শুক্রবার, জানুয়ারি ১৮

ক্ষুব্ধ দুই ‘রাম’কে খুশি করতেই কি এমন সংরক্ষণের প্রস্তাব?

শামিম আহমেদ

নর্দমা বা সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কার করতে গিয়ে মৃত্যুর ঘটনা ভারতে নতুন নয়। এমন কাজ কারা করেন? দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ। পক্ষান্তরে ‘শুচি’ হয়ে গায়ে পরিষ্কার বস্ত্র চাপিয়ে পূজা-আর্চার মতো যে কাজগুলো ভারতবাসী করেন তাঁদের মধ্যে দলিতদের সংখ্যা কত? এমন প্রশ্ন ওঠে। স্বাধীনতার এত বছর পরেও তথাকথিত স্পৃশ্য-অস্পৃশ্য কাজের বিভাজন দূর হয়নি। দলিতদের উপর অত্যাচার বেড়েছে। হাজার বছরের সামাজিক ক্ষত নিয়ে তাঁরা দিন গুজরান করেন। এমন বিভাজন ঘোচানোর জন্য দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা যে একেবারে ভাবেননি, এমন নয়। স্বাধীনতার পরেই দেশে শিক্ষা, চাকরিতে সংরক্ষণের ব্যবস্থা হয়েছিল। অবশ্য স্বাধীনতা-পূর্ব কালেও এমন সংরক্ষণের কথা কেউ কেউ ভেবেছিলেন। যেমন ১৮৮২ কিংবা ১৮৯১ সালে ব্রিটিশ ভারতে সংরক্ষণের কথা ভাবা হয়েছিল। কোলাপুরের রাজা সাহু অ-ব্রাহ্মণ এবং অনুন্নত মানুষদের জন্য সংরক্ষণের কথা ভেবেছিলেন।

স্বাধীনতার পরে যে সংবিধানসম্মত সংরক্ষণের কথা চিন্তা করা হয়েছিল তার মূলে ছিল পিছিয়ে পড়া মানুষদের উন্নয়নের ভাবনা। নিছক ভোটের রাজনীতি নয়। এবং সেই সংরক্ষণের মানদণ্ড ছিল জাতি-বর্ণভিত্তিক। দীর্ঘকাল যে অত্যাচার দলিতদের উপর হয়েছে, অসাম্য ও বঞ্চনার শিকার তাঁরা হয়েছিলেন তার একটা সুরাহার কথা, ন্যায়বিচারের কথা ভাবা হয়েছিল। সংবিধানে সকল মানুষের সমান অধিকার বা সাম্যের যে ধারণা ছিল এমন পরিকল্পনার মূলে। এর প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল, সমাজের বঞ্চিত মানুষদের সামাজিক ও শিক্ষাগত উন্নয়ন। মূলত দলিতদের কথা ভাবা হয়েছিল সেখানে। ‘উচ্চবর্ণ’-এর কথা ভাবা হয়নি, তার কারণ ‘উচ্চ’ শব্দটির মধ্যেই নিহিত রয়েছে। উচ্চ বর্ণ মানেই হল সমস্ত উন্নয়ন ভোগ করা মানুষজন। অবশ্য এখন দিন সামান্য বদলেছে। ভারতে এক কালে যে বর্ণব্যবস্থা চালু ছিল তার ছায়া আজও গোটা দেশকে তাড়া করে বেড়ায়। তাই উচ্চ বর্ণের সংরক্ষণের কথা বললে স্ববিরোধিতা এবং তোষণের একটা কটূ গন্ধ পাওয়া যায়। নাকে আসে কায়েমি স্বার্থের বদবুও। দলিতদের সংরক্ষণের মানদণ্ড নিয়ে অনেক প্রশ্ন ওঠে, সেগুলির মধ্যে কোনও কোনও প্রশ্ন ন্যায্যতার দাবি রাখে। সেই নিয়ে প্রতর্ক ও সিদ্ধান্ত হতে পারে। ভাবা যেতে পারে, সংরক্ষণ নামক বিষয়টির আমূল সংস্কার করে কীভাবে তার সুফল সর্বোচ্চ করা যায়। কিন্তু উচ্চ বর্ণের জন্য চাকরি ও শিক্ষাতে যে ১০ শতাংশ সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা, তার যৌক্তিক ও সামাজিক ভিত্তি নিয়ে নানাবিধ প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

