বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ২১
TheWall
TheWall

গরীব মানুষের জন্য সংরক্ষণ: স্বাধীন ভারতে এই প্রথমবার

জিষ্ণু বসু

খবরটা শুনে আমাদের পাড়ার পল্টুদার কথা মনে এল। পল্টুদা মানে শ্যামাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। পেশায় ছিলেন পুরোহিত। পাড়ার সবচেয়ে ভাঙাচোরা টালির বাড়িটা ছিল পল্টুদার। সারাদিন পুজো করে পল্টুদা সামান্য একটু চাল কলা আর অনেকটা বিদ্রুপ নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। সেই চাল কলায় পল্টুদার স্ত্রী রমা বৌদি আর তাদের দুই সন্তানের পরিবার প্রায় চলতই না। পল্টুদার ছেলে কণাদও একটু বড় হয়েই যজমানের বাড়িতে পাওয়া সস্তার ধুতি পরে পুজো করতে যেত। কণাদ কোনওমতে বারুইপুর কলেজ থেকে বিএ পাশ করেছিল। তারপর পাড়ার ক্লাবে দু’তিন বছর ক্যারাম পিটিয়ে মোড়ের মাথায় একটা সাইকেলের দোকানে কাজ করত।

বড় হয়ে বাংলার গ্রামে গঞ্জে শহরের গলিতে গলিতে শত সহস্র পল্টুদাকে দেখেছি। যাদের ঘরে পড়ার সামর্থ্য নেই, পরিবেশ নেই, পেটভরে খাবার জোগাড় নেই। উচ্চশিক্ষায় বা চাকরিতে কণাদের মতো তাদের ঘরের ছেলেদের একটু সহায়তা ভীষণ প্রয়োজন। কিন্তু কণাদ, স্ববর্ণ – জেনারেল ক্যাটিগরির। তাই সংরক্ষণের সব দরজা ছিল বন্ধ। কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদীর সরকারের মন্ত্রিসভা ঘোষণা করেছে দেশের গরিবদের জন্য উচ্চশিক্ষা ও চাকরিতে দশ শতাংশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা হবে। মানে সংরক্ষণের আওতায় ছিলেন না এমন হিন্দুরা, সব মুসলমান, সব খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের গরিব মানুষেরা এই সুবিধা পাবেন। আর এই দারিদ্রের সংজ্ঞাও একেবারে পরিষ্কার করে জানানো হয়েছে। বছরে আট লক্ষ টাকার নিচে যেসব পরিবারের আয়, যাদের, ৫ একরের কম কৃষিজমি আছে, এক হাজার বর্গফুটের কম আয়তনের বাড়ির মালিক, নথিভুক্ত পৌরএলাকায় একশো বর্গগজের কম বাস্তুজমি বা অনথিভুক্ত এলাকায় ২০০ বর্গগজের কম বাস্তুজমির মালিকরাই কেবল এই সুযোগ সুবিধে পাবেন। তাই কেবলমাত্র রাজনৈতিক সুপারিশে কারো দারিদ্র নিরূপণের সুযোগ থাকছে না।

আজকের ভারতবর্ষে দলিত আন্দোলনের অন্যতম নাম লোকজনশক্তি পার্টির রামবিলাস পাসওয়ান। হাজিপুর কেন্দ্র থেকে সব থেকে বেশি ভোট পেয়ে গিনেস বুকে নাম তুলেছেন তিনি। সেই রামবিলাসও এই পদক্ষেপকে ঐতিহাসিক বলেছেন।

