জোট ছিল কোথায়, যে ভেঙে গেল!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    শঙ্খদীপ দাস

    প্রথম দৃশ্য

    বছর দেড়েক আগের ঘটনা। ২০১৭ সালের শেষ দিকে কোনও এক দিন। প্রদেশ কংগ্রেস দফতরে সভাপতির চেয়ারে বসে রয়েছেন অধীর চৌধুরী। ঘরে আর কেউ নেই। কাঁচের টেবিলে জেসমিন টি-এর একটা কাপ রাখা। ওঁর মোবাইল সাধারণত সাইলেন্ট মোডেই থাকে। ল্যান্ডলাইনে ফোন এলো-‘দাদা, আপনাকে রবীন দেব খুঁজছেন। সিপিএমের রবীন দেব। মোবাইলে নাকি ফোনও করেছিলেন। আবার করবেন।’

    বলতে বলতে মোবাইলের স্ক্রিনে সিপিএম নেতা রবীন দেবের নাম ভেসে উঠল। ‘হ্যাঁ বলুন।’ রবীনবাবু যা জানালেন তার মোদ্দা কথা হল, সূর্যদা (সিপিএম রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র) আপনার সঙ্গে বসতে চাইছেন। পলিটব্যুরো, কেন্দ্রীয় কমিটি, প্রকাশ কারাটরা যাই বলুন, বাংলায় কংগ্রেস-সিপিএম যৌথ কর্মসূচি নিয়ে চলতেই হবে। নইলে অপোজিশন স্পেসটা বিজেপিই নিয়ে নিচ্ছে। মিটিংয়ের ওটাই অ্যাজেন্ডা।

    প্রদেশ সভাপতি এক কথায় রাজি। জানিয়ে দিলেন, সারাদিন উনি কলকাতাতেই রয়েছেন। এও জানালেন, শনিবারের বাজার। প্রদেশ দফতর খালি। চাইলে সূর্যবাবু, ওখানেও আসতে পারেন সন্ধ্যায়।

    তাই কথা হল, মিটিং নির্ধারিত হল রাত আটটায়।

    সন্ধ্যে সাড়ে সাতটার সময় আবার ফোন রবীন দেবের। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতিকে জানালেন, সূর্যবাবু কংগ্রেস দফতরে আসতে রাজি নন। বরং তিনি ( রবীন দেব ) গাড়ি নিয়ে আসছেন বিধান ভবনে। অধীরবাবুকে প্রদেশ দফতর থেকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাবেন সিপিএমের কলকাতা জেলা কমিটির দফতরে। ওটা নিরিবিলি জায়গা। লোক চোখের অনেকটা আড়ালে।
    কিন্তু অধীরবাবু তো অধীরবাবুই। বললেন, চুরি ডাকাতি করছি নাকি। বিধানসভা ভোটে জোট হয়েছে। দু’জনে দেখা করলে ক্ষতি কী? ওঁনার যখন কংগ্রেস দফতরে আসার অসুবিধা, আমিও বা সিপিএম অফিসে যাব না? যদি বসতেই হয়, তা হলে কোনও থার্ড জায়গায় বসব।

    রবীন দেব নাকি জানিয়েছিলেন, সূর্যবাবুর সঙ্গে কথা বলে ফের ফোন করবেন। সেই ফোন আর আসেনি। বিরক্ত হয়ে এক প্রকার স্বগতোক্তির মতই ঘনিষ্ঠদের সামনে ঝাঁঝিয়ে উঠেছিলেন অধীর। বলেছিলেন, এঁরা নাকি যৌথ কর্মসূচি নেবে? নিকুচি করেছে! পার্টিটাই উঠে যাবে।

    দ্বিতীয় দৃশ্য

    ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটের সময় সবংয়ের কংগ্রেস প্রার্থী মানস ভুইঞাঁর বিরুদ্ধে তৃণমূল কর্মী খুনের মামলা হয়েছিল। পরে তিনি তৃণমূলে যোগ দিয়ে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর নেতা মেনে নেন। দোষ ধুয়ে মামলা উঠে যায়। এর পর পরই কংগ্রেসের বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে রাজ্যসভায় তৃণমূল সাংসদ হিসাবে মনোনীত হন মানস। তিনি কংগ্রেসের বিধায়ক পদ ইস্তফা দেওয়ায় উপ নির্বাচন অনিবার্য হয় সবংয়ে।