উচ্চবর্ণের সংরক্ষণ নিয়ে যে এই প্রথম কথা উঠল, এমন নয়। ইতিপূর্বে মায়াবতী এবং রামদাস আঠবল এই নিয়ে আন্দোলন করেছিলেন, যদিও সেই আন্দোলনের তীক্ষ্ণতা ছিল ভোঁতা। গত শতকের নব্বই দশকে পিভি নরসিংহ রাও এমন সংরক্ষণের কথা বলেছিলেন বটে, তবে তার ভিত্তি ছিল অর্থনৈতিক মানদণ্ড। সেই প্রস্তাব সর্বোচ্চ আদালত খারিজ করে দেয় কারণ সংরক্ষণ কখনও ৫০%-এর বেশি করা যাবে না, এই ছিল আদালতের যুক্তি।

মোদী সরকারের মন্ত্রিসভা উচ্চবর্ণের সংরক্ষণের জন্য অর্থনৈতিক মানদণ্ড খাড়া করেছেন। মাসে ৭৫ হাজার টাকার কম রোজগেরে অর্থাৎ বার্ষিক ৮ লক্ষের নীচে যাঁরা উপার্জন করেন তাঁরা এমন সংরক্ষণের আওতাভুক্ত হবেন। এছাড়া জমির পরিমাণ হতে হবে ৫ একরের নীচে এবং/ বা বাসগৃহের পরিমাণ হবে ১০০০ স্কোয়ার ফুটের নীচে ইত্যাদি। কারা কারা তালিকাভুক্ত হবেন সেই নিয়েও একটা প্রাথমিক তালিকা সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে। উত্তর ভারতের ব্রাহ্মণ, বানিয়া, রাজপুত, কায়স্থ, খতরি, বৈষ্ণব; উত্তর-পূর্ব ভারতের অহোম, কায়স্থ, কায়স্থ করণ, খণ্ডিয়ত; পশ্চিম ভারতের পতিদার/ পটেল, মারাঠা। চন্দ্রসেনীয় কায়স্থ; দক্ষিণ ভারতের কাম্মা, রেড্ডি, কাপু, গোমতী বানিয়া, বেলাম্মা, ভোক্কালিগা, লিঙ্গায়ৎ, নায়ার, বেল্লালার, মুক্কুলাঠোর, সেনগুন্তার, পারকাবাকুলাম, নাগারাম বানিয়া। এই যে তালিকা তার নিশ্চয় সংযোজন-বিয়োজন হতে পারে কিন্তু প্রাথমিকভাবে দেখা যাচ্ছে, বাংলার কোনও উচ্চবর্ণ এখন অব্দি তালিকায় স্থান পায়নি। যদিও একজন বিজেপি নেতা বলেছেন, এতে নাকি ক্রিশ্চান, মুসলমানরাও উপকৃত হবেন।

উচ্চবর্ণ বললে আমাদের মনে সাধারণত ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের কথা ভেসে আসে। বাংলায় ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বৈশ্য-শূদ্র এমন বিভাজনের চেয়ে ব্রাহ্মণ ও শূদ্রের বিভাজন বেশি চোখে পড়ে। শাস্ত্রের কথা মানতে গেলে অনেক তর্ক ওঠে। বর্ণ নিয়ে নানা কথা সেখানে আছে। এক বর্ণের মানুষ অন্য বর্ণের কাজ করতে পারেন না, যদিও ব্রাহ্মণের ক্ষত্রিয়বৃত্তি এবং ক্ষত্রিয়ের ব্রাহ্মণ্যবৃত্তির কথা পাওয়া যায়। ব্যস, ওইটুকুই। তবে এখন যুগ পালটেছে। কিন্তু বর্ণ-জাতি নামক মানদণ্ডটি পালটায়নি। সামাজিক ক্ষেত্রে বর্ণব্যবস্থা আগের মতোই টিকে আছে। এই দেশে সবচেয়ে বেশি ব্রাহ্মণ বাস করেন উত্তরাখণ্ড এবং হিমাচল প্রদেশে। কিন্তু সারা দেশে ব্রাহ্মণদের সংখ্যা মাত্র ৬.৩ শতাংশ। তপশিলি জাতি ২০%, উপজাতি ৯ শতাংশ, অন্যান্য পিছড়ে বর্গ ৪১%, মুসলমান ১৫%, ক্রিশ্চান ২.৩%, শিখ ২%, বৌদ্ধ ও জৈন মিলিয়ে ১%। সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে উচ্চবর্ণ কীভাবে ১০ শতাংশ সংরক্ষণ পেতে পারে, তা নিশ্চয় একটা বড় প্রশ্ন।

