মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বৈধতা দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদীই

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    শঙ্খদীপ দাস

    রবিবাসরীয় সন্ধ্যায় নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহ জমানাকে যখন গুন্ডারাজ বলছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তখন তার সরাসরি সম্প্রচার শুধু পশ্চিমবঙ্গের সীমানার মধ্যেই সীমিত ছিল না। গোটা দেশ তা দেখেছে। এবং দেখতে দেখতেই হয়তো ক্ষণিকের জন্য হাঁটতে শুরু করে দিয়েছে পিছনে!

    ফ্ল্যাশব্যাকে দেখেছে, মধ্যরাতে নয়াদিল্লিতে সিবিআই সদর দফতর ঘিরে ফেলেছে দিল্লি পুলিশ। এবং রাত দু’টোয় রাতারাতি বিজ্ঞপ্তি জারি করে সিবিআই প্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে অলোক বর্মাকে। সিবিআই স্পেশ্যাল ডিরেক্টর পদে বসে রয়েছেন রাকেশ আস্থানা। যাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর করেছেন খোদ সিবিআই প্রধান। অথচ তাঁর দিকেই আস্কারা ঢেলে দেওয়া হচ্ছে উপর থেকে। পরে সুপ্রিম কোর্ট অলোক বর্মাকে বহাল করেছে। কিন্তু উচ্চ পর্যায়ের কমিটিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে পরের দিনই তাঁকে সরিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে দমকল বাহিনীতে।

    আরও পিছনে হাঁটুন। মধ্যপ্রদেশে ব্যাপম কেলেঙ্কারি নিয়ে সিবিআই তদন্ত করল। যে কেলেঙ্কারিতে কত-শত নিরীহ প্রাণ খুন হয়েছে ইয়ত্তা নেই। কিন্তু কারও বিরুদ্ধে তেমন দোষ খুঁজে পেল না মোদীর সিবিআই। কর্নাটকে শত দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও ইজ্জত ও মর্যাদার সঙ্গেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন বিজেপি-র প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ইয়েদুরাপ্পা। সিবিআই সেখানেও পেল না কিছু।

    অথচ চন্দ্রবাবু নায়ডু কেন্দ্রে এনডিএ ছেড়ে বেরোতেই, তাঁর দলের সাংসদ ওয়াইএস চৌধুরীর বাড়িতে হানা দিল কেন্দ্রীয় এজেন্সি। অথচ সেই চৌধুরী যখন দু’মাস আগে অবধি মোদী মন্ত্রিসভায় ছিলেন, তিনি তখন তুলসী পাতার মতোই পবিত্র। সেখানেও থামল না। উনিশের ভোট উঁকি দিতেই, এই তো সে দিন উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী নেতা অখিলেশ যাদবের বিরুদ্ধে হঠাৎ উদয় হল বেআইনি খনি দুর্নীতির অভিযোগ। মায়াবতীর বিরুদ্ধে চোদ্দোশো কোটি টাকার সৌধ কেলেঙ্কারির কাহানি। সৌজন্যে সেই সিবিআই।

    শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন, শুধু রাহুল গান্ধীই বা কেন, শুধু এমকে স্ট্যালিন, চন্দ্রবাবু নায়ডু বা কুমারস্বামী কেন; সোশ্যাল মিডিয়া দেখুন, রবিবার রাত থেকে একেই গুন্ডারাজ বলছেন তামাম ভারতবর্ষের শিক্ষিত সমাজের হাজার হাজার মানুষ। কারণ, তাঁরা যা দেখছেন, তাতে এটাই ঠাওর করছেন, সত্যিই তো! এই সিবিআই তো রাজনীতির অস্ত্র! ভোটের আগে একে দিয়েই তো ভয় দেখানো হয়। নিজের লোকেদের দুর্নীতি ঢাকা যায়। অন্য দলের লোককে চোর বানানো যায়। এ তো ভয়াবহ। জরুরি অবস্থার মতোই ভয়াবহ।

    ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। কলকাতার ঘটনা লঘু ঠেকেছে অনেকের কাছেই। রবিবার কলকাতার রাস্তায় যে ভাবে পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের বাড়ির সামনে থেকে সিবিআই অফিসারদের টেনে-হিঁচড়ে গাড়িতে তুলেছে কলকাতা পুলিশ, তা সাংবিধানিক কাঠামোয় বিরল এবং বিপজ্জনক ঠিকই। কিন্তু বহু মানুষের কাছে মনে হয়েছে, আরে এর থেকে বড় সংকট তো তৈরি হয়েছে দিল্লিতে, রাইসিনা হিলে। অনেকের কাছে তাই মনে হতে শুরু করেছে, কলকাতায় যে ঘটনা ঘটেছে, তার সমাধানের আগে উচিত দিল্লিতে স্বচ্ছতা অভিযান চালানো। কারণ, দেশ বিপন্ন।