    সবংয়ের শিশুরাও জানেন, ষোলোর ভোটে কংগ্রেস-সিপিএম জোট না হলে মানসবাবুর জেতা মুশকিল ছিল। কিন্তু সতেরো সালের ডিসেম্বরে উপ নির্বাচনের সময় সিপিএম সাফ জানিয়ে দিল, না এখন আর জোট নয়। সিপিএম-কংগ্রেস আলাদা আলাদা লড়বে। কিন্তু কেন? তার কোনও স্পষ্ট যুক্তি নেই। পলিটব্যুরো, কেন্দ্রীয় কমিটি, শরিকদের বায়নাক্কা মিলিয়ে মিশিয়ে সে জটিল ব্যাপার। পরিণাম, তৃণমূল প্রার্থী ড্যাং ড্যাং করে সবং জিতে গেলেন।

    তৃতীয় দৃশ্য

    মহেশতলার বিধায়ক কস্তুরী দাসের আকস্মিক মৃত্যুর পর সেখানে উপ নির্বাচন হবে। এ বার সিপিএম পরিষদীয় দলনেতা সুজন চক্রবর্তীর ফোন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরীকে। অনুরোধ, কংগ্রেস যেন উপ নির্বাচনে প্রার্থী না দেয়। বিরোধী ভোটের ভাগাভাগি রুখে দিতে পারলে তৃণমূলকে চাপে ফেলা যাবে। অধীরবাবু এক কথায় রাজি। অথচ মহেশতলার নির্বাচনী প্রচারে তাঁকে একদিনও ডাকল না সিপিএম। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির সে কী অভিমান!

    এই তিন দৃশ্য নমুনা মাত্র। গত তিন বছরে সিপিএম-কংগ্রেস সম্পর্কের এমন কয়েকশ দৃশ্য সাজিয়ে মেগা সিরিয়াল হতে পারে। যার পরতে পরতে দেখা যাবে, তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের এতটাই ফারাক যে মিল খাওয়ানোই অসাধ্য। পারস্পরিক বিশ্বাসযোগ্যতার প্রবল অভাব!

    অথচ এই জোটের সম্ভাবনা কিন্তু কম ছিল না! চোদ্দর ভোটের আগে থেকে গোটা বাংলা যখন চিটফান্ড দুর্নীতি নিয়ে আন্দোলিত, তখন সিপিএম নেতা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য এবং কংগ্রেস নেতা আবদুল মান্নান হাতে হাত মিলিয়ে সুপ্রিম কোর্টে লড়েছিলেন। তাঁদের সওয়ালের জেরেই চিটফান্ড কাণ্ডে সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল সর্বোচ্চ আদালত। কিন্তু সেই সখ্য যখন ক্রমশ দানা বাঁধতে বাঁধতে ষোল সালের বিধানসভা ভোটে জোটে পরিণত হল, তখন দেখা গেল একটা দুর্বল ইমারত। জোট গঠন কেবল মাত্র অস্তিত্বরক্ষার চেষ্টায় পর্যবসিত হয়ে গেল। ভাবটা এই যে, জোট না হলে দুটো পার্টিই বাংলায় ধুয়ে মুছে যাবে, তাই পরস্পরের হাত ধরলাম। জোট যে তৃণমূল সরকারকে বিপাকে ফেলতে পারে, তাঁরা চেষ্টা করলে নিদেন পক্ষে সরকার গঠনের কাছাকাছি যে পৌঁছতে পারেন সেই আত্মবিশ্বাসটাই নিখোঁজ। দৈন্য এতটাই যে ভোটের মাঝেই জোটকে ঘোঁট বলে ফেললেন বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু। যৌথ প্রচার নিয়ে নাক সিঁটকে ফেলল আলিমুদ্দিন। সেই ছুঁৎমার্গ এতটাই প্রকট হয়ে ধরা পড়ল যে সিঙ্গুরের সভায় অধীর চৌধুরী যখন বক্তৃতা দিচ্ছেন, দেখা গেল দূরে চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছেন সীতারাম ইয়েচুরি। অধীর চলে গেলে তবে তিনি মঞ্চে উঠবেন। শেষমেশ একেবারে অন্তিম লগ্নে পৌঁছে, পার্ক সার্কাস ময়দানে নমো নমো করে রাহুল গান্ধী-বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য যৌথ সভা হল।