সারা দেশে মুসলমান ও দলিতদের উপর নির্যাতন বাড়ছে। সরকার একটা সময় দলিত রক্ষা আইন তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তীব্র আন্দোলনের মুখে তা ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হন খাতায় কলমে। কিন্তু যে অনুন্নত জাতিকে সামাজিক সুরক্ষা দেওয়ার অভিপ্রায়ে সংরক্ষণের আওতায় আনা হয়েছিল, তাদের উপর অত্যাচার বাড়িয়ে এবং উচ্চবর্ণের মন পেতে সংরক্ষণ চালু করার চেষ্টা এই সরকারের নীতি-বর্শামুখ নির্দিষ্ট করে দেয়। সেই বর্শামুখ হল সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করা এবং ওই অস্থির পরিবেশে ভোট শিকার করা। অসাম্য দূর করা যদি সংরক্ষণের লক্ষ্য হয় তবে কোন যুক্তিতে ‘উচ্চ’ বর্ণ সংরক্ষণ পেতে পারে, তা যেন সোনার পাথরবাটির মতো অদ্ভুত ঠেকে। এই দেশে মোট চাকরির ২ শতাংশ সরকারি, ৯৮% বেসরকারি। মনে রাখতে হবে, বেসরকারি ক্ষেত্রে কোনও সংরক্ষণ নেই। সেখানে চিত্র বদলের সামান্য লক্ষণও দেখা যায়নি। নিম্নবর্ণের মানুষ বেসরকারি তেমন কোনও পদে নেই বললেই চলে, অবশ্য নালি-নর্দমা সাফ, ঝাড়ুদার বা মল পরিষ্কার প্রভৃতি কয়েকটি ক্ষেত্র বাদ দিলে।

ভোটের আগে উচ্চবর্ণের জন্য সংরক্ষণের এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে যে কারণটি রয়েছে বলে মনে করা হয়, তা হল উচ্চ বর্ণের মানুষদের ভোট আদায় করা। এখন উচ্চের বিপরীত কোটিতে যে মানুষরা বাস করেন তাঁরা যদি এমন প্রশ্ন তোলেন যে উচ্চ বর্ণের যতটুকু অস্তিত্বের পরিমাণ ততটুকু সংরক্ষণ তাঁদের দিয়ে বাকিটা সাধারণ করে দেওয়া হোক এবং ওই উচ্চ বর্ণ সাধারণ কোটাতে চাকরি পাবেন না। তাহলে কেমন অঙ্ক হবে সেটা? এই সরকারও জানেন যে উচ্চ বর্ণের দশ শতাংশ সংরক্ষণ কার্যকরী করার জন্য সংবিধান সংশোধন করা প্রয়োজন। পরিবর্তন করতে হবে সংবিধানের ১৫ নম্বর ধারা। তার আগে বা পরে তো রয়েছেই উচ্চ আদালত। ভোটে উচ্চবর্ণের সমর্থন আদায়ের পথ কিন্তু মসৃণ নয়। আসল যে বিষয়, তা হল, এনডিএ এখন অস্তিত্ব রক্ষার মরিয়া লড়াইয়ে ব্যস্ত। অসম গণ পরিষদ এনডিএ ছেড়েছে, পিডিপির সঙ্গে বিচ্ছেদ পূর্বেই হয়েছে, নীতিশ কুমার চলে যাওয়ার রাস্তা খুঁজছেন, শিব সেনা নানা কারণে প্রধান শরিককে অপদস্ত করছে, বিজেপির অন্দরে যোগী-মোদীর বিরুদ্ধে ক্রোধ পুঞ্জীভূত হচ্ছে।  দুই শরিক–লোকজনশক্তির রামবিলাস পাসোয়ান আর আরপিআইয়ের রামদাস আটাওয়ালে—এই দুই নরচন্দ্রমা দীর্ঘদিন উচ্চ বর্ণের সংরক্ষণ চাইছিলেন। ক্ষুব্ধ দুই রামকে খুশি করতেই নাকি এমন সংরক্ষণের প্রস্তাব।

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

শামিম আহমেদ দর্শনের অধ্যাপক। উপন্যাস, গল্প ও প্রবন্ধ লেখেন।

ফাইল চিত্র 

Shares

Comments are closed.