    তাৎপর্যপূর্ণ হল, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ২০১৪ সালে চিটফান্ড তদন্তের দায়িত্ব নিয়েছিল সিবিআই। স্মৃতি দুর্বল না হলে মনে পড়বে, গোড়ায় বেশ কয়েক দিন সিবিআই লম্ফঝম্প দিয়ে তদন্ত শুরু করেছিল। চিটফান্ড তদন্তে গ্রেফতার হয়েছিলেন তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের পরিবহণ মন্ত্রী মদন মিত্রও।

    কিন্তু তার পর ২০১৫ সালের প্রথম ১১ মাস বাংলা থেকে যেন স্রেফ উবে গিয়েছিল এই কেন্দ্রীয় তদন্ত এজেন্সি। একেবারে ভোঁ ভাঁ! চিটফান্ড তদন্তের জন্য কাউকে ডাকাডাকি নেই, কোনও জেরা নেই। কোনও চার্জশিট নেই! বরং দিল্লিতে তখন দেখা যাচ্ছে অন্য ছবি। সংসদে কক্ষ সমন্বয়ে কংগ্রেসের পাশে এনসিপি, ডিএমকে, সিপিএমের মতো দলগুলি থাকলেও বহু সময়েই তৃণমূল সেই দলে নেই। স্বতন্ত্র। ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও’ টাইপের! গুলাম নবি আজাদের মতো প্রবীণ কংগ্রেস নেতা তথা রাজ্যসভায় বিরোধী দলনেতা তখন দিনের পর দিন সংসদে নিজের ঘরে বসে সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেছেন, বিভিন্ন বিল নিয়ে ভোটাভুটিতে অনুপস্থিত থেকে বা ওয়াক আউট করে নরেন্দ্র মোদী সরকারকে সুবিধা করে দিচ্ছে তৃণমূল।

    পরে ২০১৬ সালের ভোটের সময় বাংলায় প্রচারে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী হাতে গুনে কয়েক দিন দিদি-দিদি, চিটফাণ্ড-সিন্ডিকেট চিৎকার করলেন। তার পর আপাতদর্শনে ফের শীতঘুমে চলে গেল সিবিআই তদন্ত। মাঝে আবার সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, তাপস পাল গ্রেফতার হলেন। আবার চুপ।

    এবং এই প্রতিটা নীরবতা পালনের সময়েই পশ্চিমবঙ্গের প্রদেশ কংগ্রেস, সিপিএম নেতারা এবং পর্যবেক্ষকদেরক অনেকেই অভিযোগ করেছেন, নিশ্চয়ই কোনও আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়েছে। আবদুল মান্নানের মতো কোনও কোনও নেতা তো ঠোঁটকাটা। বলতেন, মোদী-দিদি আঁতাঁতের জন্যই তো থমকে যাচ্ছে তদন্ত। অর্থাৎ সিবিআইয়ের অপব্যবহার নিয়ে অভিযোগের যদি সত্যিই কোনও সারবত্তা থাকে, তা হলে তার সুফল এবং কুফল– তৃণমূল দু’টোই পেয়েছে ও পাচ্ছে বলে মনে করেন অনেকে।

    গোটা ব্যাপারটাকে আরও খানিকটা বিস্তৃত করা যাক। পুলিশ ও প্রশাসনের অপব্যবহার নিয়ে দিল্লি সরকারের বিরুদ্ধে যেমন রাজনৈতিক শ্রেণির অভিযোগ রয়েছে, বাংলায় কি তা নেই? দিব্যি রয়েছে। অধীর চৌধুরী, সোমেন মিত্র, আবদুল মান্নান, সূর্যকান্ত মিশ্র, দিলীপ ঘোষ, মুকুল রায়– প্রত্যেকেই বারবার অভিযোগ করেছেন, পুলিশ ও প্রশাসনকে দিয়ে বিরোধীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা সাজাচ্ছে তৃণমূল সরকার। বাংলায় গণতান্ত্রিক পরিবেশ নেই।

    কিন্তু… হ্যাঁ, এর পরেও একটা কিন্তু রয়েছে। সেটা হল, রবিবারের অনেকেরই হয়তো মনে হয়েছে, বাংলায় এ সবই হচ্ছে ক্ষুদ্র পরিসরের মধ্যে। এর ব্যপ্তি ও প্রভাব সর্বভারতীয় স্তর পর্যন্ত পৌঁছবে না। এর কোনও লোকালাইজড ট্রিটমেন্ট নিশ্চয়ই খুঁজে বার করা যেতে পারে। কিন্তু দিল্লিতে ভারসাম্য নষ্ট হলে, সিবিআই তথা রাষ্ট্রশক্তির অপব্যবহার হলে সংকট দেশের। সেই ক্ষতি অপূরণীয় হয়ে উঠতে পারে।

    সুতরাং, সব মিলিয়ে মোদ্দা বিষয় কী দাঁড়াল? মোদীর জন্যই কি বৈধতা পেয়ে গেল না মমতা?

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More