    এর ফল যা হওয়ার ছিল তাই হল। টেনেটুনে ৭৭ টি আসনে জিতল জোট। অর্থাৎ যাদের নিজেদের উপরেই বিশ্বাস নেই, তারা বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হল। বামেরা অভিযোগ করতে শুরু করলেন, তাঁরা কংগ্রেস প্রার্থীকে ভোট দিলেও, কংগ্রেসের সমর্থকরা তাঁদের প্রার্থীকে ভোট দেননি। ফলে প্রায় কানের পাশ থেকে বেরিয়ে গিয়েছে অন্তত কুড়ি পঁচিশটি আসন।
    বস্তুত যে দুটি দলের মতাদর্শ বিপরীত মেরুতে, যারা ঐতিহাসিক ভাবে পরস্পরের সঙ্গে লড়াই করেছে, একে অন্যের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস ও অত্যাচারের অভিযোগ এনেছে, তাদের মধ্যে জোট গঠনের চেষ্টা সহজ সাধ্য ছিল না। এটা ঠিক, ষোলো সালের ভোটে তার একটি ভিত তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তার পর থেকে গত দু বছরে যৌথ আন্দোলন গড়ে তোলার কোনও চেষ্টাই ছিল না দু দলের মধ্যে। এটা ঠিক যে, ষোল সালের ভোটের সময় নিচুতলার অনেক কংগ্রেস কর্মীই জোট মেনে নিতে পারেননি। তারা সিপিএমকে ভোটও দেননি। কারণ, অতীতে তারা সিপিএমের কাছেই মার খেয়েছে। কিন্তু এও ঠিক, এই মুহূর্তে তৃণমূলের থেকে তাদের আশঙ্কা বেশি। ফলে নিচুতলায় যৌথ মিছিল, মিটিং, কর্মসূচি ধারাবাহিক ভাবে গ্রহণ করলে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা তৈরি হতে পারত। জোটের বিশ্বাসযোগ্যতাও বাড়ত। কিন্তু তা হয়নি। সিপিএম, কংগ্রেসের নেতারা যখন টিভিতে এবং বিধানসভার বারান্দায় পৃথক পৃথক ভাবে শক্তি ক্ষয় করেছেন, তখন ভাল হোক বা মন্দ হোক জমিতে নেমে রাজনীতিতে অনেক বেশি দেখা গিয়েছে বিজেপি-কে। বিধানসভায় আসন সংখ্যার নিরিখে তারা অনেক পিছিয়ে থাকলেও বিরোধী পরিসরের প্রায় ষোল আনাই দখল করে ফেলেছে তারা।

    তার পর শেষ মুহূর্তে পৌঁছে সাংবাদিক বৈঠক থেকে বিমান বসুকে এখন বলতে শোনা যাচ্ছে, “বাংলায় বিজেপি বিরোধী ভোটকে ব্যাপক ভাবে ঐক্যবদ্ধ করা এই সময়ে অত্যন্ত জরুরি।” অর্থাৎ অস্তিত্বরক্ষার জন্য আরও একবার করুণ আর্তি।
    সিপিএমের হাবভাব ও আচরণ নিয়ে অনাস্থা প্রকাশ করে এমনিতেই কংগ্রেস নেতারা জানিয়ে দিয়েছেন জোট হবে না। একাই লড়বেন তাঁরা। এর পরেও কংগ্রেসের জেতা চারটে আসনে প্রার্থী না দিয়ে আসন ভিত্তিক সমঝোতার মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সিপিএম। যাতে অন্তত মুর্শিদাবাদ ও রায়গঞ্জের আসনে কংগ্রেস তাঁদের প্রার্থী তুলে নেয়। অর্থাৎ লোকসভা ভোটে বাংলায় সিপিএমের আসন সংখ্যা যাতে শূন্যে না নেমে আসে।

    অর্থাৎ সবটাই পিঠ বাঁচানোর জন্য। বৃহৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সেখানে নেই। এই জোটকে কেন বিশ্বাস করবেন মানুষ?

    আরও পড়ুন

    ধর্মতলায় মঞ্চ, মোদী-মমতার মন্ত্রের লড়াই, ভাবুন তো!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More