মন্ত্রিসভার এই সিদ্ধান্তকে ঐতিহাসিক বলা হচ্ছে অনেকগুলো কারণে। ভারতবর্ষের হিন্দুসমাজের এক দুরারোগ্য ব্যাধি হল জাতিভেদ প্রথা। জাতিভেদ সমাজের একটা বড় অংশকে শত শত বছর ধরে বঞ্চিত করে রেখেছে। অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সম্মানের দিক থেকে পিছিয়ে গিয়েছেন জাতিভেদ প্রথার শিকার হওয়া মানুষরা। এই অন্ত্যজ সমাজের দুঃখ ও অপমান বাবা সাহেব আম্বেদকরের মতো মনীষীদের নাড়া দিয়েছিল। তাই তাঁরা সংবিধানে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু সংরক্ষণের মূল ভাবনা ছিল বহু প্রজন্মের বঞ্চিত মানুষ একবারে মুক্ত প্রতিযোগিতায় আসতে পারবে না। তাই প্রয়োজন একটু সহায়তার।

সমাজের মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পরিবারের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। সেই জন্যই অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল সাধারণ জাতির মানুষদেরও সম্ভব হলে সহযোগিতা করা উচিত। যে কোনও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষই এই কথার সঙ্গে একমত হবেন।একে বলে, ‘ল অব ন্যাচারাল জাস্টিস’। কিন্তু বাধ সেধেছিল সংবিধানের ৪ ও ৬ নম্বর ধারা। অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর মানুষের জন্য সংরক্ষণের অনুমতি ছিল না। তাই কালের প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা ছিল সেদিক থেকে দেখতে গেলে এটা অবশ্যই যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। এর আগে সংরক্ষণে আওতা থেকে ‘ক্রিমি লেয়ার’ অপসারণের মতো পদক্ষেপের কথা এসেছে বটে, কিন্তু সাহসের সঙ্গে সমস্যাকে সরাসরি মোকাবিলা করার প্রয়াস এই প্রথম।

সমস্যাকে সরাসরি মোকাবিলা না পরিস্থিতি বেশি জটিল হয়। অযৌক্তিক খামখেয়ালি হয়ে ওঠে। বামশাসনের শেষ দিকে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এমনই এক ঘটনার সাক্ষী ছিলেন। ২০০৬ সালে সাচার কমিটির রিপোর্টে জানা গেল যে পশ্চিমবঙ্গে মুসলমান সম্প্রদায়ের অবস্থা দেশের মধ্যে সব থেকে খারাপ। কিন্তু বামগণতান্ত্রিক শক্তির দীর্ঘ তিনদশকের শাসনে সংখ্যালঘুদের এমন বীভৎস অবস্থা কেন? শুরু হল চাপানউতোর। চটজলদি কিছু করার চেষ্টা। কিন্তু সংবিধান ধর্মভিত্তিক সংরক্ষণের বিরোধী। তবে উপায়? যে উপায় বার হল তা আরও ভয়ংকর।

শুরু হল মুসলমান সম্প্রদায়কে ‘অন্য পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়’ এর তকমা দেওয়ার কারসাজি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ববিদ্যা বিভাগের ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব সোশ্যাল এক্সক্লুউশান অ্যান্ড ইনক্লিউসিভ পলিসি’ নামে একটা প্রকল্পকে এই দায়িত্ব দেওয়া হল। মাত্র তিনজন অধ্যাপক তিন মাসে এক কোটি টাকা খরচ করে ফেললেন। এই প্রকল্প শুরু হয়েছিল ১ জুলাই, ২০১০ –এ আর শেষ হওয়ার সরকারি তারিখ হল ৩১ আগস্ট ২০১০। সামান্য এই সময়ের মধ্যেই দায়িত্বপ্রাপ্ত ওই তিন অধ্যাপক এই রাজ্যের সমগ্র মুসলমান সমাজের তথ্য নিয়ে দেখলেন বেশির ভাগ মুসলমান সাব-কাস্টই অনগ্রসর। এই প্রথম মুসলমান সমাজ নিজেরাই তাদের ‘কাস্ট’ বা জাতের কথা শুনলেন। ওই বিশেষজ্ঞদের দল পশ্চিমবঙ্গে ৮৫ শতাংশ মুসলমানের সাবকাস্ট অনগ্রসর বলে আবিষ্কার করলেন। তখন এই রাজ্যে দু’কোটির বেশি মানুষ মুসলমান। ২০১২ সালের ১১ মে নতুন সরকার অধ্যাদেশ জারি করে  আরও ৩৪টা মুসলমান সাবকাস্টকে ওবিসি-এ পর্যায়ভুক্ত করে। ২০১২ সালের ১০ অক্টোবর ‘শেখ’ সম্প্রদায়কে (পড়ুন পদবীধারী কারণ মুসলমান সমাজে জাতিভেদ আসলে নেই) অন্তর্ভুক্ত করা হল। ২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর আরও চোদ্দটা সাবকাস্টের নামও যোগ হল। যে সব জাতের নাম (জোলা মোমিন, বেলদার, মহালদার ইত্যাদি) ঘোষণা হয়েছিল সেই সব নাম  এরাজ্যের মুসলমান সমাজ কখনওই শোনেনি। ওই ভিত্তিতে ‘ওবিসি-এ’র শংসাপত্রের জন্য এরাজ্যের কোনও মুসলমানকে কোনও প্রমাণপত্র জমা দিতে হয় না। কারণ মুসলমান দলিল, বিয়ের কাগজ ইত্যাদিতে জাতের কোনও উল্লেখ থাকে না।

