ পাবে, সেই প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে। ধরেই নেওয়া যায়, এই সুযোগে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ তাদের ভাবধারায় বিশ্বাসী ছেলেমেয়েদের সেনায় যোগ দিতে উৎসাহিত করবে। তাদের চেষ্টা সফল হলে এই সব অগ্নিবীরদের একদিন পাড়ায় পাড়ায় ‘হিন্দু সেনা’ হয়ে ওঠা অসম্ভব নয়। আরএসএস এমন ‘সামরিক-সমাজ’ প্রত্যাশা করে।

প্রশ্ন হল, তাহলে অগ্নিপথের বিরোধিতায় পথঘাট অগ্নি-পথ হয়ে উঠল কেন? যে রাজ্যগুলি সেনায় নিয়োগের নয়া স্কিমের বিরুদ্ধে উত্তাল, তারমধ্যে বিজেপি শাসিত রাজ্যও আছে। লক্ষণীয়, অবিজেপি শাসিত রাজ্যের বিরুদ্ধেও আন্দোলনকারীদের মদত দেওয়া, হিংসায় হাত গুটিয়ে থাকার অভিযোগ করার সুযোগ নেই। ঘটনা হল, সবচেয়ে উত্তপ্ত বিহারে বিজেপি আজ সতেরো বছর ধরে সরকারের শরিক। মুখ বাঁচাতেই সেখানে তারা রাজ্য প্রশাসনের দিকে আন্দোলন মোকাবিলায় শিথিলতার অভিযোগ তুলেছে।

কৃষক আন্দোলনের সময়ে পাঞ্জাব, রাজস্থানের কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ তোলা হয়েছিল কেন্দ্রের শাসক দলের তরফে। পাঞ্জাবে আন্দোলনকারীদের পিছনে খলিস্তানপন্থীদের মদতের কথাও প্রচার করেছিল সরকারের একাংশ। কারণ আন্দোলন যে জায়গায় চলে গিয়েছিল তাতে বিরোধী-শাসিত রাজ্যের প্রশাসন এবং আন্দোলনকারীদের বিচ্ছিন্নতাবাদী, উগ্রবাদী বলে দেগে দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।

কৃষি আইন বিরোধী আন্দোলনের মতো অগ্নিপথ বিরোধী বিক্ষোভেও দেখতে পাচ্ছি, বিজেপি নেতারা সদলবলে মোদী সরকারের মুখ রক্ষায় নেমে পড়েছেন। কারণ, দিল্লির নির্দেশ। কিন্তু রাজ্য বিজেপির বেশ কয়েকজন নেতার বক্তব্য, তাঁরা কথা বলে বুঝেছেন, এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা তাঁদের দিল্লির কর্তারাও প্রায় কেউ জানতেন না। দলের কোনও স্তরে এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয়নি।

কৃষি আইন বিরোধী আন্দোলনের সময়ও বিজেপির অধিকাংশ নেতা-মন্ত্রী অবাক হয়েছিলেন, কেন করোনার মতো মহামারীর মধ্যে সরকার আইন তিনটি চালু করার জন্য অর্ডিন্যান্স জারি করতে গেল? আন্দোলনকারীদের তরফে সরকারের ডাকা বৈঠকে যোগ দেওয়া এক কৃষক নেতা তখন একদিন কথায় কথায় বলেছিলেন, তাঁদের ধারণা, কৃষিমন্ত্রী নরেন্দ্র সিং তোমরও সব কিছু জানতেন না। একের পর এক বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার কারণ তিনি খুব সাধারণ বিষয়েও দায়িত্ব নিয়ে সরকারের তরফে কোনও কথা দিতে পারতেন না। সেই অর্ডিন্যান্স আইনে রূপ দেওয়ার আগেও সরকার দেশের কৃষক সংগঠনগুলি তো নয়ই, এমনকি বিজেপির প্রথম সারির নেতাদেরও মতামত নেওয়া চেষ্টা করেনি। অগ্নিপথ নিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা প্রাক্তন সেনা প্রধান জেনারেল ভিকে সিং জানিয়েছেন, সরকার তাঁর মতামত নেয়নি। তিনি কিছু জানতেন না।

Image - মোদী দলেও কি সবকা সাথ?

আসলে, শুধু কৃষিবিল বা অগ্নিপথই নয়, নরেন্দ্র মোদী সরকার চালাচ্ছেন এভাবেই। সিদ্ধান্ত তাঁর, ঝড়ঝাপটা সামলানোর দায়িত্ব দলের। আশ্চর্যের হল, তিনি কংগ্রেস-মুক্ত ভারতের স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু যত দিন গড়াচ্ছে, ততই তিনি আঁকড়ে ধরছেন কংগ্রেসের সংস্কৃতি। ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধীরা প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসে এভাবেই সরকার ও দলকে নিজেদের অধীন করে রেখেছিলেন। তাঁদের সিদ্ধান্ত মুখ বুজে মেনে নেওয়া এবং কার্যকর করাই ছিল অলিখিত নিয়ম।

ইন্দিরা, রাজীবদের মতো মোদীও কথায় কথায় দলের মুখ্যমন্ত্রীদের বদলে দিচ্ছেন। ফলে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীদের মধ্যে অলিখিত প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে মোদী ভজনায় কে কত জোরে ছুটতে পারেন। দৃশ্যতই এগিয়ে উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ এবং অসমের হিমন্ত বিশ্বশর্মা। সবচেয়ে আগে তাঁরাই টুইট করে ঘোষণা করেছেন, অবসরপ্রাপ্ত অগ্নিবীরদের রাজ্য পুলিশের চাকরিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা। ইন্দিরা, রাজীবদের জমানায় টুইটার, ফেসবুক ছিল না। নেতা-মন্ত্রী-মুখ্যমন্ত্রীদের তাই ছুতোনাতায় দিল্লি গিয়ে পড়ে থাকতে হত, কবে ইন্দিরা, রাজীবদের দর্শন মেলে। ইন্দিরার সময়ে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের দিল্লি গিয়ে পড়ে থাকা নিয়ে ‘দ্য স্টেটসম্যান’ একবার বিদ্রুপ করে লেখে, ‘মুখ্যমন্ত্রী আগামীকাল কলকাতায় ফিরছেন। আপাতত কিছুদিন নিজের রাজ্যে থাকবেন।’

নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহেরা যেভাবে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবকে সরালেন, তাতে অনেকেরই বহু বছর আগে অন্ধ্রপ্রদেশে মুখ্যমন্ত্রী বদলের কথা মনে পড়ে গিয়েছে। মাঝরাতে মুখ্যমন্ত্রীকে বরখাস্ত করেন ইন্দিরা। একটি তেলুগু সংবাদপত্রের দিল্লি সংবাদদাতা পরের দিনের কাগজে ব্যাঙ্গাত্মক নিবন্ধে লেখেন, ‘নতুন মুখ্যমন্ত্রী কে? সূর্যাস্তের পর ইন্দিরা দিল্লিতে বসে যাঁকে দেখতে পাবেন।’

কংগ্রেসের সদ্য অনুষ্ঠিত চিন্তন শিবিরে আলোচ্য নানা প্রস্তাবের একটি ছিল সংসদীয় বোর্ড ফেরানো। নরসিংহ রাও প্রধানমন্ত্রী এবং দলের সভাপতি থাকা পর্যন্ত এই বোর্ডই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সিলমোহর দিত। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর প্রভূত ক্ষমতা। ফলে তাঁর মতকে উপেক্ষা করে সংসদীয় বোর্ডের যাবতীয় সিদ্ধান্তে আপত্তি তোলার প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু বোর্ডের সদস্যরা অনেক বিষয়ে মতামত, পক্ষে-বিপক্ষে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াগুলি সম্পর্কে আভাস দিতে পারেন।

কিন্তু মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে সব বদলে যায়। সভানেত্রী এবং ইউপিএ-র চেয়ারপারসন সনিয়া গান্ধী পার্লামেন্টারি বোর্ড বা সংসদীয় কমিটির তুলে দেন। সরকারি ক্ষমতা হাতছাড়া হওয়ার পর তিনি আরও বেশি করে তা চান না। ফলে উদয়পুরের চিন্তন শিবিরে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি সংসদীয় বোর্ড ফেরাতে গুলাম নবি আজাদ, আনন্দ শর্মাদের প্রস্তাব খারিজ করে দিয়েছে।

কংগ্রেসে যা নেই, বিজেপিতে তা আছে। কিন্তু অনেকেই বোধহয় দলের সেই ক্ষমতাশালী কমিটির কথা ভুলে গিয়েছেন। অটলবিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আদবানি, মুরলি মনোহর যোশীদের সময়ে দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সংসদীয় বোর্ডে আলোচনা করে নেওয়া হত। পদাধিকার বলে প্রধানমন্ত্রীই বোর্ডের চেয়ারম্যান। বাজপেয়ী কখনও একা সিদ্ধান্ত নিতেন না।

কিন্তু নরেন্দ্র মোদীর সময়ে সংসদীয় কমিটির অস্তিত্বই টের পাওয়া কঠিন। একদিকে কমিটির বৈঠকের বালাই নেই। অন্যদিকে বহু গুরুত্বপূর্ণ পদ ফাঁকা। সেই পদগুলিতে অনন্ত কুমার, সুষমা স্বরাজ, অরুণ জেটলির মতো অকালপ্রয়াত নেতারা ছিলেন। ছিলেন বর্তমান উপ রাষ্ট্রপতি ভেঙ্কাইয়া নাইডু। তিনি অটল বিহারী বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালেও ওই বোর্ডের সদস্য ছিলেন। কর্নাটকের বর্তমান রাজ্যপাল তহরচাঁদ গেহলট নরেন্দ্র মোদীর প্রথম মন্ত্রিসভায় সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ছিলেন। তিনিও ছিলেন সংসদীয় বোর্ডের সদস্য। বোর্ডের বর্তমান সদস্যদের অন্যতম হলেন, নিতিন গডকড়ি, অমিত শাহ, রাজনাথ সিংহেরা। শেষের দু’জনের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে, মোদী ‘হ্যাঁ’ বললে ‘হ্যাঁ’, ‘না’ বললে ‘না’ বলা।

সংসদীয় বোর্ডকে অকেজো করে রেখে মোদীর কার্যত একক সিদ্ধান্তে সরকার পরিচালনা নিয়ে বিজেপির অন্দরে ক্ষোভ, অসন্তোষ আছে। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধতে এখনও কেউ প্রস্তুত নন।

ঘটনা হল, ইন্দিরা, রাজীবরা ‘সবকা সাথ’ স্লোগান, ঘোষণা দেননি। অন্যদিকে, নরেন্দ্র মোদী সব কিছুতেই ‘সবকা’। সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা প্রয়াস, সবকা বিশোয়াস। তাঁর কথায় আর কাজে ফারাক এতদিনে মানুষ বুঝে গিয়েছে। কৃষি আইন, অগ্নিপথের বিরোধী আন্দোলনে দিশেহারা বিজেপিকে দেখে বোঝা যায়, মোদী দলেও সবকা সাথ নন।

‘বিজেপি অফিসে পাহারাদারের কাজ করবেন অগ্নিবীররা’, কৈলাসের মন্তব্যে তোলপাড়

You might also like