তথ্যের অধিকার আইনে আরও কয়েকটি মজার বিষয় উঠে এসেছে। ওই সার্ভের জন্য কোনও প্রশ্নসূচী তৈরি হয়নি। জেলায় জেলায় পর্যবেক্ষণ করে, ২ কোটি মানুষের ন্যূনতম নমুনাতেও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান করে ফেলা ওই দলের পক্ষে মাত্র দুই-তিন মাসে সম্ভব ছিল না। মানে প্রতি ঘরে জমি, গৃহস্থালীর পরিমাণ ও মূল্যায়ন কিংবা পরিবারের সদস্যদের খাবারের ক্যালোরি কনসামশানের পরিমাপ করা সম্ভব হয়নি।

তাহলে কী হয়েছে? কিছু একটা হয়েছে যাতে জেলায় জেলায় ওয়েস্ট বেঙ্গল কলেজ অ্যান্ড ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন (ওয়েবকুটা) ও অলবেঙ্গল টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন (এবিটিএ) যুক্ত ছিল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় লিখিতভাবে ওই দুই বামপন্থী সংগঠনের নামই জানিয়েছে। প্রশ্ন ওঠে, ওই এক কোটি টাকার কতটা অংশ ওই দুই সংগঠন পেয়েছিল? সবচেয়ে ভয়ানক বিষয় হল, ২০১১ সালের ৩ ফেব্রুয়ারীতে লেখা চিঠিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এসপিআইপিও জানিয়েছেন সার্ভের চূড়ান্ত রিপোর্ট এখনও তৈরি হয়নি। অথচ ওই রিপোর্টের ভিত্তিতে বিধানসভায় ততদিনে আইন পাশ হয়ে গিয়েছে।

এ রাজ্যের মুসলমান সমাজও এই প্রতারণাকে ভালোভাবে নেয়নি। ২০১১ সালের বিধানসভা ভোটে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় কোনও মুসলমান প্রধান এলাকায় বামফ্রন্ট জিততে পারেনি। সেদিন কিন্তু বামফ্রন্ট সরকার অর্থনৈতিক ভিত্তিতেই সংরক্ষণের জন্য কেন্দ্রকে সুপারিশ করতে পারতেন। তাতেও এই রাজ্যে মুসলমান সমাজের হতদরিদ্র মানুষই বেশি উপকৃত হত।

তাই সব দিক দিয়ে দেখলে নরেন্দ্র মোদী সরকারের এই পদক্ষেপ প্রকৃত অর্থেই ঐতিহাসিক।

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

লেখক সাহা ইনস্টিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স এ কর্মরত। বাংলায় প্রবন্ধগল্প ও উপন্যাস লেখেন।

ছবি প্রতীকী 

Comments are closed.